x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

বৃহস্পতিবার, মার্চ ২৩, ২০১৭

মলয় রায়চৌধুরী

sobdermichil | মার্চ ২৩, ২০১৭ | | মিছিলে স্বাগত
সমর সেনের সঙ্গে কেবল দু’বার দেখা হয়েছিল
সমর সেনের সঙ্গে আমার কেবল দু’বার দেখা হয়েছিল, আমিই দেখা করতে গিয়েছিলুম । একবার ষাটের দশকে, হাংরি আন্দোলনের সময়ে, যখন উনি ইংরেজি ‘নাও’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, আমার বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে একটা বক্স আইটেম সংবাদ দিয়েছিলেন, তখনকার পত্রিকাগুলোর মতন বিরুদ্ধে লেখেননি, কিন্তু এসট্যাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে যৎসামান্য খোঁচা ছিল, সম্ভবত এসট্যাবলিশমেন্টের ঘাঁটি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন বলে । 

সেসময়ে অন্যান্য পত্রিকাগুলোয়, যেমন, ‘জনতা’, ‘দর্পণ’, ‘অমৃত’, ‘দেশ’ ‘আনন্দবাজার’, ‘যুগান্তর’, ‘চতুষ্কোণ’, ‘উত্তরসূরী’ ইত্যাদি পত্রিকায় পুলিশকে ওসকাবার জন্য এবং আমাদের সাহিত্যজ্ঞানহীন লুমপেন প্রতিপন্ন করে সংবাদ প্রকাশিত হতো, এখন সেই সব সাংবাদিকদের আমার মনে হয় অশিক্ষিত ইডিয়ট । ‘নাও’ এর সংবাদ ছিল বেশ পজিটিভ । সমর সেন আমার চেয়ে একুশ বছরের বড়ো । তখন জানতুম না যে অগ্রজ কবিদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে হয় ; জানলে করতুম । ‘নাও’ ছিল হুমায়ুন কবিরের টাকায়-চলা পত্রিকা, কবিরসায়েবের সঙ্গে মতান্তরের কারণে ছেড়ে দিয়েছিলেন । তার আগে সমর সেন ‘হিন্দুস্তান স্ট্যাণ্ডার্ড’’-এর চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন, তাঁকে না জানিয়ে একটি বিতর্কিত সংবাদ প্রকাশ করার জন্য ।

‘নাও’ এর দপতরে বিশাল টেবিলের ওইদিকে বসেছিলেন সমর সেন, কর্পোরেট কেবিনের মতন সাজানো টেবিলের টুকিটাকি, চোখেমুখে গর্ববোধ, স্ট্রাইপড শাদা শার্ট ক্রিজদেয়া ট্রাউজারে গোঁজা, গলায় টাই, চুলে শ্যাম্পু, আদবকায়দায় সাহেবিয়ানা, চা খাওয়ালেন আমাকে আর দাদা সমীর রায়চৌধুরীকে, দামি কাপে প্লেটের ওপরে রাখা । টেবিলের ওপর নানা দামি পত্রপত্রিকা, অ্যাশট্রেতে গোঁজা বেশ কয়েকটা সিগারেট, ঠোঁটেও সিগারেট থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে । 

সমর সেন যেহেতু সাংবাদিক ছিলেন তাই জানতে গিয়েছিলুম যে কারা আমাদের বিরুদ্ধে পুলিশে নালিশ করেছেন । সমর সেন স্মিত হেসে বললেন, “জানি, কিন্তু বলব না ।” পরে কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডামের সেকরেটারি এ.বি. শাহ, র্যা ডিকাল হিউমানিস্টের দপতরে আমার সঙ্গে দেখা করলে, তাঁর কাছ থেকে জানতে পারি যে যাঁরা নালিশ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে আবু সয়ীদ আইয়ুব আর সন্তোষকুমার ঘোষ অন্যতম ; আরও অনেকে করেছিলেন কিন্তু উনি সবায়ের নাম বলতে চাইলেন না । 

আমি আর দাদা যে অস্পৃশ্য অতিদরিদ্র বিহারি ছোটোলোকদের পাড়া পাটনার ইমলিতলা থেকে সাহিত্যের জগতে ঢুকেছি তা বিশ্বাস হচ্ছিল না সমর সেনের, কেননা সেসময়ে সাহিত্যজগত বলতে এলিট পাতিবুর্জোয়া বাঙালিদের জমঘট বোঝাতো । সমর সেন নিজেও ছিলেন সেই সমাজের একেবারে উঁচুতলার মানুষ, তাঁর পূর্বপুরুষরা বিখ্যাত বাঙালি। আমার বাবা-মা তো স্কুলেও পড়েননি ।

দ্বিতীয়বার দেখা করতে গিয়েছিলুম ‘ফ্রন্টিয়ার’ দপতরে । ‘নাও’-এর সোভিয়েত মার্কসবাদী সাহেব সমর সেন থেকে একেবারে ভিন্ন বাঙালি মাওবাদী সমর সেন । রাশিয়ায় পাঁচ বছর অনুবাদক হিসাবে কাটাবার ফলে সেখানকার আমলাতান্ত্রিক সাম্যবাদের আসল চেহারা টের পেয়ে গিয়ে থাকবেন । তিনি স্ট্যালিনের অনুরাগী ছিলেন এবং মনে করতেন যে অজস্র খারাপ বৈশিষ্ট্য থাকার পরও একনায়ক স্ট্যালিনের প্রয়োজন রাশিয়ার ছিল । অথচ রাশিয়ায় কবি-লেখকদের ওপর যে নেকনজরি লোপাট আর সাইবেরিয়ায় পাঠানোর ভয়াবহ খেলা চলছে, তা কেন তিনি জানতে পারেননি ! কিংবা আরও অনেক মস্কোবাসী বাঙালি অনুবাদকদের মতো দেখেও দেখেননি, দেশে ফিরে তাদের দুষ্কর্ম ফাঁস করেননি ! এনারা কি সাধারণ রাশিয়ানদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পেতেন না ? মস্কোবাসী ননী ভৌমিক ব্যাপারটা চেপে রেখে-রেখে শেষকালে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন ।

জ্যোতি সিনেমার কাছে ৬১ মট লেনের সরু অন্ধকারাচ্ছন্ন সিঁড়ি বেয়ে লম্বাটে ঘিঞ্জি ঘরে তাকের ওপরে সস্তা নিউজপ্রিন্টে ছাপা পুরোনো ‘ফ্রন্টিয়ার’-এর ডাঁই, কাঠের ছোটো টেবিলের ওদিকে সমর সেন, সেই চেয়ারটাও অতিপুরোনো । বেশ রোগা হয়ে গেছেন, পোশাকেও রদবদল ঘটেছে, বাড়িতে কাচা ধুতি আর দোমড়ানো-কলার শার্ট, চশমার কাচ পুরু হয়েছে, ফ্রেমও কতকটা গোল ধাঁচের, ঠোঁটে সিগারেট, ধরাননি, হয়তো ছাড়ার চেষ্টা করছেন, কাঁচাপাকা চুল পেছনে, ব্যাকব্রাশ বলছি না, আঁচড়ে থাকবেন সকালে আসার সময়ে । চিনতে পারলেন, কিন্তু কেন গেছি তা জেনে অবাক হলেন । বললেন, “তুমি তো কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছ, কলকাতা ছেড়ে চলে গেছ । এই পত্রিকার দপতরে কি কাজ ?” 

আমি তখন গ্রামীণ উন্নয়নের কাজে সারা ভারত চষে বেড়াচ্ছি, সেই সূত্রে অনেককিছু জেনেছি, বুঝেছি, দেখেছি । গ্রামীণ উন্নয়ন বিষয়ে একটি চিঠি যাতে ‘ফ্রণ্টিয়ার’ পত্রিকায় ছাপা হয় তাই দিতে গিয়েছিলুম । চিঠিটা ছাপা হয়েছিল । জিগ্যেস করেছিলেন ‘ফ্রন্টিয়ার”-এ কেন’ । বলেছিলুম এই পত্রিকায় যাঁরা লেখেন আর যাঁরা এটি পড়েন তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য । আসলে ‘ফ্রন্টিয়ার’ পত্রিকার বামপন্থী ঝিকমিক যতোটা ছিল ততোটা তা পাঠকদের কাছে পৌঁছোতো না, আর যাদের জন্য ‘ফ্রন্টিয়ার’ তারা তো সবাই আনপঢ়। 

সোভিয়েত মার্কসবাদের অবলুপ্তি আর চিনা মাওবাদের ডিগবাজি দেখে যেতে হয়নি সমর সেনকে । ১৯৮৭ সালে মারা গিয়েছিলেন সমর সেন ; গর্বাচেভ আর দেন জিয়াও পিঙ আবির্ভূত হয়েছেন তারপর । আর এখনকার ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, আফগানিস্তান দেখলে কি বলতেন উনি, জানতে ইচ্ছে করে, এই যে মধ্যযুগের মতন ক্রীতদাসী বিক্রি, যৌন অনাচারের জন্য সাময়িক বিয়ে, ইত্যাদি । জানি না ১৯৭৯ সালে লেওনিদ ব্রেজনেভের সোভিয়েত সৈন্য যখন আফগানিস্তানে ঢুকে বারব্রাক কারমালকে গদিতে বসালো, তখন তাঁর কেমনতর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল । এই ঘটনা থেকেই তো ইসলামিক দেশগুলো সামাজিক, রাজনৈতিক, ধার্মিকভাবে ছত্রখান হওয়া আরম্ভ হল ।

সমর সেনের ‘উড়ো খই’ আর ‘বাবু বৃত্তান্ত’ আমি পড়েছিলুম । জানতুম উনি নিজের সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি রোমান্টিক কবি নই ; আমি মার্কসিস্ট’ । বাঙালি মার্কসবাদীরা জন্মরোমান্টিক ; তাঁরা কবি-সাহিত্যিক-নাট্যকার-অভিনেতা, দারিদ্র্যের মাহাত্ম্যপূজক, বুদ্ধিজীবী হিসাবে অহংকারী, মানবতাবাদী, দুর্ভোগের জন্যে সবসময়ে তৈরি, আত্মবলিদানকে মনে করেন সর্বোচ্চ প্রাপ্তি । ফলে সমর সেনের প্রজন্মের পর এক অদ্ভুত মার্কসবাদী বাঙালি প্রজন্মের তত্ত্ব পাওয়া গেল, যা এরকম : গরিব হওয়া ভালো, সর্বহারা হওয়া ভালো, উদ্বাস্তু হওয়া ভালো, ইংরেজি না শেখা ভালো, জবরদখল করা ভালো, একঘেয়ে করে দেয়া ভালো, গ্রামছাড়া করে দেয়া ভালো, খেতখামার পুড়িয়ে দেয়া ভালো, কমপিউটার না শেখা ভালো, ইত্যাদি ইত্যাদি । 

সমর সেন রবীন্দ্রনাথের লিরিকাল রোমান্টিসিজম থেকে বাঙলা কবিতাকে বের করে এনেছিলেন, সেই হিসাবে তিনি রোমান্টিক কবি নন, তবে তা বাঙলা কবিতায় আধুনিকতাবাদী রোমান্টিসিজমের একটি প্যারাডাইম শিফ্ট হলেও মার্কসবাদী হিসাবে রোমান্টিক মধ্যবিত্তের “বাবুকবিতা”। মার্কসবাদের জন্য কবিতা লেখা ছেড়ে দিলেন, তখন তাঁর বয়স পঁচিশ । কম বয়সে কবিতা লেখা ছেড়ে দেওয়াকে বাঙালি আলোচকরা কিংবদন্তির অন্তর্গত করেছেন, যেমন র্যাঁমবো। নানা জায়গায় পড়েছি যে সমর সেন ছিলেন টি এস এলিয়টের আধুনিকতাবাদের পথচারী এবং অমন আধুনিকতার সঙ্গে মার্কসবাদের সংশ্লেষ বাংলা বিপ্লবী কবিতায় আনতে চেয়েছিলেন ।

‘কবিতা’ পত্রিকায় সমর সেনের কবিতা পড়ে রবীন্দ্রনাথ বুদ্ধদেব বসুকে ৩ অক্টোবর ১৯৩৫ একটা চিঠিতে লিখেছিলেন, “সমর সেনের কবিতা কয়টিতে গদ্যের রূঢ়তার ভিতর দিয়ে কাব্যের লাবণ্য প্রকাশ পেয়েছে । সাহিত্যে এঁর লেখা ট্যাঁকসই হবে বলে মনে হচ্ছে।” একুশ বছরের সমর সেনকে বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, “নবযৌবনের কবি”। বুদ্ধদেব বসু ১৯৩৮ সালে সমর সেনকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন । সমর সেন যে ধরণের কবিতা লিখেছেন তা পড়ে তাঁকে কি সত্যিই “নবযৌবনের কবি” বলা চলে ! পাতিবুর্জোয়া বাঙালির জীবনযাপনের জোচ্চুরি ফাঁস করাটা কি নবযৌবনের কবির কাজ ছিল ?

১৯৩৮ সালের শেষদিকে কলকাতায় নিখিল ভারত প্রগতি সন্মেলনের অধিবেশনে সমর সেন “ইন ডিফেন্স অফ ডেকাডেন্স” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ পড়েছিলেন । তাতে তিনি নিজের কবিতা রচনার বৈপ্লবিকতা আর সামাজিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন । সমর সেন বলেছিলেন, কবিরা তাঁদের পাতিবুর্জোয়া জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সূত্র আহরণ করে লিখছেন, এবং যেহেতু প্রকৃত সাম্যবাদী সমাজ ছাড়া কবিতা লেখা সম্ভব নয়, কবিদের এখন এরকম কবিতা লেখাই দরকার ; অর্থনৈতিক বনেদ এবং সামাজিক সুপারস্ট্রাকচারের মধ্যে পার্থক্য আছে, কিন্তু কবিতার ভিতরে তো সরাসরি প্রচার চালানো সম্ভব নয় । কবিদের মধ্যে এসম্পর্কে সচেতনতা দেখা দিয়েছে, আর তার ফল পাওয়া যাচ্ছে, বিশেষ করে বাঙলা কবিতা রবীন্দ্রনাথের তরল সেন্টিমেন্টালিজমের বাইরে বেরিয়ে যেতে পেরেছে । প্রবন্ধটিতে সমর সেন আরও বলেছেন, কবিতা হল একজন ব্যক্তিএকক কেমন করে সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছে, তার একটা মাধ্যম, আর সমাজে ডেকাডেন্সের উপলব্ধিও বিপ্লবের পথে অগ্রগমণ ।

আমি কলেজে পড়ার সময়ে মার্কসবাদে আকৃষ্ট হয়েছিলুম, একটা বইও লিখেছিলুম ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’ নামে । কিন্তু ভারতবর্ষের গ্রামগঞ্জ চাক্ষুষ করে, জাতিপ্রথার ভয়াবহ প্রকোপ দেখে-দেখে মার্কসবাদ সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলুম ; তার ওপর স্ট্যালিনের একনায়কতন্ত্রের খবরাখবর সেসময়ে পড়ে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলুম, এরপর আরম্ভ হল পশ্চিমবঙ্গে ক্যাডারদের রক্তচোষার দিগ্বিজয়, র্যা ডক্লিফের ঔরসে সিদ্ধার্থজ্যোতির গর্ভে জন্ম নেয়া এক নতুন বাঙালি । মনে হল অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা অসম্ভব । আজও তাই মনে হয় । এই নতুন বাঙালিরা পয়দা হবার আগেই সমর সেন অবশ্য লিখেছিলেন, সরোজকুমার দত্তের সমালোচনার উত্তরে, “বাংলাদেশের আজ যে অবস্হা, তাতে অগ্রগামীব্লক রাতারাতি গুণ্ডাব্লকে পরিণত হলেও বাহবা পায়।”

‘ফ্রন্টিয়ার’ পত্রিকায় সমর সেন যাদের রাজনৈতিক আদর্শ সমর্থন করতেন, তারা এখন ঝাড়খণ্ড থেকে ছত্তিশগড় পর্যন্ত জঙ্গলের করিডরে বিপ্লবের বীজ পোঁতার চেষ্টা করে চলেছে, এবং এই অঞ্চলটি ভারতের বিভিন্ন ট্রাইব-অধ্যুষিত । প্রতিটি রাজ্যে তফশিলিদর উৎখাত করার বন্দোবস্ত প্রায় হয়েই গেছে, তাদের জমির তলায় খনিজ, বেশিদিন লড়তে পারবে বলে মনে হয় না । মাওবাদীরা সেখানে ঢুকে তফশিলীদের সংস্কৃতিও ভাষা ক্রমশ পালটে দিচ্ছে । তার ওপর তফশিলিরা যে মাওবাদী নয়, তার নানা পরীক্ষা দিতে হচ্ছে তাদের । কিছুদিন আগে আদিবাসী তরুণীদের মাই টিপে প্যারামিলিটারির জওয়ানরা দুধ বেরোচ্ছে কিনা পরীক্ষা করেছিল, দুধ না বেরোলে তারা মাওবাদী, অর্থাৎ অত্যাচারযোগ্য । 

দাদা সমীর রায়চৌধুরী কলকাতায় সিটি কলেজে পড়তে গেলে, বিতর্কিত কবিতা-উপন্যাস পাটনায় আমার জন্য নিয়ে আসতেন । সমর সেনের কবিতার সঙ্গে আমি পরিচিত হই দাদা তাঁর কয়েকটা বই নিয়ে এলে। তিরিশের আর চল্লিশের কবিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা তাঁর কবিতার মেজাজ । বেশ ভালো লেগেছিল, গদ্যে লেখা তাঁর কবিতাগুলো, যাতে তিনি বিদ্রুপের ঠোনা মেরে তুলে ধরছিলেন কলকাতার মধ্যবিত্ত জীবন ও ব্যক্তিএককের হতাশা, ক্লান্তি, স্ববিরোধিতা, ভণ্ডামি, অসঙ্গতি । কিন্তু তাঁর কবিতার সঙ্গে আমার ভাবনাচিন্তার টিউনিং সম্ভব হয়নি । 

১৯৩৮ সালে নিখিল ভারত প্রগতি সন্মেলনের অধিবেশনে আরেকজন স্বঘোষিত মার্কসবাদী সরোজকুমার দত্ত, সমর সেনের কবিতার সমালোচনা করে কয়েকটা কথা লিখেছিলেন, যার সঙ্গে, আমি যখন সরোজকুমার দত্তের লেখাটা পড়ি, আমার সেসময়ে যৎসামান্য মতের মিল হয়েছিল, তার কারণ আমি নিজেও তখন মার্কসবাদে আকৃষ্ট ছিলুম । নকশাল আন্দোলনের সময়ে সরোজকুমার দত্তের মুণ্ডু কেটে ময়দানে ফেলে দেয়া হয়েছিল ।

সমর সেনের কবিতা সম্পর্কে সরোজকুমার দত্ত লিখেছিলেন, “তাঁর কবিতা ‘ইনটেলেকচুয়াকল ক্লিকের’ জন্য লেখা, আমার-আপনার জন্য নহে । পাঠক সম্প্রদায়ের প্রতি এই সানুনাসিক অবহেলা আপনার কাব্যকে সর্বসাধারণের উপভোগ হইতে বাঁচাইয়া দুর্বোধ্য করিবার এই গলদঘর্ম প্রয়াসে ইহা আর যাহাই হউক, বিপ্লবী মনোভাবের পরিচায়ক নহে । মসীকৌলিন্যের অভিমানে শ্রীযুত সেন আজ আর্টের প্রচাররূপ ও কমিউনিকেটিভনেসকে পরোক্ষভাবে অস্বীকার করিতেছেন । রচনার আবেদনের পরিধি সংকীর্ণ হইতে সংকীর্ণতর হইয়া ক্রমে আত্মতৃপ্তিতে পরিণত হইতে বসিয়াছে । এই শম্বুকবৃত্তিকে কি বিপ্লবী প্রচেষ্টা বলিব ? ইহা বিপ্লবের নামে ইণ্ডিভিজুয়াল অ্যানার্কির চরম অবস্হা মাত্র ।”

সমর সেনের কবিতায় দুর্বোধ্যতার দুটো নমুনা দিয়েছিলেন সরোজকুমার দত্ত, যা এখানে তুলে দিচ্ছি:

আকাশচরের শব্দ আকাশ ভরায় ।
নীবিবন্ধে কূটগ্রন্হি
শিবিরে আর নিবিড় মায়া নেই
তুষারপাহাড়ের শান্তি যদিচ শিশিরে ঝরে ।

আরেকটি নমুনা :

পেস্তাচেরা চোখ মেলে শেষহীন পড়া
অন্ধকূপে স্তব্ধ ইঁদুরের মতো’
ততদিন গর্ভের ঘুমন্ত তপোবনে
বণিকের মানদণ্ডের পিঙ্গল প্রহার । 

বহুকাল পরে, ১৯৭৭ সালে, সমর সেন নিজের এবং সরোজকুমার দত্তের তর্কের প্রেক্ষিতে লিখেছিলেন, “বহুদিন পর লেখাটি পড়ে মনে হল সরোজ দত্ত ঠিক লিখেছিলেন, তিরিশের দশকে অনেক লেখক বোধহয় বিপ্লবীর অভিনয় করে বাহবার চেষ্টায় থাকতেন, তাঁদের আসল চেহারা সরোজ দত্ত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন ।” 

সমর সেন যে সময়ে কবিতা লিখছিলেন, সেসময়ে কবির নিজের একটা ব্র্যাণ্ডিং জরুরি মনে করা হতো, অর্থাৎ কবিতা পড়ে বোঝা যাবে কার লেখা, যা ঘটছিল জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখের কবিতায় । সমর সেনও নিজের কবিতার জটিল ব্র্যাণ্ডিং গড়ে তুলেছিলেন । এই বিশেষ ব্র্যাণ্ডিঙে আর কবিতা লেখার প্রয়োজন নেই মনে হয়ে থাকবে তাঁর । ব্র্যাণ্ডিঙে বদল ঘটানোও অধুনিকতাবাদের দৃষ্টিতে গ্রাহ্য ছিল না ।

এখনকার কবিরা আর নিজস্ব ব্র্যাণ্ডিঙের কথা ভাবেন না, তাঁদের কাছে পাঠবস্তুটিই গুরুত্বপূর্ণ ।

এখন বহু ভাবকল্প পড়েছে গিয়ে গাড্ডায়, যেগুলো নিয়ে সমর সেনের কালখণ্ড অতিচিন্তিত থাকতো । যেমন বিপ্লব, প্রগতি, সমাজ, সময়, ইতিহাস, প্রতিক্রিয়াশীল, বাণিজ্য, অবক্ষয়, জীর্ণতা, শ্রেণি, ইত্যাদি । এমনকি কবিতার সংজ্ঞা ।

[রচনাকাল: এপ্রিল ]


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.