x

প্রকাশিত | ৯৪ তম মিছিল

কান টানলেই যেমন মাথা আসে, তেমন ভাষার প্রসঙ্গ এলেই মানুষের মুখের ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারের কথাও মনে পড়ে যায়, বিশেষত আজকের দিনে। ভাষা দিবস মানেই শুধু মাতৃভাষা নিয়ে আবেগবিহ্বল হয়ে থাকার দিন বুঝি আজ আর নেই!

কেননা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা মাথায় বসে আছেন, বিশেষত যাঁরা রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাভােগী এবং লােভী, তাঁদের মুখের ভাষা এবং তার প্রয়ােগ আজ ঠিক কতটা শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় সেটা শুধু ভাবার নয়, রীতিমতো শঙ্কার এবং সঙ্কটের।

সবই কি তবে মহৎ ভাবনা, অনুপ্রেরণার জোয়ার? নাকি রাজনৈতিক কারবারিরা 'সুভাষিত' শ্রবণাতীত বয়ানে নিজেদের অক্ষমতার মদমত্ত প্রকাশ করছেন? সাধারণ ছাপােষা মানুষ বিস্ফারিত চিত্তে এই ভাষাসন্ত্রাস,এই ভাষাধর্ষণ দেখতে শুনতে ক্লান্ত। এর থেকে উত্তরণের উপায় এখনও অবধি কোনাে ভাষা দিবস দেখাতে পারেনি। এবারের ভাষা দিবসের কাছেও কি সেই উপায় আছে? নাকি এই খেলা হবে, চলবে ... মেধাহীন গাধাদের দৌলতে?

চলুন মিছিলে 🔴

মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৭

সুদীপ্ত চক্রবর্তী

sobdermichil | ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৭ | | মিছিলে স্বাগত
ভাষা, গান আর সেই বৈষ্ণবী
কিছু সময় আছে, যেন মনে হয় স্বপ্ন থেকে উঠে আসা, বার্লিন প্রাচীর যে বছর ভাঙে আমার বয়স তখন পাঁচ, যদিও এ লেখাটার সাথে বার্লিন প্রাচীর ভাঙবার কোন সম্পর্ক নেই, তবুও হটাৎই মনে হল ঘটনা টা। আজ আমার ধুলোয় মিশে যাওয়ার অনেক বয়স হল যেন, কত সহস্র বছর যেন, সেই সন্ধ্যা, সেই দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ......... হ্যাজাক লাইটের আলোয় দেখেছিলাম সেই মায়াময় মুখ। মন্দিরা আর খোলের আওয়াজের সাথে মিশে যাচ্ছিলো তাঁর কোমল কণ্ঠের ভাসানো সুর; কপাল জুড়ে বৈষ্ণবী রঙ মাখা, মৃদু হাসি লেগেছিলো চোখে; হাসি ঠিক নয়, লাবণ্য বিচ্ছুরণও বলা যেতে পারে। 

পৌষের সেই ঠাণ্ডায় শহুরে আমি কেমন মোহগ্রস্ত হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম সেই দিকশূন্য মাঠের মাঝে, আখড়ার সামনে, শেষ ভোর, গান থামিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন তিনি, আর তীব্র কম্যুনিস্ট আমি প্রেমে পড়ে যাচ্ছি, সেই মায়াময় কণ্ঠের, সেই দৃষ্টির, সেই সুরের, সেই শব্দের যার প্রত্যেক রন্ধ্রে গাঁথা ছিল ঈশ্বরকে (নাকি প্রেম) পাওয়ার প্রবল আকুতি। সেই রাতেই প্রথম বিশ্বাস জন্মেছিল ভাষা আমায় পাগল করে, ঈশ্বর আমায় টানে, আমি ঘোরতর নাস্তিক এ কথা মুখে বললেও আদপে নয়। নাছোড়বান্দা আমি সারাদিন ঘুরে বেড়ালাম বৈষ্ণবীর পিছুপিছু, খাওয়াও জুটে গেলো তাঁরই আখড়ায়। সন্ধ্যে নেমেছে, বাঁশির আওয়াজ ভাসিয়ে দিচ্ছে সব ক্লেদ, গ্লানি, মন্দিরার ধ্বনিতে রাধাকৃষ্ণের সন্ধ্যাআরতি সমাপ্ত, তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন, গান শুরু হবে, নীরব কাতর প্রার্থনা আমার, আমায় ভাসিয়ে দাও; তিনি অনুগ্রহ করে কথা বললেন--পৌষের সেই কৃষ্ণপক্ষের রাতেও যেন হটাৎ করেই ছাতিম গন্ধভরা এক হৈমন্তী জ্যোৎস্নার বান নামলো। 

আমার আজন্মের জেদ, নাগরিক পোশাক, পিঙ্ক ফ্লয়েড- ডায়াস্ট্রেস-বনজোভি কোথায় যেন এক মুহূর্তে হারিয়ে গিয়ে আমায় তীব্র দ্বৈত-বাদ থেকে অদ্বৈত-বাদে পৌঁছে দিয়েছে এক মায়াবী সুর, অভিশপ্ত অপ্সরীর মতো এক কণ্ঠ আমায় অমোঘ আকর্ষণে টেনে রাখছে সেই সুরে ডুবে যেতে। আমার স্বত্বা আর সজ্ঞা যেন ক্রমশ অবশ হয়ে যাচ্ছে, আমি বেশ বুঝতে পারছি শহুরে ক্যাকোফোনি ছাড়িয়ে আমার কানে গুনগুন করছে ভ্রমরার সুর, শ্রীরাধিকার কান্না। আমার এতদিন কার শিক্ষা আমায় বলছে "ফিরে যাও তুমি, এ পথ তোমার নয়।"; অথচ আমার আজন্ম লালিত বিশ্বাস আজ বিশ্বাসঘাতকতা করছে,অন্তরের ভেতর থেকে কে যেন আমায় বলছে," ভেসে যাও, এই সাগরে...... এই তো জীবন।"

সে বৈষ্ণবীকে সেই মাঠেই, নাকি সেই কৃষ্ণপক্ষের রাতেই অথবা তারো অনেক পরে হারিয়ে ফেলেছি আমি, কিন্তু সেই মায়ামাখা সুর এখনো সেই একইভাবে বয়ে যাচ্ছে আমার শিরা ধমনী জুড়ে, চোখ বুজলেই দেখি কচুরী পানার ঘ্রাণ, আমায় অবশ করে দেয়, চোখের সামনে ভেসে বেড়ায় হলুদ সাদা প্রজাপতির দল, মাথার কাছের জানালা খোলা পেয়ে ঢুকে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। একতারা নিয়ে ফিরে চলা শেষ বিকেলের বাউল থমকে দাঁড়ায় জানালার পাশে, সে তার গান শুনিয়ে যায় আমায়। ঠিক সন্ধ্যে নামার বুকে ঠিক শুনতে পাই গড়ভাঙ্গার আখড়ায় দোতারা বাজিয়ে গান গাইছেন মনসুর ফকির, দ্রিম দ্রিম করে পুরুলিয়ার গ্রাম থেকে ভেসে আসা মাদলের আওয়াজ ভাসিয়ে দেয় রাতভোর। আমার ভাষা পাল্টে যায় একটু একটু করে, কখনো লালন, কখনো কালাচাঁদ দরবেশ আবার কখনো সলাবত মাহাতো কথা ভোরে দেয় আমার বুকে,মুখে; আর আমি সেই কোন আদিম গুহার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে প্রাণ খুঁজি।

আমার শরীর জুড়ে ছয় রিপু খেলে বেড়ায়, কিন্তু মনের তল খুঁজতে গিয়ে বিস্ময়ে অবাক হয়ে যায়, সেখানে একমনে বসে পদাবলী কীর্তন পাঠ করছেন সেই বৈষ্ণবী। আমার কান ভেদ করে ঢুকে যায় ডাকাতিয়া বাঁশীর ডাক, আমার নাগরিক সাজ মনে মনে ভেঙে যায়, ভেঙে ভেঙে গড়ে মনের ভেতর সুরের ভাষার মায়াময় রূপ, সেই রূপ জুড়ে এপার ওপার গোটা বাংলার ভাষা আঁকা হতে থাকে, ভাটির টানে ভাসতে ভাসতে শুনি মাঝি মল্লার গান। আফ্রিকার কোন লোকের সাথে হেঁটে যাই ছোটনাগপুর মালভূমির কোন গ্রামে, বুঝতে শিখি সুরের ভাষা।

আবারো ফিরে আসে সেই জ্যোৎস্না মাখা রাত্রি, গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আমিও গাছ হয়ে যাই, জ্যোৎস্নায় ভিজতে থাকি; উলঙ্গ বৃক্ষের শাখা প্রশাখা জুড়ে নেমে আসে সুর-ভাষা, মাটি থেকে শেকড়ের টানে উঠে আসে গান; কানে কানে এসে যেন সেই হারিয়ে যাওয়া বৈষ্ণবী বলে যায়, " মানুষ রতন, করো তারই যতন......"। নীরব আমার বুক থেকে আওয়াজ বেরোয়," ওগো নিরাময়-নিরুপদ্রব, হে অনিন্দ্যসুন্দর, আরও সুর দাও, আরও ভাষা দাও... আরও গান দাও, এই নিরাকার চরাচরে তুমি সুকল্প হও।", শাখায় বসা পাখিগুলি ভোরের আলোয় একসাথে গেয়ে ওঠে কোন ভোরাই, আমি একমনে শুনতে থাকি, খুঁজতে থাকি প্রানের মানুষ।।


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.