Header Ads

Breaking News
recent

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

কবিতার পথে পথে
প্রথম পর্ব

প্রথম কবে কবিতা লিখেছিলাম আজ আর মনে নেই। সেই কবিতা কোথায় আছে তাও জানা নেই। সেই কবিতা সেদিন সত্যিই কবিতা হয়ে উঠেছিল কিনা জানি না। তবে এটা বলতেই পারি, সেদিন আমার কিছু বলতে ইচ্ছা করেছিল। চলতে ফিরতে সবাই যেমন কথা বলে, আমারও তেমন কিছু বলতে সাধ হয়েছিল যা একান্তই আমার নিজের কথা। যে কথার শরীর জুড়ে ছড়িয়ে ছিল শুধু আমি। সেই কথা বলা আজও চলছে। আমার মতো করে আমি বলে চলেছি। এই কথা বলার সময় বুঝতে পারি, আমার মধ্যে আমি থাকি না। আমাকে দিয়ে কেউ যেন কথা বলিয়ে নেয়। 

প্রায় ত্রিশ বছর ধরে কবিতার পথে হেঁটে চলেছি। এই হাঁটার কোনো শেষ নেই। প্রতিদিন ঝুলিতে নিত্য নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হচ্ছে। এতদিন কবিতার পথে পথে একা হেঁটেছি। কবিতা নিয়ে নিজের মনে অনেক কথাই বলেছি। আজ মনে হচ্ছে কবিতার পথে পথে হাঁটতে হাঁটতে আপনাদের সাথেও কথা বলব। কবিতা নিয়ে হাজার প্রশ্ন মনের ভেতর সবসময় উঁকি দেয়। সে সবও আপনাদের জানাব। জেনে নেব আপনাদের মতামত। অভিজ্ঞতার ঝুলি আরও ভরে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস।

আমি বিশ্বাস করি, কবির জন্ম মৃত্যু বলে কিছু হয় না। এ সৃষ্টিশক্তির একটা ধারা। এ যেন ঠিক রিলে রেসের মতো। একজন দৌড়বীর ছুটতে ছুটতে এসে আর একজন দৌড়বীরের হাতে ব্যাটন তুলে দেন। চোখের পলকে তিনি তখন ছুটতে শুরু করেন। কবিদের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। কবিরা তৈরী হয়েই পৃথিবীতে আসেন। পৃথিবীতে এসে তাঁর বিশেষ কিছু নেওয়ার নেই। তিনি শুধু আমাদের দিতে আসেন। জন্মমুহূর্তে আমরা তো লক্ষ্য করি না (সেটা সম্ভবও নয়), করলে বুঝতে পারতাম সাধারণ মানুষের পৃথিবীতে আসার মতো কবির পৃথিবীতে আসা নয়। ভীষণভাবে স্বতন্ত্র। তা না হলে কেন একজন কবি যৌথ পরিবারের সন্তান হয়েও(পাঁচ ভাই, চার বোন) দাদা ভাই এমনকি তাঁর মায়ের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকবে না। কেন তিনি একা একাই ঘুরে বেড়াবেন, যখন ইচ্ছা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়বেন, যখন ইচ্ছা ঢুকবেন ----- কেউ তার কোনো খোঁজ করত না, কোনো শাসনও ছিল না। স্কুলে যখন পড়তেন পাঁচিল ডিঙিয়ে বাইরে চলে যেতেন। বাইরে গিয়ে জগৎটাকে আলাদা লাগত, নতুন লাগত, অতিরিক্ত লাগত। যেতে যেতে টের পেতেন, যে জারুল গাছটার নীচে তিনি এতক্ষণ বসেছিলেন, এখন তাকে আলাদা লাগছে। কেন লাগছে এই আলাদা? আসলে পার্সপেকটিভ বদলে গেছে। এই বদল চতুর্দিকে চলছে। বদলের নির্মাণ চলছে। নির্মাণ নিজের ভেতর নির্মিত হচ্ছে। কবির ভিতরও হচ্ছে।

হ্যাঁ, কবি আলোক সরকারের কথাই বলছি। সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে নিশ্চয়ই তাঁর একটা আসা আছে। সময়টা হল ১৪১৭ সালের ৮ চৈত্র ( ২৩ মার্চ, ১৯৩১ )। বাড়িতে কবিতা লেখার একটা আবহ ছিল। দাদা অরুণকুমার সরকার একজন বিখ্যাত কবি ছিলেন। মাও কবিতা লিখতেন। এইরকম একটা পরিবেশের মধ্যে থেকে তাঁরও কবিতা লেখার শখ তৈরী হয়।

তাঁর বক্তব্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক দেখা। এক বিশেষ দেখা। সেই দেখার মধ্যে দিয়ে যে সৃষ্টি তা যেন আমাদের এক ভিন্নলোকে পৌঁছে দেয়। তাঁর বাবার জ্যাঠামশাইও একজন কবি ছিলেন। তাঁর একটি কবিতা ----- " আয় চলে আয় এই আমতলায় / দূর থেকে দ্যাখ বাড়িটা তোর / এদিকে জানলা ওদিকে দোর।" এই কবিতা প্রসঙ্গে তিনি বলতেন, বাড়ির ভিতর থেকে বাড়িকে দেখা যায় না, দূর থেকে দেখতে হয়। একটা বিশেষ স্থান, যেখান থেকে বাড়িটাকে ঠিকঠাক দেখা যায়। এই দেখাই প্রকৃত দেখা, সম্পূর্ণ দেখা। ওই বিশেষ স্থানটি থেকেই দেখতে হয় বাড়িটার কাজকর্ম বিশ্রাম। তার সঙ্গে যিনি দেখছেন তার স্বপ্ন। অপরিকল্পনা। সমস্ত অনুভব নিয়েই জেগে আছে ওই বাড়িটা।

কবির প্রথম কবিতার বই ছিল 'উতল নির্জন'। কবিতাগুলি তিনি সতের আঠারো বছর বয়সে লিখেছিলেন। কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের সাথে সাথে চারপাশে বেশ ভালোই সাড়া পড়েছিল। নিজের কবিতার সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য কোন কবিকে না খুশি করে। কিন্তু প্রথম বইয়ের প্রশংসা কবি আলোক সরকারকে খুশি করতে পারে নি। কুড়ি বছর বয়সেই তাঁর মনে হয়েছিল তাঁকে নতুন কিছু লিখতে হবে। যে কবিতা তাঁকে প্রশংসা এনে দিল সেই কবিতাকেই সামনে রেখে প্রতিজ্ঞা করলেন, আর কখনও এভাবে লিখবেন না। দাদার জন্য সেইসময় তাঁর অনেক কবিতার বই পড়ার সুযোগ হয়েছিল। জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসুর কবিতা তাঁর ভালো লাগত। তাঁর মনে হল এইসব কবিদের সৃষ্টির কাছে তাঁর কবিতা খুবই কাঁচা। যদিও তখন তাঁর কবিতা বিষ্ণু দে-র 'সাহিত্যপত্র'-এ, বুদ্ধদেব বসুর 'কবিতা'-য় এবং সঞ্জয় ভট্টাচার্যের 'পূর্বাশা'-য় নিয়মিত প্রকাশিত হয়। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো অনেক কবি তাঁকে সমর্থন করলেও তাঁর মনে হত, এ লেখা তাঁর নিজস্ব লেখা নয়, এসব প্রবহমান লেখা। তিনি লেখা ছেড়ে দিলেন। নিজের ভাষা খুঁজতে লাগলেন। নিজেকে বদলে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে লাগলেন। একদিন তরুণ মিত্র নামে এক বন্ধুর সাথে তিনি এক জায়গায় বসে আছেন। একটু দূরেই টালিগঞ্জ রেলওয়ে ----- সেখান দিয়ে একটা ট্রেন যাচ্ছে। তাঁর মাথায় হঠাৎ একটা লাইন এল। তাঁর মনে হল এটা তাঁর নিজের লাইন। "ভিড়ের মধ্যে আকাশে মুখ তুলে তোমায় দেখলাম, তুমি স্থির, আকাশের মতো স্থির" ------ আকাশের কোনো জন্মদিন নেই, কোনো মৃত্যুদিন নেই, কোনো মেঘ তাকে স্পর্শ করতে পারে না। মেঘের দিকে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহও নেই, ভালোবাসা নেই। তাঁর মনে হল, আকাশের মতো তাকে প্রত্যয় অর্জন করতে হবে। কোনো কিছুই যেন তাঁকে স্পর্শ করতে না পারে। তিনি বাড়ি ফিরেই উপরোক্ত কবিতাটি লিখে ফেলেছিলেন। একই বিশ্বাস নিয়ে তিনি আরও কিছু কবিতা লিখলেন। এইসব কবিতাগুলোই একসাথে করে প্রকাশিত হল 'আলোকিত সমন্বয়' বইটি। বইটিতে যে কবিতাগুলি ছিল তার মধ্যে দিয়ে কবির যে দেখা তা একেবারেই আলাদা। ছন্দও ছিল আলাদা। কিন্তু ছন্দকে তিনি অস্বীকার করেন নি। তিনি ছন্দকে মনে করতেন ছবির ফ্রেম। শিল্পী যত বড়ই হোন না কেন তাঁকে ছবিতে ফ্রেম রাখতেই হবে।

একটি ঘটনার দিকে যদি আমরা নজর দিই তাহলে দেখব কবি আলোক সরকার সত্যিই কতখানি স্বতন্ত্র। আজকের কবিদের দিকে তাকালে এসব ভাবাই যায় না। কবি হিসাবে কী ভীষণ আত্মবিশ্বাস ছিল। বুদ্ধদেব বসু 'কবিতা' পত্রিকার জন্য তাঁর কাছ থেকে লেখা চেয়েছেন। দিন কয়েক পরে তিনি সাতটি লেখা দিয়েছিলেন। প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত মারফত খবর এল, বুদ্ধদেব বসু তাঁকে দেখা করতে বলেছেন। তাঁদের দেখা হল, কথা হল। বুদ্ধদেব বসু প্রস্তাব দিলেন, তিনি যদি কবিতাগুলোকে নির্দেশমতো কিছুটা সংশোধন করে দেন তাহলে কবিতাগুলোকে ছাপতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। সেইসময় 'কবিতা' পত্রিকায় সাতটি কবিতা ছাপার অর্থ হল পুরোপুরি কবি হয়ে ওঠার ছাড়পত্র। কিন্তু সংশোধন করতেও তিনি রাজি নন। কারণ তিনি মনে করেন, সংশোধন মানেই কবিতা লেখা তাঁর আর হবে না, শেষ হয়ে যাবে। তাই প্রণবেন্দু দাশগুপ্তকে তিনি জানিয়ে দিলেন, সংশোধনের অনুমতি তিনি দেবেন না।

আলোক সরকারের কবিতার সমালোচকরা বলেন, তাঁর কবিতার প্রধান দুটি ত্রুটি এই যে, সেখানে সমসাময়িক পৃথিবীর কোনো প্রতিফলন নেই। কবির ভক্তেরা মনে করেন, এই বৈশিষ্ট্যই তাঁর কবিতার সবচেয়ে বড় স্বতন্ত্রতা। পঞ্চাশের দশকে 'শতভিষা' প্রকাশিত হল আর তার কিছুদিন পরেই 'কৃত্তিবাস'। পত্রিকা দুটিকে ঘিরে তৈরীও হয়ে গেল দুটি পৃথক গোষ্ঠী। অবশ্যই এক গোষ্ঠীর কবিরা অন্য গোষ্ঠীর পত্রিকায় লিখতেন। দুটি গোষ্ঠীর কবিদের বেঁচে থাকার ধরণধারণ পুরোপুরি আলাদা। কৃত্তিবাসের কবিদের বেঁচে থাকার মধ্যে একটা স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল, জীবনের উত্তাপ ও উদ্দামতা ছিল। অন্যদিকে কৃত্তিবাসের কবিরা মনে করতেন শতভিষার কবিদের জীবন নিরুত্তাপ, বর্ণহীন। প্রতিটি মানুষকে ঘরে বাইরে বেঁচে থাকতে হয়। কবিও এর বাইরে নন। সকলের কবিতায় আজকের সময়ের পৃথিবী থাকবে এমন কোনো কথা নেই। থাকতেই হবে এমন কোনো শর্তও নেই। গোধূলিবেলার রক্তিম সূর্য কিভাবে আমাদের মনে ভালোবাসার রক্তরাগ ছড়িয়ে দেয়, ভোরের নৈঃশব্দ্য কিভাবে আমাদের জীবনের বৃত্তে ফিরিয়ে আনে ------ এসবের আলোচনাও কবিতা। কবিতার এই ঘর চিরকালীন, শাশ্বত। আলোক সরকারের কবিতা, কবিতা পাগল মানুষদের প্রতিমুহূর্তে এই ভাবনায় ঋদ্ধ করবে। আলোক সরকারের কবিতা চিরন্তন সমাজ-সংসারেরই নির্যাস, পৃথিবীর চিরকালীন দুঃখ-কষ্ট-আনন্দের নির্যাস।


কোন মন্তব্য নেই:

সুচিন্তিত মতামত দিন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.