x

প্রকাশিত | ৯৪ তম মিছিল

কান টানলেই যেমন মাথা আসে, তেমন ভাষার প্রসঙ্গ এলেই মানুষের মুখের ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারের কথাও মনে পড়ে যায়, বিশেষত আজকের দিনে। ভাষা দিবস মানেই শুধু মাতৃভাষা নিয়ে আবেগবিহ্বল হয়ে থাকার দিন বুঝি আজ আর নেই!

কেননা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা মাথায় বসে আছেন, বিশেষত যাঁরা রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাভােগী এবং লােভী, তাঁদের মুখের ভাষা এবং তার প্রয়ােগ আজ ঠিক কতটা শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় সেটা শুধু ভাবার নয়, রীতিমতো শঙ্কার এবং সঙ্কটের।

সবই কি তবে মহৎ ভাবনা, অনুপ্রেরণার জোয়ার? নাকি রাজনৈতিক কারবারিরা 'সুভাষিত' শ্রবণাতীত বয়ানে নিজেদের অক্ষমতার মদমত্ত প্রকাশ করছেন? সাধারণ ছাপােষা মানুষ বিস্ফারিত চিত্তে এই ভাষাসন্ত্রাস,এই ভাষাধর্ষণ দেখতে শুনতে ক্লান্ত। এর থেকে উত্তরণের উপায় এখনও অবধি কোনাে ভাষা দিবস দেখাতে পারেনি। এবারের ভাষা দিবসের কাছেও কি সেই উপায় আছে? নাকি এই খেলা হবে, চলবে ... মেধাহীন গাধাদের দৌলতে?

চলুন মিছিলে 🔴

বৃহস্পতিবার, মার্চ ২৩, ২০১৭

সাত্যকি দত্ত

sobdermichil | মার্চ ২৩, ২০১৭ | | মিছিলে স্বাগত
বসন্ত উৎসব
কোপাই পাড়ের নিরিবিলি শাল বন - গতকাল গোধূলিতে এই শালতরু গুলিকে ঘিরে অবিরাম বৃষ্টি পড়েছে, ফাল্গুনী রৌদ্রগন্ধ ধুয়ে মিশেছে মাটিতে - আজ সারাদিনই শালতরুর নতুন করে চৈতি রৌদ্রস্নান দেখে এখনও মেদুরতায় ভুগছে কোপাই পাড় - সন্ধ্যা সলজ্জিত নববধূর মতো এইমাত্র আলতো স্পর্শ করেছে কোপাইয়ের জল, দিগন্ত ছুঁয়ে একটা কালো পাখি উড়ছে - আকাশের মেঠো পথ ধরে শুক্লা-ত্রয়োদশীর পোয়াতি চাঁদ - পুরানো ক্ষেতের ধারে পলাশরা প্রশাখায় আগুনে ফাঁদ সাজিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সারাদিনই, এখন সেই ফাঁদে ধরা দিয়েছে বসন্তের বাতাস - কী অদ্ভূত কৌশলে বাতাস ও আগুনে পলাশের ভাব হয়ে গেছে - বাতাস যত দুলে দুলে হাসছে, ততই পেখমের মতো জ্বলে জ্বলে উঠছে কোমল আগুন - আমাদের চোখের সামনে এছাড়া আর কোন আবিলতা নেই, আমাদের পিছনে বনে কাছটায় অধীর অন্ধকার এসে ক্ষণিকের জন্য হলেও থেমেছে !

-" ফুল নেবে ? মালা করে গলায় পরবে বসন্ত উৎসবে ? সুন্দর লাগবে !"

আমরা দুজনে একসাথে চকমে পিছনে ফিরে দেখি, একটি কিশোরী মেয়ে অনেকগুলি প্লাস্টিকে আগুনে পলাশ ভরে কখন আমাদের পিছনে দাঁড়িয়েছে নিঃশব্দে - মায়ের পুরনো শাড়ির নীচে কিশোরীদের সদ্যোদ্ভিন্ন, লোকলজ্জাকাতর বুকদুটির মতোই তার মুখ, আনত দুটি চোখ স্বপ্নালু । আমাদের বিস্মিত হতে দেখে, সে আরও একটু সংকোচের সাথে বলল, " ফুল নেবে ? এই সবে মাত্র কুড়িয়েছি !"  কিশোরীর গলার স্বর মধুর, যেন গোটা কয়েক কাঁচের চুড়ি একসাথে ভাঙছে !

অভিষিক্তা হেসে বলল, না লাগবে না ! আমাদের বাড়ি হলুদ পলাশ আছে !

এতক্ষণে আলাপের লজ্জা কাটিয়ে অন্ধকার শাল বনে খেলা করে বেড়াচ্ছে - কোপাইয়ের জলে বিষণ্ণতার ছাপ গাঢ় হচ্ছে, তার ভিতর গড়াগড়ি দিচ্ছে দু একটা ফুটফুটে তারা ! অভিষিক্তার কথা শুনে কিশোরীটাও বুঝি বিষণ্ণ হল, আনত দুচোখে তার ছাপ - আমি বললাম, আমি কিনবো - কত করে ?

কিশোরী ফুটফুটে চোখ করে বলল, দশ টাকা এক প্যাকেট !

- 'দাও সব গুলোই ! পাঁচ প্যাকেট আছে মনে হচ্ছে - এতগুলো একসাথে কিনছি একটু কম হবে না ? চল্লিশ টাকা দেই !'

- "আচ্ছা তাই দিন !"

আমি একশ টাকার নোট বের করে তার হাতে দিলে, সে খুব দুঃখিত হয়ে বলল - " আমার কাছে তো কোনো টাকা নেই  !"

- 'নেই ? আচ্ছা তবে এখন পুরোটা রাখো - পরে দেখা হলে ফিরত দিও !'

কিশোরী যেন আরও দুঃখিত হল, বলল - আপনাকে ফুল গুলি এমনি দিলাম । আমার টাকা লাগবে না !

আমি চোখ বড় বড় করে বললাম, এটা তুমি কি বললে ? মেয়েরা কোন ছেলেকে এমনি এমনি পলাশ দিলে কী হয় জানো ?

যে গভীর বিস্ময়ে ভীতু স্বরে বলল, কী হয় !

- " ছেলেটা মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলে ! "

কিশোরী খলখলিয়ে হেসে ফেলল, এমন অদ্ভূত কথা যেন সে আগে কোনদিনই শোনেনি - কিশোরী বেশ অনেকক্ষণ ধরে আগ্রহ করে হেসে চলেছে, আমি এমন করে কখনও কাউকে হাসতে দেখিনি, হয়ত সে অনেক দিন পর হাসছে - তার মনের ভীতরটা আমার কাছে স্পষ্ট না হলেও , মনে হচ্ছিল - অনেকদিন পর তাকে ঘিরে যেন বৃষ্টি পড়ছে, আর সে এখন শুধু কিশোরী নয় - কিশোরী শালতরু !

কপট রাগ দেখিয়ে বললাম, ওত হেসো না হেসো না - আমার পাশে কে দাঁড়িয়ে দেখছ তো ? একে আমি রাখাল বালক বলে ডাকি ! এখন তুমি যদি আমাকে পলাশ দিয়ে দাও, তবে আমার রাখাল বালকের কী হবে শুনি !

সে আবার নতুন করে হাসতে শুরু করল, ত্রয়োদশীর চাঁদের পোয়াতি আলোয় তার গায়ের চাঁপাফুলের মতো রঙটা যেন আরও উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে, পিছনের বনে যত অন্ধকার ছোটাছুটি করছে !

অভিষিক্তারও মেয়েটাকে বোধ হয় ভালো লেগে গেল , বলল - কী মিষ্টি মেয়ে ! নাম কী তোমার ! থাকো কোথায় !

কিশোরী চড়ুই পাখির মতো ঠোঁটে বলল, কাবেরী! এরপর আঙুল উঁচু করে অন্ধকারে প্রায় মিলিয়ে যাওয়া কম্পমান বিন্দু বাতির দিকে দেখিয়ে বলল, ওই বাড়িটা !

অভিষিক্তা বলল, শোনো কাবেরী , সন্ধ্যা হয়ে এলো ! তুমি বাড়ি যাও । আর ওই টাকাটা রাখো । কাল বাদে পরশু বসন্ত উৎসব তো, তাই মনে করো ফুলের দাম বেড়ে গেছে - এখন কুড়ি টাকা করে । ঠিক আছে ?

সে এখনও কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না, কখনও মাথা নীচু করে কী ভাবছে, কখনও বা আমাদের দুজনের মুখের দিকে তাকাচ্ছে - বোধ হয়, কিশোরীটির আত্মসম্মানবোধ প্রবল, তাই তার ভিতর অদ্ভুত একটা গ্লানি কাজ করছে - এই গ্লানি কিশোরীটির সুন্দরতার দেওয়ালে লজ্জায় একেবারেই লীন হয়ে ধুয়ে মুছে মিলিয়ে যাচ্ছে না কিছুতেই !

অভিষিক্তা কিশোরীর কাছে সরে এসে বলল, তুমি ফুল বিক্রি করো ? আগে তো তোমাকে কখনো দেখিনি !

কাবেরী চমকে বলল, না না ফুল তো আমি বিক্রি করি না, আজই শুধুমাত্র করছি ! আমি এবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবো ।

আমি অবাক হয়ে বললাম, আজ করছো মানে ?

কিশোরী দুচোখ টলমল করে উঠল, বিষাদ অবনতা দু চোখ থেকে অতিকষ্ট করেও ক্ষীণ অশ্রু ধারাকে তার পক্ষে সামলানো সম্ভব হল না !

অভিষিক্তা তার দুহাত নিজের হাতে নিয়ে বলল, আমাদেরকে বলতে চাইলে বলো ! কাঁদছ কেন বোকা মেয়ে একটা ! এই দেখো, ওই ছেলেটাও কিন্তু এবার তোমার কান্না দেখে কেঁদে ফেলবে, বুড়ো ছেলে কাঁদলে রাস্তার লোক কী বলবে ভাবো !

কিশোরী অশ্রুধারা নিয়েই খলখলিয়ে হাসলো ! কী মধুর সে হাসি, সে হাসিতে কোথাও যেন ব্যথা বাজে !

এরপর কিশোরী আমাদের যেন বিশ্বাস করে ফেলল, বিহ্বল ঠোঁট দুটি থেকে তার যত্ন করে লুকিয়ে রাখা কষ্ট গুলো গুলি আমাদের মনকে মুহূর্তে বড্ড বেশি আবেশিত করলো !

সে অনেক কষ্টে একপ্রকার ঘোরের ভীতর যা বলল, সেটা হল - কাবেরীর বাবা নেই, বেঁচে থাকলেও সে কোথায় আছে কাবেরী জানেনা ! তবে তার মাঝে মাঝে মনে হয়, খুব ছোট বেলায় সে তার বাবাকে দেখেছে - বাবা তাকে যেন লাল বেলুন কিনে দিয়েছিল ! কাবেরীর দিদি আছে, ওর থেকে চার বছরের বড় - বিশ্বভারতীর ছাত্রী। কাবেরীর মা, তিনটে বাড়ির বাগান দেখাশোনা করে - মালিকরা সবাই কোলকাতায় থাকে । মাস গেলে যা পায়, তাতে কাবেরী দের চলে না - তাই তিন জন মিলে রাত জেগে মাটির গহনা বানায়, কাপড় সেলাই করে ! অভাব অনটন থাকলেও , সুখে এতদিন ভাঁটা পড়েনি মা-মেয়েদের ক্ষুদ্র সংসারে - দিন বেশ চলে যাচ্ছিল ! মেয়ে দুটোই রূপবতী এবং মেধাবিনী - সুতরাং মায়ের আর চিন্তা কিসের !

হঠাৎ, কাবেরীর দিদি অসুস্থ হয়ে পড়ল - তার যে কী হয়েছে কেউ ধরতে পারে না - ডাক্তার, মনসা, শীতলা, পীর ফকির সবাইকে ফেল করিয়ে দিদি এখন বিছানায়, খালি চেয়ে থাকে ছাদের দিকে - গভীর সেদৃষ্টির আকাশে মাঝে মাঝে মেঘ করে বৃষ্টি হয় , বাঁধ ভাঙা বৃষ্টির জল চোখ থেকে গড়িয়ে বালিশ ভিজে যায় ।

দিদি গত বছরও বসন্ত উৎসবে কাঁচা হলুদ শাড়ি পরেছে, খোঁপাতে দিয়েছে রুদ্র পলাশ - তার পর বোনের হাত ধরে সবার সাথে আবির খেলেছে - নাচ করেছে , ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় ...

কাবেরীর খুব ইচ্ছে , এবারে সে তার দিদির সাথে ঘরেই রঙ খেলবে - বসন্ত উৎসবে নাই বা যাওয়া হলো ! কিন্তু, রঙ সে পাবে কোথায় ! রঙ যে হাতে তৈরি করবে তার উপকরণ কেনার পয়সাই বা কোথায়! এতদিন ভাবনা চিন্তা করেও সে যখন কোন উপায় পেল না, তখন আজই সে ফুল বিক্রি করার সিধান্ত নিয়েছে, কিন্তু সে একটা ফুলও গাছ থেকে পাড়েনি, তলা থেকেই কুড়িয়েছে ! কারণ, তার মা নাকি তাকে বলেছে - ফুল গাছদের সন্তান, সন্তান থেকে মাকে আলাদা করতে নেই ।

কাল সে দিদির জন্য রঙ কিনবে, লাল - সবুজ - হলুদ ! আর পরশু দিন দিদিকে কাঁচা হলুদ শাড়ি পরাবে, গলায় পরাবে মাটির মালা, খোঁপা করে গুঁজে দেবে রুদ্র পলাশ । তারপর দিদিকে বসন্ত উৎসবের গান শোনাবে । তার ধারণা, রবীন্দ্র-সঙ্গীত শোনার মুহূর্তটায় দিদি ভালো হয়ে যায়, আগের মতো করে একটা আনন্দের রেখা তার মুখে জেগে ওঠে !

সন্ধ্যার আলিঙ্গনে আঁধার নেমেছে - অভিষিক্তাকে নিয়ে টোটো করে ফিরছি , যদিও অন্যদিকে ফিরে তবুও বুঝতে পারছি ও অবিরাম কেঁদেই চলেছে , একটি হাত কেবল শক্ত করে আমাকে আঁকড়ে ধরে আছে !  আমাদের মধ্যিখানে রক্তরাঙা বসন্তের ফুল আর দুপাশের কতদিনের পুরানো গাছগুলোতে যেন খেলা করে বেড়াচ্ছে একাটা মৃদু অথচ বিহ্বল বিষণ্ণতা !





Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.