x

প্রকাশিত

​মহাকাল আর করোনাকাল পালতোলা নৌকায় চলেছে এনডেমিক থেকে এপিডেমিক হয়ে প্যানডেমিক বন্দরে। ওদিকে একাডেমিক জেটিতে অপেক্ষমান হাজার পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ।​ ​দীর্ঘ সাতমাসের এ যাপন চিত্র মা দুর্গার চালচিত্রে স্থান পাবে কিনা জানি না ! তবে ভুক্তভোগী মাত্রই জানে-

​'চ'য়ে - চালা উড়ে গেছে আমফানে / চ'য়ে - কতদিন হাঁড়ি চড়েনি উনুনে / চ'য়ে - লক্ষ্মী হলো চঞ্চলা / চ'য়ে - ধর্ষিতা চাঁদমনির দেহ,রাতারাতি পুড়িয়ে ফেলা।

​হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানুষটি লালমার্কার দিয়ে গোল গোল দাগ দেয় ক্যালেন্ডারের পাতায়, চোদ্দদিন যেন চোদ্দ বছর। হুটার বাজিয়ে শুনশান রাস্তায় ছুটে যায় পুলিশেরগাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স আর শববাহী অমর্ত্য রথ...। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেকটা জল, 'পতিত পাবনী গঙ্গে' হয়েছেন অচ্ছুৎ!

এ কোন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

সমীরণ চক্রবর্তী

মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৭

শ্রীশুভ্র

sobdermichil | ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৭ | | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
সাহিত্যে শ্লীলতা ও অশ্লীলতার বিতর্ক
সাহিত্যে শ্লীলতা ও অশ্লীলতা নিয়ে তর্ক বিতর্কের শেষ নাই। এই তর্ক বহু যুগ ধরেই চলে এসেছে, আরও বহু যুগ চলতেও থাকবে। একসময়ের অশ্লীলতার দোষে দুষ্ট সাহিত্য পরবর্তী বহু যুগের সাহিত্য ও সাহিত্যপ্রেমীদের সাহিত্যবোধকে পুষ্ট করেছে, এমন দৃষ্টান্তও ভুরিভুরি। অনেকেই বলেন সাহিত্যের ভাষা হবে লেখকের ব্যক্তিচরিত্র ও রুচির প্রতিফলন। যে ভাষা থেকে পাঠক তার পছন্দের সাহিত্যিকের ব্যক্তিরুচির ও সংস্কৃতির এইকটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি এঁকে নিতে পারবে নিজের ভক্তির দর্পনে। যে ছবিটিই পাঠককে উদ্বুদ্ধ করবে সেই সাহিত্যিককে পুজো করতে। এটি আসলেই ব্যক্তি পুজোরই নামান্তর। আসলে আমাদের সমাজে আমরা সাহিত্য নয় সাহিত্যিকের খ্যাতির প্রতিই বেশি মোহগ্রস্ত বলেই অনেকেই এই ধারণার পৃষ্ঠপোষক। সেই কারণেই দেখা যায়, সহিত্যের হাটে যে সাহিত্যিক যত বেশি জনপ্রিয়, তাকেই আমরা তত বড়ো সাহিত্যিক হিসাবে ধরে নিই। পাশাপাশি কম জনপ্রিয় বা প্রায় অখ্যাত সাহিত্যিকের শ্রেষ্ঠ কীর্তিকেও আমরা আমল দিই না। এসবই হয় জনমানসের মানসিকতার প্রতিফলনে। যে মানসিকতা সাহিত্যবোধের বিপ্রতীপে সমাজিক ন্যায়বোধের উপর প্রতিষ্ঠিত। আবার এই সামাজিক ন্যায়বোধ যে যুগে যুগে সদাই পরিবর্তনশীল একটি ধারণা, অধিকাংশ সময়েই স্মরণে রাখি না আমরা সেই সত্যটিই।

এখন একজন সাহিত্যিক ঠিক কোন ভাষায় লিখবেন? যে ভাষায় তিনি সকলের সাথে স্বচ্ছন্দে যোগাযোগ করতে পারেন নিঃশঙ্কচে, সেই ভাষাতেই? যে ভাষাটি সমাজিক মাপকাঠিতে শ্লীল বলে পরিগণিত? নাকি তিনি ঠিক সেই ভাষাতেই লিখবেন যে ভাষাটিকে দাবি করে তাঁর লেখার বিষয় বস্তুটি? বস্তুত এই দ্বন্দ্ব লেখকের নিজস্ব দ্বন্দ্ব হতে পারে। লেখককেই ঠিক করতে হবে তাঁর নিজের পথ কোনটি। বাইরে থেকে এই বিষয়ে তার উপর কোন মতামত চাপিয়ে দেওয়া বা কোন একটি নির্দিষ্ট পথে তাঁকে পরিচালিত করতে চেষ্টা করাই বস্তুত স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতারই সামাজিক প্রতিফলন মাত্র। তাই আমাদের বোঝা দরকার, লেখার ভাষা নির্ধারিত হবে লেখার বিষয়বস্তুর উপর। নয়তো সে লেখা কালত্তীর্ণ সর্বজনীন হয় না। একটু বুঝিয়ে বলি, আমরা যখন সিনেমার স্টারদের নিয়ে নাচানাচি করি, তখন তাদের চলাফেরা কথাবলা ঘার বেঁকানো গলার স্বর হাসার ধরণ, নানার মুদ্রা ও মুদ্রাদোষ যেগুলিকে মিডিয়া বেশি করে হাইলাইট করে জনপ্রিয় করে তোলে; মুলত সেই ধরণগুলির উপর নির্ভর করেই স্টারদেরকে মাথায় তুলি। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, সেই স্টারদের অভিনিত অধিকাংশ ছবিতেই আগের ছবির জেরক্স অভিনয় দেখা যায়। আর সেইটাই দেখতে ফ্যানেরা ব্ল্যাকে টিকিট কাটে। আর সেটাই স্টার ভ্যালু। কিন্তু সেখানেই একজন স্টারের সীমাবদ্ধতা। যেমন উত্তম কুমার। তেমনি লেখকও যদি সব লেখা তাঁর নিজের ব্যক্তিগত রুচির উপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা ভাষায় লিখে যেতে থাকেন, তবে সেখানেই তার লেখকসত্ত্বার সীমাবদ্ধতা। তিনি আর বাড়তে পারেন না। এবার আসি অভিনেতাদের কথায়। একজন ভালো অভিনেতা, এক একটি সিনেমায়, গল্পের পরিচয়ে এক একটি চরিত্রের মতো করে হাঁটেন, কথা বলেন, তাকান, ঘার বেঁকান, হাসেন, সেই কাল্পনিক চরিত্রটির মুদ্রা ও মুদ্রাদোষগুলিকেই জীবন্ত করে তোলেন। সেখানে দর্শক কিন্তু সেই অভিনেতার ধরণগুলিকে খুঁজে পান না। সেই কারণেই তিনি প্রকৃত অভিনেতা। যেমন সদ্য প্রয়াত ওম পুরী। ঠিক তেমনই সেই লেখকই বড়ো লেখক, যিনি তার লেখার বিষয়বস্তুর প্রয়োজন অনুসারে তার লেখার ভাষা ঠিক করে নিতে পারেন। যাতে করে তার ব্যক্তিগত রুচি ও লেখার ধরণ বিষয়বস্তুকে অড়াল করে ছাপিয়ে ওঠে না। এক একটি লেখা পূর্ববর্তী লেখার ধারণ ধারণ থেকে স্বতন্ত্র মাত্রায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। এবার বলি, বিখ্যাত ফরাসী লেখক গুস্তভ ফ্লবেয়ারের কথা, তিনি ১৮৫৭ সালের ১৮ই মার্চের একটি পত্রে Mlle. Leroyer de Chantepie কে লিখছেন; "It is one of my principles that a writer should not write himself. The artist must be in his work the way God is in the creation, invisible and all-powerful; he should be felt everywhere but seen nowhere."

অনেকেই বলেন, যে সাহিত্য সকলের সামনে সজোরে নিঃশঙ্কচে পড়াই যায় না, সেই সাহিত্য সাহিত্যই নয়। তা নেহাতই অশ্লীল। বড়ো সরলরৈখিক ভাবনা। প্রথমতঃ সাহিত্য নিরিবিলিতে পাঠকের একান্ত নিজস্ব বৃত্তেই পাঠের বিষয়বস্তু। অনেকেই বলবেন, তা কেন? সাহিত্যের আসরে গল্প কবিতা আবৃত্তি তো দর্শক শ্রোতার কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্যেও পাঠ করা হয়, হয়ে থাকে। খুবই সত্য কথা। আর অনেকেরই আপত্তি ঠিক সেখানেই, যে লেখাটি সকলের সামনে নিঃশঙ্কচে পাঠ করা যায় না, সেটি কি করে সাহিত্যের সমগ্রী হতে পারে? এখানে একটু ভাবা দরকার, এই যে সকলের সামনে পাঠের কথাটি হচ্ছে, এই সকল বলতে আমরা কাদের বুঝাতে চাইছি? সব রকম সহিত্যের আসরে সব রকম মানুষই কি সমবেত হন? তাই কি? বড়োদের সাহিত্য, ছোতটদের সাহিত্য বলে তবে তো আলাদা শ্রেণীবিন্যাসই থাকতো না। তাই না কি? কিন্তু আমরা জানি সেটা আছেই। সব কালেই থাকে। আবার প্রাপ্তবয়স্ক মানেই যে তিনি সাহিত্যের পাঠক বা শ্রোতা বা সাহিত্যবোদ্ধা তাও কিন্তু নয়। ফলে সব রকম সাহিত্যের আসরেই সব রকমের পাঠক শ্রোতারা কিন্তু সমবেত হন না। তারও থাকে নানান রকমের শ্রেণী বিন্যাস। অনেকেই হয়তো মুচকি হাসতে পারেন এই ভেবে যে, তবে কি শ্লীল সাহিত্যের আসর আর অশ্লীল সাহিত্য আসর বলে নতুন কোনো শ্রেণী বিভাজনের দিকে যেতে হবে আমাদের? না তা নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু কোনটা শ্লীল সাহিত্য আর কোনটি অশ্লীল সাহিত্য, সেটি ঠিক করবে কে? এবং কিভাবে। কি হবে শ্লীলতার মানদণ্ড? এই মৌলিক প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে হবে আমাদেরকে।

সমকাল অধিকাংশ সময়েই বর্তমান কালের সংস্কারের ফেটিতে তার বোধকে অবরুদ্ধ করে রাখে। গণ্ডগোলটা হয় তখনই। আমি বরং আগে কয়টি দৃষ্টান্ত দিই! রবি ঠাকুরের কড়ি ও কোমল মানসী সোনারতরীর অনেক কবিতাই সে য়ুগের জ্যাঠামশাইদের কাছে অশ্লীল বলে মনে হয়েছিল। স্বয়ং দ্বিজেন্দ্রলালের ধারণায় চিত্রাঙ্গদার মতো অশ্লীল কাব্য সমাজকে অধঃপতিত করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ঠ মনে হয়েছিল। ঠিক যেমন পরবর্তীতে কল্ললযুগের লেখকদের আধুনিকতাকে মেনে নেওয়া শরৎচন্দ্র ও রবিঠাকুরের পক্ষেও সহজ হয় নি আদৌ। সাহিত্যের ইতিহাস মূলত এই দ্বন্দ্বেরই ইতিহাস। ১৯২৯ সালে বৃটেনে আদালতের নির্দেশে ডি এইচ লরেন্সের যে "লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার" উপন্যাসকে অশ্লীলতার দায়ে তিন দশকের উপর নিষিদ্ধ করে হাজার হাজার বইয়ের কপি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, অথচ বিগত ৫ দশকে আবিশ্ব ইংরাজী সাহিত্যে সবচেয়ে বেশি গবেষণা পত্র তৈরী হয়েছে সেই উপন্যাস ও তার লেখককে নিয়েই। এ আমি নিজের চোখেই দেখেছি। তাই লেখায় সর্বজনীনতা কখনোই সকলের সামনে সজোরে পড়ার উপর নির্ভর করে না। সব লেখাই সকলের সামনে সজোরে পড়ার বিষয় নয়। সব কাজই সকলের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে করার নয়। তাই বলে মলমূত্র ত্যাগ বা যৌনমিলন অশ্লীল কর্ম হয়ে যায় নয় কিন্তু। আমাদের এই কথাটি মনে রাখা দরকার। যুবানশ্বের লেখা পটলডাঙার পাঁচালীর ভাষা যদি রাবীন্দ্রিক হতো, তবে তার সাহিত্যমূল্য প্রায় শূন্য হতো। আমার বলার কথা এটাই, লেখককের ভাষা ব্যবহার নির্ভর করবে তার লেখার বিষয়বস্তুর মূল্যবোধের উপর। যে মেয়েটি জীবনধারণের জন্যে পতিতাপল্লীতে বিকারগ্রস্ত কামুক পুরুষদের যৌনক্ষুধা নিবৃত্তি করতে করতে নিজের শরীরকেই একসময় ঘেন্না করতে শুরু করে, তার মুখে গোড়ার সুচরিতার ভাষা বসিয়ে দিলে সেটা সকলের সামনে সজোরে পড়া যেতে পারে ঠিকই, কিন্তু তার মতো নির্মম অশ্লীলতা ও অসাধুতাও আর হতে পারে না। এটা পরিস্কার বুঝে নেওয়া দরকার আমাদের। যে লেখক তার নিজ চরিত্র অনুয়ায়ীই তার লেখার ভাষা ঠিক করতে থাকেন, তার সেই লেখা কালজয়ী হতে পারে না। ভাষা হবে তিনি কি লিখছেন, কাদের নিয়ে লিখছেন, কোন সময়ের কথা লিখছেন, সেই সময়ের ধরণ ও তার লেখার চরিত্রদের বিশ্বাস সংস্কার শিক্ষাদীক্ষা ও রুচির উপযুক্ত। সেখানে যদি তিনি নিজের রুচি শিক্ষা দীক্ষা সংস্কারকেই বড়ো করে তুলে ধরতে থাকেন, তবে তিনি তাঁর সময়ে যতই জনপ্রিয় হোন না কেন, কালের কুলোতে একদিন বিস্মৃতির সরণীতে ধুলোবালি হয়ে যাবেন।

ইতিহাসের দিকে তাকালে কি দেখতে পাই আমরা? যারা যারা রবি ঠাকুরের চিত্রাঙ্গদাকে অশ্লীল বলে দেগে দিয়েছিল একসময়ে, কিংবা ক্যাম্পে কবিতা লেখার জন্যে চাকুরী হারাতে হয়েছিল কবিকে যাদের সাহিত্যবোধের দৌলতে, কিংবা লেডি চ্যাটার্লিজ লাভারকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল যে সমাজপতিরা, কালের বাতাসে তাদের টিকিটিও কেউ আমরা খুঁজে পাই না আর। পেতেও চাই না। কিন্তু চিত্রাঙ্গদা, বা ক্যম্পে কবিতা বা লরেন্সের সেই উপন্যাস পরবর্তীকালের সাহিত্যের জন্যে প্রশস্ত ও নতুনতর সব দরজা জানলা খুলে দিয়েছিল। যে কারণেই রবি ঠাকুর থেকে জীবনানন্দ লরেন্স আজও আবিশ্ব সাহিত্যপ্রেমীদের নয়নমনি হয়ে রয়ে গিয়েছেন। ঠিক এই কারণেই আমি সাহিত্যে জ্যাঠামশাইগিরি অপছন্দ করি বড়ো। প্রতিটি পাঠক, তাঁর ব্যক্তিগত রুচিবোধের পরিমিতিতেই তার পছন্দের সাহিত্যিক বেছে নেবেন। ব্যক্তিগত সাহিত্যবোধের গণ্ডীতেই আমরা পছন্দের অপছন্দের তালিকা তৈরী করবো। তাতে কারুর কিছুই বলার নাই। কিন্তু গোল বাঁধে তখনই যখন দল পাকিয়ে আমরা অমুক সাহিত্য অশ্লীল বলে দেগে দিতে উঠে পড়ে লাগি। এই প্রবণতার সাথে সাহিত্যবোধের কোন সংযোগ নাই। বরং অন্য অনেক রকম রাজনীতি থাকতে পারে। যাই থাকুক, যে সাহিত্য সর্বযুগের মানুষকে চিন্তা ভাবনার খোরাক যুগিয়ে যেতে থাকবে, সেই সাহিত্যকে তার সমকাল কি বলে দেগে দিল বা না দিল, তাতে সেই সাহিত্যের কিছুই এসে যায় না। সাহিত্যের ইতিহাস বারবার আমাদেরকে এই শিক্ষাই দিয়ে এসেছে। আমি স্বীকার করি আর নাই করি। তাতে কি এসে গেল বিশ্বসাহিত্যের?

এবার আসি আমাদের বাঙালি পাঠকদের কথায়। সাহিত্যে শ্লীলতা ও অশ্লীলতা নিয়ে আমরাই তো সরব হই সবচেয়ে বেশি, অথচ মজার বিষয় হলো, সেই আমরাই বিশ্ব সাহিত্যের এমন অনেক লেখা নিয়ে নিজেদের পাণ্ডিত্য প্রকাশ করি ও সেই সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্ব প্রামাণে উঠে পড়ে লাগি, যে সাহিত্যগুলিও কোন না কোন সময়ে কোন না কোন সমাজে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিল। অনেকেই বলবেন, সে তো হতেই পারে, এক যুগের মাপকাঠিতে অশ্লীল মনে হলেও আজকের সমাজবাস্তবতায় সেই লেখাটিই আর অশ্লীল নয় পাঠকের কাছে। এমনটি তো হতেই পারে। অর্থাৎ এবার তাঁরাই কিন্তু স্বীকার করে নিলেন আমাদের পূর্বক্ত যুক্তিটি, যে সাহিত্যে অশ্লীলতা আসলেই কালের মানদণ্ডে সীমায়িত একটি ধারণা। আবার এও দেখা যায় বিদেশী ভাষায় লেখা যে সাহিত্যটি বাঙালি পাঠকের কাছে অশ্লীল বলে মনে হয় না, সেই লেখাটিরই বঙ্গানুবাদে পিছিয়ে আসবেন হয়তো অনেক বাঙালি লেখকই। কেন হয় এমনটি? হয় কারণ আমাদের বোধের সীমাবদ্ধতা। হয় কারণ আমাদের সাহিত্যবোধের দূর্বলতা। আমাদের গোড়াতেই একটি বড়ো গণ্ডগোল রয়ে গিয়েছে আসলে। বাংলা ভাষার উদ্ভব ও বিকাশের ধারায় আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিকাশটি ঘটেছে সম্পূর্ণতই বৃটিশের কাছে পরাধীনতার আমলে। যে কারণে আমরা আমাদের মাতৃভাষাটিকে কোনদিনই আপনার করে পাই নি। পেয়েছি ইংরাজী এ বি সি ডি মুখস্ত বিদ্যায় পারদর্শীতা অর্জনের মাধ্যমে। এই যে বংশ পরম্পরায় একটি বিদেশী ভাষায় সীমাহীন দাসত্বের প্রেক্ষাপটে আপন মাতৃভাষার সাথে সম্পর্ক, এই বিষয়টি বড়োই এক জটিল মনস্তত্বের জন্ম দিয়েছে আপামর শিক্ষিত বাঙালির মধ্যে। তাই অতি সহজেই যে কথাটি ইংরাজী ভাষায় ব্যক্ত করি, সেটিই আপন মাতৃভাষায় উচ্চারণে আমাদের কান লাল হয়ে ওঠে লজ্জায়। সুখের বিষয়, বাংলার অশিক্ষিত জনসমাজে এই মানসিক দৈন্যতা আজও নাই। যে যত শিক্ষিত, তারই এই দৈন্যতা তত বেশি।

বিষয়টি তাহলে একটু খোলসা করেই বলা যাক, ‘অমুকের ওয়াইফ সম্প্রতি কনসিভ করায় ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলেন’। না গোটা কথাটি আমরা কত সহজেই আর পাঁচজনের সাথে শেয়ার করে নিতে পারি। বলতে গেলে জীহ্বাও আড়ষ্ট হয়ে যায় না। কিন্তু বিদেশী ভাষার দাসত্ব ছেড়ে সেই একই সংবাদ দিতে যেই বলে উঠবো, ‘অমুকের বৌটা পেটে বাচ্ছা ধরায় বৈদ্য দেখাতে গিয়েছিল’ তখনই নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারবো না, এই যাঃ কি বলে ফেললাম! শ্রোতাদের মাঝে অশিক্ষিত ও অশ্লীল ভাষা প্রয়োগে আমার তখন লজ্জায় ধরণী দ্বিধা হও অবস্থা। আমাদের বাঙালিদের চেতনায় এই হলো মূলত ভাষায় শ্লীল অশ্লীল দ্বন্দ্ব। যে কোন প্রতিষ্ঠানে গেলেই দেখা যাবে লেখা আছে টয়লেট ইউরিনাল ঐ দিকে, কোথাও লেখা থাকে না মলমূত্র ত্যাগ ঐ দিকে। চিকিৎসকের নির্দেশে আমরা স্টুল টেস্ট করাবো, ইউরিন কালচার করাবো, কিন্তু ভুলেও গু পরীক্ষা কিংবা হিসি পরীক্ষা করাতে পারবো না। এইখানেই আসলে আমাদের ভাষা প্রয়োগে শ্লীলতা অশ্লীলতা বোধের ভিত্তি। আর বাংলা সাহিত্যে শ্লীলতা অশ্লীলতা নিয়ে আমাদের যাবতীয় তর্ক বিতর্ক কিন্তু এই মানসিকতারই প্রতিফলন মাত্র। তাই আমরা সমগ্র সাহিত্যকর্মটি ছেড়ে কতগুলি বাংলা শব্দের ব্যবহার করা আর না করার মধ্যেই আমাদের শ্লীলতা অশ্লীলতার মানদণ্ডটিকে কার্যকর করে রাখি কেবলই। 

দুঃখের বিষয় এই বিচিত্র মানদন্ডের বেড়াজাল ভেঙে অনেক সময়েই পরিশীলীত ভাষা ব্যবহার করেও অনেক অশ্লীল লেখা সাহিত্যের আসরে জাঁকিয়ে বসে থাকার সুযোগ পেয়ে যায়। আর অনেক সৎ সাহিত্যও খান কতক শব্দের অজুহাতে অটকা পড়ে ছটফট করতে থাকে, যুগমানসের পরিবর্তনের আশায় দিন গুনে গুনে। একই শব্দ আমাদের ইংরাজী এ বি সি ডি’র মুখস্থ বিদ্যায় সাবলীল শ্লীল শোনালেও, সেই শব্দটিই বাংলায় উচ্চারণ করলেই বা প্রয়োগ করলেই তা অশ্লীল; এই যে অশিক্ষিত মানসিকতা, আসুন এই মানসিকতাকেই অশ্লীল বলে ভাবা শুরু করি বরং। একমাত্র তখনই পারবো আমরা সৎ সাহিত্য ও অসৎ সাহিত্যের রাজনীতিটি স্পষ্ট বুঝে নিতে। 

অনেকেই সাহিত্যে যৌনতার ব্যবহারটিকেই অশ্লীলতার চর্চা বলেও অভিহিত করে থাকেন। তাঁরা ভুলে যান সাহিত্যের মূল ভিত্তিই হল নর নারীর সম্পর্ক, ও সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে জগৎসংসার ও মানব বিশ্বের সাথে সম্পর্ক বিন্যাসের যাবতীয় দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়ের মধ্যেই। সেই কারণেই যাবতীয় সাহিত্যের প্রাণ ভোমরা নারী পুরুষের প্রেমের গল্পের হাত ধরেই। নারী পুরুষের প্রেমের গল্প কি নারী পুরুষের যৌন সম্পর্ককে অস্বীকার করে? প্রেমের উৎস মুখ কি শুধুই হৃদয় কেন্দ্রিক? সে কি শরীরজাত নয়? শরীরকে অস্বীকার করে প্রেম? তাহলে তো বলতে হয় সে নেহাৎই অশরীরী প্রেম। আসলে সাহিত্যের বিষয়বস্তু সমগ্র জগৎ জীবনকে নিয়েই। সেখানে হৃদয়ও যতটা গুরুত্বপূর্ণ যৌন আবেগও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। তাই যৌনতা মানেই অশ্লীল এই ধারণা সাহিত্যবোধ সঞ্জাত হতে পারে না কিছুতেই। এখন সেই যৌনতাকে কোন লেখক কোন কোন শব্দের নির্যাসে কোন ভঙ্গিমায় ধরবেন, কিংবা ধরবেন না, সেটা সেই সেই লেখকের লেখকসত্ত্বার উপর নির্ভরশীল। সমাজ কখনোই তার উপর খবরদারী করতে পারে না। করলে সেটিই অশ্লীলতা। সাহিত্যে অশ্লীলতা প্রধাণত এই সমাজিক খবরদারীরই অশ্লীলতা। কালের কষ্টিপাথরে যা বারে বারে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়, প্রকৃত সৎ সাহিত্যের অভ্যন্তরীন শক্তিতে ও তার বিষয় ভাবনার সৌকর্য্যে। তার প্রকাশভঙ্গীর দ্যুতিতে।

বাংলা সাহিত্যে শ্লীলতা অশ্লীলতার যে বিতর্ক, তা বিংশ শতকের শেষ প্রান্ত পর্য্যন্ত মূলত সাহিত্য সমাজের ঘেরাটোপেই সীমাবদ্ধ ছিল। বৃহত্তর পাঠক সমাজে এর বিশেষ কোন প্রভাব ছিল কি না, বা থাকলেও তা কতটুকু সে সব গবেষণার বিষয়। কিন্তু বর্তমান শতকের প্রথম দশক থেকেই অন্তর্জাল বিপ্লবের হাত ধরে এই যে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে গেল, যার প্রভাবে সকলেই কবি সকলেই বিচারক, লেখক আর পাঠকের মধ্যে ঘুচে গেল সব ব্যবধান; সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজ আর সাহিত্যে শ্লীলতা অশ্লীলতার বিতর্ক শুধু মাত্র সাহিত্য সমাজের মুষ্টিমেয় প্রভাবশালীদের ঘেরাটোপে আবদ্ধ নেই। তাই আজ সকলেই এই বিতর্কের বিশিষ্ট অংশীদার। কিন্তু দুঃখের বিষয় এইটিই যে; যে জীবনবোধ ও সাহিত্যপ্রজ্ঞা থাকলে শ্লীলতা অশ্লীলতার বিষয়টি অনুধাবন করা যায়, সেটি আমাদের অধিকাংশ পাঠক ও মতদানকারীরই থাকে না। আর তাই আমরা সমগ্র লেখাকে ছেড়ে বিশেষ কতগুলি শব্দ ও তার ব্যবহারকে ঢাল করে লেখকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়ে নিজেরাই বিচার সম্পন্ন করে ফেলি। এইটি ঘটছে একেবারে হাল আমলে। আর তার একমাত্র মাধ্যমটি হলো সামাজিক অন্তর্জাল পরিসর। আমাদের বিচারের একটিই মাত্র মানদণ্ড। আর সেইটি হলো আমাদের পছন্দ ও অপছন্দ। অবশ্যই প্রতিটি পাঠকের নিজস্ব রুচি পছন্দ অপছন্দের একটি ব্যক্তিগত মানদণ্ড থাকতেই পারে। যার ভিত্তিতে আমি ঠিক করে নেব কোন লেখাটি পড়বো, আর কোনটি পড়বো না। তাতে ঠকা জেতা আমারই নিজস্ব ব্যাপার। সেই বিষয়ে কারুরই কিছু বলার থাকতে পারে না। কিন্তু তাই বলে আমিই যখন আমার মতটাকে, আমার পছন্দ অপছন্দের মতামতটিকে চুড়ান্ত সামাজিক বা সাহিত্যিক অভিমত হিসাবে চাপিয়ে দিতে যাবো তখন সেইটিই স্বৈরতন্ত্র। আমাদের বুঝতে হবে সেই সত্যটিই।

আবারো যদি আমরা সেই ইতিহাসের দিকেই তাকাই, দেখতে পাবো কোন অশ্লীল সাহিত্যই কালের সীমা অতিক্রম করতে পারে না। পারে নি। এবং পূর্বেই আমরা দেখিয়েছি বহু কালোত্তীর্ণ সাহিত্যকেই তার সমকালের কাছে অশ্লীলতার ভ্রান্ত অজুহাতে দায়বদ্ধ হতে হয়েছিল। তাই কোন সাহিত্য অশ্লীল বা কোন লেখক অশ্লীলতার চর্চা করছেন, আমাদের ভাবনার অভিমুখটি সেই দিক থেকে সরিয়ে আমরা যদি কেবল মাত্র আমাদের নিজস্ব রুচি শিক্ষা ও সাহিত্যবোধের পরিমিতিতেই আমাদের পছন্দের সাহিত্যকে বেছে নিয়ে সাহিত্যচর্চা করতে থাকি, তাহলে অযথা কোলাহলে নষ্ট হয় না বহু মূল্যবান সময়। অযথা ভ্রান্ত অপবাদে ধর্ষিত হতে হয় না অনেক সৎ সাহিত্যকেই। আমরা যেন ভুলে না যাই আমাদের জীবদ্দশায় আমাদের ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের মানদণ্ডের থেকেও অনেক বড়ো কালের কষ্টিপাথর। এবং আমরা যেন এই সত্যটুকুর উপরেও বিশ্বাস রাখি যে, কোন অশ্লীল সাহিত্যই কোন দিন কালোত্তীর্ণ হতে পারে না। ফেলতে পারে না সাহিত্যের পাঠকের উপর চিরস্থায়ী কুপ্রভাব।





Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.