Header Ads

Breaking News
recent

মৌ দাশগুপ্ত

মৌ দাশগুপ্ত


চরিত্র

 ১। ফল্গু

আকাশে তখনো ছিল মেঘ। মেঘের বুকে লুকানো ছিল বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎকে সঙ্গে নিয়ে আসন্নপ্রসবা ধানক্ষেত পার হচ্ছিলো রাত। বিদ্যুতের ক্ষণকালীন আলোয় ভাসিয়ে নিচ্ছিল  আঁধারিয়া ছবিবৃক্ষ সংসার, যাদের পাতায় পাতায় গল্প-গুচ্ছ, কবিতার শিঞ্জন,শব্দের চুপকথা। মেঘ, বৃষ্টি আর নদীবালিকার অফুরান ভালোবাসা লুকিয়ে আছে সেই পাতাদের বিন্যাসমঞ্জরীতে । ঠিক তখনই মাটির কোল থেকে মুখ তুলে আকাশ দেখেছিল ফল্গুনদী।তখনো বর্ষামঙ্গলের সামগান  স্মৃতি জেগে আছে তার বালিভরা বুকে। অনেক স্বপ্ন ছিল তার। কোন এক দুরন্ত কিশোর নদীজলে বাইবে কলাগাছ ভেলা। সরলা কিশোরী পদ্মাতায় ভাসাবে ইচ্ছেপ্রদীপ। বিরহান্তরীতা নারী আনমনে ভুল ঘাটে ভাসাবে তার কলসী। দূর থেকে ভেসে আসবে অভিমানী বাঁশির ডাক। বাঁশি যে বিরহ চেনে, সেই বিরহের সুর মেখে উদাসী নদী বয়ে যাবে সাগরসঙ্গমে। সীতার অভিশাপে ফল্গু জানেনা সঙ্গম কতদূর। কতপথ উজিয়ে গেলে সমুদ্রকে দু’হাতে ছোঁয়া যায়,তার কোন সন্তান নেই যাকে কানেকানে বলতে পারবে কত ঢেউয়ের আঘাতে প্রেমের মর্ম বোঝা যায়। দিক থেকে দিগন্তে ছুটে যায় বিদ্যুৎ, রাতের আঁচলে ঢেকে যায় চরাচর। ফল্গুনদীর মন জানেনা কেউ। কেউ ডাকেনা বাঁধনভোলার ডাক। আজও তাই মাটির কোলে মুখ লুকিয়ে পৃথিবীর যাবতীয় জলতর্পণ, তিলাঞ্জলির সাক্ষী থাকে একাকিনী ফল্গু, নতুন কোন এক সীতার অপেক্ষায়।।


২। অথ মহাভারতী কথা

বায়োস্কোপের খোপে চিত্রায়িত ভারতের আঠারো পর্বের মহাভারত। আগুনের হলকায় পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া  মহাভারতীর শৈশব।মাতৃহীন, পিতৃহীন, পরিচয়হীন, অস্তিত্বহীন, এক রহস্যময় শৈশব।অতঃপর,“অথ শ্রী মহাভারত কথা। কথা হ্যায় পুরুষার্থ কি, অর্থ কি, পরমার্থ কি”। কিন্তু তারপরেও আরো কিছু বাকি থেকে যায়।আগুনে পোড়া অক্ষরে লেখা যাজ্ঞসেনীর না জানা ঘুমপাড়ানী গান,আধোআধো বোল কথা, টলোমলো পায়ে এগিয়ে চলা অগ্নিপথ যাত্রার কথা। পুত্রেষ্ঠি নামক রাজ্যবাদী চাহিদায় অবাঞ্ছিত যাজ্ঞসেনীর আবির্ভাব কথা থেকে মাছের চোখ নামক নির্ঘুম দৃষ্টিপথে ভোগ ও ভাগের পথে পা রাখার কথা।পুরুষতান্ত্রিক রাজপথ থেকে ভোগবাদী রজঃপথ যাত্রাকথা। রাজবধুর অলক্তক চিহ্নময় পথ থেকে অপমানের কন্টকাকীর্ণ বনপথের কথা। অন্তপুরিকার ঘোমটার আড়াল থেকে অন্তহীন আঁচলের বস্ত্রহরণ কথা।পঞ্চপতি গরবিনীর নিরপত্য জীবন থেকে রাজেন্দ্রানীর পক্ষপাতদুষ্ট মহাপ্রস্থানকথা।কথাকলি কন্যার অন্তহীন কথামালার কথিত অকথিত কথকতা। মহাভারতের যুগ থেকে  যে কথার কথক এই আমরাই, আজকের মহাভারতীরা ।


৩। প্রবৃত্তি

মানুষের আধুনিকতা দ্রুত হেঁটে মিলিয়ে যাচ্ছে ফেলে আসা আদিম অরণ্যে...! আদতে অরণ্য নেই। লৌহসভ্যতা থেকেই একটু একটু করে উজাড় হয়েছে সবুজের একচ্ছত্র রাজ্যপাট। অতএব অরণ্যচারী শ্বাপদস্বভাব বাসা বেঁধেছে আপাত নিরাপদ মন নামক অতলান্ত গিরিখাদের শিরায় শিরায়।লোভ হিংসা উদ্বেগ পরশ্রীকাতরতা নামের ছোট ছোট ইন্ধনগুলো যত ভার বাড়িয়েছে তত ঘন হয়েছে তাদের কাজলকালো বসতি। নিঝুম জোনাক রাতে শব্দের উর্ণনাভ জাল ছিঁড়ে মৃগয়াবিহারে বেরিয়েছে মনের লুকানো আদিম প্রবৃত্তিরা।তাদের দাঁতে বিষধুতুরা, নখে শ্বেত আকন্দ,চোখে হায়নার দৃষ্টি, রক্তে না-পুরুষের না মেটা তৃষ্ণা।তাদের কোন নাম নেই পরিচয় নেই, ভালবাসা দয়া মায়া স্নেহ মমতা নামের কোন আত্মীয় অপত্য নেই। জন্মের দাগ নিয়ে একা চুপ মানুষের সংস্কার।আবিল যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত মানবিক সম্পর্কের ছোটবড় দায়দায়িত্ব, আত্মসুখ।  এত কথা বলার পরেও দেখি সেই অ্যাসিডদগ্ধা মেয়েটার পোড়া ঠোঁটে, ধর্ষিতা মেয়েটির খোলা বুকে, স্বামীপরিত্যক্তা কামিন মেয়ের হাতের তালুতে, সোনাগাছিতে বেচে দেওয়া মেয়েটার পায়ের নূপূরে, শেরপুরায় মানুষ বেচাকেনার মেলায় হাত ফেরতা হওয়া মেয়েটার গলায়, দু’মুঠো চালের বিনিময়ে বেচে দেওয়া নাবালিকার শক্ত হাতের মুঠোয়, ডাস্টবিনে কুকুরের খাদ্য হওয়া অজাতিকা ভ্রূণের না কাটা নাড়ীতে,  ভাজ্য ভাজক ভাগফলের হিসাব মিলিয়ে অবশেষ পড়ে আছে মায়ের ঘুমপাড়ানিয়া গল্পের রেশটা...



কোন মন্তব্য নেই:

সুচিন্তিত মতামত দিন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.