x

প্রকাশিত | ৯৪ তম মিছিল

কান টানলেই যেমন মাথা আসে, তেমন ভাষার প্রসঙ্গ এলেই মানুষের মুখের ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারের কথাও মনে পড়ে যায়, বিশেষত আজকের দিনে। ভাষা দিবস মানেই শুধু মাতৃভাষা নিয়ে আবেগবিহ্বল হয়ে থাকার দিন বুঝি আজ আর নেই!

কেননা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা মাথায় বসে আছেন, বিশেষত যাঁরা রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাভােগী এবং লােভী, তাঁদের মুখের ভাষা এবং তার প্রয়ােগ আজ ঠিক কতটা শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় সেটা শুধু ভাবার নয়, রীতিমতো শঙ্কার এবং সঙ্কটের।

সবই কি তবে মহৎ ভাবনা, অনুপ্রেরণার জোয়ার? নাকি রাজনৈতিক কারবারিরা 'সুভাষিত' শ্রবণাতীত বয়ানে নিজেদের অক্ষমতার মদমত্ত প্রকাশ করছেন? সাধারণ ছাপােষা মানুষ বিস্ফারিত চিত্তে এই ভাষাসন্ত্রাস,এই ভাষাধর্ষণ দেখতে শুনতে ক্লান্ত। এর থেকে উত্তরণের উপায় এখনও অবধি কোনাে ভাষা দিবস দেখাতে পারেনি। এবারের ভাষা দিবসের কাছেও কি সেই উপায় আছে? নাকি এই খেলা হবে, চলবে ... মেধাহীন গাধাদের দৌলতে?

চলুন মিছিলে 🔴

মঙ্গলবার, মে ০৯, ২০১৭

অনিন্দিতা মণ্ডল

sobdermichil | মে ০৯, ২০১৭ | | মিছিলে স্বাগত
সন্ধিক্ষণ
রাতের কালি একটু একটু করে কাটছে। সাবেক বাড়ির বড় শোবার ঘরের মেঝে ছোঁয়া জানলার গরাদ স্পর্শ করছে নীলচে মায়াবী আলো। এ ঘরে কোনও রাত-আলো জ্বলেনা। নিকষ আঁধারে ঘুম ভালো হয়। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের চলাফেরা দেখতে পাওয়া যায়। তার জন্যে কোনও বাইরের আলোর দরকার পড়েনা। তারপর যখন গভীর রাত পেরোয় ঠিক সেইভাবে, যেভাবে মাঝঅরণ্য থেকে আরও গহীনে গেলে অরণ্যের বাইরে বেরিয়ে আসা হয়, সেরকমই আকাশে নীলচে আলো বুঝিয়ে দেয় রাতের শেষ হতে চলেছে। অর্চিস্মান ঘুমে অচেতন। ভোরের আগের এই সময়টাতেই তাঁর ঘুম বড় গাঢ় হয়। যতই জরুরি তলব হোক না কেন, কেউ ডেকে তুলে না দিলে তিনি উঠতে পারেননা। অনসূয়া এসব সময়ে গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে নীল আলোকে ছুঁয়ে থাকেন। সূর্য ওঠার আগে যখন নীল কেটে বেগুনী আভায় আকাশ ছেয়ে যায় সেই সময়টা ওঁর খুব প্রিয়। শান্ত স্তব্ধ চরাচর। কোথাও একটুও হেলদোল নেই, জীবনের স্পন্দন নেই। যেন ধ্যানমগ্ন পৃথিবী। অনসূয়া ভাবতে ভালোবাসেন জীবন ও মরণের মাঝেও এমনই একটি শান্ত নিস্তব্ধ ক্ষণ আসে। অনুভবে তা জীবনের শত গ্লানিকে মুছে দেয় নিশ্চয়। জীবনে কি কম গ্লানি? মৃত্যুর দুয়ার পেরিয়ে যেতে গেলে সেই গ্লানির স্তুপকে ফেলে যেতে হবে তো! যেমন নচিকেতা তাঁর অর্জিত যত ভোগ, যত বাসনা, যত প্রবৃত্তি, এমনকি অমরত্বের আশাকেও ত্যাগ করেছিলেন। মৃত্যুর তো এমনই দাবী থাকে! অনসূয়ার একা জীবনে অর্চি ছাড়া আর কারো তেমন পদধ্বনি শোনা যায়নি। যতদিন অর্চির বাবা মা ছিলেন ততদিন তবু মিতবাক অনসূয়ার দু একটা কথা বলার দরকার পড়ত। কিন্তু তাঁরা তো বহুকাল আর নেই। অনসূয়ার জানতে ইচ্ছে করে জীবনের গ্লানি তাঁরা ধুতে পেরেছিলেন কিনা। এই দুটো মানুষের কাছে তিনি স্নেহ পেয়েছেন প্রচুর। কিন্তু তাঁকে কেউ মা বলে ডাকলনা। এই দুঃখ তাঁদেরও ছিল। সেই গ্লানি কি কেটেছিল? মৃত্যুর আগে? জানা হয়নি। 

রাতের ঘুম অনসূয়ার বড় একটা হয়না। জাগরণ আর ঘুমের মাঝে দোলা খেতে থাকেন। কখনও তন্দ্রার ঘোরে স্বপ্নরা খেলা করে। বড় প্রিয় বিলাস। সেইসব স্বপ্নরা ঘুম ভেঙে গেলে আর দেখা দেয়না। দিনের খর আলোয় কোনও স্বপ্ন নেই। কঠিন পৃথিবীর মতই কঠিন বাস্তব। স্বপ্নে দেখা দুকুল ফুলে ওঠা নীল নদীর অস্তিত্ব অনুভবে পেতে চাইলে পৃথিবীসুদ্ধ লোক তাঁকে বলে উন্মাদ! এ কেমন মানুষ! কথা বলেনা। রাগ করেনা। অকারণ খিলখিল করে হেসে ওঠেনা। অভাব অভিযোগ কাকে বলে জানেনা! অনসূয়া বড় অসামাজিক তাই। কেউ নেই প্রাণের কাছাকাছি। 

আজ রাত পোহানোর আগেই ডেকে দিতে হবে অর্চিকে। ঘণ্টা খানেক আগে হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছিল। মোবাইল ফোন রাত্রে বন্ধ করা থাকে। বৈঠকখানা ঘরে ল্যান্ড লাইনেই ফোন আসে রাত্রে। যদি জরুরি ফোন হয় তবে তা জানানর দায় থাকে অনসূয়ার। কারণ অর্চি তো রাতে ঘুমোন! অনসূয়ার মত পাতলা ঘুম তাঁর নয়। তার ওপর সারাদিনের ব্যাস্ততা। রাতের বিশ্রাম খুব দরকার। রাতের ফোন অনসূয়াই ধরেন। তারপর সময় বুঝে ডেকে দেন অর্চিকে। ফোন আসা আর অর্চিকে ডেকে দেওয়ার মাঝের সময়টা তিনি এই জানলার কাছে কাটিয়ে দেন। আজ অর্চির এক পেসেন্ট সিন্ক করছে। খবর এসেছে। ছেলেটির বয়স খুব কম। ঠিক কি কারণে, কেন এত কম বয়সের ছেলের হঠাৎ সিস্টেম ফেলিওর হতে চলেছে সেসব মেডিকেল কারণ অনসূয়া জানেননা। জানতে চেষ্টাও করেননা। অর্চি বহুবার অনসুয়াকে এব্যপারে বোঝাতে চেয়েছেন। কিভাবে হার্ট কাজ করে। কখন সে জবাব দেয়। কেনইবা দেয়। বংশগত কারণে কারো হৃদয়ঘটিত অসুখ হয় কিনা। ডায়াবেটিক হলে কমবয়সেই এন্ড অরগ্যান, মানে মাথা, হৃৎপিণ্ড, কিডনি, চোখ ইত্যাদি আক্রান্ত হতে পারে। এইসব জ্ঞানগর্ভ আলোচনার সময়ে অর্চি দেখেছেন অনসূয়ার চোখ কোন সুদুরে চলে যায়। তিনি যেন শুনেও শুনছেন না। খুব অপমানিত বোধ করেন। তাঁর একটি লেকচারের জন্য শিষ্যকুল হাঁ করে বসে থাকে। আর অনসূয়া পাত্তাই করেননা! চুপ করে যান তিনি। মনে মনে ভাবেন, তাঁর তো কাজ আছে। কত কি এখনও করা বাকি আছে। কিন্তু অনসূয়া তো একা। অবশ্য একাকিত্বকে নিজেই টেনেছেন কাছে। তবু মায়া হয়। যে সাইকিয়াট্রিস্ট অনসুয়াকে দেখেন তিনি পরিষ্কার বলেছেন, কেসটা টেক্সটবুক একজাম্পল হিসেবে সাইট করা না গেলেও এ একধরণের অসুখ বই কি! বিষাদ নয় অবসাদও নয়। কিন্তু ইফ দ্য সোসাইটি ইজ নট এট ইজ উইদ দ্য পারসন অর দ্য পারসন ইজ নট এট ইজ উইদ দ্য সোসাইটি, দেন ইট ইজ সিওরলি আ ডিজিজ। অনসূয়া তো নিজেকে সমাজবিচ্ছিন্ন করেই রেখেছেন। 

জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে বেগুনী আভা ঘরের স্বেতপাথরের মেঝেতে এসে পড়তেই অনসূয়া খাটের কাছে এগিয়ে গেলেন। আলতো হাতে অর্চির গায়ের পাতলা চাদরটা সরিয়ে দিলেন। গায়ে হাত রেখে ডাকলেন – অর্চি ওঠো। অর্চি জানেন হাসপাতাল থেকে কোনও ফোন এসেছে নিশ্চয়। ছেলেটিকে তো ক্রুসিয়াল দেখেই এসেছেন। রাতে ঘুমের মধ্যে মুখটা ফিরে ফিরে আসছিল। এরকম বড় একটা হয়না। কিন্তু এ ছেলেটির বয়স বড্ড কম। আচ্ছন্ন মুখখানা দেখতে কি নিস্পাপ! অনসুয়াকে বলেছিলেন ছেলেটির কথা। “জানো অনু, আমাদের যদি সন্তান হত তবে এরকমই বয়স হত তার”। অনসূয়া কি চমকে উঠেছিলেন ভেতরে ভেতরে? অর্চির মনে গ্লানি জমছে! সন্তানহীন হওয়ার গ্লানি! অপ্রাপ্তির গ্লানি! তবে তো সেই দুয়ারটা পেরোতে বড় কষ্ট পেতে হবে! সেই চেতনাব্যাপী অনুভব তো ধরা দেবেনা। কিন্তু তাও জিজ্ঞেস করেছিলেন। “ছেলেটিকে একবার দেখতে যাবো?” অর্চি অবাক হয়েছিলেন – কেন অনু? তুমি তো তাকে চেনোনা! আমিও চিনিনা! আমার একজন রুগী, এইতো পরিচয়। অনসূয়া উত্তর দেননি। 

গ্যারেজ থেকে গাড়ি বেরোবার আওয়াজ পেয়ে অর্চি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন। চা একটু না খেয়ে তিনি বেরোতে পারেননা। সাড়ে চারটে বাজে। পৌঁছতে দশ মিনিটও লাগবেনা। রাস্তা এখন গড়ের মাঠ। হাসপাতালে ফোন করে জেনে নিলেন রুগীর পরিবারের লোকজন কেউ আছে কিনা। সহকারী ডাক্তারদের ফোন করে নিলেন। 

গাড়িতে উঠতে গিয়ে দেখেলন অনসূয়া দাঁড়িয়ে। জিজ্ঞেস করলেন – কিছু বলবে? এখনও গরম পড়েনি সেভাবে। ভোররাতের ঠাণ্ডা লেগে গেলে সিজন চেঞ্জের সময় অসুখবিসুখ হতে পারে। অর্চির কথায় বাঁধা দিয়ে মৃদুস্বরে অনসূয়া জানালেন আজ তিনিও অর্চির সঙ্গে হাসপাতালে যাবেন। অপ্রস্তুত বিরক্ত অর্চি জোর করে কিছু বলতে পারলেন না। গাড়িতে উঠে বসলেন। পেছনের সিটে অনসূয়া। 

আইসিসিইউতে ঢুকে অনসূয়া একটু থতমত খেলেন। কখনও এমন অদ্ভুত আচরণ করেননি। কিন্তু আজ যে তাঁকে আসতেই হত! ক্রমাগত একটা মুখ ঘুরেফিরে আসছে স্বপ্নে। কমবয়সী একটি ছেলের মুখ। কি জানি সে কি চায়। কিন্তু চুপ করে চেয়ে থাকে অনসূয়ার মুখের দিকে। অনসূয়া প্রশ্নভরা চোখে তাকান। কিন্তু সে কিছু বলেনা। অর্চির পেসেন্টকে একবার দেখতে চান তাই। কেমন যেন মন বলছে এ সেই ছেলেটি। 

ছেলেটি নিশ্চুপ শুয়ে আছে। নাকে নল, অক্সিজেন মাস্ক তখনও পরানো। নার্স জানালো এখনও নিঃশেষ হয়ে যায়নি। আরও কিছু সময় বাকি আছে। অনসূয়া চাইলেন নার্সের দিকে – আয়ু? আরও কিছুকাল আয়ু আছে? কতকাল? নার্স জানেন ডাক্তার মুখার্জির মিসেস একটু পাগলাটে। থেমে থেমে বোঝানোর ভঙ্গীতে উত্তর করলেন – মিসেস মুখার্জি মৃত্যুর সময় তো নির্দিষ্ট করে বলা যায়না। তবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ নিঃশ্বাস নেবে ছেলেটি। অনসূয়া কাছে গিয়ে ভালো করে মুখের দিকে চাইলেন। হ্যাঁ, তাঁর অনুমান সঠিক। এ সেই ছেলেটি। স্বপ্নে আসে কয়েকদিন ধরে। এ কি তাঁর স্বপ্নজ সন্তান তবে? নয়ত তাঁর কাছে কিসের জন্য আসে? কিসের আশ্রয় তিনি দিতে পারেন? কঠিন পৃথিবী ছেড়ে স্বপ্নের নীলচে আলোর দুনিয়ায় সে অনসূয়ার কাছে ধরা দেয়। অনসূয়া রোজ রাতে ক্রমান্বয়ে একই স্বপ্ন দেখে চলেছেন। দিবারাত্রির সন্ধিক্ষণ। তবে তা প্রত্যুষ নয়, প্রদোষ। সেই আলোআঁধারিতে কে যেন তাঁর হাত ধরে টানছে। বলছে – শিগির চলো। ও চলে যাচ্ছে। অনসূয়া ব্যাস্ত বোধ করেন। সঙ্গের সাথীটিকে দেখতে পাননা, তবে উপস্থিতি অনুভব করেন। দেখতে পান একটি সিঁড়ি। সেটি বেয়ে উঠতে থাকেন ওপরে। বুকে কষ্ট হয়। হয়ত উঁচুতে ওঠার কারণে। একসময় পৌঁছে যান একটি দরজায়। সেই খোলা দরজার ওপারে দেখতে পান একটি ঘর। ঘরের পেছনে ও অন্যপাশে দেওয়াল আছে। কিন্তু দরজা যেন শূন্যে। দেওয়াল নেই। আর ঘরের সামনের দেওয়াল নেই। সেটি মিশে গেছে অনন্ত আকাশে। সেই অদ্ভুত ঘরের মধ্যে একটি শুভ্র শয্যা। তার পাশে সেই অসীম শূন্যে চোখ মেলে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছেলে। অনসূয়াকে দেখেও সে চোখ ফেরালনা। অনসূয়া একবার নীচের দিকে তাকাতে গেলেন। দেখলেন ঘরখানা তার অর্ধেক সীমান্ত নিয়ে শূন্যে ভাসমান। হঠাৎ ভয় পেলেন। তিনি কি তবে নিজেও চলে এসেছেন এপারে? পরক্ষণেই মনে হ’ল গ্লানি কি কাটছে তবে? ছেলেটির গ্লানি কি কাটল?

নার্স ডাকলেন – মিসেস মুখার্জি, পেসেন্ট এক্সপায়ার করে গেছে। সরে আসুন এদিকে। চলুন স্যারের অফিসে বসুন গিয়ে। অনসূয়া ঘোরের মধ্যে বেরিয়ে আসেন। ছেলেটির মুখে কি প্রশান্তি! গ্লানি নেই আর। অনসূয়া সেই অদ্ভুত নীলচে আলোর মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালেন আবার। ওইযে দরজা পেরিয়ে গিয়েছে সে। 

বাড়ি ফেরার সময়ে মনটা খুব হালকা লাগছিল অনসূয়ার। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন অর্চিকে – ছেলেটির নাম কি বলতো? অর্চি একটু অবাক হলেন। নাম? কি যেন বলছিল ওর নাম...ওহ মনে পড়েছে, নচিকেতা। অনসূয়া নিশ্চিন্তে গাড়ির সিটে শরীরটা এলিয়ে দিলেন।



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.