x

প্রকাশিত ৯৬তম সংকলন

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

মজার মানুষ রবীন্দ্রনাথ

sobdermichil | মে ০৯, ২০১৭ |
মজার মানুষ রবীন্দ্রনাথ
১)

মরিস সাহেব ছিলেন শান্তিনিকেতনে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার অধ্যাপক। একা থাকলে তিনি প্রায়ই গুনগুন করে গান গাইতেন। একদিন তিনি তৎকালীন ছাত্র প্রমথনাথ বিশীকে বললেন, জানো গুরুদেব, চিনির ওপর একটি গান লিখেছেন, গানটি বড়ই মিষ্টি।’ প্রমথনাথ বিশী বিস্মিত হয়ে বললেন, “কোন গানটা? তার আগে বলুন, এই ব্যাখ্যা আপনি কোথায় পেলেন?”

উত্তরে মরিস সাহেব জানালেন, ‘কেন, স্বয়ং গুরুদেবই তো আমাকে এটা বলে দিয়েছেন।’

অতঃপর তিনি গানটি গাইতে লাগলেন, ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে, ওগো বিদেশিনী, তুমি থাকো সিন্ধুপারে…। ’প্রমথনাথ বিশী মুচকি হেসে বললেন, তা গুরুদেব কিন্তু ঠিকই বলেছেন, চিনির গান তো মিষ্টি হবেই”।

২) 

শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক বিধুশেখর শাস্ত্রীকে রবীন্দ্রনাথ একবার লিখে পাঠালেন, ‘আজকাল আপনি কাজে অত্যন্ত ভুল করছেন। এটা খুবই গর্হিত অপরাধ। এজন্য কাল বিকেলে "আমি আপনাকে আমি দন্ড দিব ।”

গুরুদেবের এহেন কথায় শাস্ত্রী মশাই তো একেবারে অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন । এমন কি অন্যায় তিনি করেছেন যার জন্য তার দন্ডপ্রাপ্য ?

চিন্তিত, শঙ্কিত শাস্ত্রী মশাই পরদিন শশব্যস্তে কবির কাছে উপস্থিত হলেন। আগের রাতে দুশ্চিন্তায় তিনি ঘুমাতে পারেননি। এখনো তাঁকে বেশ কিছুক্ষণ উত্কণ্ঠার মধ্যেই বসিয়ে রেখেছেন কবিগুরু। অবশেষে পাশের ঘর থেকে একটি মোটা লাঠি হাতে আবির্ভূত হলেন কবি। শাস্ত্রী মশাই তখন ভয়ে কাণ্ডজ্ঞান লুপ্তপ্রায়। তিনি ভাবলেন, সত্যি বুঝি লাঠি তাঁর মাথায় পড়বে। কবি সেটি বাড়িয়ে ধরে বললেন, ‘এই নিন আপনার দণ্ড! সেদিন যে এখানে ফেলে গেছেন, তা একদম ভুলে গেছেন।’

৩) 

একদিন সকালবেলায় রবীন্দ্রনাথ জলখাবার খেতে বসেছেন। প্রমথনাথ এসে তার পাশে বসলেন। উদ্দেশ্য, গুরুদেবের খাবারে ভাগ বসানো। ফল, লুচি, মিষ্টি সবকিছুরই ভাগ পেলেন তিনি। কিন্তু তার নজর একগ্লাস সোনালি রংয়ের সরবতের দিকে যেটা তাকে দেওয়া হয়নি। গুরুদেব তার ভাব লক্ষ করে বললেন, “কী হে এই সরবত চলবে নাকি?” প্রমথ তাতে খুব রাজি। অমনি গুরুদেব বড় এক গ্লাসে সেই সরবত প্রমথকে দেওয়ার আদেশ দিলেন। বড় গ্লাস ভর্তি হয়ে সেই সোনালি সরবত এল। প্রমথনাথ এক চুমুক খেয়েই বুঝলেন সেটা চিরতার সরবত। এদিকে গুরুদেব তার মুখের দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছেন। ভাবখানা এমন-- ‘কেমন জব্দ’।

৪) 

একবার রবীন্দ্রনাথ ঘুমোচ্ছেন। ঘরের জানালা খোলা। জানালা দিয়ে চাঁদের আলো আসছে। ফুটফুটে জ্যোৎস্না। আলোতে ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথ ভৃত্য মহাদেবকে ডেকে বললেন, “ওরে মহাদেব, চাঁদটাকে একটু ঢাকা দে বাবা।”

মহাদেব তো হতভম্ব। চাঁদ সে কীভাবে ঢাকা দেবে?

গুরুদেব হেসে বললেন, “জানালাটা বন্ধ কর, তাহলেই চাঁদ ঢাকা পড়বে।”


৫)

রবীন্দ্রনাথ তার ভক্ত ও ছাত্রছাত্রীদের সামনে গান গাইছেন, ‘হে মাধবী, দ্বিধা কেন?’

তখন ভৃত্য বনমালী আইসক্রিমের প্লেট নিয়ে তার ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বনমালী ভাবছে ঘরে ঢুকবে কি ঢুকবে না। কারণ রবীন্দ্রনাথ গান গাইছেন, এ সময় বিরক্ত হবেন কিনা কে জানে। গুরুদেব বনমালীর দিকে তাকিয়ে গাইলেন, ‘হে মাধবী, দ্বিধা কেন?’

বনমালী আইসক্রিমের প্লেট গুরুদেবের সামনে রেখে লজ্জায় ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘বনমালীকে যদিও মাধবী বলা চলে না। তবে তার দ্বিধা মাধবীর মতোই ছিল। আর আইসক্রিমের প্লেট নিয়ে দ্বিধা করা মোটেই ভালো নয়।’

৬) 

সাহিত্যিক ‘বনফুল’ তথা শ্রীবলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের এক ছোট ভাই বিশ্বভারতীতে অধ্যয়নের জন্য শান্তিনিকেতনে পৌঁছেই কার কাছ থেকে যেন জানলেন, রবীন্দ্রনাথ কানে একটু কম শোনেন। অতএব যা বলতে হবে চিৎকার করে বলতে হবে। আশ্রমে এসেই তিনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। রবীন্দ্রনাথ যখন বললেন, ‘কী হে, তুমি কি বলাইয়ের ভাই কানাই নাকি’, তখন বলাইবাবুর ভাই চেঁচিয়ে জবাব দিলেন, ‘আজ্ঞে না, আমি অরবিন্দ।’

রবীন্দ্রনাথ তখন হেসে উঠে বললেন, ‘না কানাই নয়, এ যে দেখছি একেবারে সানাই।’


৭) 

একবার এক মহিলা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্য কিছু পিঠা বানিয়ে নিয়ে যান। কেমন লাগল পিঠা জানতে চাইলে কবি গুরু উত্তর দেন- লৌহ কঠিন, প্রস্তর কঠিন, আর কঠিন ইষ্টক, তাহার অধিক কঠিন কন্যা তোমার হাতের পিষ্টক।


৮) 

এক সভা শেষে ফিরবার পথে কবিগুরু চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়কে বললেন -“দেখলে চারু আমার প্রায়শ্চিত্য । আমি না হয় গোটা কয়েক গান কবিতা লিখে অপরাধ করেছি । তাই বলে আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে এরকম যন্ত্রণা দেয়া কি ভদ্রতা সম্মত । গান হল কিন্তু দুজনে প্রাণপন শক্তিতে পাল্লা দিতে লাগলেন যে , কে কত বেতালা বাজাতে পারেন আর বেসুরা গাইতে পারেন । গান যায় যদি এ পথে তো বাজনা চলে তার উলটো পথে । গায়ক বাদকের এমন স্বাতন্ত্র্য রক্ষার চেষ্টা আমি আর কস্মিনকালেও দেখিনি । তারপর ঐ একরত্তি মেয়ে , তাকে দিয়ে নাকিসুরে আমাকে শুনিয়ে না দিলেও আমার জানা ছিল যে , তঁবু মঁরিতে হঁবে । ” উল্লেখ্য , গানের প্রথম লাইন ছিল ‘তবু মরিতে হবে ‘।

৯)

মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবী কবিগুরুকে বেশ কয়েকদিন ধরে নিরামিষ খাওয়াচ্ছিলেন । তো একদিন মৈত্রেয়ী দেবী কিছু খাবার নিয়ে এসে বললেন -“এটা একটু খাবেন ?রোজ রোজ আপনাকে কি নিরামিষ খাওয়াবো ভেবে পাইনা ।”

কবিগুরু বললেন -“ও পদার্থটা কি?”

মৈত্রেয়ী দেবীর উত্তর-ব্রেইন ।

তখন কবিগুরু বললেন-“এই দেখ কান্ড , এ তো প্রায় অপমানের শামিল । কি করে ধরে নিলে যে, ঐ পদার্থটার আমার প্রয়োজন আছে? আজকাল কি আর আমি ভাল লিখতে পারছিনে ?”

১০)

কবিগুরু নাকি বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে গিয়ে মেয়ের মা’কে পছন্দ করে এসেছিলেন । স্বয়ং কবির মুখেই শোনা যাক সেই কাহিনী :-

“মেয়ের বাবা অনেক পয়সা কড়ির মালিক। বাসায় যাবার পর, দুটো অল্প বয়সী মেয়ে এসে উপস্থিত হলো। একটি মেয়ে নেহাত্ সাধাসিধে , জড়ভরতের মত এক কোনে বসে রইল এবং অন্যটি যেমন সুন্দরী তেমনি স্মার্ট । কোন জড়তা নেই । শুদ্ধ উচ্চারনে ইংরেজিতে কথা বলছে। ওর সঙ্গে কথা হল। আমাদের পিয়ানো বাজিয়ে শোনালো । আমি মুগ্ধ , বিস্মিত । মনে মনে ভাবছি , সত্যিই কি আমি ওকে পাবো । ভাবনায় ছেদ পরলো । বাড়ির কর্তা তখন ঘরে ঢুকলেন । ঘরে ঢুকেই তিনি মেয়েদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন । সুন্দরী, স্মার্ট মেয়েটিকে দেখিয়ে তিনি বললেন , হেয়ার ইজ মাই ওয়াইফ । আর জড়ভরতটিকে দেখিয়ে বওলেন, হেয়ার ইজ মাই ডটার ।আমি তো শুনে থ হয়ে গেলাম । যা হোক, বিয়ে হলে মন্দ হতো না। সাত লাখ টাকা পাওয়া যেতো । বিশ্বভারতীর কাজে ব্যয় করতে পারতাম। তবে শুনেছি, মেয়েটি নাকি বিয়ের দু’বছর পরই বিধবা হয় । যাক, বাঁচা গেছে । কারণ স্ত্রী বিধবা হলে আমার প্রাণ রাখা শক্ত হতো ।"

১১ ) 

একবার মৈত্রেয়ী দেবী কবিগুরুকে জিজ্ঞেস করলেন ,’আপনার বিয়ের গল্প বলুন ।’

কবি জবাব দিলেন ,” আমার কোনো বিয়ের গল্প নেই । বৌঠানরা বিয়ের জন্য জোরাজোরি শুরু করলে আমি বললাম ,তোমাদের যা ইচ্ছা কর । আমার কোন মতামত নেই । তারপর বোঠানরাই যশোরে গিয়েছিলেন । আমি বলেছি ‘ আমি কোথাও যেতে পারবো না। আমার বিয়ে জোড়াসাকোতেই হবে । ‘

মৈত্রেয়ী দেবী বললেন ,” কেন আপনি বিয়ে করতেও যান নি ?” "কেন যাবো? আমার একটা মান সম্মান আছে না ? "-রবীন্দ্রনাথের সাফ জবাব ।

১২ ) 

একবার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে চীন ভ্রমনে গিয়েছিলেন সেন মশাই (ক্ষিতিমোহন সেন )।আর সেটা ছিলো আমের মরশুম । কবিগুরু আম ভালবাসেন যেনে চীন কর্তৃপক্ষ আম আনালেন বাংলাদেশ থেকে । তখন তো আর দ্রুত যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল না । আম যেন না পচে তাই রাসায়নিক মিশানো হয়েছিল । কিন্তু আম যখন চীনে পৌছল তখন সেগুলি শুকিয়ে চুপসে গিয়ে রপান্তরিত হয়েছিল এক অদ্ভুত বস্তুতে । খাবার টেবিলে দেয়া হলো রবীন্দ্রনাথ , তার ভাগ পেলেন সেন মশাইও। চীনের লোক তো আর আম চেনে না , কবিকে তার প্রিয় খাদ্য দিতে পেরে ভারি খুশি । তাদের মনোরঞ্জনের জন্য এত কষ্ট করে আনা আম গলধঃকরণ করলেন দু’জনেই মুখ বুজে ।কবিকে সেন মশাই জিজ্ঞেস করলেন -“কেমন আম খেলেন গুরুদেব ? ” মৃদু হেসে জবাব দিলেন কবি-“আম খেতে খেতে মনে হচ্ছিল এক রবীন্দ্রনাথ আর এক রবীন্দ্রনাথের দাড়িতে তেতুল গুড় মেখে চুষছে ।”

১৩ ) 

একবার শান্তিনিকেতনে ওজনের একটি মেশিন ক্রয় করা হয় এবং এতে ছেলেমেয়েদের একে একে ওজন নেয়া হচ্ছিল । রবীন্দ্রনাথ দাড়িয়ে দাড়িয়ে তা লক্ষ করছিলেন ।এক একজনের ওজন শেষ হলেই কবি তাকে জিজ্ঞাসা করছিলেন -কিরে তুই কত হলি !

এর মধ্যে একটি স্থুলাঙ্গী মেয়ে বলল -দু’মন ।

এই মেয়েটির সে সময় বিয়ের আলাপ চলছিল এবং কবি তা জানতেন । তাই তিনি পরিহাস করে বললেন -“তুই এখনও দু’মন , এখনও এক মন হলি নে”।

১৪ ) 

কবিগুরুকে এক ভদ্রলোক লেখেন -আপনি কি ভুতে বিশ্বাস করেন ?

কবি উত্তরে লিখলেন-"বিশ্বাস করি বা না করি -তবে তাদের দৌরাত্ব মাঝে মাঝে টের পাই -সাহিত্যে , পলিটিক্সে সর্বত্রই একেক সময় তুমুল দাপাদাপি জুড়ে দেয় এরা । দেখেছি -দেখতে ঠিক মানুষের মত ।"


তথ্য সুত্র :

১। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় :- রবীন্দ্র জীবন ও রবীন্দ্র সাহিত্য প্রবেশক।
২। প্রমথনাথ বিশী :- রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন
৩। মৈত্রেয়ী দেবী :-মংপুতে রবীন্দ্রনাথ
৪। সীতাদেবী :- পুন্যস্মৃতি
৫। প্রতিমা ঠাকুর :- নির্বাণ
৬। রানী চন্দ :- আলাপচারী রবীন্দ্রনাথ


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.