x

প্রকাশিত

​মহাকাল আর করোনাকাল পালতোলা নৌকায় চলেছে এনডেমিক থেকে এপিডেমিক হয়ে প্যানডেমিক বন্দরে। ওদিকে একাডেমিক জেটিতে অপেক্ষমান হাজার পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ।​ ​দীর্ঘ সাতমাসের এ যাপন চিত্র মা দুর্গার চালচিত্রে স্থান পাবে কিনা জানি না ! তবে ভুক্তভোগী মাত্রই জানে-

​'চ'য়ে - চালা উড়ে গেছে আমফানে / চ'য়ে - কতদিন হাঁড়ি চড়েনি উনুনে / চ'য়ে - লক্ষ্মী হলো চঞ্চলা / চ'য়ে - ধর্ষিতা চাঁদমনির দেহ,রাতারাতি পুড়িয়ে ফেলা।

​হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানুষটি লালমার্কার দিয়ে গোল গোল দাগ দেয় ক্যালেন্ডারের পাতায়, চোদ্দদিন যেন চোদ্দ বছর। হুটার বাজিয়ে শুনশান রাস্তায় ছুটে যায় পুলিশেরগাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স আর শববাহী অমর্ত্য রথ...। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেকটা জল, 'পতিত পাবনী গঙ্গে' হয়েছেন অচ্ছুৎ!

এ কোন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

সমীরণ চক্রবর্তী

রবিবার, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৬

শৌ ন ক দ ত্ত

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৫, ২০১৬ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
মনের চিলেকোঠায়...








পুবের আকাশ জাফরান কালির মতো,পশ্চিম আকাশে কমলা রঙের রোদ আর সারা আকাশ থেকে তুষারের মতো ঝিরঝির বৃষ্টি।এটাকে ঠিক ইলশেগুড়ি বৃষ্টি বলা যায় কিনা জানিনা। টিনের চাল পিচঢালা রাস্তায় প্রকৃতির এক অপরূপ জলজ আলপনা তৈরী করেছে বৃষ্টিকণা। মাঝে মাঝে পাতারা হাসির মতো দুলে উঠছে। বৃষ্টির জোর বাড়ছে।মলাট বন্ধী লেলিন,কালমার্কস,চে এর গায়ে বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগছে। অরুনিমা জানলা বন্ধ করতে করতে দেখলো সৌম্যচেহারা ছবির মানুষ রবীন্দ্রনাথ অপলক তাকিয়ে আছেন বাঁশি হাতে নজরুলের দিকে আর ধ্যানস্থ রামকৃষ্ণের পায়ের কাছে বিবেকানন্দ নিশ্চুপ। গল্পটা এখান থেকেই শুরু হতে পারতো কিন্তু আযানের ধ্বনি ভেসে আসতেই অরুনিমা ছুটে গেলো ঠাকুরঘরের দিকে। অরুনিমা যে খুব ধার্মিক তা কিন্তু নয়। একলা থাকা অরুনিমার ঠাকুর ঘর মানে অরুনিমার কাছে ধূপধূনা প্রদীপে কিছুটা সময়ের সুব্যবহার মাত্র।সারাদিন স্কুল কোচিং শেষে সন্ধ্যায় ফ্ল্যাটে ফিরে অরুনিমা শাওয়ার নিয়ে ধূপের গন্ধে কফি মগ আর পেপার নিয়ে বসে এটাই তার নিত্যকর্ম।কাজের মেয়ে সকালে এসে সব কাজকর্ম করে রাতের খাবার রেঁধে তার আসার আগেই ফিরে যায় ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে অরুনিমা রোজ ঘরে ঢুকে। কফি বানিয়ে নিয়ে অরুনিমা স্টাডিরুমে আসে। বাইরে এখনো বৃষ্টি ঝিনুকের ভেতরের মতো অন্ধকার আর বৃষ্টি ফোঁটা ও বাইরের ফ্ল্যাটগুলোর আলো মুক্তার মতো ছলছল করছে। পত্রিকাটা নিতে গিয়ে অরুনিমা দেখলো একটি খাম। খামের উপর তার নাম ঠিকানা খুব যত্নে লেখা। বিস্ময়ে খামটা উল্টেপাল্টে দেখলো অরুনিমা এতবছর এই ফ্ল্যাটে আছে কোনদিন চিঠি আসেনি যাও দুএকটা আসে সেসব অফিসিয়াল চিঠি স্কুলেই আসে। কফিমগে একটু চুমুক দিয়ে খামটা যত্নে ছিড়লো অরুনিমা। চিঠিটা বের করে দুপাতার চিঠির শেষে প্রেরকের নামটা পড়ে একটু থমকে গেলো অরুনিমা।আনমনে ঠোঁট কেঁপে উঠে ঋদ্ধি! অরুনিমা চোখের সামনে মেলে ধরে ঋদ্ধির চিঠিটা ...

হৃদীবরেষু,অরু -
অনেক বছর পর তোমায় লিখছি,সেই নীল খাম দেখে নিশ্চয় অবাক হয়ে এক নিঃশ্বাসে খাম খুলে পড়তে শুরু করে দিয়েছো হয়ত একটু ক্ষোভে একটু ঘৃণায়। এতদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের বরফ আনমনেই হয়ত জলপ্রপাত হয়ে বইছে তোমার সেই হরিণী নয়নে কিংবা ক্ষোভে মৃত চাপা পড়া আগ্নেয়গিরি জ্বলে উঠছে জ্বলন্ত লাভায়।তোমার কোন প্রশ্নের জবাব আজো দেয়া অসাধ্য আমার কাছে।কেন পালিয়েছি,কেন পনের বছর পর নিজেকে চিঠির মাঝে তুলে এনেছি আবার তারও উত্তর জানা নেই। ভাবচ্ছি,সম্পর্কহীনতার পাশে কেউ ঈশ্বর বলে ডাকে,এই বন্ধুত্বতা,প্রেম এই পালানো মায়াময়।তুমি আমার অস্তিত্ব,অনাথ জীবনে অসীমের নাথ। না,লিখবার জন্য শুধু লিখছিনা,তোমার চেয়ে অনেক অনেক বেশি বরফ আমার বুকে আর তাই লিখতে লিখতে ভাবছিলাম, নিজের কাছে ফেরার চেয়ে কঠিন কোনও যাত্রা পথ নেই। নিজেকেই অর্থাৎ তোমার কাছেই প্রশ্ন করছিলাম,নিজের কাছে কী করে একা ফিরতে হয়? তার কি মানচিত্র আছে? পনের বছর আগে তোমার বাবা যখন আমার দুহাত ধরে বললেন তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে বিলেত ফেরত পাত্রের সাথে। আমি গোপনে এ রাতে শহর ছেড়ে না গেলে এ বিয়ে তুমি করবেনা তাই তখন উনাকে ফেরাতে পারিনি। 

বন্ধুত্বতা,প্রেমের চেয়ে তখন কেন জানি পিতৃ আজ্ঞাকে অনেক বড় বেশি কর্তব্য মনে হয়েছে।ঐ রাতেই কাউকে না জানিয়েই অগস্ত্য যাত্রা করলাম নিরুদ্দেশে। অনাথ,বাবা মার স্নেহ ভালবাসা কখনো পাইনি তো তাই তোমার বাবাকে ফেরাতে পারিনি সেইদিন।যদিও সেই রাতে ডানা ভেঙে ঘুরে ঘুরে পড়ে যাচ্ছিলাম আহত পাখির মতো ঘাসের উপরে, কে তার ভেঙেছে ডানা প্রশ্ন করছিলাম নিজেই নিজেকে।আকাশের ঘরে (তোমার) কোনদিন-কোনদিন আর তার হবে না প্রবেশ। জানে না সে,কোনো এক অন্ধকার হিম নিরুদ্দেশ ঘনিয়ে এসেছে তার। জানে না সে,আহা সে যে আর আমি নই,প্রেম নয়,স্বপ্ন নয় তা জানি অথচ যেন কিছুই জানে না সে,ঈর্ষা নয়,হিংসা নয়,ত্যাগ নয়,বেদনা নিয়েছে আমায় কেড়ে।সাধ নয়,স্বপ্ন নয় একবার দুই ডানা ঝেড়ে বেদনারে মুছে ফেলে দিতে চেয়েছি রূপালী বৃষ্টির গান,রৌদ্রের আস্বাদ,মুছে গেছে শুধু আমার-বেদনারে মুছে দেবার সাধ। গত পরশু বোস্টন থেকে একটা কাজে দেশে ফিরলাম।অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তোমার ঠিকানাটা পেয়েছি।তোমার বাবার সেইদিনের ভেজা চোখের আশীষ আর তোমার নীরব অভিমান আর তোমার না থাকার মাঝে থাকার যে প্রেরণা সব মিলিয়ে কয়েক বছরের দীর্ঘ শ্রমে একটা বিদেশী কোম্পানীতে চাকরী হয়ে গেল। বোস্টনের অফিসেই কাজ করছি।সময়ের দুরন্তপনায় বিয়েটা আর করা হয়ে ওঠেনি। সূর্য অস্ত যাচ্ছে।দিকচক্রবাল অস্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ তুমি বিয়েটা করলেনা কেন? পরশু তোমার কাছে আসতে চাই, দেখা করবে কিনা জানিনা এতক্ষণে গাছের পাতা থেকে গোধূলির আলো নিয়ে পাখিদের উড়ে যাওয়া বলছে দেখা হবে। 

ইতি
ঋদ্ধি


অন্ধকার একটু ফিকে হতেই উঠে পড়েছে অরুনিমা।ঋদ্ধির চিঠিটা পড়ার থেকে ভেতরে এতদিনের একটা ক্ষোভ আর এতবছর পর মনের মানুষটাকে দেখার একটা আনন্দময় উত্তেজনা জেগে আছে। আজই ঋদ্ধি আসবে। উঠে বারান্দায় এলো। ঝিরঝিরে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। মনটা বিষাদে ভরে উঠলো,এই বৃষ্টি বাদল মাথায় করে ও আসবে তো? 

তাছাড়া খামে দেয়া সেল নম্বরে কল করে অরুনিমা ঋদ্ধিকে যেভাবে অপমান করেছে!কি বলেনি অরুনিমা আর ঋদ্ধিটাও চুপ করে শুনে গেছে। শেষে শুধু বলেছে আমি কি কাল আসবো অরু? না আসবে না বলেও অরুনিমা বলেছে হ্যাঁ আসো একটা সপাটে চড় তোমার পাওনা আছে সেটা নিয়ে যাও এসে ... কাপুরুষ কোথা কার বলেই কল কেটে দিয়েছে অরুনিমা। অরুনিমা কাল সারা রাত ভেবে দেখেছে চড় মারতে সে পারবে না তবে কিছু কঠিন কথা ঋদ্ধিকে বলতে হবে কি কি বলবে সব মনে মনে সারা রাত ভাবতে ভাবতে অরুনিমা টের পেয়েছে মনের কোথায় কোন চিলেকোঠায় যেন একটা আনন্দময় উত্তেজনা জেগে আছে আজো, সেই প্রথম দিনগুলোর মতো।অনেক বছর পর কালই অরুনিমা আশ্চর্য রকম ভাবে খেয়াল করেছে পৃথিবীর সব কিছুই তার বর্ণময় সুন্দর লাগছে কোথাও কোনও মালিন্য নেই।সময় দ্রুত কাটছে। ঋদ্ধি যদি পনের বছর পর তার প্রাপ্য দাবী করে যদি বলে অরু চলো আমরা আবার শুরু করি। অরুনিমা জানে ঋদ্ধিকে সে ফেরাতে পারবে না। এও ভেবেছে ফেরাবেই বা কেন সমাজের কথা ভেবে একটু থমকে গেলেও পরক্ষণেই  মনে হয়েছে সমাজ পরিবার করতে করতে বাঙালী মেয়েদের জন্মের থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নিজস্ব বলে কিছু থাকে না। প্রথমে বাবা,পরে স্বামী স্বামী না হলে দাদা ভাই কিংবা আত্মীয় পরে সন্তানের ইচ্ছা পালন করতে করতেই জীবন শেষ।

নাহ, এ বৃষ্টি থামবে না।ভেতর ভেতর একটা হতাশার অস্থিরতা জাগলো শেষ পর্যন্ত ঋদ্ধি আসবে তো? ঋদ্ধির মুখটা বারবার মনে করার চেষ্টা করলো পনের বছর বছর।এখন ও দেখতে কেমন হয়েছে কে জানে? গভীর নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছিলো যৌবনের সেই দিনগুলোয়। আশ্চর্য!অবাক হলো অরুনিমা, এত ঘৃণা এত ক্ষোভের পরও ঋদ্ধির ওপর থেকে আকর্ষণটা একটুও কমেনি। রবীন্দ্রসঙ্গীতের সিডিটা চালিয়ে শাওয়ার সেরে পাটভাঙা সমুদ্রনীল একটা শাড়ি পরে ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে পাতা বেতের চেয়ারে বসলো অরুনিমা। কফি শেষ করে কাপটা নামিয়ে রাখতেই আবার সেই  অসহিষ্ণু অস্বস্তির ভাবটা ফিরে এল। দেয়াল ঘড়িতে সময় দেখলো।বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি শুরু হল।আকাশ অন্ধকার  করে এসেছে।জানালা বন্ধ করতে করতে অরুনিমার মনে হল বহুকাল অবজ্ঞায় পড়ে থাকা ঘরে কে যেন এসে আজ প্রদীপ জ্বেলে দেবে তাই মলাট বন্ধী লেলিন চে রা আজ উজ্জ্বল কান রেখে যেন শোনা যাচ্ছে বিবেকানন্দ গাইছেন নজরুল বাঁশি বাজাচ্ছেন আর রবীন্দ্রনাথ,রামকৃষ্ণ যেন মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে বিভোর অথচ ঘরময় বাজচ্ছে'তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম...'ঋদ্ধির চিঠিটা আর ও একবার পড়লো অরুনিমা। কাল ফোনে বললো নয়টায় আসবে এখন নয়টা বাজতে পাঁচ। ঋদ্ধি ছাড়া আর কে আসবে আবার ঘড়ি দেখলো ঠিক নয়টা একটা গাড়ি থামার শব্দ ভেসে এলো।কথার অসম্ভব দাম তো ওর! নয়টা বলেছিলো তো নয়টাই। ভেতরে এক বন্য আবেগ অনুভব করছে।হৃদয়টা যেন লাফ মেরে গলার কাছে উঠে এসে আবেগের বেড়াজালে আটকে গেল। ক..ত..দি..ন পর দেখবে ঋদ্ধিকে। ইতিহাসের কল্পান্ত পেরিয়ে আসছে যেন ঋদ্ধি। যৌবনের সেই দিনগুলো থেকে যেন এক ঝলক বাতাস বয়ে আনছে ও। আবিষ্ট অরুনিমা কখন যেন রেলিংয়ে ঝুঁকে দাঁড়িয়েছে। দূরে গেটের গায়ে লতিয়ে ওঠা অপরাজিতার জলভেজা লকলকে ডগাগুলোর ছোঁয়া বাঁচিয়ে চঞ্চল সেই যুবকের মতো গাড়ি থেকে নেমে দৌঁড়ে সিঁড়ির কাছে এলো ঋদ্ধি, সিঁড়ি ভেঙে ব্যালকনিতে উঠে এল ... অরুনিমা পা থেকে মাথা এক পলক দেখলো। 

ঋদ্ধির চুলের মাঝে মাঝে রুপোলি ঝিলিক।রিমলেস ফ্রেমের চশমায় মাইনাস পাওয়ার। ব্ল্যাক স্যুট বাঁ হাতে সোনালী ঘড়ি উঁকি দিচ্ছে ... চকচকে দামী সু।বয়স হয়েছে ঋদ্ধির তবু কোথায় যেন সেই যুবক ঋদ্ধি আজও টিকে আছে। 

ভরাট গলার স্বর ভাসিয়ে ঋদ্ধি বলল, কেমন আছো অরু? কী,বসতেও বলবে না! নাকি চড়টা আগে দিয়ে বসতে বলবে বলেই চশমটা খুলে গালটা একটু বাড়িয়ে দেবার মতো গলাটা বাড়িয়ে দিলো।অরুনিমা থতমত খেয়ে চেয়ার দেখিয়ে বললো বসো।সামনের চেয়ারটায় বসতে বসতে ঋদ্ধি চশমাটা পড়তে পড়তে জিজ্ঞেস করল,সত্যি করে বল তো অরু আমাকে চিনতে পেরেছ? 

কাজের মেয়েটা কফি,ডিমটোস্ট,কলা,আপেলের প্লেট দিয়ে গেল দু জায়গায়। খেতে খেতে অরুনিমা লক্ষ করলো এতকাল পরেও ঋদ্ধির কথা বলার ধরনে সেই সারল্যটুকু আজও অম্লান।কফিতে চুমুক দিতে দিতে চারপাশটা দেখছিল নিঃশব্দে ঋদ্ধি আর অরুনিমার চোখের দৃষ্টি সামনের দিকে কিন্তু বাস্তবে অরুনিমা কোনও দিকেই তাকিয়ে নেই।তার দৃষ্টি আসলে সামনের সব ভেদ করে সুদূর কোন ফেলে আসা অতীতে।ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি।শূন্য। 

অরুনিমা কেমন ঘোরের মধ্যে ক্রমশ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে!মুহুর্মুহু বুকের মধ্যে ঠেলে উঠছে এক অবাধ্য,অবাঞ্ছিত যৌবনের পুরনো আবেগ।গতরাত ও মনে মনে কত রকম কথা সংলাপ মুখস্ত করে রেখেছিলো,সেসব গুলিয়ে যাচ্ছে। 

এতক্ষণের নীরবতা ভেঙে মুখর হল ঋদ্ধি,অরু আমার কত দিনের আশা তোমার সঙ্গে সুবলং দেখবো। মনে পড়ে তোমার? অরুনিমা চুপ। 

তুমি কিন্তু দেখতে এখন আরো বেশি সুন্দর হয়েছো।অরুনিমার মনের মধ্যে পুরনো চেনা তারটা রিনরিন ঝঙ্কার তুলল।এই টানটান যুবতী শরীরের মধ্যে এখনও কেন সেই কিশোরী শরীরের উষ্ণতা? এই মুহুর্তে ঋদ্ধির প্রশংসায় কেন  গায়ে পদ্মকাঁটা ফুটে উঠছে।কেন আবার সেই মায়াবী সন্মোহন!কেন এমন পাগলপারা অস্থিরতা? এ কী পাপ? নাকি অন্যায়? 

-কে বলেছে পাপ,কে ঠিক করবে ন্যায় অন্যায়...? 

অরুনিমাকে চুপচাপ দেখে ঋদ্ধি কুন্ঠায় কুঁকড়ে গেল,তবে কী অরুর সঙ্গে কিছু বিসদৃশ আচরণ করে ফেলেছে? 

তোমার ফ্ল্যাটটা ঘুরে দেখাবেনা অরু? কথাটা বলে আনমনে হাতটা অরুনিমার হাতে রেখে আবার বিদ্যুত্ গতিতে সরিয়ে নেয়।অরুনিমা ঋদ্ধির হাতের দিকে তাকিয়ে চোখের পরে চোখ রাখে।সরি,তুমি কি কোন কথাই বলবে না আমার সাথে অরু? এটলিস্ট চড়টাই মারো।মনটা হালকা হবে ক্ষোভ কিছুটা কমবে।

অরুনিমা উঠে দাঁড়ায় সঙ্গে ঋদ্ধি।একটু এগিয়ে গিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে অরুনিমা ঋদ্ধির দিকে তাকায় এতবছর পর তুমি কেন এলে ঋদ্ধি? আমি তো বেশ ছিলাম নিজের মাঝে কেন আবার..কথাটা শেষ না করেই বারান্দা পেরিয়ে ভারী পর্দা সরিয়ে রিডিংরুমে ঢুকে অরুনিমা পেছন পেছন ঋদ্ধি। মলাট বন্ধী লেলিন মার্কস চে দের উপর জানালার কাঁচ ভেদ করে হালকা রোদের আভা পড়েছে। পর্দা সরিয়ে জানালা খুলে দিতেই দেয়ালে টানানো রবীন্দ্র নজরুল রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দরা যেন বহুবছর পর জেগে উঠলেন প্রথম মৃত্যুর মতো ঘুম থেকে। সমাধি ভেঙ্গে রামকৃষ্ণ হয়ত এখনই চোখ মেলে খুঁজতে লাগবেন তার আরাধ্যকে জীবন্ত। ঘরময় নীরবতা ভেঙে দিয়ে হটাৎ  সিডিটা বেজে উঠলো ... 'আমি হৃদয়ের কথা বলতি ব্যাকুল শুধায়লো না কেহ....'অপ্রস্তুত দুজোড়া চোখ চোখ রাখলো একে অপরের চোখে। 

ঋদ্ধি অরুনিমার একটা হাত টেনে নিজের হাতে ছুঁয়ে ধরল।ঋদ্ধির মনে হচ্ছে সমস্ত অন্তরাল,সব প্রাচীর ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে অরুনিমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে একটি চুম্বন করে।যৌবনের সেই অহঙ্করী দিনগুলোয় যে ভুল করেছে,যে ভীরুতার বশীভূত হয়েছিল তা যে কত ঠুনকো,কত মূল্যহীন তা বুঝে হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছে আজ।এক তীব্র সুখে সমস্ত শরীর রোমাঞ্চিত হচ্ছে। 

অরুনিমারও সমস্ত শরীরমন নিবেদনের আকুলতায় উন্মুখ হয়ে উঠছে।যেন কত জন্মজন্মান্তর ধরে তার শরীরমন ঋদ্ধির জন্য প্রতীক্ষা করছে।কী করবে অরুনিমা এখন?তীব্র মাদকতাময় এক ঘোরের মধ্যে আচ্ছন্ন হতে হতে কোন ভাবেই নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না সে। 

দিদি,দুপুরে কি কি রাঁধবো?কাজের মেয়েটার স্বরে ভেঙে গেলো সন্মোহন।এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে পর্দা সরিয়ে অরুনিমা বেরিয়ে গেলো।মলাটবন্ধী বইগুলো নেড়ে চেড়ে দেখতে দেখতে অরুনিমা ফিরে এলো। অরু,রিটায়ারের পরে কি এখানেই একা একা কাটিয়ে দেবে?অরুনিমা ভ্রূ কুঁচকে দেখলো । না,মানে বলছিলাম আমার বোধ হয় আর দেশে ফেরা হবে না। তোমারও তো বাবার মৃত্যুর পর আর তেমন কেউ নেই যে শেষ বয়সে তোমার পাশে থেকে দেখাশোনা করবে।ধ্যানস্থ রামকৃষ্ণের ছবির দিকে তাকিয়ে বললো এই ছবিটার দিকে তাকালে পার্থিব সব চাওয়া পাওয়ার বেদনা ভোলায় যায়। অরু আমাদের তো জীবনের চড়াই উত্রাইটা ভাঙা হলো না তাই বলছিলাম কি..

স্থির দৃষ্টিতে ঋদ্ধির চোখে চোখ বিঁধিয়ে প্রশ্ন করল,সেটা কার জন্য ঋদ্ধি? এমন একটা জিজ্ঞাসার মুখে আবার পড়বে ভাবেনি ঋদ্ধি।অরুনিমা ফের ধরা গলায় বললো,সত্যি তোমরা ছেলেরা পারও বটে। মন বলে কী তোমাদের কোনও বস্তু থাকতে নেই! অরু আমি জানি কিন্তু সেই সময় আমি তোমার সুখী জীবন চেয়েছিলাম। কিন্তু ভেবে দেখেছো আমার কথাটা একবার কত বড় খেসারত জীবনভর আমিও দিয়ে যাচ্ছি।তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,কত আশাই তো মানুষের জীবনে ফুলের কুঁড়ির মতো থেকে যায়-ফুল হয়ে আর ফোটে না-মনে কর তেমনই...। বলেই অরুনিমার দুটো হাত নিজের হাতে চেপে ধরে ঋদ্ধি। 

অরুনিমা অপার পুলকে শিহরিত হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।এ শিহরনের ব্যাখ্যা নেই।অথচ আজ ঋদ্ধিকে তার ঘৃণা করা উচিত ছিলো মানুষের মনের অবচেতনিক এই সন্মোহন বড় অদ্ভুত।যৌবনের সেই প্রেমপর্বে কোনোদিন একটি চুম্বন, এমনকী সামান্য স্পর্শটুকু পর্যন্ত করেনি।আজ সামান্য একটু স্পর্শেই এ কী রোমাঞ্চ হচ্ছে! 

দুপুরের খাওয়াটা একসাথে খেতে বসে ঋদ্ধি নিঃসংকোচে বললো এভাবে তোমার সঙ্গে বসে লাঞ্চ করবো কদিন আগেও কেউ বললে বিশ্বাস করতাম না। তা বললে না তো অরু উত্তরটা। অরুনিমা সর্ষে কৈ ঋদ্ধির পাতে দিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলো।অরু বলছিলাম কি এভাবে একা থাকার সমস্যা অনেক ... তাছাড়া বয়স বাড়ছে ... রোগবালাই বাড়বে।

-তোমার যখন একাকীত্বের এত সমস্যা বিয়ে করে ফেলো ঋদ্ধি তাছাড়া আজকাল তো লিভটুগেদার ও করছে কতজন।
-অরু আমি তোমার কথা বলছি।আমার কথা না ভাবলেও চলবে। বুঝতে চেষ্টা করো অরু একাকীত্বের  দুঃখ যে শূন্যতার বেদনা তা কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে।

অরুনিমা ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসল,যাক তোমারও তবে শূন্যতার দুঃখবোধ আছে।

বেসিনে হাত ধুতে ধুতে আয়নায় তাকিয়ে খোঁচাটা টের পেল ঋদ্ধি। অপরাধীর হীনন্মন্যতার আড়ষ্টতা তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। লিভিং রুমে এসে বেতের চেয়ারে বসলো ঋদ্ধি। দুইমগ কফি নিয়ে অরুনিমা ঢুকলো।তোমার আজো মনে আছে দুপুরের খাবার পর আমার কফি প্রিয় যদিও সেইদিনগুলোয় কফি আর পেতাম কোথায় চা খেয়েই কাটতো।একটা সিগারেট ধরাতে পারি? অকপট দুটো চোখ তুলে তাকাল অরুনিমা। ঋদ্ধির হৃত্স্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।তার চোখে অচেনা আলো জ্বলে উঠলো। অরুনিমার দুটো হাত নিজের করতলের মধ্যে চেপে আকুল স্বরে বলে ফেললো,অরু আমি তোমাকে ভালোবাসি। শেষটুকু সময় না হয় চলো আমরা একসাথে কাটিয়ে দেই জীবনের।

হাত দুটো ছাড়িয়ে অরুনিমা আচমকা কষে এক চড় বসালো ঋদ্ধির গালে ... বেরিয়ে যাও এখনি এখান থেকে বলেই লিভিংরুম থেকে দৌড়ে রিডিং রুমে এসে অরুনিমা চোখ বুজে বসে পড়লো।বন্ধ চোখের কোল ঝাঁপিয়ে জলের ধারা নামছে।ঋদ্ধিও কখন পেছন পেছন এসে অরুনিমাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে রুমাল দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিলো।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামে।অলস রোদ গা মোড়ামুড়ি দিতে দিতে বিদেয় নেয়।সিরসির হাওয়ায় অরুনিমা আর ঋদ্ধির নিশ্চুপ বসে থাকা কথা বলে যায় আর আকাশে গোধূলির লাল আভা মুছে যেতে যেতে সন্ধ্যার কালচে ছোপ পড়তে থাকে।বারান্দার গোল টেবিলটাতে কফির মগ এনে রেখে যায় কাজের মেয়েটি।ঋদ্ধি গ্রীলের পাশে ফুটে থাকা ব্লিডিংহার্ডের গাছটার পাশে গিয়ে কফি মগে চুমুক দিয়ে বলে-ভাবছি,তোমার যদি রাগ কমে থাকে আর কোন রকম আপত্তি না থাকে তোমাকে নিয়েই বোস্টন ফিরবো!অরুনিমা নিশ্চুপ কফি মগে চুমুক দিতে গিয়ে চমকে উঠে।একদিন তো এই মানুষের সঙ্গেই সারা জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিল।সেদিন এসে যারা বাদ সেধেছিল আজ তারা কেউ নেই।আজ যদি নতুন করে তারা সংসার পাতে তাতে কারও কিছু এসে যাবে না। 

কথার উত্তর দিচ্ছো না যে অরু?সন্ধ্যার আঁধার নেমেছে।আযানের শব্দ ভেসে এলো।আলো আঁধারি ঝুঝকো বেলায় ঋদ্ধির মুখটাও ঝাপসা দেখায়।অরুনিমার হৃদয়ের গভীরে শীতকুয়াশার হিমেল আস্তরণ নিজেকেও বড় অস্পষ্ট লাগে তার।অরুনিমার ভেতরের ভাঙন সহসা অন্য খাতে ঘুরে গেল,এ কী যৌবনের শুরুর সেই সুক্ষ্ম অবচেতনিক বন্ধনে আবদ্ধতার দৈববাণী!নাকি অন্য এক যন্ত্রনাদায়ক বেদনার সূচনা?ভাবতে ভাবতে বুকের মাঝে চরম শূন্যতার তীব্র এক হাহাকার জাগছে টের পেল।কতক্ষণ পর ঠিক মনে নেই,ঋদ্ধির কথায় সংবিত্ ফিরলো-আমি এবার কিন্তু একা ফিরবো না অরু।ঋদ্ধি অরুনিমার পায়ের কাছে বসে গলায় মিনতি ফোটালো,অরু,তোমার কাছে জীবনে কোনওদিন তো কিছু চাইনি,এই অনুরোধটুকু রাখো আমায় এইটুকু সুযোগ দাও প্রায়শ্চিত্তের,ভুলের,তোমার এতদিনের যন্ত্রনার। 

অরুনিমা উঠে দাঁড়ায়।ঋদ্ধি এখন তোমার যাওয়া উচিত। রাত অনেক হলো।একজন পরপুরুষ সারাদিন একজন কুমারী নারীর ফ্ল্যাটে ... এ নিয়ে কোনোরকম কথা হোক সোসাইটিতে আমি তা চাইনা। তাছাড়া আমার একটা স্ট্যাটাস আছে আমি একজন শিক্ষিকা।

কিন্তু আমি যে ভেবেছিলাম অরু আজ রাতটা আমরা বারান্দায় বসে দুজনে গল্প করে কাটিয়ে দেবো..একটা রাত। অরুনিমা বেশ খানিকটা সময় নিস্পন্দ থাকলো।ঋদ্ধি ব্যাকুল চোখে অরুনিমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।একটু সময় পর অরুনিমা থামা থামা আত্মগত স্বরে ...

-না তা আর হয় না ঋদ্ধি।
-কোনটা  ... আমার সাথে বাকীটা জীবন কাটানো, নাকি রাত কাটানো?
-দুটোই। একবার তুমি না বলে চলে গেছিলে তোমার কর্তব্য কে কিংবা পিতৃআজ্ঞা কে বড় করে । সেটা তোমার সীমাবদ্ধতা ছিলো। আমারও তো কিছু সীমাবদ্ধতা আছে।

যন্ত্রচালিতের মতো ছিটকে দু পা পিছিয়ে গেলো ঋদ্ধি।পর্দা সরিয়ে রিডিং রুমে প্রায় দৌড়ে গেলো কিছুক্ষণ পর ব্লেজার হাতে বেরিয়ে এসে অরুনিমার দিকে তাকিয়ে একপলক দেখে নিঃশব্দে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলো। অরুনিমা বারান্দা থেকে স্পষ্ট দেখতে পেলো শব্দ করে গাড়ির দরজাটা টেনে দিল ঋদ্ধি। সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের আলোটা নিভে গিয়ে একরাশ ঘন অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল ঋদ্ধি। 

ঝাঁ চকচকে গাড়ির ব্যাক লাইটের লাল আলো দুটো দূরে আরও দূরে ক্রমশ বিন্দু হতে হতে এক সময় অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।নিঃসীম অন্ধকারে বিদেহীর মতো সেদিক পানে তাকিয়ে একা দাঁড়িয়ে থেকে অরুনিমা রিডিং রুমে এসে আলো জ্বাললো। দেয়ালে টানানো সবগুলো ছবির দিকে তাকিয়ে এই প্রথম তার বিবেকান্দকে মনে হলো সবচেয়ে বেশি দুঃখী, এতদিন কখনো তা অরুনিমার মনে হয়নি আজ কেন মনে হলো ভাবতে ভাবতে চোখটা আটকে গেলো টেবিলে রাখা এয়ারটিকিট,আর একটা ভিজিটিং কার্ডে। এয়ারটিকিটটা তার নামে আর ঋদ্ধির ভিজিটিং কার্ড। কার্ডের পেছনে লেখা তুমি আসবে জানি,অপেক্ষায় থাকলাম তোমার কলের। টিকিট,ভিজিটিং কার্ড রেখে অরুনিমা ছুটে গেলো লিভিং রুমে ... পোট্রেট জুড়ে একজোড়া পাখি উড়ছে আকাশে আর খাঁচা নদীর জলে পড়ে ভেসে যাচ্ছে। ছবিটার দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে ছিলো অরুনিমা জানে না ... যখন খেয়াল হলো তখন মোবাইলের ঐ প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে ...

হ্যালো অরু...
হ্যালো..হ্যালো...অরু!




Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.