x

প্রকাশিত

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ২৬, ২০১৭

জিনাত রেহেনা ইসলাম

sobdermichil | জানুয়ারী ২৬, ২০১৭ |
একচিলতে স্বাধীনিতা

রানার আজকাল খুব মন খারাপ থাকে। মুড সুইং অনবরত। কলেজে একবার বন্ধুরা চ্যাংদোলা করে অ্যালকোহলিক রানাকে নিয়ে গিয়েছিল এক ডাক্তারের কাছে। সে বেটা বলে মেলাকোলিয়া আছে। তারপর মেসে রানার স্থায়ী নাম হয়ে গেল মেলানচোলি।এই নিকনেম কলকাতার হোস্টেল অবধি গড়ালো।ইউনিভার্সিটি হয়ে বেলঘরিয়ার মেসে কিছুদিন থাকা।মন না টানায় আবার সেই পুরানো কলেজের দিনে মেসে ফেরা। চারবছর ধরে লড়াই জারী। একটা চাকরী মেলে নি এখনো।

পুজোর সময় এবারে বাড়ীতে যাওয়া হয়নি রানার। মানে মন চায় না। বাড়ীতে বিবাহযোগ্য বোন, আত্মীয়স্বজন। সকলের মুখে আশ্বাসের ভাষা-‘এবারে তোর চাকরিটা হবেই, ভগবান কি এমনই নিষ্ঠুর!ছেলেটি চাকরী পেলে ঘরের মেয়েটির একটা হিল্লে হয়, ঠাকুর,ঠাকুর’। বাবা বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। দেখা করতে গেলেই জিজ্ঞাসা ‘কোনো পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোল?’ বাবা পোস্টঅফিসে ছিলেন। ভাল জায়গায় ছেলেকে পড়াশুনা করিয়েছেন। মেয়েরটা একরকম বন্ধ রেখেই। এখন পেনসনের টাকাতে পরিবার সহ মাঝে মাঝে রানাকে ও চালাতে হয়। 

রানার স্কুলের প্রধান শিক্ষকের মৃত্যুবার্ষিকীতে আসতেই হয় রানাকে একবার, তাই বাধ্য হয়ে গ্রামে রানার পা ফেলা। স্যার খুব ভালো বাসতেন রানাকে। বলতেন এ গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করবে একদিন এই ছেলে ।স্যারের বাড়ী থেকে প্রতিবার কাজ সেরে ফেরার পথে একবার তাকে স্কুলে আসতেই হয়। খেলার মাঠ,ফুলের বাগান, শ্রেনীকক্ষে ছড়িয়ে থাকা স্মৃতিতে ডুবে যায় রানা। নিজেকে যেন ফিরে পায় এই চত্বরে। মাঝে মাঝে যন্ত্রণায় গলা বুজে আসে। মনে হয় আরেকবার যদি নতুন করে শুরু করা যেত। মদন স্যার যদি আরেকবার রানার হাত ধরতেন!

এবারে দেখে স্কুলের পথটা একদম চকচকে নতুন। সরু রাস্তা পেরিয়ে বাগান। ফুলের গাছের গায়ে নাম লেখা পোষ্টার। মদন স্যারের একটি ছবি দেওয়া প্ল্যাকার্ড লাগানো বাগানের ছোট্ট গেটে। বেরিয়ে এসে মাঠে দ্যাখে ব্যাডমিন্টন খেলার কোর্ট এক প্রান্তে। চারদিক ঘিরে সার দিয়ে ঝাউ গাছের এনক্লোজার যেন!। হু হু করে কেঁদে ওঠে রানা পুরানো স্কুলের বাগানের একটি ঝাউ গাছ আঁকড়ে ধরে। আচমকা পেছন ফিরে দ্যাখে, স্যরের ছেলে।বিশাল অবাক হয়ে বলে,রানাদা! এখানে আসবে বাড়ীতে বললে নাতো! তারপর বিশাল নিজেই বলতে শুরু করে স্কুল যে দেখাশোনা করে তাকে সে খুঁজতে এসেছে, বার্ষিকীতে সে ও নিমন্ত্রিত ছিল কিন্তু খেতে আসেনি তাই। কোনো রকমে চোখের জল লুকিয়ে ফেলে রানা। বলে স্যারকে খুব মনে পড়ে স্কুলে এলে!বিশাল রানাকে জড়িয়ে ধরে বলে,’বাবা তোমায় খুব ভালো বাসতেন রানা দা’! 

বিশাল জানায় তার ডাক্তারি পড়া শেষে সে গ্রামীন হাসপাতালেই ফিরতে চায় তবে তার নিজের গ্রামের আশেপাশে পোস্টিং নেওয়া সহজ হবে। বিশাল অকপটে জানায় তার আগামীর স্বপ্নের কথা। বিভোর হয়ে শুনতে শুনতে একসময় রানা দেখে মদন স্যার যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে।মনে পড়ে যায় এই বাগানের ফুল তোলা নিয়ে বিবাদ শুরু হলে সারা গ্রামবাসীর সামনে প্রতিরোধের প্রাচীর তোলেন স্যার। তাদের দাবী মন্দিরের ফুল স্কুলের বাগান থেকে দিতে হবে। স্যার বলেন, ফুলের ওপর ছাত্রদের অধিকার। ছাত্রদের সম্পদে স্যার হাত দেবেন না।টানা স্কুল বন্ধ থাকে ৭ দিন। নাছোড় গ্রামবাসীদের সঙ্গে লড়াই জারী রাখেন স্যার।একদিন উলটো পথে হেঁটে এসে রানাদের বাড়ীর জানলা ধরে বলেন ‘ঠিক সময়ে পড়তে বসবি, ফাইন্যাল পরীক্ষা যথাসময়ে হবে’।চোখের কোন চিকচিক করে ওঠে রানার। স্যার এইতো সামনে!বিশাল স্যারের যোগ্য উত্তরসূরি।দুই প্রজন্মের এই আদর্শের উত্তরণ রানাকে এত হতাশার মাঝেও একটু শান্তি দেয় যেন।

বিশাল রানাকে কথায় কথায় বলে কাল স্বাধীনতা দিবসের দিন গ্রাম লাগোয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উদ্বোধনে অনেক নামী দামী লোকসহ প্রশাসনিক একটি টিম আসবে। বিশাল খুব উৎসাহ নিয়ে রানাকে আমন্ত্রন করে বলে ‘এসো তো্মার ভালো লাগবে’। বিশালের মুখ চেয়ে রানা হ্যাঁ বলতে বাধ্য হয়।বিশাল ফিরে যাওয়ার পথে আবার বলে, ‘রানাদা যেও কিন্তু অপেক্ষায় থাকবো’। অনিচ্ছা স্বত্বেও রানা হাত তুলে সম্মতি জানায়।‘শেষের দিকে যাবো বিশাল’ বলে বাড়ীর পথ ধরে রানা। ফিরে রানা ঘুমোতে পারে না রাতে। বার বার সেই ক্লাসরুম, বাগান, স্যারের বলা কথা মনে পড়তে থাকে।চোখ কখন বন্ধ হয়ে গেছে কে জানে! সকালে ঘুমভাঙে মায়ের ডাকে।

তখন ৮.৩০। রানা মুখ ধুয়ে ব্রেকফাস্ট না করেই তড়িঘড়ি ছুট দেয় গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে। ভিড় উপছে পড়ছে মাঠ। জাতীয় পাতাকা পতপত করে উড়ছে।বিশাল আমন্ত্রিত অতিথির চেয়ারে বসে।মঞ্চে বিডিও বক্তৃতা দিচ্ছে।বিশাল বার বার পেছন ঘুরে দেখছে হয়ত তার অপেক্ষা করছে।এগিয়ে যাচ্ছে রানা সামনে। দেবুদা্র মাইকে ঘোষনা,’আজ আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন মাননীয় বিধায়ক’। আচমকা মাথা ঘুরে যায় রানার। বিশালের চেয়ার ধরে সে বসে পড়ে। বিশাল চিৎকার করতে থাকে ‘রানাদা! রানাদা!জল ,জল নিয়ে আয় কেউ’! জ্ঞান ফিরতেই রানা দ্যাখে ভিজে গেছে সে পুরোটা। বিশাল নীচু গলায় কি যেন বলতে থাকে। রানা উঠে দ্যাখে একজন লোক দূর থেকে তাকে দেখছে, রানা বিশাল কে জিজ্ঞাসা করে ‘উনি কে’? বিশাল বলে,’চিনিনা। বোধহয় বিধায়কের সাথে এসেছেন’। রানা ভালো করে দেখার পর চিনে ফেলে সাদা পাঞ্জাবি পড়া লোকটিকে।

দুই বছর আগে কেপিএস পরীক্ষা দিয়ে রানার মেসের এক দাদা তাদের চাকরী সুনিশ্চিত করতে এক ব্যাক্তির কাছে নিয়ে যায়। প্রত্যেকের কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবী করেন এই পাঞ্জাবি পড়া ভদ্রলোক। রানা নিজের বাইক বিক্রী করে টাকা দেয়। এই টাকা বোনের বিয়ের জন্য রাখা ছিল। রানা দূরে দূরে টিউশনি পড়াতে যাবে বলে বাবা তাকে বাইক কিনে দিয়ে বলেছিল ‘টাকাটা চাকরী পেলে দিয়ে দিও’। রানার চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাবার অসহায় মুখ!

রানা প্রানপন ছুটতে থাকে। ডাকতে থাকে ‘স্যার,একটু শুনুন,আমি রানা ,বাপ্পা দা মানে ওই বিডিও অফিসের পিওন আমাকে আপনার কাছে নিয়ে গিয়েছিল’। ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যায় মানুষটি। বিশাল পেছনে ছুটতে ছুটতে বলে,’রানা দা ওই দ্যাখো উনি বিধায়কের গাড়িতে উঠছেন’! রানা পাগলের মত গাড়ী লক্ষ্য করে ছুটতে থাকে। না ধরতেই হবে তাকে! রানা চিৎকার করতে থাকে- স্যার, আমার চাকরীটা হবে তো! আমাকে আপনি কথা দিয়েছিলেন স্যার! চাকরীটা আমার খুব প্রয়োজন। আমি আপনাকে ভরসা করেছিলাম! 

জাতীয় সংগীত শেষে মাইক থেকে যায়। গ্রামের পথ জুড়ে ধ্বনিত হতে থাকে-‘ ভারত ভাগ্যবিধাতা।জয় হে! জয় হে!জয়জয় হে!’।বিশাল ছুটতেই থাকে,জানেনা কতদূর যাবে কিন্তু রানাদাকে তাকে থামতেই হবে!




Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.