x

প্রকাশিত

​মহাকাল আর করোনাকাল পালতোলা নৌকায় চলেছে এনডেমিক থেকে এপিডেমিক হয়ে প্যানডেমিক বন্দরে। ওদিকে একাডেমিক জেটিতে অপেক্ষমান হাজার পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ।​ ​দীর্ঘ সাতমাসের এ যাপন চিত্র মা দুর্গার চালচিত্রে স্থান পাবে কিনা জানি না ! তবে ভুক্তভোগী মাত্রই জানে-

​'চ'য়ে - চালা উড়ে গেছে আমফানে / চ'য়ে - কতদিন হাঁড়ি চড়েনি উনুনে / চ'য়ে - লক্ষ্মী হলো চঞ্চলা / চ'য়ে - ধর্ষিতা চাঁদমনির দেহ,রাতারাতি পুড়িয়ে ফেলা।

​হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানুষটি লালমার্কার দিয়ে গোল গোল দাগ দেয় ক্যালেন্ডারের পাতায়, চোদ্দদিন যেন চোদ্দ বছর। হুটার বাজিয়ে শুনশান রাস্তায় ছুটে যায় পুলিশেরগাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স আর শববাহী অমর্ত্য রথ...। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেকটা জল, 'পতিত পাবনী গঙ্গে' হয়েছেন অচ্ছুৎ!

এ কোন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

সমীরণ চক্রবর্তী

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ২৬, ২০১৭

অনিন্দিতা মণ্ডল (গাঙ্গুলি)

sobdermichil | জানুয়ারী ২৬, ২০১৭ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
সরহুবজ্র

বিপুল খাস্তগীর তাঁর লালবাতিওয়ালা জিপটা ছেড়ে একটা পুরনো লজঝরে এমবাসাডার গাড়িতে চড়লেন। তাঁর ছিপছিপে বেতের মতন সাজোয়ান চেহারাটা খেলোয়াড়সুলভ ক্ষিপ্রতায় লাফিয়ে জিপ থেকে নেমে যখন অন্য গাড়িটাতে চেপে বসল তখন আশপাশের অধস্তনদের চোখে একরাশ মুগ্ধতাজড়িত ঈর্ষা। ‘সার, আপনার সঙ্গে কে কে যাবে?’ বিপুল তাঁর কালোচশমা সমেত চোখ দুটো তুলে প্রশ্নকর্তাকে দেখলেন একবার। ‘কেউ না। শুধু ড্রাইভার’। - ওকে সার। ইতস্তত করে পিছু হঠে গেলেন দলের বাকি সকলে। জায়গাটা মোটেই নিরাপদ নয়। পুরনো একটা প্রায় ভাঙা গাড়ি আর ড্রাইভার, সঙ্গে মাত্র একটি সার্ভিস রিভলভার নিয়ে বিপুল নামলেন মেঠো পথে। পিছনে ছেড়ে এলেন সহযোদ্ধাদের।

কি আশ্চর্য! এতদিনেও এই রাস্তাগুলো পিচের হলনা। এত বছর হয়ে গেলো। দূরের দিকচক্রবালে তখনও সূর্যের আলো লেগে। বিপুল কখনও কর্মক্ষেত্রে নিজের পরিচয় নিয়ে কথা বলেনা। অসম্ভব কর্মদক্ষ, কুশলী ও ভদ্র বলে তাঁর সুনাম আছে। এত অল্পবয়সে, মাত্র দু তিন বছরের কর্মজীবনে, সিভিল সার্ভিসের সার্কিটে তাঁর বেশ সুনাম হয়েছে। ছিলেন আসামে পোস্টেড। হঠাৎ একটি বিশেষ অ্যাসাইনমেন্টে তাঁকে এখানে ডেকে আনা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ একটি ছোট্ট দলের ইনচার্জ করেছে তাঁকে। আজ দুদিন হোল তিনি উড়ে এসেছেন জেলাসদরে। কর্মপন্থা, মানচিত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ও কৌশল আলোচনা সেরে আজ তিনি চলেছেন গন্তব্যে। দিনের বেলায় এ অপারেশন সম্ভব নয়। তাই যেতে হচ্ছে সন্ধ্যের আলো আঁধারিতে। 

নিজের টিনের চাল দেওয়া পাতলা ইটের দেওয়ালের স্কুলঘরে বসেছিলেন সরোজ ভদ্র। গতকাল একটা চিঠি পেয়েছেন। হাতের লেখাটা বড্ড চেনা চেনা। তারপর স্মৃতি ঘাঁটতেই বেরিয়ে এলো এক বছর দশেকের শিশুমুখ। শীর্ণ মুখে দুটো উজ্জ্বল চোখ। গরীব ব্রাহ্মনের ঘরের ছেলে। ‘মাষ্টারমশয়, ইস্কুলে পড়বনি কো আর’। 

- কেন রে? কি হোল? 

– বাবা আর ঘরে ফিরবেনি কো। 

সরোজ বিরক্ত চোখে তাকান। 

- কতবার বলেছি ভাষা ঠিক কর? কো কো করিস কেন? 

ছেলেটি মাথা নীচু করে। কি মুক্তোর মতন হাতের লেখা ছিল ছেলেটার! ছিল কি, এখনও আছে। কি লিখেছে সে? একটি লাইনই তো ভাসছে চোখের সামনে। “চঞ্চল চিএ পৈঠবি কাল”। কিন্তু তাঁর তো চিত্ত চঞ্চল হয়নি! আজ এতকাল পর গুরুশিষ্য মুখোমুখি হবেন। সরোজ বসে আছেন। শাল পিয়ালের ঝুপসি হয়ে আসা আঁধারে স্কুলবাড়িটা কেমন শূন্য। কি জানি কেমন করে শূন্য হোল সব! আজ তাঁর সাঙ্গ হবে লেনাদেনা। একা একাই আবৃত্তি করে চলেছেন।

জইশে জাম মরণ বি তইশে। 
জীবন্তে মঅলেঁ ণাহি বিশেশে।। 
জাএথু জাম মরণে বিসঙ্কা। 
সো করউ রস রসানেরে কথা।।

( জন্মও যেরূপ, মরণ ও সেইরূপ। জীয়ন্তে ও মরণে কোনই বিশেষ নাই। জন্ম ও মরণে যার শঙ্কা, সেই রস ও রসায়নের আকাঙ্খা করুক।)

এসময়ে বাইরে ঝরা শালপাতার ওপর লজঝরে গাড়ির চাকার শব্দ উঠল। সরোজ নিশ্চেষ্ট বসে আছেন। বিপুল ঘরে ঢুকলেন। একরাশ নিস্তব্ধতা সরিয়ে, পনেরো বছরের অদর্শন সরিয়ে বিপুল বললেন, ‘মাষ্টারমশাই, আমি এসেছি। জঙ্গলমহলে কিছু জরুরী কাজ পড়েছে। এতদিন পর আপনাকে চোখে দেখার লোভ সামলাতে পারলামনা’। সরোজ হাসলেন। ‘ওহ তাই বল’। বিপুলও হাসলেন। ‘কেন মাষ্টারমশাই? আমাকে আপনার ভয় কিসের? আমি তো গুরুসন্দর্শনে এসেছি!’ সরোজ বলে উঠলেন - জীবন্তে মঅলেঁ ণাহি বিশেশে। বাপু হে, জঙ্গলমহলের স্কুলমাষ্টার আমি। সর্বক্ষণই তো মরে বেঁচে আছি। তোমার কাছে আর কি গোপন বলো? বিপুল টানটান শরীরটা নুইয়ে সরোজের পা ছুঁলেন।

- মাষ্টারমশাই, এই ধ্বংসস্তুপে পড়ে থাকাটা আর ঠিক নয়। আপনি বরং আমার সঙ্গে চলুন’। 

অন্ধকারের বুক চিরে অ্যামবাসাডারটা বেরিয়ে এলো। পেছনের সিটে সরোজ ভদ্র বসে। কর্মচারীরা অবাক! সত্যি সারের অসাধ্য কাজ নেই! একা গিয়ে এই দুর্ধর্ষ উগ্রপন্থী মাষ্টারকে গ্রেফতার করে নিয়ে এলেন?



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.