x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৭

তুষার কান্তি দত্ত

sobdermichil | ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৭ |
অল্পচেনা চুইখিম
কালিয়াগঞ্জ, জোড়াকদম, পাতকাটা, রংধামালি পেড়িয়ে যেতেই রাস্তা আগলে দাঁড়ালো কত গুলি খুদে বাচ্চা। আর কদিন পড়েই সরস্বতী পূজো। ওদের হাতে ৫টাকা চাঁদা দিয়ে, ডানদিকে তিস্তাকে রেখে এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। দিনটি ছিল ২৭ তারিখ। সকাল সকাল বাইক নিয়ে আমি আর বিশ্বজিৎ রেডি। জলপাইগুড়ি থেকে বোদাগঞ্জের দিকে ছুটে চলেছি নদী বরাবর। তিস্তার পারের উপর দিয়েই রাস্তা। জোড়াকদম, পাতকাটা, রংধামালি জনপদগুলোর বেশ কিছুটা অংশ নদী বেডেই অবস্থিত। বান-বন্যা আটকাতে পাড়ে নি তিস্তাপাড়ের মনুষ্য বসতি। প্রতিবছর বন্যার সময় এই বসতিগুলো বানের জলে প্লাবিত হয়। এসব জায়গার আক্ষরিক অর্থেই কোন দলিল নেই। পাট্টা করেই গড়ে উঠেছে গাঁ-গঞ্জ। রংধামালি বাসস্টপে একটা রাস্তা সোজা নেমে গেছে নদীবেডে। আর বাঁদিকের রাস্তা চলে গেছে বেলাকোবার দিকে। হিরো হুন্ডা সুপার স্প্লেন্ডারে, গাড়ির গতি ৬৫ ছুঁই ছুঁই। যাবার পথে রাস্তার ডানদিকে পড়ল বোদাগঞ্জ ইকোট্যুরিজম পার্ক। দুপাশে শালের জঙ্গল। এই অরণ্য বৈকুন্ঠপুর ফরেস্টের'ই সম্প্রসারিত অংশ। 

বোদাগঞ্জ -এর ছোট্ট বাজারটা পার করে একটু এগোলেই জঙ্গলের ভেতরে মায়ের মন্দির। এটাই ভ্রামরী দেবীর মন্দির। পুরাণকথা অনুসারে এটি দেবীর ৫১ পীঠের একটি পীঠ। পুরাণে বর্ণিত, শালবাড়ি গ্রামে ত্রিস্রোতা (তিস্তা) নদীর ধারেই পড়েছিল দেবীর "পা"। অতীতে কোন একসময় ভ্রামরী দেবীর মন্দির ছিল তিস্তার পাড়ের উপরেই। পরবর্তী সময় নদী খাত কেটে কেটে সরে গেছে অনেকটা। জঙ্গলের মধ্যে উঁচু একটা স্পারের উপর এই মন্দির। মন্দিরের পেছনের চত্ত্বর ঢালু হয়ে নেমে গেছে তিস্তার বেডে।

বর্তমানে এটি বোদাগঞ্জের পিকনিক স্পটও বটে। উত্তরবঙ্গের ত্রাসের নদী তিস্তা একাধিক বার পাল্টেছে তার নদীখাত। যাত্রাপথে নদীর খাত পরিবর্তনের ছাপ সুস্পষ্ট। মূল নদী খাতের মধ্যে খোদিত নদীবাঁকে নদী সরে গেছে একটু একটু করে। বর্তমানের ভ্রামরী দেবীর মন্দির, তিস্তার মূল খাত থেকে ২/৩ কিমি দূরে অবস্থিত।


ভ্রামরীদেবীর মন্দির দেখে নদীবেডে রাস্তাধরি। একদিকে শিকারপুর অন্যদিকে গজলডোবা। নদীর চরে নেমে ঢালু রাস্তা ধরে টাকিমারি....। টাকিমারি থেকে মিলন পল্লী ৫ কিমি। তিস্তার উর্বর পলিতে দুপাশের জমি ঘন সবুজ। লাউ, আলু, মটরশুটি, রাই, পালং, ধনেপাতা আর লাফাশাকের বাগান। মাঠ পেরোলেই জঙ্গলের স্পষ্ট সীমানা ধোঁয়াশায় অস্পষ্ট। জঙ্গলের প্রান্তদেশে পর পর ওয়াচ টাওয়ার। মাঝে মাঝে হাতী বেরিয়ে এসে মাঠের ফসল নষ্ট করে। তাই সার সার এত ওয়াচ টাওয়ার। মিলন পল্লীতে এসে পেয়ে গেলাম ক্যানেলের পাশ দিয়ে ঝাঁ চকচকে রাস্তা। বাইকের গতি ৭০-৭৫। রাস্তার দুই প্রান্তের একদিকে গজলডোবা অন্যদিকে ফুলবাড়ি। ফুলবাড়িকে পেছনে রেখে গাড়ি ঘোরায় বিশ্বজিৎ। 

গজলডোবা। এটাই তিস্তার ব্যারেজ। ব্রীজে ওঠার আগে গাড়িতে ব্রেক করল বিশ্ব। পকেট থেকে মোবাইল ক্যামেরা বের করে ছবি তুলছি নীল জল, ব্যারেজ, পানকৌড়ি, বালিহাঁস, বক আর জেলে নৌকার। হঠাৎ এক গার্ড এসে বাধা দেয় আমাদের। ব্যারেজের একপাশে নোটিশ বোর্ডে তাকিয়ে দেখি, লেখা রয়েছে " YOU ARE UNDER CC TV"। ঝটপট ক্যমেরা বন্ধ করে আবার বাইকে উঠে বসি। 

গজলডোবা ব্রীজ পার করে সোজা রাস্তা চলেগেছে কাঠামবাড়ি ফরেস্ট আর ক্রান্তির দিকে। হাতের বাঁদিকে গজলডোবা স্কুলের পাশ দিয়ে বাইকের হ্যান্ডেল ঘোরায় বিশ্বজিৎ। লোকালয় পার হতেই আবার জঙ্গল। বসন্তে ঝরা পাতার উপর দিয়ে বাইক এগিয়ে যায়। ফেলে রেখে মড়মড় শব্দ। জঙ্গলের মধ্যেদিয়েই রাস্তা। মাঝে মাঝেই পথে হাতি চলে আসে কাঠামবাড়ি ফরেস্ট রেঞ্জ থেকে। পথে পড়ল ধুমসিগাড়া কিছুটা এগোতেই আবার চা বাগান। একপাশে চা বাগান অন্যদিকে তিস্তার নদীবেড। উত্তরবঙ্গের জন জীবনে তিস্তাই জীবনরেখা। তিস্তাকে কেন্দ্রকরেই জীবন জীবিকা, পরিবহন, কৃষিকাজ আর বসতি। জঙ্গলকেটে চা বাগান। যতদূর চোখ যায়, সমতল সবুজ চাগাছে প্রান্তর। মাঝে মাঝে ছায়া প্রদানকারি বৃক্ষরাজী। চলতে চলতে হাতের বাম পাশের জঙ্গল, হালকা হতে হতে মিলিয়ে যায় ডুয়ার্সের চাবাগানে .....

সুপারির বাগানে ছাওয়া ডুয়ার্সের ছোট্ট জনপদ ওদলাবাড়ি। বাজারের ভেতর দিয়ে মূল রাস্তায় উঠতেই নাকে লাগে শুটকি মাছের গন্ধ। ডুয়ার্স মানেই আমার কাছে শুটকিমাছ, লাফাশাক, রাইশাক, কোয়াস, শুখামূলার আঁচার আর শীতের কমলা। ওদলাবাড়ি থেকে সামান্য গেলেই বাগরাকোট। এখানে যাত্রা বিরতি। চা, জল আর একটা সিগারেটে সুখ টান দিয়ে আবার রওনা দেই। আজ যাচ্ছি চুইখিমে। 

অল্পচেনা চুইখিম’কে এখনো ঠিকঠাক চেনেনা সমতলের মানুষ। বাগারাকোট বাজার থেকে সোজারাস্তা চলে গেছে আর্মি ক্যম্পের দিকে। এই পথে সামান্য এগোলেই সোজা রাস্তা। খাড়া উপরে উঠে গেছে। ক্রমাগত হেয়ার পিন বেন্ড পেরিয়ে উপরে উঠছি। ১২৫ সিসির হিরো হোন্ডার বাইক জবাব দিয়ে দেয় মাঝ রাস্তায়। থার্ড গিয়ার থেকে সেকেন্ড গিয়ার। তারপর ফার্স্ট গিয়ার। তাতেও কাজ হয় না। অগত্যা আমি নেমে পড়ি বাইক থেকে। বাইকে মাড়িয়ে যায় শুকনো পাতা। নিস্তব্ধ চারিধার। পাতা খসানো ঋতুতে ঝড়ে পড়ে টুপ টাপ শুকনো পাতা। পাক খেয়ে ঘুরে ঘুরে নামে। ঝরা পাতা উড়ে যায় দমকা বাতাসে। বসন্তের বৈরাগ্য লেগে থাকে গাছেদের গায়ে। এলোমেলো কাঠের কঙ্কাল দাড়িয়ে থাকে পাহাড়ের গায়ে। 

বাগরাকোট থেকে চুইখিম১৪ কিমি। ৫ কিমি এগিয়ে এসে অদ্ভুত সুন্দর একটা ভিউ পয়েন্ট। এখান থেকে তিস্তা নদীকে দেখি পাখির চোখের দৃষ্টিতে। ভি আকৃতির উপত্যকা পেড়িয়ে এসে বিস্তৃত প্লাবনভূমি, সমতলে প্রসারিত হয়েছে। তিস্তা এখানে প্রবাহিত অসংখ্য ধারায়। দূরে আবছা রেখার মত দেখা যায় সেবকের রেল ব্রীজ। ফাঁকা রাস্তা। শুনশান। কারোর দেখা নেই এই পথে। মাঝপথে প্রকান্ড এক ধ্বস। অর্ধেক রাস্তাই তলিয়ে গেছে অতলে। উপর থেকে দেখলে মাথায় পাক খায়। পাহাড়ের দেওয়াল ঘেসে কোনমতে পার হয়ে যাই। পাহাড়ের একটা শৈলশিরার প্রায় উপরে গাড়িটাকে দাঁড় করায় বিশ্বজিৎ। খাদের পাশে বাঁশের চাটাই নির্মিত চা, নুডুলস আর মোমোর ছোট্ট দোকান। অর্ডার দেই দু’প্লেট ভেজ মোমোর। অনেকটা পথ পেড়িয়ে এসে দুজনেই বড্ড ক্লান্ত। গরম গরম ধোঁয়া ওঠা মোমোর প্লেট ভুলিয়ে দিল পথের ক্লান্তি। চারখোল নদীর পাশ দিয়ে নেমে গেছে খাঁড়া রাস্তা। ছড়ানো পাথর আর ধুলোমাখা এই রাস্তায় হাঁটাপথে ১ঘন্টায় চলে যাওয়া যায় চুনাভাট্টি। অনেকদিন আগে "ভ্রমণ পত্রিকায়" প্রকাশিত টুটুল রায়ের একটা লেখায় পড়েছিলাম "বাগরাকোটের ফরেস্ট ওয়াচ টাওয়ার" এর কথা। একে ওকে তাকে বলে অনেক চেষ্টা করেও খুঁজে পেলাম না, স্মৃতির সেই আস্তানা। অগত্যা বাগরাকোট রেল লাইন ক্রস করে উঠে এসেছি ১৪কিমি উপরে। চুইখিমে। 

এপথে সোজা গেলে বরবট, নিম্বুং। তার পর ফাটক। ফাটক থেকেই রাস্তা ভাগ হয়ে গেছে তিন দিকে একদিকে পেমলিং অন্যদিকে লাভা লোলেগাঁও। আর একটা পথ চারখোল সিংজি হয়ে কালিম্পং চলে গেছে । ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ চুইখিম। এদিক ওদিক ইতস্তত হাঁটছি। হঠাৎ-ই দেখা হয়ে গেল বিনয় ভুজেল, প্রশান্ত আর সতীশ ছেত্রীর সাথে। পথ চলতেই আলাপ হয়ে গেল ওদের সাথে। ফুটফুটে মিষ্টি বাচ্চারা আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল শৈলশিরা বরাবর একটা উচু পাহাড়ের মাথায়।

এটা নরেশ গুরুং এর বাড়ি। এখানে মাথাপিছু ৭০০টাকায় হোম-স্টে তে থাকা যায়। শৈলশিরার অপরপ্রান্তে পবিত্র ভুজেলের আরো একটা হোম-স্টে। হাতে সময় নিয়ে আসলে স্থানীয় কোন গাইডের সাথে ট্রেক করে ঘুরে নেওয়া যায় পানবো, মাকুম, সামথার। তিস্তার ডান তীরের দুর্গাশিলা রেঞ্জের পাশ দিয়েই রাস্তা।

এখান থেকে বাগরাকোট নেমে গেছে সোজা দক্ষিনে। নদীর ঠিক বিপরীতে মহানন্দা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারী। আর তার দক্ষিনে বৈকুন্ঠপুর ফরেস্ট। বেলা পড়ে এসেছে। হাতে সময় খুব কম। আজই ফিরতে হবে জলপাইগুড়িতে। তাই ফেরার জন্য পা বাড়াই। পাহাড়ের উঁচু থেকে শেষবারের মত দেখে নেই ডুয়ার্সের বন্ধনহীন গ্রন্থি। শুনশান অরণ্যের পাতা খসানোর খস খস শব্দ। দুরে কোথাও কোন নাম না জানা পাখির শিসে কান খাড়া করি। তাড়াতাড়ি নামতে গিয়ে পায়ের তলার দুএকটা পাথর আচমকাই সরে যায়..... পাহাড়ের ঢালে বড়এলাচ, রাই শাক, ভুট্টা আর সুন্দর ফুলের বাগান। ফেরার পথে বিনয়, প্রশান্ত ও সতীশের নিস্পাপ হাসি হাসি মুখগুলো লেগে থাকে চোখে। লেগে থাকে চেতনায়....। গাড়িতে স্টার্ট দেয় বিশ্বজিৎ। 


# প্রয়োজনীয় তথ্য চুইখিমে থাকতে হলে , নরেশ গুরুং এর  ...
VALLEY VIEW HOME STAY 
Ph no -- 9563664825 & 7031518397 

# চারখোলে থাকতে গেলে
BLUE PINE RETREAT, 
AN UNIT OF SAMALBONG RESORT & TOURS Pvt. Ltd 
Ph no – 03324648752 & 9432406006


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.