x

প্রকাশিত ৯৬তম সংকলন

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

sobdermichil | মে ০৯, ২০১৭ |
  কবিতার পথে পথে
দ্বিতীয় পর্ব

কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি কবিতা বিষয়ক পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায় (১৪২১) আমার পরম শ্রদ্ধেয় এবং প্রিয় কবি রমেন আচার্য মহাশয় "মিথ্যের সৌন্দর্য" নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। প্রবন্ধটি পড়ে আমার মনে কিছু বক্তব্য তৈরি হয়। রমেনদাকে সেকথা জানিয়েওছিলাম। বর্তমান প্রবন্ধটি সেই বক্তব্যেরই লিখিত রূপ।

স্কুলের গণ্ডি পার হচ্ছি যখন সেই সময় একটা গান খুব গাইতাম ------

" এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না ।
মন উড়েছে উড়ুক না রে মেলে দিয়ে গানের পাখ্না ।। "

গানটি শুনে আমার এক কাকা একদিন আমাকে বলেছিলেন, " এই লোকটার কোনো কাজ ছিল না, লেখা ছাপানোর চিন্তা ছিল না ----- তাই মনের আনন্দে যা খুশি তাই বলে গেছে। " অর্থাৎ বোঝাই যায়, কাকা গানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত ছিলেন না। গানের বক্তব্যে তাঁর সমস্যা কোথায় সেকথা অবশ্য তিনি আমাকে বলেন নি। তবে আমার মনে হয়, গানের পাখনায় আর সেই পাখনা নিয়ে মনের উড়ে যাওয়াতে। সত্যিই তো গানের পাখনা হয় নাকি! যে পাখনার বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই, সেই পাখনা সঙ্গী করে মনের উড়ে যাওয়া ! এসব কি মেনে নেওয়া যায় নাকি !

যে বয়সে আমি গানটা গাইতাম সেই বয়সে গানের কথার চেয়ে সুরটাই আমাকে বেশি টানত। হ্যাঁ, গানের মানে অবশ্যই বুঝতাম। তবে সত্যি বলতে কি সেই বয়সে এত তলিয়ে কিছু ভাবি নি। গানের কথার বাস্তব প্রয়োগ সম্ভব কিনা তা আমাকে তখন সেইভাবে ভাবায় নি। তাই কাকার বক্তব্যে আমি একটু রাগান্বিতই হয়েছিলাম।

একটু বয়স বাড়তে যখন চোখ ও মনের ভেতর দরজা খুলে গেল তখনও কবির বক্তব্যে কোনো অসামঞ্জস্য খুঁজে পাই নি। মনে হয়েছিল এটাই বাস্তব। এটাই তো স্বাভাবিক। আজকের বয়সে যখন আমি দাঁড়িয়ে তখন সরস্বতী পুজোর দুপুরের রোদ দেখে আমার মন গেয়ে ওঠে -----

" ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে -------
ডালে ডালে ফুলে ফলে পাতায় পাতায় রে,
আড়ালে আড়ালে কোণে কোণে ।। "

গানের পাখনা মেলে আমার মন তখন শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবের গৌড়প্রাঙ্গণ, আম্রকুঞ্জ, ছাতিমতলায় উড়ে উড়ে গান গায় ------

"আকাশ আমায় ভরল আলোয়, আকাশ আমি ভরব গানে
সুরের আবীর হানব হাওয়ায়, নাচের আবীর হাওয়ায় হানে

ওরে পলাশ, ওরে পলাশ,
রাঙা রঙের শিখায় শিখায় দিকে দিকে আগুন জ্বলাস ----

আমার মনের রাগ রাগিণী রাঙা হল রঙিন তানে ।।"

কিন্তু সাধারণ মানুষকে কিভাবে বোঝানো যাবে, মন গানের পাখনা মেলে অনায়াসে দূর দূরান্তে উড়ে যেতে পারে। একজন সাঁতারু তাঁর এক ছাত্রকে বলছেন এবং জলের মধ্যে হাত পা কিভাবে নেড়ে ভেসে থাকতে হয় সেটা দেখাচ্ছেন। একটু পরে সেই শিক্ষার্থীটি একই কায়দায় হাত পা নেড়েও জলে ডুবে যাচ্ছে। তার মানে জলের ভেতর শুধু হাত পা নাড়লেই হবে না, ভেসে থাকতে গেলে হাত পা নাড়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত কিছু একটা করতে হবে। এই অতিরিক্ত কিছু-টাই সাঁতারু শিক্ষার্থীর জলে ভেসে থাকার চাবিকাঠি, আর কবিতা পাঠকের কাছে তা কবির কবিতার রহস্যময় জগতে প্রবেশের ছাড়পত্র। 


রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসুর অনেক কবিতাই তাই এখনও আমাদের কাছে সুবোধ্য নয়। আসলে "সকলেই কবিতার পাঠক নন, কেউ কেউ মাত্র পাঠক" ---- একথা জোরের সঙ্গে উচ্চারণ না করলেও পাঠক হিসাবে একটা যোগ্যতা তো থাকতেই হবে। তা না হলে -----

"দখিন হাওয়া জাগো জাগো, জাগাও আমার সুপ্ত এ প্রাণ।
আমি বেণু, আমার শাখায় নীরব যে হায় কত-না গান।।"

দখিন হাওয়াকে কিভাবে জাগতে বলব? আর সে-ই বা আমাদেরকে কিভাবে জাগাবে?

"পথ এখনো শেষ হল না, মিলিয়ে এল দিনের ভাতি", "আলোয় আলোয় মিলন হবে পথের মাঝে পথের সাথী", "পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে" ----- পথ নিয়ে তো কম লেখা লেখেননি রবীন্দ্রনাথ। শুধু রবীন্দ্রনাথই বা কেন, সব কবিই কিছু না কিছু লিখে গেছেন। কিন্তু এর পরেও পাঠকেরা বলবেন, পথ হল ইঁট, খোয়া, পাথর, পিচ প্রভৃতি উপাদান দিয়ে তৈরি যাতায়াতের মাধ্যম। অথচ এই পথকেই সেই কোন ছোটোবেলা থেকে আমার শুধু পথ বলে মনে হয় নি। গ্রামের ছেলে হওয়ার কারণে পথ কখন যেন আমার বন্ধু হয়ে গেছে। আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি সেখানে পথই তো আমাকে এনেছে। পথ ছাড়া আমাকে কে-ই বা নিজের মতো করে ভেবেছে। এই পথের দিকে তাকিয়েই কেটে গেছে আমার কত কাল। বর্ষায় মুষলধারে বৃষ্টিরাতে পথকে একা শুয়ে থাকতে দেখেছি। তার যন্ত্রণা আমাকে স্পর্শ করে গেছে। জানলায় দাঁড়িয়ে সারারাত তার সাথে কথা বলে গেছি। কখনও হেসেছি, কখনও কেঁদেছি। হ্যাঁ, পথকে সঙ্গে নিয়েই।

রিউবেন ক্যাস্টাং সাহেবের কথা এখানে খুব মনে পড়ছে। তিনি কবি না হলেও তাঁর বক্তব্য এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক। বহুকাল তিনি পশুদের সঙ্গে ভাব পাতিয়ে বেড়িয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, "আমি পশুদের ভাষা বেশ বুঝি। কতবার আমি জংলি হাতির সামনে পড়েছি, বাঘের গরম নিঃশ্বাস অনুভব করেছি, প্রকাণ্ড ভাল্লুকের থাবা মুখের সামনে দেখেছি, গরিলা প্রায় জড়িয়ে ধরে ফেলেছে আমাকে। কিন্তু একটি জিনিস প্রত্যেকবারই আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে ----- সেটি হচ্ছে পশুদের ভাষার জ্ঞান। আমি পশুদের ভাষা কিছু কিছু জানি বলেই, এতবার সাক্ষাৎ যমকে এড়িয়ে যেতে পেরেছি।" এখানেই তিনি থেমে যাননি ------ "সিংহকে যদি তারই ভাষায় বলতে পারো, তুমি তার বন্ধু, তাহলে অনেকটাই নিরাপদ হবে। তারপর যদি তাদের জাতের আদবকায়দা অনুসারে তার কাছে যেতে পারো, তাহলে ভয়ের বিশেষ কারণ থাকবে না।"

এখন সাধারণ মানুষ যদি ক্যাস্টাং সাহেবকে না পড়ে তাঁর পশুদের সঙ্গে ওঠাবসা দেখেন তাহলে তো তাঁরা ভাববেনই যে, ওই পশুগুলি সবই কাগজের। অথচ তাঁর কথা আমাদেরকে আরও অবাক করে ------- "পশুর গলার শব্দের অবিকল নকল করার ক্ষমতা থাকায় শুধু যে বহুবার আমার প্রাণ বেঁচেছে তা নয় ; এদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাবারও অনেক সুবিধা আছে। পশুরা শুধুমাত্র শব্দের সাহায্যে কথা বলে না, নানারকম ইশারায়ও বলে।

কবিতারও এরকম ভাষা হয়। কবিতার পাঠককে সেই ভাষা জানতেই হবে। কবিতা পাঠ করতে গেলে শুধু বিদ্যে বুদ্ধি থাকলে চলবে না। কল্পনা, বোধ, ইন্দ্রিয়কেও এর সাথে যুক্ত করতে হবে। তখন আর কবির বক্তব্যকে মিথ্যে বলে মনে হবে না।

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.