x

প্রকাশিত | ৯৪ তম মিছিল

কান টানলেই যেমন মাথা আসে, তেমন ভাষার প্রসঙ্গ এলেই মানুষের মুখের ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারের কথাও মনে পড়ে যায়, বিশেষত আজকের দিনে। ভাষা দিবস মানেই শুধু মাতৃভাষা নিয়ে আবেগবিহ্বল হয়ে থাকার দিন বুঝি আজ আর নেই!

কেননা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা মাথায় বসে আছেন, বিশেষত যাঁরা রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাভােগী এবং লােভী, তাঁদের মুখের ভাষা এবং তার প্রয়ােগ আজ ঠিক কতটা শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় সেটা শুধু ভাবার নয়, রীতিমতো শঙ্কার এবং সঙ্কটের।

সবই কি তবে মহৎ ভাবনা, অনুপ্রেরণার জোয়ার? নাকি রাজনৈতিক কারবারিরা 'সুভাষিত' শ্রবণাতীত বয়ানে নিজেদের অক্ষমতার মদমত্ত প্রকাশ করছেন? সাধারণ ছাপােষা মানুষ বিস্ফারিত চিত্তে এই ভাষাসন্ত্রাস,এই ভাষাধর্ষণ দেখতে শুনতে ক্লান্ত। এর থেকে উত্তরণের উপায় এখনও অবধি কোনাে ভাষা দিবস দেখাতে পারেনি। এবারের ভাষা দিবসের কাছেও কি সেই উপায় আছে? নাকি এই খেলা হবে, চলবে ... মেধাহীন গাধাদের দৌলতে?

চলুন মিছিলে 🔴

বৃহস্পতিবার, মার্চ ২৩, ২০১৭

সুনীতি দেবনাথ

sobdermichil | মার্চ ২৩, ২০১৭ | | মিছিলে স্বাগত
সুনীতি দেবনাথ
বড় একা মনে হয়  

বড় একা মনে হয়
সমুদ্র স্রোতে ভেসে আসা ফেনিল বেলাভূমে
মৃত্যু ঘুমে শুয়ে থাকা শিশু আইলানের মত
আমার অগ্নিলা নেত্রপল্লবের অন্দর থেকে
দুর্ধর্ষ স্রোতে বু্দবুদ স্বপ্নের অবিরল ধারা
আজন্ম চেনা প্রিয়দের ছেঁড়াখোঁড়া সমাধির
ঘাসে ঢাকা মাটির অলিন্দে ছায়া ছায়া
ঘুরপাক খায় কঙ্কালের আবছা শরীরে।
যে দুজন মানব মানবীর রোদেলা স্বপ্ন আমি
এই পৃথিবীর হলুদ স্বপ্নিল ঘাসের অরণ্যে
ঘাসের সংসারে জন্ম নিয়ে খেলেছি বেড়েছি
বহুদিন হল তারা ঘুম ঘুম সমাধির অন্ধকার ঘরে
ঘুমিয়ে পড়েছে ন্যাতানো ঘাসের গন্ধহীন অবর্ণিল
আকারে তারপর মাটিতে মিশে মাটি হয়ে গেছে।
মাটি হয়ে গেছে সে পুরুষ সঙ্গী
একটা জীবনের স্বল্প পরিসর বাদে
সবটা নিয়েই যে বড় স্পষ্ট হয়ে ছিল,
এই হয় এমনই হয় ঘাসের সংসারে।
বড় একা হয়ে যেতে হয়
একদিন অতীতের দুর্ভাগা স্বপ্নদের জঞ্জালে,
আমি এক পৃথিবী মৃত্যুর মুখ দেখেছি
ইচ্ছে হয় একটি একটি করে সব নাম
প্যাপিরাসের পাতায় লিখে মিশরের পিরামিডে
সংরক্ষণ করে রাখি আগামী পৃথিবীর জন্য
কঠিন বটে বড় সুকঠিন।
পিরামিডগুলোও তো জমকালো সমাধিসৌধ
বহু বহু কাল বহু বহু জনের শ্রমে হয়েছে নির্মাণ
নির্মিতি কৌশল সংরক্ষিত হয়েছে পরম্পরা ক্রমে,
সেই সব শ্রমজীবীদের সমাধি ছিল
নদীকূলে ঘাসেদের সংসারে
বহতা নদীর তীব্র স্রোতে গিয়েছে হাড়গোড়সহ
সবই কোথায় ভেসে কে জানে!
এইতো পৃথিবীর সরল ধারাপাত।



 সেই শেষ দিনে   

সারাটা শরীরে চাবুকের ডোরাকাটা
রক্ত ঝরছে পাগলা ঝর্ণার বেসামাল
ধারার মত টপকে খাঁজের সীমানা।
সেই সে দিন  পৃথিবীর অন্য এক দিন
এমন আগুনঝরা পাগলা আকাশ
এমন খুন পিয়াসী নুড়ি পাথর
আর বিশাল সব আদিম প্রস্তরখণ্ড
আগুনে বিছের শুঁয়োর মত শুঁয়োওলা
আখের পাতা,   কর্কশ পাতা আরও
ভয়াল হাত বাড়িয়ে জাপটে ধরছে।
উন্মত্ত সূর্যটাও ক্ষিপ্ত ক্রোধের আক্রোশে
আকাশটাকে নিয়ে মত্ত আগুন খেলায়।
অদূরে সমুদ্র ভীষণ হিংস্র গর্জনে প্রমত্ত
বেলাভূমিতে আছড়ে পড়ছে ঢেউ,
এক মহানাটকের ভীষণতম দৃশ্যপট,
অভিনীত হবে ক্লাইমেক্সের বিমুর্ত দৃশ্য!
ঐ রাক্ষুসেবাহিনী সাদা চামড়ার
পশুগুলি এসেছিল, আর ঠিক ফাঁকেই
আলকাতরা রঙের কৃষ্ণা জননী
এদিক ওদিক তাকিয়ে কাঠ কাঠ
টুকরো রুটি তুলে দিচ্ছিল কিশোর
ক্ষুধার্ত ছেলেটির হা করা লালচে মুখে।
মায়ের দুচোখ তখন শুকতারার মত
স্নিগ্ধ আলোয় কোমল মন্দাকিনী
দুঃখ যেন পটচিত্রে মূর্তিমতী জননী।
ওরা এলো দুর্ধর্ষ তাতার বাহিনীর মত,
এলো নরক থেকে আসা ভয়ঙ্কর সেই
মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে যমদূতের মত।
ভীত সন্ত্রস্ত কালো মা বুকে জাপটে ধরে
কোমলকান্ত শিশুর থরোথরো দেহ,
শৃঙ্খল বেজে ওঠে ঝনঝন আফ্রিকীয়
সেই সে কালো ক্রীতদাসীর আর
জন্মসূত্রে ক্রীতদাস অবুঝ শিশুটিরও।
ক্রীতদাসী অনুভবে জেনে গেলো
আজ আর নিস্তার নেই স্নেহের অপরাধ
করেছে সে কাজ ফেলে ঘোরতর।
তারপর নির্দয় চাবুকের ওঠানামা
তারপর আর্ত শিশুর সে কী আর্তনাদ!
জননী তার দাঁতে চেপে দাঁত নিশ্চুপ
ঠোঁট কেটে ঝরলো খুন চোখ জলহীন
আকাশে আগুন জ্বলছে আগুন চোখে
অসহায় শিখা করছে দহন নিজেকে,
চাবকে চাবুকে ক্লান্ত ওদের ঝরছে ঘাম
মা চোখ বুঝে চাটছে রক্ত ঠোঁটের
চিবুকের গালের কপাল থেকে নামা
ধারাস্রোতের, রক্তের স্বাদ নোনতা!
হঠাৎ ধুম্! ফট্টাস্!!
আকাশচেরা সমুদ্র কাঁপানো মৃত্তিকার
অনন্ত কাঁপানো  শিশুকণ্ঠের আর্তনাদ!
একবার শুধু একবার! তারপর নিস্তব্ধ!
সমগ্র বিশ্ব থমকে শব্দশূন্য গতিশূন্য
সৃষ্টির বিপরীতে মনুষ্যত্বের পতনে
শিশু হত্যার কৃষ্ণতম পাপে কলঙ্কিত,
নির্লজ্জ মানুষের নিষ্ঠুর পাপের ছবি।
গলছে পাথর গলছে, জ্বলছে ঘৃণা
জ্বলছে মা জ্বলছে, পৃথিবী কাঁপছে!
কোথা থেকে আসা ডানা মেলা
শকুনের ঝাঁক খাচ্ছে পাঁক দেহটি ঘিরে
ঠুকরে নিচ্ছে কচি মাংসের টুকরো
মায়ের বুকের পাঁজর হচ্ছে গুঁড়ো গুঁড়ো
সারি বেঁধে ঢাউস কালো পিঁপড়েরা এলো
নিখুঁত কারুকাজে চোখ দুটি
কুরে কুরে শিশু ক্রীতদাসের স্বপ্ন নিয়ে গেলো চলে,
খয়েরি সামুদ্রিক হিংস্র সেই মাংসাশী কাঁকড়ারা এলো
দাঁড়া উঁচিয়ে, এতো স্বাদ মাংসে তোর?
ছুটে গেলো মা যে পাথরে  ফুটবল হয়ে
সবুট পায়ে ঐ সাদা জানোয়ারের কিকে
রক্তাক্ত দেহটা পড়ে মাথা থেতলে যায়,
এখনো টাটকা রক্ত! মা চাটতে লাগলো
সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রক্তবীজ
অসুরের রক্ত যেভাবে পান করেন
মহাশক্তি দানবনাশিনী কালিকা।
ইচ্ছে যেন আর কোন শিশু বংশসূত্রে
ক্রীতদাস না হয়, আর কোন ক্রীতদাসী
না হারায় মা হবার পবিত্র অধিকার!
যখন একফোঁটা রক্ত বাকি নেই
দুহাতে পরম মমতায় কঙ্কাল চেপে
জড়ায়ে বুকে পা পা হেঁটে জলের কাছে
নতজানু মা বিদ্রূপে হেসে ভাসালো
সমুদ্রের জলে, দেখো মুক্ত ক্রীতদাস,
আমি মুক্ত হবো পারাবার, দেখি কোন
সে শক্তি আছে আমার মুক্তিকে রোধে?
সেদিন সমুদ্র দেখেছিল, আকাশ
দেখেছিল, মর্মরিত বাতাস অনুভবে
জেনেছিল,ভূমিও বুঝেছিল এক নারী
কৃষ্ণ আফ্রিকার মৃত্তিকায় জন্ম যার
আটলান্টিক পেরিয়ে ক্যারিবিয়ান দ্বীপে
সমগ্র মানব সভ্যতাকে ধিক্কার জানিয়ে
ইক্ষু ক্ষেতে রচেছিল ভিন্নতর ইতিহাস,
মুক্তির আকাঙ্খার ভয়ঙ্কর সুন্দর  ইতিহাস —
অদূরে গাছের ছায়ায় শায়িত কন্যাকে,
পাঁচ মাসের কন্যাটিকে বুকে জড়িয়ে
কপালে শেষ চুম্বন এঁকে নিষ্পলক দেখে
ইক্ষু কাটারির কোপ গলায় দিল তার,
তুই আর কোনদিন হবি না ক্রীতদাসী মা!
তারপর নিষ্কম্প হাতে নিজকণ্ঠে
কাটারির ঘা একদম সহজ,
বর্তমান ভবিষ্যতের ক্রীতদাসীর রক্ত
সেই সেদিন মিলেমিশে সভ্যতাকে
ঘৃণা করেছিল, মুক্তি কিনেছিল!



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.