x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ২৬, ২০১৭

সাত্যকি দত্ত

sobdermichil | জানুয়ারী ২৬, ২০১৭ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
বৃষ্টিস্নাত

সুপ্রভাদি সুন্দরী । শুধু সুন্দরী বললে সবটা বলা হয় না । ট্রেনে, বাসে, সিনেমা হলে, ইউনিভার্সিটির ফেস্টিভ্যালে কিম্বা কোলকাতা বুক ফেয়ারে ওর মতো সুন্দরী সচারাচর খুঁজে পাওয়া যাবে না । ওর বিয়ে হয়েছিল লেকটাউনে । স্বামী সঞ্জীব সেন ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টের একজন অফিসার ।

সুপ্রভাদির ছেলে সুপ্রতিমের বয়স যখন সাত, একদিন সারা রাত - সারা দিন অপেক্ষার শেষেও সঞ্জীব সেন বাড়ি ফিরল না । মনে পড়ে সুপ্রভাদি আর সুপ্রতিমকে নিয়ে সমস্ত রাত শহর উল্টে পাল্টে খুঁজেছিলাম মানুষটাকে। এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে অন্যের বাড়ি, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতাল। বাইরে তখন উথাল পাতাল জ্যোৎস্না। গাড়ির জানলা দিয়ে তার এক টুকরো চলকে এসে পড়ছে সুপ্রতিমের হাতে। সুপ্রতিম মুঠো করে জ্যোৎস্না ধরার চেষ্টা করছে, পারছে না। ওর হাত ভর্তি চাঁদের আলো অথচ ধরতে গেলেই তার কিছু নেই - ব্যাপারটায় সে মনে হয় বিস্মিত হয়েছে, তাই এই বারবার জ্যোৎস্না ধরার নিরর্থক খেলাটা তার কাছে বিরক্তিকর বলে মনে হচ্ছে না । জ্যোৎস্নার মুগ্ধতায় সে তার মায়ের দিকে তাকাতে ভুলে গেছে, যদি একটা বার তাকাত তবে আরও বিস্মিত হয়ে দেখত ওর মায়ের অশ্রু বিন্দুতে সে জ্যোৎস্না কখন যেন বাঁধা পড়ে চিকচিক করছে ।

ভোরে আমদের গাড়ি সকল সম্ভবনাকে মিথ্যা প্রমাণিত করে এসে থামল লেকটাউন থানায়, সেখানে যে অভিজ্ঞতাটি হয়েছিল সেটি হল হারানো মানুষ খুঁজে বের করবার কোনো পদ্ধতি ভারতবর্ষের পুলিশের কাছে অন্তত নেই , আর থাকলেও খুন , ধর্ষণ , সংঘর্ষ নিয়ে এরা এত ব্যস্ত যে সে পদ্ধতি অবলম্বনের সময় তাদের কাছে কই । তবুও সেকেন্ড অফিসারের হাই অগ্রাহ্য করে একটা জিডি এন্ট্রি করা গেল । একটা মানুষ এই আছে এই নেই, কত ছোট্ট কথা কিন্তু কারো কারো কাছে এই না থাকা কত মারাত্মক , অনুপস্থিতির ব্যধি সংক্রামিত হৃদয়ের কত যন্ত্রণা । পরে জেনেছিলাম সুপ্রভাদি তখন তিন মাসের গর্ভবতী ।

মাঝখানে কিছু মাস কাটল, সেদিনটা ছিল উবুশ্রান্ত শ্রাবণের । হটাত সুপ্রভাদির ফোন, সুপ্রতিমের গলা - কাকাই মা তোমাকে ডাকছে । আমি ভাবলুম আমাকে দেখার তার ইচ্ছে হয়েছে বলে ইয়ার্কি করছে। বললাম, সে ডাকুক । আজ আমি কথাও যাচ্ছি নে, আজ সারাদিনই বৃষ্টি দেখবো । সুপ্রতিম আবার বলল, মা তোমাকে এক্ষুনি ডাকছে। কি যেন একটা ছিল ওর কণ্ঠস্বরে, ওই বৃষ্টির ভেতর বেরিয়ে পড়লাম । সুপ্রতিম দরজা খুলতেই চাপা গোঙানির শব্দে ছুটে গেলাম সুপ্রভাদির ঘরের দিকে, দরজা পর্যন্ত গিয়েই হতভম্ব । খাটে বিছানো শাদা চাদর রক্তে মাখামাখি। চাদর থেকে গড়িয়ে মেঝেতে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ছে। সুপ্রভাদির মুখ ছাই বর্ণের । প্রচণ্ড ব্যথা সে নিজের মধ্যে চেপে রেখেছে বোঝা যাচ্ছে শুধু তার কণ্ঠার হাড়ের ওঠানামা থেকে ।

আমি ওর মাথাটা কোলে নিতে নিতে বললাম, সুপ্রভাদি কি হয়েছে ! সে ফিসফিস করে বলল, মনে হয় এবোরশন হয়ে যাচ্ছে । আমি বললাম, কি সর্বনাশ । তুমি আর একটু এই ভাবে থাকো। আমি এক্ষুনি এ্যাম্বুলেন্স ডেকে আনছি । সুপ্রভাদি উত্তর দিল না , খালি ঘোলাটে চোখে আমার দিকে তাকালো । সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল এ্যাম্বুলেন্স ডেকে সময় নষ্ট করার মতো সময় হাতে নেই । সুপ্রভাদিকে পাজাকোলা করে নিয়ে যে গাড়ি করে আমি এসেছিলাম সেই গাড়িতেই তুললাম । বৃষ্টি তখনো একবিন্দু কমেনি ।

সন্ধ্যে ছটায় ডাক্তাররা সুপ্রভাদিকে নিয়ে অপারেটিং রুমে গেল । তাদের মুখে দেখে বোঝা যাচ্ছে তারা রুগী সম্পর্কে আশাবাদী নয় । কিছু একটা করতে হয় বলেই যেন অপারেটিং রুমে নিয়ে যাওয়া । সুপ্রতিম জ্যোৎস্না দেখার সেই একইরকম বিস্ময়ে সব কিছু দেখছে , অনেক কিছু সে বুঝে উঠতে পারছে না যদিও , তবুও সে দেখছে , কারণ এ ছাড়া তার আর কিছু দ্রষ্টব্য ছিল না সেই মুহূর্তে । ওপাশের প্রত্যেকটা জানালায় ঝুলে আছে গোধূলির ধূসর রঙ । সে দিনের সেই শান্ত - ধূসর আবহাওয়া যেন চারদিক থেকে জড়িয়ে ধরছিল আমাকে , আমি যেন আস্তে আস্তে তার মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছি , হারিয়ে যাচ্ছি । একটা চরম বিরতি , অবসান - তারই দিকে যেন ভেসে যাচ্ছে আমার সমস্ত স্বপ্ন , ভবিষ্যৎ , কল্পনা । অন্যদিকে আমার অন্য এক স্বপ্ন আর কল্পনার ছায়াময় আলো সেদিন সব চেয়ে বেশি করে পড়ছিল সুপ্রভাদির মুখের উপর । আবিষ্কার করলাম , কখন যেন সুপ্রভাদিকে বড় বেশি ভালোবেসে ফেলেছি , এমনকি যাকে ছাড়া এক মুহূর্ত বেঁচে থাকা অসহ্যের তার থেকেও বেশি । এক ধাক্কায় যখন জীবনের উপর থেকে ক্যালেন্ডারের পাতার তারিখ নিরর্থক হয়ে গেছে , তখনই সামনে এসে গেছে নেপথ্যে বয়ে চলা আর এক স্বতন্ত্র স্রোত , সেই স্রোতে আমার আমি যেন অন্য এক আমি , আমার নতুন চাওয়া , নতুন কল্পনা , নতুন স্বপ্ন আর সেগুলি যেন বড্ড বেশি করে সত্যি কারণ সে গুলির পরিণতি বলে কিছুই নেই কেবল আছে জীবনের ক্লান্তি , ক্লান্তি আর ক্লান্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভেসে যাওয়ার আনন্দ । সুপ্রতিমকে জড়িয়ে ধরলাম ।

রাত দশটা । সুপ্রতিম ঘুমিয়ে পড়েছিল , জাগিয়ে খবর দিলাম , তোর একটা ফুটফুটে বোন হয়েছে রে । সুপ্রতিম খুশি হয়েছে কিনা বোঝা গেল না , খালি বলল - বোনটার নাম কি ? আমি বললাম - নাম যে এখনো রাখা হয়নি । সে আবার বলল - নাম রাখা হয়নি কেন ? আমি ওকে কোলে নিয়ে বললাম চল সারাদিন এখানে বসেই আছিস , বাইরে থেকে ঘুরে আসি । সুপ্রতিম আপত্তি করল না । সে দিনও শ্রাবণী পূর্ণিমা , বৃষ্টিস্নাত আকাশের গৃহত্যাগী জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে সব কিছু। দেখলাম সুপ্রতিম আজ জ্যোৎস্না ধরার চেষ্টা করছে না , কিন্তু ওর দু চোখ দিয়ে জলের নদী যার মধ্যে জ্যোৎস্নারা বাঁধা পড়ে চিকচিক করছে। সুপ্রতিম কাঁদছে কেন ? জিজ্ঞেস করলাম না , শিশুদেরও একটা নিজস্ব বোঝাপড়ার জগত আছে , তাদেরও কিছু ভালো লাগা একাকিত্ব আছে , মাঝে মাঝে তাদেরকে তাদের মতো করে থাকতে দিতে হয় , নষ্ট করতে নেই তাদের অবচেতনকে । আমার মনে হয়েছিল, সুপ্রতিম বুঝি কাঁদছে তার বোনের কোনো নাম নেই সেই কষ্টে , হতেই পারে । সেই মুহূর্তে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা নাম দিলাম - বৃষ্টিস্নাত ।



Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.