x

প্রকাশিত

​মহাকাল আর করোনাকাল পালতোলা নৌকায় চলেছে এনডেমিক থেকে এপিডেমিক হয়ে প্যানডেমিক বন্দরে। ওদিকে একাডেমিক জেটিতে অপেক্ষমান হাজার পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ।​ ​দীর্ঘ সাতমাসের এ যাপন চিত্র মা দুর্গার চালচিত্রে স্থান পাবে কিনা জানি না ! তবে ভুক্তভোগী মাত্রই জানে-

​'চ'য়ে - চালা উড়ে গেছে আমফানে / চ'য়ে - কতদিন হাঁড়ি চড়েনি উনুনে / চ'য়ে - লক্ষ্মী হলো চঞ্চলা / চ'য়ে - ধর্ষিতা চাঁদমনির দেহ,রাতারাতি পুড়িয়ে ফেলা।

​হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানুষটি লালমার্কার দিয়ে গোল গোল দাগ দেয় ক্যালেন্ডারের পাতায়, চোদ্দদিন যেন চোদ্দ বছর। হুটার বাজিয়ে শুনশান রাস্তায় ছুটে যায় পুলিশেরগাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স আর শববাহী অমর্ত্য রথ...। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেকটা জল, 'পতিত পাবনী গঙ্গে' হয়েছেন অচ্ছুৎ!

এ কোন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

সমীরণ চক্রবর্তী

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ২৬, ২০১৭

সুমনা পাল ভট্টাচার্য্য

sobdermichil | জানুয়ারী ২৬, ২০১৭ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
 আমানিশার আলো


কোথায় যে গেলো ওই কালো শালটা!
ওই আলমারিটা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পেলো না চন্দ্রিমা, অস্থির লাগছে এখন..

ওই চাদরটা শুধু সুন্দর কাশ্মীরী কারুকাজ করা বলে তার প্রিয়, তা তো নয়, হানিমুনে গিয়ে অনেককিছুর সঙ্গে ওটাও তমাল কিনে দিয়েছিল ওকে।ওটাই আজ গায়ে দেবে বলে ভেবেছিল মনে মনে, এখন বের করতে গিয়ে খুঁজেই পাচ্ছে না। কার ভালো লাগে! 

এই এতোক্ষণ ধরে খোঁজাখুঁজি করার ধকল তার শরীর নেয় না আর! ভাবতে ভাবতেই শোবার ঘরের গোদরেজ আলমারিটা খুলে বসে পড়ল চন্দ্রিমা। এক নম্বর, দুই নম্বর, তিন নম্বর তাকের পিছনে ওই তো ওটা নাকি!টেনে সামনে আনতেই এক অদ্ভুত আনন্দের ঝিলিক খেলে গেলো চোখে মুখে তার।

'ইয়েস এটাই' ----

উফ্ বাব্বা পাওয়া গেলো তাহলে। সরস্বতী পূজার নেমন্তন্ন প্রতি বছরই থাকে, ওই 'সুরবাণী' স্কুলে। মায়া দি এখনও গেলেই আগে গান করতে বসিয়ে দেয় চন্দ্রিমা কে। গত বছরও তো নয় নয় করে চারটে গান শোনাতে হয়েছিল তাকে। গানের চর্চাটা গত ক'মাস তো নেইই। এখন গলা দিয়ে আর স্বরই বেরোতে চায় না।

খুব আদুরে হাতে চাদরের ভাঁজটা খুলে গায়ে জড়িয়ে নিতে যাবে, ঠিক এমনিই সময় ঝপ করে ব্রাউন পেপারে মোড়া একটা পুরোনো খাম পরে গেল মাটিতে।

কি ওটা!!

নীচু হতেও ব্যথা লাগে কোমরে, সারা শরীরে যেন বিষাক্ত যন্ত্রণা। তবু নীচু হয়ে খামটা খামচিয়ে তুলে নিল চন্দ্রিমা। আস্তে করে খুলতেই সময়টা কেমন দশ বছর আগে থেমে গেল।এটা তো সেই 'সুরবাণী' স্কুলেরই ওপেনিং ডে'র ছবি।

কি সুন্দর লাগছে চন্দ্রিমাকে।

চন্দ্রিমার সাজ বলতে চোখে ঘন কাজল, ঠোঁটে হাল্কা লিপস্টিক, বড় একটা টিপ, কোমর ছাপানো চুলের একটা লম্বা বিনুনী আর আলতো করে লাগানো তাজা ফুলের মালা। ঐ বিনুনী আর ফুলের মালাটুকু না থাকলে চন্দ্রিমা কে চন্দ্রিমাই মনে হত না কারোর।

চন্দ্রিমা স্নান সেরে বেরোলেই তমালের অভ্যাস ছিল পিছন থেকে ওকে জড়িয়ে ধরে ওর ভেজা চুলের গন্ধ নেওয়া। নিজের গায়ের সাথে চন্দ্রিমার সোঁদা শরীরটাকে মিলিয়ে নিয়ে তমাল কানে কানে বলত, " ওগো আমার বিদিশার নিশা --- আমি যে পাগল হয়ে যাই "...

চন্দ্রিমা ফিক করে লাজুক লাজুক হাসি হেসেই বলত, " ঢের হয়েছে, সরো এবার"... এ যেন রোজনামচার একটা বাঁধাধরা ছবিই ছিল, তাদের ভালবাসা যাপনের।

চন্দ্রিমা নিজে কখনো মালা লাগাতো না চুলে, বিয়ের পর থেকেই তমালেরই ডিউটি ছিল ওটা, স্বেচ্ছায়। সমর্পিত প্রেমিকের আঙুল আদরে সেজে উঠতো চন্দ্রিমার জোছনার হাট। ছবিটা কেমন টলমল করছে, ঝাপসা হচ্ছে, এই প্রথম, প্রথম, প্রথমবার সে.....

হঠাৎই চমকে উঠলো, মাথায় সুড়সুড় করে উঠলো কি যেন ... পিছন ঘুরে তাকালো চন্দ্রিমা, " ও: তুমি!! চমকে গেছি তো...."

তমাল থুতনিটা আস্তে করে নামিয়ে আনলো, চন্দ্রিমার কাঁধের কাছে। কাঁচাপাকা চুল আর রিমলেস চশমাতে এখনও তমালের সৌম্য চেহারাটাতে ভাঁজ পরেনি তেমন। কেমন অদ্ভুত করে চেয়ে থাকতে পারে তমাল চন্দ্রিমার দিকে, ওর চোখ যে কতো কিই বলে...

এই বারো বছরের বিবাহিত জীবনে সেই ভাষা বদলাতে দেখেনি চন্দ্রিমা। নিরেট পাথরের মতো কামানো মাথাটাতে হাত দিয়ে চন্দ্রিমা কাঁপা গলায় বলে উঠলো, "এটা আবার কি হল..."

তমালের নি:শ্বাস চন্দ্রিমার গালে, কানে.. কানের লতিতে তমালের ঠোঁটের ঝাপট, খুব মায়াবী গলায় তমাল বলল, " বা: রে, এবার মালা নেই তো কি আছে? ফ্লোরাল স্কার্ফ আছে ম্যাডাম। এবার আমার বিদিশার নিশা ফুলেল সুবাসে ভেসে যাবে।"

হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো চন্দ্রিমা। আর্তনাদ সেই কান্নায়... মৃত্যূভয় - যন্ত্রণা - বিচ্ছেদ সব যেন একসাথে আছড়ে পড়ছে তার কান্নায়। তমালেরও দু-চোখ বেয়ে গালের সীমানা ছাপাচ্ছে জলস্রোত।

" চাঁদ প্লিজ না, আমরা কি কথা দিয়েছিলাম দুজনে দুজনকে, এই সরস্বতী পূজোটা আমরা সেই কলেজের দিনগুলিতে ফিরে যাবো। তুমি হলুদ শাড়ি পড়বে, আর আমি নীল পাঞ্জাবি, তারপর হেদুয়ার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কলেজ ছুঁয়ে বেড়িয়ে যাবো অনেকটা পথ সেই পাশাপাশি হাত ধরে, সেই ফুঁচকা, সেই তোমার নুপুরের সুর, সেই তোমার কাজল চোখ, সেই আমার আদর..."

চন্দ্রিমার কান্না গলায় দলা পাকাতে পাকাতে জমে যাচ্ছে হঠাৎ উষ্ণতায়, সেও যে মুঠো ভরে নিতে চাইছে এই সবটুকু মুহুর্ত।

বাঁচতে হবে, বাঁচার মতো বাঁচতে হবে। ভালবাসায় ভরে যেতে হবে। আগামীর যা কিছু তার পাওনা সব এই ক'দিনেই প্রাণভরে পেতে হবে তাকে। হবেই....


তমাল এতোক্ষণে আঙুলের মাদকতা ছড়িয়ে দিচ্ছে চন্দ্রিমার কানের লতিতে, কানের পাশ বেয়ে নামছে তার আঙুল গলার হাড়ে। ঘুরে তাকালো চন্দ্রিমা তমালের দিকে, তমালের বুকের ঘাসে গুঁজে দিল নিজের মুখ, আহ্লাদে খরগোশ ছানার মতো। তমাল আস্তে আস্তে কপাল, গাল, চিবুক ছুঁয়ে আঙুলটা নিয়ে গেল তার চাঁদের ঠোঁটে।

তারপর ফিসফিসিয়ে বলল, " আজ কিন্তু আমি একশোটা চুমু খাবো, না না দুশো টা, না না তিনশো টা..."
চন্দ্রিমা এবার আলতো ঘুঁষিতে তমালের বুকে নকশা আঁকছে। পাশের ঘরে পরীর স্বপ্নে ঘুমোচ্ছে তাদের একমাত্র সন্তান তিন্নি। বয়েস 'নয়'..। সে ভাল করে জানেও না, ওঘরের টেবিলে রাখা মা এর অসুধগুলো এক মরণ রোগের, যার নাম "ক্যানসার"..

কাল  শ্রী পঞ্চমী। বাতাসে বসন্তের রাগ। সেই সুর তাদের ঘরে বয়ে এনেছে প্রেম, জীবন, মুক্তি... মৃত্যূর কালো থাবা সেখানে বারবার হেরে যায়, বারবার....




Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.