x

প্রকাশিত | ৯৪ তম মিছিল

কান টানলেই যেমন মাথা আসে, তেমন ভাষার প্রসঙ্গ এলেই মানুষের মুখের ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারের কথাও মনে পড়ে যায়, বিশেষত আজকের দিনে। ভাষা দিবস মানেই শুধু মাতৃভাষা নিয়ে আবেগবিহ্বল হয়ে থাকার দিন বুঝি আজ আর নেই!

কেননা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা মাথায় বসে আছেন, বিশেষত যাঁরা রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাভােগী এবং লােভী, তাঁদের মুখের ভাষা এবং তার প্রয়ােগ আজ ঠিক কতটা শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় সেটা শুধু ভাবার নয়, রীতিমতো শঙ্কার এবং সঙ্কটের।

সবই কি তবে মহৎ ভাবনা, অনুপ্রেরণার জোয়ার? নাকি রাজনৈতিক কারবারিরা 'সুভাষিত' শ্রবণাতীত বয়ানে নিজেদের অক্ষমতার মদমত্ত প্রকাশ করছেন? সাধারণ ছাপােষা মানুষ বিস্ফারিত চিত্তে এই ভাষাসন্ত্রাস,এই ভাষাধর্ষণ দেখতে শুনতে ক্লান্ত। এর থেকে উত্তরণের উপায় এখনও অবধি কোনাে ভাষা দিবস দেখাতে পারেনি। এবারের ভাষা দিবসের কাছেও কি সেই উপায় আছে? নাকি এই খেলা হবে, চলবে ... মেধাহীন গাধাদের দৌলতে?

চলুন মিছিলে 🔴

শুক্রবার, মে ২৬, ২০১৭

পৃথা ব্যানার্জী

sobdermichil | মে ২৬, ২০১৭ | | মিছিলে স্বাগত
বিদ্রোহী কবির প্রেমাখ্যান
“মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য” এই কথা একমাত্র নজরুলই বলতে পারেন। এই কবিতায় আমরা দুর্বিনীত, নিশঙ্ক চিত্ত একরোখা বিদ্রোহী নজরুলকে দেখতে পাই। তিনি যেমন রণতরীতে যাত্রা করেছেন তেমনি ভেলা ভাসিয়েছেন প্রেমের সাগরে। তিনি প্রেম দিয়ে জগৎটি দেখেছেন। কিন্তু প্রতিদানে তিনি পেয়েছেন বঞ্চনা আর আঘাত। সেই যন্ত্রণায় তিনি হাতে তুলে নিয়েছেন অস্ত্র হয়েছেন বিদ্রোহী। আবার তিনি নিতান্তই প্রেমিক হিসেবে গানের সাহায্যে তাঁর প্রিয়াকে সাজিয়ে তুলেছেন প্রকৃতির আভরণে –“মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী/ দেব খোঁপায় তারার ফুল’। হৃদয়ে রাণীর ভালোবাসার স্রোতে ভেসে যেতে চান। নজরুলের উদাত্ত আহ্বান আমাদের কোমল হৃদয়েও ঝড় তোলে, প্রেমের দরজায় কড়া নাড়ায়। একইসাথে বিদ্রোহ, এবং প্রেমকে ধারণ করে এমন স্বতঃ:স্ফূর্ত প্রকাশ কেবল নজরুলের পক্ষেই সম্ভব।

তাঁর গান ও কবিতায় প্রেম ও বিদ্রোহ একসাথে মূর্ত হয়ে উঠেছে। কখনো তিনি বিদ্রোহী, কখনো তিনি প্রেমিক, কখনো তিনি প্রকৃতি পূজারী আবার কখনো তিনি মরমি সাধক। মূলত তিনি যৌবনের কবি আর যৌবনের ধর্মই হচ্ছে প্রেম ও বিদ্রোহ যা সমসাময়িক আবেগের সাথে চলে। বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উড়িয়েও তিনি দেখছেন প্রিয়ার নত নয়ন। মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত কবি প্রেমের শাশ্বত আবেদনের কাছে হার মেনে স্বস্তি খুঁজে পেতে চেয়েছেন- ‘হে মোর রাণী! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে/আমার বিজয় কেতন লুটায় তোমার চরণ-তলে এসে।’ বিদ্রোহের সানাই-এর সাথে তাঁর মনে ভেসে আসে গোপন প্রিয়া চকিত চাহনি, কানে বাজে প্রেয়সীর কাঁকন চুড়ির কনকন। 

মানব মনে কখন প্রেম আসে তা কেউ বলতে পারেনা আর পারেনা বলেই সে শাশ্বত প্রেমের পশরা সাজিয়ে অপেক্ষা করে। অনেক অপেক্ষা করার পরই প্রেম ধরা দেয় কোনও এক মানবীর মাধ্যমে। সেই মানসী যখন দুরে চলে যায় তখন প্রেম আরও গভীর হয় আর খাঁটি হয়। এই জগতে যা কিছু সুন্দর তা-ই ক্ষণস্থায়ী হয়। যে হৃদয় যত মহৎ তার প্রেমে কষ্টও তত বেশি। বিরহ প্রেমের পরিণতি। যেখানে প্রেমের গভীরতা সেখানেই বিরহ। তাই নজরুলের জীবন বিরহ ব্যাথায় পূর্ণ। প্রেমের কবিতা ও গানে তাঁর মুল সত্তাটি হচ্ছে বিরহী আত্মার প্রতীক। 

নজরুলের জীবনে তিনবার ফুটেছিল প্রেমের ফুল তার মধ্যে প্রথম কলিটি হচ্ছে নার্গিস। রাধিকা যেমন বাঁশি শুনে কৃষ্ণের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তেমনই হয়েছিলেন সৈয়দা খানম, কবি পরে যাঁর নামকরণ করেন নার্গিস। খাঁ বাড়ির দীঘির ঘাটে বাঁশির মনমাতানো সুরে আকৃষ্ট হন সুন্দরী যুবতী নার্গিস। সামান্য আলাপ পরিচয়ের মধ্যেই দুটো কিশোর প্রাণ ধরা পড়ল প্রেমের বাঁধনে। কিন্তু বাঁধন হারাকে শর্তের বাঁধনে বাঁধতে চেয়েছিলেন পুস্তক প্রকাশক আলি আকবর খান তাই ফুল ঝড়ে পড়ল ফোটার আগেই। বিয়ের রাতেই নজরুল কুমিল্লায় ফিরে আসেন। ১৯৩৭ সালে নার্গিস ভুল বুঝতে পেরে নজরুলকে একটি চিঠি লেখেন। তার উত্তরে কবি লিখে দেন, -- যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই,/ কেন মনে রাখ তারে/ ভুলে যাও তারে ভুলে যাও একেবারে। 

নার্গিসের দ্বিতীয় বিয়ের সংবাদ শুনে নজরুল এই গানটি লিখে পাঠিয়েছিলেন, “পথ চলিতে যদি চকিতে কভু দেখা হয় পরানপ্রিয়”। সঙ্গে একটি চিরকুটে লিখে পাঠিয়েছিলেন – জীবনে তোমায় পেয়ে হারালাম, তাই মরণে পাব এই বিশ্বাস ও সান্ত্বনা নিয়ে বেঁচে থাকব। চক্রবাক কাব্যগ্রন্থটির-- হিংসাতুর, চক্রবাক, গানের আড়াল, মিলন-মোহনায় প্রভৃতি কবিতার মধ্যে দিয়ে তিনি নার্গিসকে মনে করেছেন। তিনি লিখেছেন, --‘ বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে’।

দ্বিতীয় প্রেম আসে প্রমীলা সেনগুপ্ত। বাসর থেকে বেড়িয়ে দীর্ঘ পথ পার হয়ে কবি যখন সেনগুপ্ত পরিবারে পৌঁছালেন তখন পথশ্রমে আর মানসিক চাপে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। প্রমীলা তখন সেবা করেন অসুস্থ কবির। দুজনের মধ্যে তখনই গড়ে ওঠে প্রেমের সেতু। তাঁর এই প্রেমর কথা তিনি বিজয়িনী কবিতায় এভাবে প্রকাশ করেন --- “হে মোর রানী! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে। আমার বিজয়-কেতন লুটায় তোমার চরণ-তলে এসে”।

দোলন-চাঁপা কাব্যগ্রন্থে দোদুল-দুল কবিতায় কবি প্রমীলার সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন। অবশেষে ধর্ম ও বিবাহ আইনের সমস্ত বেড়াজালকে ডিঙিয়ে দুজনে একসাথে চলার শপথ নিয়েছিলেন। তৃতীয় প্রেম বেগম ফজিলাতুন্নেসা। এর মাঝে ফজিলাতুন্নেসার প্রতি কবির অনুরাগ কিংবদন্তীতুল্য। এ ছাড়া রানী সোমসহ আরও দু-একজনের নাম এলেও সেগুলো তেমন কিছু বিশেষ না।

প্রেম নজরুলের জীবনে এসেছিল বারবার, কখনো ঝড়ের মতো কখনো নিভৃতে। প্রিয়ার বিরহে হয়েছেন বেদনাভারাতুর। "বুকে তোমায় নাই বা পেলাম,রইবে আমার চোখের জলে। ওগো বধূ তোমার আসন গভীর ব্যথার হিয়ার তলে।" এভাবে নজরুলের অসংখ্য কবিতা ও গানে প্রেম ও বিরহ প্রকাশ পেয়েছে। হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে কবি একাই ঝরা-ফুল কুড়িয়ে গেছেন। প্রিয়াকে সবকিছুই দেয় দাতা প্রেমিক। প্রিয়াকে ধনী করে। দীনহীন হয়ে শুধু প্রেমকে পাথেয় করে জীবন কাটাতে পারে খাঁটি প্রেমিক। সেই প্রেমের কথাই লিখেছেন প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলাম এভাবে--

'আপনারে ছলিয়াছি, তোমারে ছলিনি কোনোদিন / আমি যাই, তোমারে আমার ব্যথা দিয়ে গেনু ঋণ।' ( স্তব্ধ রাত : চক্রবাক )

প্রেমের শাশ্বত-সত্য-সুন্দর রূপটি তিনি ধরতে পেরেছিলেন। প্রেমের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন কিন্তু প্রেম অধরা থেকে গেছে। বিরহ অনলে পুড়ে পুড়ে তিনি হয়েছেন খাঁটি। প্রেম থেকে তীব্র বঞ্চনার শিকার হয়ে যুবক নজরুল হয়েছিলেন বিদ্রোহী। বিদ্রোহী হয়েছিলেন মূলত প্রেমিকার বিরহে। 

পরিশেষে নির্দ্বিধায় বলতে পারি কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান ও কবিতায় প্রেম ভালবাসা উজ্জ্বল মহিমায় দীপ্যমান। তাঁর জন্মদিনে তাঁকে প্রণতি জানাই।


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.