x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

মঙ্গলবার, মে ০৯, ২০১৭

পূজা মৈত্র

sobdermichil | মে ০৯, ২০১৭ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
নাসবন্দি
সকাল সকাল মুডটা বিগড়ে গেল মুন্নার। জলদি হাসপাতাল পৌঁছতে হবে, নাসবন্দি ক্যাম্প আছে-তড়িঘড়ি করে সাইকেল চালাচ্ছিল। ঐ বলে না-তাড়াতাড়ি করলে বাড়াবাড়ি হয়, হাসপাতাল থেকে কিলোমিটার খানেক আগে সাইকেলটা গেল পাংচার হয়ে। সামনের টায়ারটা এই নিয়ে এই মাসে চারবার পাংচার হল। টায়ারেরই বা দোষ কি? আজকের সাইকেল তো নয়। বাবার সাইকেল নয় নয় করে বছর চল্লিশেক বয়স। ওটাকেই পার্টস পাল্টে পাল্টে চালায় মুন্না। নাঃ। সামনের চাকাটা এবার না বদলালেই নয়। আজ করাতে পারলে কাল কড়া উচিত হবে না। অথচ হাতে যা টান। সামনে বোনের বিয়ে। মাস দেড়েক পরেই। বাবার জমানো যা ছিল,সব খরচা হয়ে যাবে। ছেলে মুম্বাই-এ সোনার দোকানে কাজ করে। ভালো পাত্র। ইনকাম মন্দ নয়। নেশা ভাঙ করে না। বখাটে নয়। আর কি চাই? হাজার পঞ্চাশ নগদ,খাট,আলমারি,ড্রেসিং টেবিল,টিভি, ভরি তিনেক সোনা-এ তো সবাই নেয়। উপরি শুধু একটা বাইক চেয়েছে। তা বলে তো আর পিছিয়ে আসা যায় না— 

শালা! সাইকেলটা হাঁটাতে হাঁটাতে রাগ ধরছিল মুন্নার। কত কষ্ট করে বাবলাদাকে বলে সরু চ্যানেল করে রেলের ডি-গ্রুপে একটা চান্স করেছিল মুন্না-সব ভেস্তে গেল। বাবা এর পরে আর মুন্নাকে টাকা দেবে কি করে? মুন্নাও বা কোন মুখে চাইবে? যতই হোক-একটা মাত্র বোনের সারাজীবনের ব্যাপার-মুন্নার আর কি? এভাবেই তো সাতাশটা বছর চলে গেল। হায়ার সেকেন্ডারিতে ইংরাজিতে ব্যাক পেয়ে আর পড়াশুনা হয়নি। রানাদের গ্যাংটায় নাম লিখিয়ে ফেলেছিল সেবার থেকেই। বিনপাড়ার ছেলেপিলেদের মত অ্যাকশন করার ধক নেই মুন্নার-তবুও ওদের সাথ দিত। মদ,গাঁজা,ডেনড্রাইট সবই চলত পুরোদমে। বছর তিনেক হল ওদের সঙ্গ ছেড়েছে। চাঁপা বলে বলে ছাড়িয়েছে।চাঁপা ওদের পাড়ার মেয়ে। কলেজে পড়ে। বি.এ ফাইনাল দেবে এবার। মুন্নার মধ্যে ও কি দেখেছে, মুন্না জানে না-তবে বড্ড ভালোবাসে ওকে। মুন্না এতে বেশ অবাক হয়। চাঁপার গায়ের রংটাই যা চাপা, নাহলে বাকি সব ঠিকঠাক। যেখানে যতটুকু দরকার ততটুকুই রয়েছে-ফিটিং একদম। আজ বললে কালকেই চাকরিওয়ালা ছেলের সাথে বিয়ে হয়ে যাবে। অথচ চাঁপা বলে ও বিয়ে করলে নাকি মুন্নাকেই করবে।নিজেকে আয়নায় দেখে মুন্না,প্রায়শই দেখে। বেশ লম্বা ও। ছিপছিপে চেহারা। গাঁজা টেনে ধসে গেছিল ফিগারটা। এখন অনেকটা হাল ফিরেছে। গায়ের রং একসময় বেশ ফরসা ছিল। এখন রোদে জলে পুড়ে গেছে অনেকটা। নাক,চোখ,ঠোঁট নিখুঁত বলা যায়। হাল্কা দাড়ি রাখে মুন্না। দাড়ি না রাখলে নিজেকে বেমানান লাগে কেমন। তবে দশ বছর আগে ওকে হিরোর মত দেখতে ছিল-মুন্না এটা মানে। এখন যেটা পড়ে আছে সেটা ধ্বংসাবশেষ বলা যায়। তবুও চাঁপার ওকেই পছন্দ। চাঁপার জন্যই চাকরির চেষ্টা করছে। হাসপাতালে দালালির ধান্দাটা চাঁপার বড় জামাইবাবু বিমানদার হাত ধরেই শেখা। চাঁপার অপছন্দের কাজ। বছর দুই ধরে এই ধান্দায় আছে মুন্না। বেশ নাম হয়েছিল চালাক চতুর ছেলে ও। ডাক্তার,নার্স,আয়া থেকে গ্রুপ ডি স্টাফ সবার পালস বোঝে। কোন দেবতা কোন ফুলে তুষ্ট হয়,ভালোই জানে। বছর দেড়েক ধরে বিমানদার অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল। বেগার খেটেছে প্রায়। মুখ বুজে খেটেছে। ব্যবসায় ঘাঁতঘোতগুলো জানার অপেক্ষা ছিল শুধু। মাস ছয়েক হল নিজের আলাদা একটা ব্যবসা ধরেছে। ওষুধ কোম্পানি নিয়েছে একটা। যা জমানো টাকা ছিলো ওর,সব দিয়ে উপরি চাঁপার টিউশন করে জমানো টাকার থেকেও হাজার পনেরো ধার নিয়েছে। ছোট করেই ব্যবসা খুলেছে। হাসপাতালে রমরমিয়ে ব্যবসা চলছিল ব্যাগরা দিল সরকার। ন্যায্য মূল্যের দোকান হওয়ার পর থেকেই হাসপাতালে পি.ডি-র ব্যবসা চৌপাট। এখন ভরসা প্রাইভেট চেম্বারগুলো। মুন্নার মাথায় তাই প্রচুর চাপ। ডাক্তারবাবুরা অ্যাডভান্স টাকা খেয়ে নিয়েছে-হজম না করে ফেলে-এই টেনশনে রাতে ঘুম হয় না। সকাল সকাল হাসপাতালে ঢুকে পড়তে হয় তাই। সকালবেলা মুখ দেখিয়ে ফেলতে পারলে সারাদিন ডাক্তারবাবুদের মনে থাকে ওর কথা। উনাদের কলমে মুন্নার প্রোডাক্ট তখন এমনিতেই চলে আসে। কাল পরশু ওষুধ তুলতে হবে। হাজার দশেক টাকার ধাক্কা। বাপ্পাদা আজকাল ক্যাশ পেমেন্ট ছাড়া কাজ করে না। করবেই বা কি করে? হাসপাতালে নয় নয় করে প্রতি মাসে কোটি টাকার ইনজেকশনের ব্যবসা হত। ঐ ইনজেকশনগুলো এখন ঘরে পচছে। সরকারের দেওয়া ঘা দগদগ করছে বাপ্পাদার বুকে। তাই ওদের মত চুনোপুঁটির উপর চাপ বেড়েছে।হাতে পুরো দশ হাজার নেই,নাশবন্দি ক্যাম্পটা করা জরুরি তাই। গোটা পাঁচেক কেস করাতে পারবে মনে হয়। পার কেস দুশো টাকা করে পাওয়া যায়। হাজার টাকার ধান্দা হবে। মন্দ কি? যে দিক থেকে ধান্দা হয় হক। দুটো খালাস কেস ধরে দিয়েছে ডাক্তার দাস কে। আজ বিকালে নার্সিংহোমে হবে। ওখান থেকেও শ’পাঁচেক পাওয়া যাবে। বিমানদার কথাটা অক্ষরে অক্ষরে মানে মুন্না। দালালি করতে গেলে না সিঁটকানো ভাব থাকলে হবে না। নাচতে নেমে ঘোমটা টেনে লাভ নেই। ওষুধের ব্যবসা তো হালে ধরেছে মুন্না। আগে দেড় বছর পুরোদস্তুর দালাল ছিল। রক্ত পরীক্ষা,এক্সরে,ইসিজি,প্লাস্টার-এমনকি অ্যাম্বুলেন্সের দালালিও করেছে। হাসপাতাল থেকে রোগী রেফার করিয়ে নার্সিংহোমে তুলে কমিশন নেওয়া-এটাও মুন্নার বাঁ হাতের কাজ,চাঁপার কথায় ওষুধ লাইনে এসে ক’দিন জাতে উঠেছে বটে-তবে প্রয়োজনে পাঁকে নামতে দুবার ভাবে না মুন্না। যেভাবেই হোক টাকা চাই-পথটা সোজা না বাঁকা এটা ভাবতে বসলে অন্যেরা মুখের গ্রাস ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যাবে।

সাইকেল গ্যারেজে এসে বিমানদার সাথে দেখা হল। আজকাল বিমামদাকে একটু এড়িয়েই চলে মুন্না। আবার সেই পুরোনো কথা তুলবে,পুরনো কেচ্ছা ঘাঁটবে-মুন্নার এখনকার মেইন ব্যবসার ক্ষতি হবে তাতে। পুরোনো ইমেজটাকে ময়লা কাপড়ের মত ছেড়ে ফেলতে জানে মুন্না। মস্তানিটাও এভাবেই ছেড়েছিল,দালাল পরিচয়টাও মুছে দেবে, মুন্না এখন এম.আর। হাসপাতালে যে দুজন ডাক্তার ওর মাল সবচেয়ে বেশী লেখেন-সেই দুজনই নতুন। মাস চারেক হল জয়েন করেছেন। উনাদের চোখে মুন্নার সাফ সুতরো ইমেজটা রয়েছে,বিমানদার সাথে বেশী মিশতে দেখলে,তাতে কালির ছিটে পড়ে যাবে। বিমানদা তো ষ্ট্যাম্পমারা দালাল। বিমানদার দিন আজ। নয় নয় করে কুড়ি পঁচিশটা খদ্দের ধরেছে নিশ্চয়। ভালো টাকা কামাবে। সাইকেলটা পাংচার সারাতে দিয়ে গ্যারেজ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল মুন্না। চা-এর দোকানে ঢুকবে। অসীম থাকবে ওখানে। পি.ডি ব্যবসার ঘাঁতঘোঁত অসীমই ওকে শিখিয়েছে। ও এই লাইনে প্রায় বছর দশেক রয়েছে। মুন্নার বয়সী ছেলে। এই করেই বাইক কিনেছে,দোতলা বাড়ি করেছে,বিয়ে করেছে,বছর দুয়েকের মেয়ে আছে একটা। চাঁপার অসীমের বাড়িতে যাতায়াত আছে। ওর দাদার ছেলেটাকে চাঁপা পড়ায়-তাও বছর তিনেক হয়ে গেছে। ঐ সূত্রেই চাঁপা অসীমের সাথে মুন্নার যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল। অসীম দিল দরিয়া ছেলে। একা খাবে এই ভাবনাটা ওর মধ্যে নেই। তাই মুন্নাকে হেল্প করতে অরাজি হয়নি। গ্যারেজ থেকে বেরোতে যাবে,বিমানদা পিছু ডাকল

-কি রে এখন চিনতেই পারিস না যে? মুন্না বিরক্ত হল

-লক্ষ্য করিনি।বলো কেমন আছ?

-মন্দ না। তোর মত ভদ্দর লোক সাজতে যাইনি তো। কাকের যে ময়ূর হতে কি কষ্ট হয়,সে কাকই জানে। বলেই খ্যাঁকখ্যাঁকিয়ে হেসে উঠল বিমানদা।

-সকাল সকাল দিমাগ চেটো না। কাজ আছে আমার। মুন্নার গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছিল।

-কাজ তো আছেই। পাঁচটা খদ্দের ধরেছিস। ভালোই আছিস। গাছেরও খাচ্ছিস। তলারও কুড়োচ্ছিস। মুন্না চমকে ওঠে,শালা এইটাও জানে?

-কে বলল?

-আমি বলছি। সবিতা আয়াটা যে সাতজনকে নিয়ে এসেছে তার মধ্যে পাঁচটাই তোর চেনা। বেনামে চালাচ্ছিস। ক্ষীরটা তুই-ই খাবি।

-তাতে তোমার কি? নিজের ধান্দা নিজে কর।

-আমার কি মানে? শালা!সাজবি ভদ্দরলোক...আবার দালালি করবি।

-অ্যাই-বিমানদা! মুখ সামলে কিন্তু...

উতপ্ত বাক্যবিনিময় শুনে চা-এর দোকান থেকে অসীম চলে এসেছিল। ও মুন্নাকে গ্যারেজ থেকে সরিয়ে না নিয়ে গেলে বিমানদা ঘা কতক দিয়ে দিত আজ। এমনিতেই একটা পা টেনে হাঁটে। তার উপর...চা খেতে খেতে নিজেকে ধমকাল মুন্না। এসব করলে ওরই বদনাম হত,বিমানদা তো তাই-ই চায়। মুন্নার মাথা গরম করিয়ে দিয়ে ভুলভাল কিছু একটা করিয়ে দিতে পারলে-বিমানদারই লাভ। মালটা খুব বেড়েছে। চাঁপাদের বাড়ি গিয়ে সেদিন ওর বিয়ের কথা তুলেছে। চাঁপা কোনক্রমে ধামা চাপা দিয়েছে ব্যাপারটা,সামনে পরীক্ষা বলে টলে কথাটা ঘুরিয়ে দিয়েছে। এভাবে বেশিদিন আটকানো যাবে না,এটা ওরা দুজনেই জানে। চাঁপার পরীক্ষা হয়ে গেলেই পাত্রপক্ষের আলোচনা শুরু হবে। চাঁপার বাবার আবার চাকরিওয়ালা পাত্র দরকার। এইজন্যই রেলের চ্যানেলটা করেছিল মুন্না,বোনের বিয়েটা ঠিক হওয়ায় সব কেঁচিয়ে গেল। মুন্না ভবিষ্যৎটা দেখতে পায়। অঙ্ক কষে ও বোঝে চাঁপার সাথে বিয়েটা না হওয়ার সম্ভবনাই প্রবল। তাতে একটু কষ্ট হবে মুন্নার। তবে সামলে নেবে ও। চাঁপার থেকে ভালো মেয়েও বছর কয়েক পরে পাওয়া যাবে,যদি পকেটে টাকা থাকে। সিগারেট ধরাল মুন্না। চা এর দোকানের উল্টোদিকের বটগাছটার তলায় একটা পাগল বসে থাকে,যে যা দেয় খায়,কারোর কাছ থেকে কিছু চায়না। রাতে চটকাতলার শিবমন্দিরের চাতালে শুয়ে থাকে। চুপচাপ বসে থাকে,ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে কোনদিকে কে জানে। কেউ ডাকলেও জবাব দেয় না। বিড়বিড় করে একটা নাম আউড়ে যায়,“পিয়ালি...পিয়ালি...অসীম বলে পিয়ালি ওর প্রমিকার নাম।ওকে দাগা দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করে চলে গেছে। লোকটার বয়স বড় জোড় ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ হবে। দেখে মনে হয় ভালো ঘরের ছেলে। ওর বাড়ির লোক কেমন কে জানে,খোঁজ করতেও আসে না। এখানকার ছেলে,নাকি বাইরের-কে জানে? আজো বসে আছে ওখানেই। অসীম ওকে দুটো বিস্কুট দিল। অসীমের দিকে চেয়েও দেখলো না। হাত থেকে বিস্কুটটি নিয়ে গপগপ করে খেতে থাকল। পাগলটাকে বড্ড বোকা মনে হয় মুন্নার। পিয়ালির জন্য এত শোক কিসের রে বাবা? পিয়ালি গেছে অলি,কলি,মিলি কত আসবে...মনে মনে হাসে মুন্না। চাঁপার কথা মনে পড়ে ওর। ইনিয়ে বিনিয়ে প্রায়ই বলে

-শোন না,তুমি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে? মুন্না ওর মন রাখতে বলে

-না। পারব না,আর তুমি?

-আমি তো পারবই না। তাড়াতাড়ি কিছু একটা করো না। মুন্না বিরক্তি প্রকাশ করে।

-করব। দেখলেই তো,রেলটা কেমন...

-হাতছাড়া হয়ে গেল,না? অন্য কোথাও দেখ না...

-কোথায় দেখব? টাকা দরকার সবখানেই।

-কত টাকার দরকার খোঁজ তো নাও। মুন্না জানে চাঁপা যেভাবেই হোক টাকাটা জোগাড় করবে। ওর নিজের একটা সোনার হার আর কানের এক জোড়া দুল আছে। সেগুলোকেও বেচে দিতে পারে। মুন্না ওগুলো কি করে নেবে? চাঁপার শেষ সম্বল,ঐটুকুই তো আছে। বাকি যা জমানো ছিল সব মুন্না খেয়ে রেখেছে। মুন্নার মত বিদ্যা দিয়ে চাকরি হওয়া দুরাশা। কত গ্র্যাজুয়েট ছেলে মেয়ে মাথা খুঁড়ে মরছে...তার থেকে এই ভালো। ব্যবসা করেই ওকে দাঁড়াতে হবে। তাতে যদি চাঁপা বেহাত হয়ে যায়,মুন্না জানবে এটাই ভাগ্যে ছিল।

নাসবন্দির লাইনে অরুণকাকাকে দেখে চমকে উঠল মুন্না। ওকে দেখে অরুণকাকার মুখটাও শুকিয়ে আমসি হয়ে গেল। কাকির তো লাইগেশন করা আছে। হ্যাঁ-মুন্না জানে। গেল বছরের আগের বছরই যখন ওদের ছোট মেয়েটা হল,সেবার তো একেবারে লাইগেশন করিয়ে নিয়ে গিয়েছিল,তাহলে আজকে অরুণকাকা এখানে? বৌ এর লাইগেশন করা থাকলে তো নাসবন্দি হয় না। মুন্না লুকিয়ে পড়ল। আড়াল থেকে রহস্যটা জানতে চাইল। অরুণকাকার লাইন ডাক্তারবাবুর সামনে এসে গেলে,কাকা এদিক ওদিক তাকাল। মুন্না নেই দেখে আশ্বস্ত হল।

-আপনি সব জেনে শুনে মত দিচ্ছেন তো?

-হ্যাঁ।

-আপনার স্ত্রীর মত?

-আছে।

-উনার লাইগেশন করা আছে?

-না,না তো...

মিথ্যেটা বলতে একটুও তোতলাল না অরুণকাকা। মুন্নার মনে হল একবার ডাক্তারবাবুকে গিয়ে সত্যিটা বলে দেয়। পরে ভাবল,না থাক এগারোশো টাকা তো কম নয়। চার চারটে মেয়ে কাকার। বড়ো সংসার। অরুণকাকা পাওয়ার লুমে কাজ করে,কাকি বাড়িবাড়ি ঠিকে কাজ করে কিছু টাকা আনে। দুজনে মিলে যা কামায় ছয়টা পেট চালানো কঠিন তা দিয়ে,তাও এই বাজারে তাই অরুণকাকা এখানে এসেছে। ঢপ দিয়ে ফোকোটে যদি এগারোশো টাকা জটে,মন্দ কি? মুন্না চেপে গেল। আজ নাসবন্দি ক্যাম্পের হাল বেহাল। সবচেয়ে খারাপ হাল বিমানদার। মাত্র তিনটে খদ্দের ধরতে পেরেছে। মুন্না মনে মনে খুব অবাক হচ্ছিল। অবশ্য বছরখানেক ধরেই বিমানদা চাপে আছে। পুরনো দলটা ছেড়ে গিরগিটির মত রং বদলাতে পারে নি। পুরনো দলের হাতে গোনা পতাকা ধরার লোকের মধ্যে বিমানদা একজন। সবাই মিলে ওকে কর্নার করছে তাই। এভাবে চললে বিমানদা হাসপাতাল চত্বর থেকেই কোনদিন আউট হয়ে যাবে।

পিন্টুর গলা পেয়ে তাকাল মুন্না। ইশারায় ওকে ডাকছে। ও এখানে কি করছে আবার-মুন্নার বহুদিনের চেনা পিন্টু। রানাদের গ্যাং-এ ছিল। এখনও কম বেশি টিমটা করে ও। বয়স বছর চব্বিশ হবে। হেন গুন নেই যা ওর বাদ রয়েছে।

-তুই এখানে? মুন্না প্রশ্নটা করেই বসল।

-অপারেশনটা করলে এগারোশো টাকা পাওয়া যাচ্ছে বলে...পিন্টুর মতলবটা ঠিক বুঝতে পারলো না মুন্না। ওর তো বিয়েই হয় নি।

-হ্যাঁ। কাকে করাবি?

-কাকে আবার? সেলিমের কাছে অনেক দেনা হয়ে আছে, তাই ভাবছি করিয়েই নেব। আঁতকে উঠল মুন্না। বলে কি ছেলেটা? কোন অপারেশন করাতে যাচ্ছে,মানে বোঝে তো? সেলিম মানে মুচিপাড়ার সেলিম। পাতার কারবার করে। পিন্টু পাতাও ধরেছে?

-এটা বাচ্ছা বন্ধ করার অপারেশন। তোর তো বিয়েই হয়নি।

-আরে,পার্মেন্ট না।চাইলেই নালিটা খুলে নেওয়া যায়।আমাকে কেদার বুঝিয়েছে। মাথাটা গরম হয়ে গেল মুন্নার। কেদার বিমানদার নতুন শাকরেদ। এভাবে একটা জোয়ান ছেলেকে ভুল বুঝিয়ে টুপিটাপা দিয়ে মাল কামাবার তাল করেছে? খারাপ লাগল মুন্নার তবুও পিন্টুকে আটকাল না। কেদারের মুখের গ্রাস কেড়ে নিলে বিমানদার কাছে খবর যাবে। বিমানদা আবার ঘাঁটাবে ওকে...

যাক। দ্যাখ্ যদি করে...

ঘর থেকে বেরিয়ে এল মুন্না। ডাক্তার সরকার রোগী বাছছেন। ঘর থেকে বেরিয়ে হাসপাতাল চত্বরটায় এসে স্যারকে ফোন করল একটা

-স্যার,মুন্না বলছি। পিন্টু মণ্ডল বলে যে ছেলেটা আসবে,ওর বিয়ে হয়নি। হ্যাঁ স্যার। ঠিক জানি। আপনি ওর বৌ এর নাম ধাম জানতে চাইবেন...তাহলেই...বলতে বলতে থমকে গেল মুন্না,বিমানদা। দূর থেকে ওকে ঠাহর করছে। নাঃ এখানে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হবে না,পিন্টুকে স্যার বাতিল করলে সব দোষ মুন্নার ঘাড়েই পড়বে।

মনটা বেশ খুশি খুশি ছিল। মুন্নার পাঁচটা কেসই পাশ করে গেছে। অপারেশন হয়েও গেছে সবকটার। যাক হাজার টাকার ধান্দা হল। চাঁপা ফোন করেছিল একটু আগে। ওকে এসব বলা যাবে না। মুন্না এখনো দালালি করছে শুনলে রেগে যাবে। পিন্টু মুখ কালো করে হাসপাতাল থেকে চলে গেল একটু আগে। স্যার ওকে বৌএর ভোটার কার্ড আনতে দিয়েছেন। শালা! বোঝ এবার!মালটা বটতলার পাগলটার থেকেও পাগল। না হলে কেউ নিজে যেচে কটা টাকার জন্য এত বড়ো ক্ষমতা হারাতে চায়? মুন্না চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দেয়। চাঁপাটার পেট বেঁধে গিয়েছিল মাস দুয়েক আগে। মুন্নারই দোষ। চাঁপা বহুবার বলেছিল কন্ডোম নিতে। মুন্না প্রতিবার সামলাতে পারে। সেই ভরসায় কন্ডোম নেয়নি,আর যা হওয়ার তা হয়ে গেছিল। চাঁপার কি টেনশন! কিভাবে কখন কত তাড়াতাড়ি খালাশ করবে-এই চিন্তায় মরে যাচ্ছিল। ডাক্তার দাসকে বলে মুন্নাই বড়ি এনে দিয়েছিল। বড়িটা চাপাকে দিতে বুকের বাঁ দিকটা চিনচিন করছিল ওর। হাজার হোক বাচ্চাটা তো ওরই। চাঁপার বাবার এই চাকরি চাকরি ছেনালিটা না থাকলে-সেদিনই কালীবাড়ি নিয়ে গিয়ে চাঁপাকে সিঁদুর দিয়ে ল্যাটা চোকাত। খালাস হয়ে যাওয়ার পর চাঁপা ফোন করেছিল। বেশ খুশি ছিল ও। শান্তি স্বস্তি ওর গলায় ঝরে পড়ছিল।

-হয়ে গেছে,জানো তো? এত খানি মাংসের দলা বেরোল। মুন্নার গলাটা কে যেন চেপে ধরছিল। নিঃশ্বাস নিতে একটু কষ্ট হচ্ছিল ওর। তাই বলেছিল

-ও।

-যাক বাবা বাঁচলাম। নইলে যা টেনশন হচ্ছিল। যতসব উটকো ঝামেলা। সব তোমার জন্য। কতবার বলেছিলাম কন্ডোম নাও। না, তখন তো আর আরাম হবে না...মুন্নার কানে কথাগুলো পৌঁছাচ্ছিলনা। চাঁপা কি করে ‘উটকো ঝামেলা’ বলল...এটাই ভাবতে চেষ্টা করছিল ও। বাচ্চাটা তো চাঁপারও ছিল,নাকি? চাঁপা বলে বিয়ের তিন বছর পর বাচ্চা নেবে। মুন্না তর্ক করে না। তবে আজকাল ওর একটা বাজে ইচ্ছা হয়েছে। বাবা হওয়ার ইচ্ছা। বেশ কয়েকটা বন্ধু চোখের সামনে বাবা হয়ে গেল। ওদের গ্রামের ওর বয়সী প্রায় সব ছেলেরই একটা করে বাচ্চা আছে-কয়েকজনের আবার দুটো। বেশ ডাঁটো হয়ে গেছে বাচ্চাগুলো। বাবা ডাকতে পারে। ওদের কোলে,পিঠে,কাঁধে,সাইকেলে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ওদের বাবারা। মুন্নার বেশ খারাপ লাগে তখন। নেশা করে জীবনের কয়েকটা বছর নষ্ট না করলে ওরও...মনকে সামলায় মুন্না। ওরা তো সব চাষা। মুন্নার মত বিজনেসম্যান তো নয়। কত বড়ো বড়ো লোকেদের সাথে ওঠাবসা ওর।ডাক্তারদের সাথে বসে প্রায় সন্ধ্যাবেলা মাল খায় মুন্না। কথায় বলে ডাক্তার ভগবান। ভগবানের প্রসাদ পেতে গেলে একটু তপস্যা তো করতেই হবে।সবুরে মেওয়া ফলে। মুন্নার ছেলেমেয়ে সাইকেল চড়বে না। বাইক চড়বে,গাড়ি চড়বে সাইকেলটা আর সারাবে না মুন্না। এখন নাকি কিছু না দিয়েও বাইক নেওয়া যায় সহজ মাসিক কিস্তিতে। বাইক নেবে একটা।ব্যবসা বাড়াতে গেলে স্পিড চাই। ছুটতে হবে,আরো ছুটতে হবে মুন্নাকে।

বটতলার পাগলটাকে দেখতে পেল না মুন্না। গেল কোথায়? ভর দুপুরে কোথাও তো যায় না। পাগল-ছাগল তো বলাও যায় না।গেছে কোথাও। মুন্না চায়ের দাম দিয়ে হাসপাতালের ভেতরে গেল। নাসবন্দির ঘরে ঢুকতে যাবে হঠাৎ একটা খুব চেনা মুখ পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল জেন। কে বুঝেও বুঝতে পারছিল না মুন্না। বড্ড চেনা চেনা লাগছে...অথচ... পিছনে পিছনে বিমানদা বেরোল। টাকা গুনতে গুনতে।

-বিমানদা, কে...কে ও?

বিমান সেয়ানা হাসি হাসে, ‘কেমন দিলাম’ মুখ করে বলে

-চিনলি না? ওটা বটতলার পাগলটা। চিনবিই বাঁ কি করে? ওকে ভালো জামা প্যান্ট পরিয়েছি,স্নান করিয়ে নিয়েছিলাম। বাপরে! গায়ে কি গন্ধ ছিল-কতদিন স্নান করেনি কে জানে। তারপর চুল দাঁড়ি ছেঁটে...

-দাঁড়াও! কি বলছ? তুমি ঐ পাগলটার নাসবন্দি করালে?

বিমান চোখ ছোট করল

-কেন অন্যায় করলাম নাকি?

-ওর তো কোন বোধই নেই। ওর মতেরও তো কোন দাম নেই।

-আরে, রাখ তো,আমার বাজার মন্দা ছিল আজ। ডাক্তারবাবুদেরও কোটা পূরণ হচ্ছিল না। তাই এ ব্যাটাকেই ঢোকালাম। বেশ লাভই হল, বুঝলি-একটা পুরনো জামা, একটা পুরনো প্যান্ট, সেলুন,সাবান খরচ, আর যাই পেটপুরে খাইয়ে দিই গে মালটাকে... একটা কেসেই হাজার খানেক থেকে যাবে।

বিমান লাভ ক্ষতির হিসাব করছিল। মুন্না অবাক হয়ে পাগলটাকে দেখছিল। চেনাই যাচ্ছে না ওকে। আস্তে আস্তে হেঁটে চলে যাচ্ছে। বটগাছটার দিকে। বিড়বিড় করে কি বলছে এখনো। কি বলছে মুন্না জানে। “পিয়ালি...পিয়ালি...” ডাকটা খুব চেনা ওর। কি নাম ওর? পাগলটার নাম কি? যদি পিয়ালি...

-খুব তো ভেবেছিলি পিন্টের কেসটা চটকে দিয়ে বিমানদার বাড়া ভাতে ছাই দিবি। আর আমিও বিমান-বিমান দাস...ছাই থেকে সোনা খুঁজতে জানি...

মুন্নার মাথায় কিছু ঢুকছিল না আর। ওর খালি মনে হচ্ছিল যদি পিয়ালি ফিরে আসে? পাগলটা তাহলে পিয়ালিকে কি দেবে? ওর তো কিছুই রইল না আর...দরদর করে ঘামছিল মুন্না। না। আর দেরি করা ঠিক হবে না। চাঁপাদের বাড়ির দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল ও।।



Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.