x

প্রকাশিত

​মহাকাল আর করোনাকাল পালতোলা নৌকায় চলেছে এনডেমিক থেকে এপিডেমিক হয়ে প্যানডেমিক বন্দরে। ওদিকে একাডেমিক জেটিতে অপেক্ষমান হাজার পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ।​ ​দীর্ঘ সাতমাসের এ যাপন চিত্র মা দুর্গার চালচিত্রে স্থান পাবে কিনা জানি না ! তবে ভুক্তভোগী মাত্রই জানে-

​'চ'য়ে - চালা উড়ে গেছে আমফানে / চ'য়ে - কতদিন হাঁড়ি চড়েনি উনুনে / চ'য়ে - লক্ষ্মী হলো চঞ্চলা / চ'য়ে - ধর্ষিতা চাঁদমনির দেহ,রাতারাতি পুড়িয়ে ফেলা।

​হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানুষটি লালমার্কার দিয়ে গোল গোল দাগ দেয় ক্যালেন্ডারের পাতায়, চোদ্দদিন যেন চোদ্দ বছর। হুটার বাজিয়ে শুনশান রাস্তায় ছুটে যায় পুলিশেরগাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স আর শববাহী অমর্ত্য রথ...। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেকটা জল, 'পতিত পাবনী গঙ্গে' হয়েছেন অচ্ছুৎ!

এ কোন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

সমীরণ চক্রবর্তী

রবিবার, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৬

দেবাঞ্জন ঘোষ

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৫, ২০১৬ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
নতুন চিত্রনাট্য











গ্রামের নাম কালিকাপুর। বোলপুর রেল স্টেশন থেকে ২৮ কিলোমিটার পথ। আবার পানাগড় ,গুসকরা হয়েও আসা যায় , আসা-যাওয়ার পথ তিন দিক থেকে , মধুছন্দাকে কাগজ পেন্সিল নিয়ে বুঝিয়েছে সুপ্রতীম । শ্যুটিং লোকেশনের নামটা জানার পর থেকেই মুখ ভার মধুছন্দার । বাধ্য হয়েই প্রোডিউসার , শ্রী ভীরা ভেঙ্কাটা সত্যনারায়ানামূর্ত্তিবান্ধাকবি ,দুর্গাপুরের ষ্টার হোটেলের বাথরুমের মাপজোক আনিয়ে ফেলেছেন । এখনও অবধি কারুর কাছে সঠিক কোন তথ্য নেই , ম্যডামের চয়েসে কি থাকবে আর কি থাকবে না ? বোলপুর - কালিকাপুর , নাকি দুর্গাপুর ? এখন শুধুমাত্র চয়েস জানার অপেক্ষা। মাধাইআবার মাথা খাটিয়ে এই বুদ্ধিও বার করেছে , শিয়ালদহ থেকে রোজ রাজধানীতে দুর্গাপুরে নেমে শ্যুটিংলোকেশন , ভোরের দিকে এক ঘুমে , মেক-আপ ভ্যানে করে সোজা কলকাতা , বিকেলে আবার রাজধানী, এই ভাবে দু-মাস....থামাতে পারেনি মধুছন্দা মাধাই এর এই ভাবনা চিন্তাকে , বুদ্ধির হেরফের পছন্দ হয় না কোনদিনই, বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাপারটাই বেশী পছন্দ চিরটাকাল , বাধ্য হয়েই বলতে হয়েছে মাধাইকে , " যতসব বোগাস বুদ্ধি । " মাধাই আক্ষেপ করে বলছে, " ম্যাডাম আমার বুদ্ধিটা নিলেনই না , এটাই আমার দুঃখ , ইউনিটের কেউই এসবে ঢুকবে না , এই একমাত্র মাধাই ছাড়া।

"নিজে থেকেই মাধাইকে ডেকেছিল মধুছন্দা , সুপ্রতীমের কাছ থেকে আজকের শুরুটা শোনার পর , সুপ্রতীমও সাত-সকাল টা নষ্ট করতে চায়নি , সাত-মহলা জমিদার বাড়িতে আজ শ্যুটিং সফরের প্রথম শ্যুট । ঘরে ঢুকেই সুপ্রতীম বলতে শুরু করেছিল , " দিদি তোমার স্বামী জমিদারের সন্তান ,তুমি চা তৈরী করছ পালঙ্কের পাশে , কিন্ত স্বামীর এখনও ইচ্ছা আর একটু দুষ্টুমি করে, তোমার নতুন বিয়ে হয়েছে, খানিক আগে বাড়ির পুকুরের জল ছুঁয়েছে তোমার শরীর , জমিদার বাড়ির নিয়মমাফিক তুমি শুদ্ধ ,বাইরে আলো ফুটে উঠছে আরও আরও , জমিদার সন্তানদের একে-একে ঘুম ভাঙছে , জানলা থেকে দেখা যাচ্ছে দূরে নাচঘরের আলোগুলোও , একে একে নেভান হচ্ছে , রাত পার করা স্বামীর ছোঁয়া মানে .... আবার বাড়ির পুকুরে ডুব । " দারুন বুদ্ধিমান এই সুপ্রতীম , শ্যুটের আগেই এমন যাত্রা করে বোঝায় ....

বুঝতে বুঝতেই হাত তুলে থামিয়ে দিয়েছিল মধুছন্দা , তখনই জানতে চেয়ছিল ," বোলপুর থেকে কোথায় যাওয়া হবে ? " সুপ্রতীমের উত্তরের সাথে সাথে মধুছন্দার মুখটা ভার হয়ে যায়। সুপ্রতীম তখন কাগজ-পেন্সিলের সাহায্য নেয়, সেটের বদলে ম্যাপ আঁকতে শুরু করে , মাধাইকে পাঠিয়ে দিতে বলে মধুছন্দা , তারকাছে তখনই । আর মাধাই এসেও আমতা আমতা করে এইসব বলে ফেলে। সেই মুহূর্ত্তে অজয় নদীর ওপারে এগারো মাইলের জঙ্গলের মাঝে কালিকাপুর জমিদার বাড়ীর সেটে যা চলছে তার খবর এল: একতলাতে যেন হাট বসে গেছে। বাড়ির উঠোন , উঠোন লাগোয়া দালান , বৈঠকখানা আর সেই লাগোয়া সেরেস্তা বাড়িতে ধূপ দেওয়া চলছে , সরকারী কাজকম্ম শুরু হবে খানিক পরে , কঠিন পরিচালকের কঠিন সেট , ব্যস্ত সবাই , টীম প্র্যাকটিসে ।মাধাই এর অনুমতির প্রয়োজন হয় না মধুছন্দার সময় পেতে । মধুছন্দা কোনদিনও কোনলোকেশনেরনাম জানতে চায়না,কন্ট্রাকট সই-সাবুদ হয়ে গেলে তাকে শুধু শ্যুট-সিডিউল জানিয়ে দিতে হয় , সেইমত সুপ্রতীম তিনমাস আগেই বোলপুর আউটডোরের কথাও জানিয়ে দিয়েছিল । সবাই একসাথে হই-হই করে গতকাল বোলপুর পৌঁছেও গেছে। বাংলা তাকে চেনে , আর মধুছন্দাও সমানভাবে বাংলাকে চেনে। বাংলার চালচিত্র বাংলার মেয়ে জানবে না এমনটা আবার হয় নাকি ? ছবির কাজে মিশে যাওয়ার সাথে সাথে সকলের সাথে মিশতে পারার অসীম ক্ষমতা , শ্যুটের মাঝেও সবার সাথে গল্প জুড়ে দেয় , পপুলার নায়িকা । 


জামসেদপুর প্রবাসী পিতার কন্যা । পিতা নিশীথ রঞ্জনের প্রবাস প্রেম কতখানি ? কর্মের একনিষ্ঠ যোদ্ধা পেশার ঘোড়া থেকে নেমেও এপ্রশ্নের যেমন সম্মুখীন হননি , তেমনি প্রেমজ সম্পর্কে , সম্পর্কের ঘর-বাড়ি তৈরী করেছেন একের পর এক । আজও অধূনা ঝাড়খন্ডের এই শহরে বা প্রতিবেশী রাজ্যের মেদিনীপুর শহরে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিজ্ঞানীরা ও ঐ ঘর-বাড়ির মানুষজন প্রনাম করেন এই আত্মজ প্রানকে। ডাক্তারী পাশ করে চাকরীর পরীক্ষা দিতে এসে জামসেদপুর-টাটানগর স্টেশনে নেমে , একটু আগাতেই শহরটাকে ভাল লেগেছিল অসম্ভব রকমের , ঠিক এমনি করেই মাধাই একটা কাজ জোগাড় করে এই স্টীল টাউনে এসে পৌঁছয় , বিষ্টুপুরের সিনেমা হলটা একটা দমকা অক্সিজেন ঠেলে দিয়েছিল মাধাই এর নাকের জোড়া ফুটোতে , রোজগার করে বাড়িতে টাকা পাঠাবার দম-বন্ধ অবস্থাতেও ভাল লেগে গেছিল শহরটা। টাটানগর শহরের প্রানকেন্দ্র এই বিষ্টুপুর মার্কেট এরিয়া । যে যেভাবে প্রান খুঁজে পায় সে সেভাবেই কাজ সারে। শ্রী নিশীথ রঞ্জন রোজ সাতসকালে নিজে এসে পুজোর মিষ্টি কিনে নিয়ে যান শ্রী গৌরাঙ্গ মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে। আর সপ্তাহের শেষে যেদিনটা সবচাইতে বেশী ভিড় হয় , সেদিনটাতে মাধাই আসে। ছুটি থাকলেও একটা মেনটেনান্স স্পেশাল ডিউটি চেয়ে নেয় মালিকের কাছে , পয়সা-কড়িতে একটু সুবিধা হয় মাস চালাতে , তারপর ছুটি গুলো যোগ করে মাস-ছয়েক পরে বাড়ি ঘুরে আসে। এরকমই এক ছুটির রাতে সিনেমা হলের নাইট শো'র এক টাকা দশ পয়সার লাইনে এই মাধাই পেটে চাক্কু খেয়েছিল। পর্দার বাইরে সিনেমা যে যন্ত্রনা দিয়ে আলিঙ্গন করবে স্বপ্নেও ভাবেনি কোনদিন। পরেরদিনটা বাড়ি যাওয়ার দিন ছিল। প্রান বেরিয়ে যায় যায় , তবু চোখ খুলে রেখেছিল মাধাই , যন্ত্রনার চোখে টাটানগরের অন্ধকার আকাশটা আরো চেপে ধরছিলো চোখ দুটোকে ।যে চোখ দিয়ে ছাপ্পান্নবার 'শোলে' দেখেছিল মাধাই , অপারেশনের পর সেই চোখ খুলে শ্রীনিশীথ রঞ্জনকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল। চোখের জলেঈশ্বর দর্শন হল। 

লেখা-পড়া ও পারিবারিক চাপে সিনেমা দেখা হয়ে ওঠেনি নিশীথ রঞ্জনের , সিনেমা করাতো দূর অস্ত। স্কলারসিপের ঠেলায় যে পড়া এগিয়ে চলে সেই পড়ার মনকে , বন্ধুদের শত চাপে শত ঠেলায় সিনেমা হলের চৌহদ্দিতেও কখনো পৌঁছে দিতে পারেননি। সিনেমার গান তার কানে আসত , পুত্রের কল্যানে , যে ট্রানজিসটার সেট কিনে দিয়েছিলেন তার থেকে ভেসে আসা বিনাকা গীতমালা।..... সেদিন আট নম্বর অপারেশন সেরে হসপিটাল থেকে রাত এগারোটা পঁয়তাল্লিশ নাগাদ বাংলোয় ফিরেছিলেন। খাবার টেবিলে বসার সাথে-সাথেই মিশমিশে কালো ফোনটা বেজে উঠেছিল মাধাইয়ের পেটে ছুরি খাওয়ার খবরটা নিয়ে। নাইট শো'র পরে কোন সিনেমা হলে লোক দেখা যায় না , সেদিনটা ছিল একেবারে আলাদা , অনেকেইআরো রাত অবধি অপেক্ষা করেছিলো বাকিরা মাধাইয়ের চোখ খোলা অবধি। ফোনটা রিসিভ করে স্টীল টাউনের ডাক্তারসাব অপরপ্রান্তকে থামিয়ে দিয়েছিলেন , স্টীলের মত মনের অধিকারী নিশীথ রঞ্জন গাড়ি পাঠাতে বলেছিলেন তৎক্ষনাত। অতি রাত বলে কিছু নেই এই স্টীল সিটিতে। ইমারজেন্সী-সারাটা রাত ট্রেনের আনাগোনা-রাস্তায় অটো সার্ভিস-'C' সিফটের দূরন্ত সফর.....সেই মুহূর্ত্তে সফর সঙ্গী মেন-হসপিটালের অতি দ্রুত অ্যামবুলেন্স , হুটার বিহীন , রুগী অপারেশন থিয়েটরের স্টেরিলাইজ্সড সবুজ কাপড়ের আড়ালে আর নিশীথ রঞ্জন ডাক্তারী মনের গহনে। 

আগের রাতে অ্যামবুলেন্সের হুটার না বাজলেও স্টীল-টাউনের সঠিক সময়ের ভোঁ ঘুম ভাঙিয়েছিল ডাক্তারসাবের । সকালের জল, দুধ , খবরের কাগজ , বাগানের মালী , নাইট-রিপোর্ট .... আরো সবকিছু এসে পৌঁচেছে কম্পানী বাংলোয়। মধুছন্দার আসা বাকি মর্নিং কলেজ সেরে। আধা দক্ষিনী প্রথায় পরনে চেকলুঙ্গী , গেঞ্জীরওপরকলারওলাবুশশার্ট, হাতে জলন্ত পানামা সিগারেট , চোখে কালো ফ্রেমের চশমা , চুলের একপেশে সিঁথির পাশ থেকে চিরুনীর লম্বা লম্বা দাগ , ভোর ছ'টায় শোয়া ক্লান্তশরীরটাকে ধীরে ধীরে এনে বসালেন ডাইনিং টেবিলের সামনেরচেয়ারে....তাকিয়ে থাকলেন বাগানের দিকে। সহধর্মিনী চা নামিয়ে রাখলেন নিশীথ রঞ্জনের সামনে , আর ঠিক তখনইদমকা হাওয়ার মত মধুছন্দা প্রবেশ করল। একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে গত রাতের প্রসঙ্গ তার মুখ থেকে আছড়ে পড়ল খাবার টেবিলে,

" একটা সিনেমার জন্য একজন একজনকে ছুরি মারতে পারে , আর অন্যজনও ছুরি খেতে পারে , কি ভাগ্য হিরো আর হিরোইনের ! "
" আঃ ,চুপ কর তো। " রান্নাঘর থেকে মা বলে ওঠে। 
" বাবা বেঁচে যাবে তো ছেলেটা?"
" আশাতো করছি মা। " দীর্ঘশ্বাস ডাক্তার সাবের। 
" গ্ল্যমার জগতের গ্ল্যামারাস ল্যান্ডিং বাবা , তোমার হাতে। "
" কেন রে , কি এমন দেখলি ? "
" দেখলাম না বাবা , শুনলাম। "
" যাক এতক্ষনে একটু সিওর হলাম। "
" কি ব্যাপারে বাবা ? "

" আসলে , কি জানিস মা , এইসব কেসে বাজে ভয়টা বাজে খবর হয়ে ছড়িয়ে পড়তে সময় নেয় না। ঘন্টা সাতেক যখন কেটে গেল আর তুইতো বলছিস আবার তোদের বন্ধুমহলে হিরো-র গল্প যখন ফেরৎ এসেছে......"

" হিরো তুমি বাবা...সারা শহরতো তাই বলছে। "

" আর নায়িকা তুই....ঐ শোন আমূল মাখন অ্যাডভার্টাইসমেন্ট শুরু হয়ে গেল ধনপতির রেডিওতে,তাড়াতাড়ি স্নান করে ধনপতির কাছথেকে ফুল এনে ঠাকুর ঘরে দে মা.....আউটডোর সামলাতে হবে , তারপর আবার ও.টি ,একেই তো শুরু হল দিনটা দেরীতে ,তোকে আমি নামিয়ে দেব ক্লাশে, তারথেকেও বড় কথা শহরের আসল হিরোকে একবার দেখাটা জরুরী....." কথাগুলো বলতে বলতেই পানামা কায়দায় আর একখানা পানামা সিগারেট বার করে ফেলেছিলেন নিশীথ রঞ্জন। ঐ সময় রেডিওতে প্রতিদিন একই সময়ে একই আ্যডভার্টাইসমেন্ট চলত এক যুগ ধরে , টাইমও জানান দিত ধনপতি মালী ওঅন্যসবাইকে । সেইমুহূর্ত্তে ,জামসেদপুর-টাটানগরশহর-ধনপতিমালীর রেডিও আর ডাক্তার সাবের সহধর্মিনীর হাতেরখুন্তি একটাই টাইমের ওপর দাঁড়িয়েছিল .... দ্বিপ্রাহরিক ওয়েদার ফোরকাস্ট। মানে সঠিক দুপুর । টাউন বাংলোয় অতিরিক্ত সংযোজন মধুছন্দার গলা ছাড়া গান , যা তার নিজস্ব , একান্তই তার মনের খবর। বাংলা সাহিত্যে অগাধ পান্ডিত্য নিশীথ রঞ্জনের , এ-সব পছন্দও করতেন মন থেকে ।


বোলপুর-শান্তিনিকেতন , রেলটিকিটে এরকমটাই লেখা থাকে , জামসেদপুর-টাটানগর আজও সমান ভাবে মধুছন্দার স্মৃতিতে । দুপুর বারোটা , নিজের রুমে নিভৃতে , হুট করতে বেরোনও যায় না। বিকেল পাঁচটা নাগাদ কালিকাপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা , তার আগে হয়ত তারই প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। এ-সবই অনুমান নামকরা হোটেলের কেতাবি লাউঞ্জে বসে। থমকে গেছে সময়টা সকলের জন্য একসাথে , কেন থমকে গেছে আর কেই বা থমকে দিয়েছে , এই দুপুর বারোটা সময়টাও যথেষ্ট নয় বলে দেবার মত। গত চার ঘন্টায় ইউনিটের একজনও , মধুছন্দার এমন কোন রূপ দেখতে চাননি যা অনভিপ্রেত। একটাই চিন্তা , আজই প্রথম দিন , চলবেও দু-মাস , আর মধুছন্দার মুড গেছে বিগড়ে । সুপ্রতীম আর মাধাই এর সাথে সবাই লাউঞ্জে বসে। ঘন ঘন খবর নেওয়া চলছে কালিকাপুরের প্রোগ্রেস। হোটেলের বাইরেও এদিক ওদিকেজটলা। একবার যদি প্রিয় হিরোইনের দেখা মেলে। এমনটা কেউ আশাও করেনি , গ্রাউন্ড ফ্লোরের লিফটের দরজা খুলে স্বয়ং মধুছন্দা বেরিয়ে আসছে। দুর থেকেই সুপ্রতীমকে ইশারায় ডাকল সে। সেও দেরী না করে মধুছন্দার দিকে দৌড়ল , এছাড়া কোন উপায় নেই , একটু দেরী মানে ..... ? হ্যাঁ , একটুদেরী মানেই মিস , প্রত্যেকের দৃষ্টি তার দিকে , লম্বা রিসেপশনের লম্বা মেয়টা থেকে শুরু করে একেবারে এই কোনের মাথা গুঁজে বসে থাকা ছোটোখাটো বেঁটে ছেলেটাও উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে। কম-বেশী সংখ্যার পর্যটকরাও একেবারে হতভম্ব , লাঞ্চ টাইম , প্রথমার্ধের পারিপার্শ্বিক সফর সেরে ফিরে পড়েছে অনেকেই । ডাইনিং জোন থেকে ভেসে আসা অজস্র কাঁটা-চামচের বিশ্রী আওয়াজ একেবারে থেমে গেছে। লাউঞ্জের মাঝামাঝি মুখোমুখি সি সি টিভি আর হলুদ আলোর সার্ভিলেন্সে মধুছন্দা , পর্দারবাইরে প্রিয় অভিনেত্রী। লনের দিকের কাঁচের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা স্বামীর গালে সটাং চুমু বসিয়ে দিলেন রম্যানী অ্যাংরিস , পাঞ্জাবী কন্যা বাঙালী বধূ , আর থাকতেও পারলেন না , " কি দেখছিগো চোখের সামনে ! "

গায়ের রংটা মাখনের মত , চোখ একেবারেই নিজস্ব , কবজী অবধি হাতটা হাত তার পরের অংশ তুলির মত , ওপর দিকের অনাবৃত অংশের শুরু থেকে কপালের শেষ অবধি একটাও ভাঁজ নেই , আর চুলের গন্তব্য কোমর , এইখানেই পরনের কালারফুল শাড়িটা নিজেকেই নিজে মেলে ধরেছে , নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে সাথে ওঠা-নামা করছে গাল দুটো। বুকের কাছে অদ্ভুত কায়দায় শাড়ির ওপরের অংশ শোভা পাচ্ছে , হাতের চুড়ি , গলার হার আর কানের দুল , এবলে আমায় দেখ , তো ও বলে আমায় দেখ। দুজনে কাছাকাছি আসতেই চোখে চোখ পড়ল দুজনার। মধুছন্দাই শুরু করল......

" আমার একটা কথা তোমাকে রাখতে হবে সুপ্রতীম , এই বই এর হীরো চেঞ্জ চাই আমি। "

"... হীরো চেঞ্জ চাই আমি " সুপ্রতীমের কানে সেকেন্ডে কথাটা দশবার রিপিট হয়ে গেল । মানে জানতে চাওয়াটা বোকামি হবে সুপ্রতীমের , আর তাছাড়া এই মনোরম লাউঞ্জ পরিবেশে সাংঘাতিক একটা অস্বস্তি চেপে ধরছে যেন সারা শরীরটাকে। ততক্ষনে দুজনার দু-পাশে এক প্রকার দৌড়ে এসে দাঁড়িয়েছে রিশেপসনের লম্বা মেয়েটা আর বেঁটে-খাটো ছেলেটা , দুজনেই একসাথে বলে উঠলো , " কনফারেন্স রুম খুলে দিয়েছি স্যার , আপনারা যেতে পারেন। " সুপ্রতীমই হাত তুলে কার্টসি সিগন্যাল দিল মধুছন্দাকে কনফারেনস্ রুমের দিকে আগাবার জন্য । 

" পঞ্চাশ পারসেনট্ বই আগিয়ে গেছে , এখন কি করে সম্ভব ? " সুপ্রতীমের সরাসরি প্রশ্ন। 
" সম্ভব অসম্ভব আমিও বুঝতে পারছি না , কিন্তু তোমাকেই এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে হবে। "
" আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না দিদি । আর যাকে বাদ দেব তাকেই বা কি উত্তর দেব ? কেস খেতে হবে , ইনজাংশন , উফ , কিন্তু কেন কেন ?

এত বড় কনফারেনস্ রুমে দুটো মাত্র প্রানী আর হিমালয় সমান ঠান্ডা । তারথেকেও অত্যাধিক ঠান্ডা উত্তর এল মধুছন্দার কাছ থেকে । " রাসবিহারীকে একবার আমার কাছে পাঠিয়ে দিও , আর ওর পূর্ন পারিশ্রমিক ওকে মিটিয়ে দিও। "

" রাসবিহারী ? কে রাসবিহারী ? "
" সত্যব্রত। সত্যব্রতকে পাঠাবার কথা বলছি । "

নবীন পরিচালকের নবীন হীরো সিলেকশন ,নবীন চরিত্র থেকে বাদ পড়তে চলেছে। আর কোন সংশয় , ধাক্কা , চাপ , লজ্জা , ভয় কিছুই অনুভূত হল না সুপ্রতীমের শরীর ও মনে । আনমনা থেকে মনে ফিরল সে , নারী কন্ঠের সম্ভাষনে........

" তুমি , তুমি কি খুব চিন্তা করছ ? আমার কোন পেমেন্টই তোমাকে করতে হবে না। যা দিয়েছ তাও ফেরত করে দেব। "


বিকেল তিনটে নাগাদ খান ছয়েক গাড়ি কালিকাপুরের দিকে এগিয়ে পড়ল , মাধাই আর মধুছন্দাকে হোটেলে রেখে দিয়ে।কারোর মধ্যেই তাপ-উত্তাপ কোনটাই নেই , গাড়ি দৌড়বার গাড়ি দৌড়চ্ছে , বোলপুর থেকে যে পথ ইলামবাজারের দিকে গেছে আরো খানিকটা এগোলে অজয়ের ব্রীজ , সামনে এগারো মাইল মিনিট চারেকের পথ , সেখান থেকে পথ গেছে কালিকাপুরে। শাল-পিয়ালের ঘন জঙ্গলের সাথেই সহাবস্থান কালিকাপুর গ্রামের । তারসাথে সাত-মহলা জমিদারবাড়ি , পুকুর , মন্দির । দুর্গা-বাড়ি সাড়ে তিনশো বছরের মিলন মঞ্চ । আজও তার ব্যতিক্রম হল না। মুখভার করা মুখগুলোকে নিয়ে ভারী গাড়িটা দুর্গা-বাড়ি আর শিব দালানের সামনের সবুজ মাঠে বকুল গাছটার তলায় এসে দাঁড়াল । অতবড় মাঠটায় এই গাড়িটারই জায়গা ছিল শুধুমাত্র , বাকি পুরো মাঠটা শুটিং পার্টির গাড়িতে ছয়লাপ । বকুল গাছটার কাছে মধুছন্দার ভ্যানের এসে দাঁড়াবার কথা ছিল । ছ-ছটা গাড়ি নিয়ে না এলেই হত , সুপ্রতীম বুঝল ওর মাথা ঠিক কাজ করছে না। যে যা বলছে ও তাতেই সায় দিয়ে দিচ্ছে । এত ভীড় , এত মানুষের আবেগ তাড়িত মন , এত আয়োজন , এতকিছুর মাঝেও প্রশাসনিক তৎপরতাটা চোখে পড়ল সুপ্রতীমের। কিছুতো একটা বলতেই হবে। সত্যনারায়নজী তার ওপরেই ছেড়ে দিয়েছে , সিলেকশন যেহেতু তার। গোটা একটা বছরের চেষ্টায় জমিদার বাড়ীর সাত-সাতটা মহল সাড়ে-তিনশো বছর আগেকার রূপে , সুপ্রতীমকে অনেকের সাহায্যও নিতে হয়েছে এই কাজে। মূল গল্পের থেকে সরে আসাটা একেবারে পছন্দের নয় সুপ্রতীমের। কিন্তু আজ সবাইকে , ইনক্লুডিং মিডিয়া , যা জানাবার তাকেই জানাতে হবে। এরই মাঝে ঝাড়লন্ঠন সব জ্বলে উঠল। অদ্ভুত আবেশে আবিষ্ট স্বর্গীয় পরমানন্দ রায়ের বাসস্থান আর সারাটা গ্রাম। এ যেন সাড়ে-তিনশো বছর আগেকার স্বর্গীয় শোভা সকলের চোখের সামনে ,যা কেউ কোনদিন এর আগে দেখেনি । দূরে নাচ-ঘরের ভেতরেও আলো জ্বালান হয়েছে , এই নির্দেশটাছিলসত্যব্রতর , দোতলার মানুষ-সমান জানলায় দাঁড়িয়ে , নাচ-ঘরের দিকে তাকিয়ে তার কিছু বাড়তি সুবিধা হবে। এখন সে নিজেই বাদ। এতক্ষনে মধুছন্দা আর সত্যব্রতর মিটিং নিশ্চই শুরু হয়ে গেছে হোটেলের রুদ্ধদ্বার বিলাসবহুল কক্ষে। আর দেরী করা ঠিক হবে না সুপ্রতীমের , অন্ধকার হয়েই এল প্রায় , নিজেই হাতে করে পোর্টেবল মাইকটা তুলে নিল , একসাথে সকলের কানে সুপ্রতীমের বলা কথাগুলো পৌঁছতে শুরু করল , " আপনাদের প্রিয় নায়িকা একশো এক ডিগ্রি জ্বরে আক্রান্ত....জ্বরে আক্রান্ত.....জ্বরে আক্রান্ত.......... " কয়েক সেকেন্ডের জন্য সুপ্রতীম থেমে গেছিল , অনুভব করল সম্ভব-অসম্ভবের মাঝে ও দাঁড়িয়ে আছে আর ওরই কথাগুলো সাত-মহলায় ধাক্কা খেয়ে ওর কাছেই ফিরে আসছে। 


সামনে কোন দিশা নেই । অনেকটা রাত হল হোটেলে ফিরে আসতে সুপ্রতীমদের । মাধাই আর একটু হলেই পড়ে যাচ্ছিল , সোফা থেকে উঠে দৌড়ে ওদের দিকে আসতে গিয়ে । কোনরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে একটা সাদা খাম আগিয়ে দিল । সুপ্রতীম মাধাই এর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে একটু হলেও তাড়াতাড়ির সাথেই খামটা খুলল । একটা মোটা কাগজের চেক , তার সাথে মুখ বাড়িয়ে আর একটা সাদা কাগজ । নিজের চোখের কাছাকাছি সাদা কাগজটাকে তুলে এনে পড়ল সুপ্রতীম , " আগামীকাল দুপুরের গাড়িতে কাউকে কোলকাতা পাঠাবার ব্যাবস্থা কর , আজ শরীরটা ক্লান্ত তাই শুয়ে পড়লাম । " ক্লান্তসবাই এই মুহূর্তে ।


সকাল সকাল শ্যুটিং পার্টির ভীড় খুব কমই দেখা যায় কালিকাপুরে । রাত কে দিন বানানো খুব সোজা কাজ , কিন্তুভোর - সকালের আলোয় সাহস করে শ্যুটিং চালানোও যায়না । আর অমনিতে সুপ্রতীম বিছানাও ছাড়ে দেরীতে । গতরাতে শোয়ার আগে দুটো কাজ সেরে রেখে ছিল সে , এক , সত্যব্রতর সাথে কথা বলা , দুই , পায়েল আর পীযুষকে আজ শান্তিনীকেন এক্সপ্রেসে কোলকাতা যেতে হবে বলে রাখা ।


শান্তিনীকেতন এক্সপ্রেসে পীযুষদের চাপিয়ে দিয়ে গেট দিয়ে বেরোবার সময় কালিকাপুরের পিকলু চক্রবর্ত্তীর সাথে দেখা হয়ে গেল সুপ্রতীমের । পিকলু নিজে থেকেই এগিয়ে এল ওর দিকে.....

" দাদা হোটেলেই যাচ্ছিলাম , আপনার গাড়িটাকে দেখে এদিকে চলে এলাম । "
" তোমাদের টাকা পেয়ে যাবে ভাই , একটু কাজ আগাতে দাও । "
" এই দেখেন দাদা কি যে বলেন ! আমিতো হোটেলে যাচ্ছি মধুছন্দা ম্যাডাম ডেকেছেন বলে । "
" তোমাকে ডেকেছে ? "

" আমিও অবাক দাদা । আর্ট ডিরেক্টার কৌস্তভ দা বললেন । সকালেই আসতে বলেছিলেন । ধান উঠছে ঘরে , সকালে কি আসা যায় ? আর আমি বিকালে স্টেশনে আসতামই , একটু আগেই চলে এলাম । "

" তা ভাই তুমি জান , কেন ডেকেছেন ? "

এবার কি তাহলে আরও চাপের চাপ শুরু হল । সত্যনারায়নজী মাথা গরম করতে শুরু করেই দিয়েছেন । কৌস্তভও কি তাহলে খোঁচাতে শুরু করল ? না না ওর কাছে সবাই ....একটা বছর ওর পরিশ্রম , কোন পারিশ্রমিক দিয়েই মেটান সম্ভব নয় । কাজটা করার জন্য ' খন্ডহর ' ছবিটা বার পঁচিশ দেখেছে ও । এ কি সব ভাবছে সুপ্রতীম ? কিছুক্ষনের জন্য মনটা অন্যদিকে চলে গেছিল । দুজন একসাথে হেঁটে এগোচ্ছে রাস্তার মুখ অবধি , পেছন পেছন গাড়িটা ।

পিকলু খুব ভাল ছেলে । পরিচালকের প্রশ্নের কি উত্তর দেবে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না । " আপনারইতোজানারকথা , কেনডেকেছেন । "

" তাহলেতো তোমাকে , আমিই কাল বলে আসতাম , জানতামই যদি ! যাইহোক আমকে একটু জানিয়ে যেও । যদি মনে কর ? "

এখন সিনেমা কমই দেখে পিকলু চক্রবর্ত্তী । সিনেমার রান্নাঘরের ভগ্নাংশের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছে নিজের গ্রামে আর এদিক ওদিক। ইদানীং অভিনয়ও শুরু করেছে । একশো এক অভিনেতা , অভিনেত্রী , পরিচালকের পরিচিত মুখ । পেছনের জ্যামটা কাটিয়ে গাড়িটা পাশে এসে দাঁড়াতেই ঝটপ টউঠে পড়ল পিকলু আর সুপ্রতীম সেন । দালাল এম্পোরিয়ামের ডান পাশের শান্তিনিকেতন রোড ধরে এঁকে বেঁকে গাড়ি হোটেলের দিকে গড়াতে শুরু করল , " দাদা ব্যাপারটো কি ? বুঝলেন কি-না , আমিতো কিছুই বুঝছি না , একটু ভয়ও পেছি । "

" আমি তোমার থেকে বেশী ভয় পাচ্ছি পিকলু । দেখ না কি বলেন , গিলেতো আর ফেলবেন না । "

মধুছন্দা সকাল থেকেই মাধাইকে বসিয়ে রেখেছে রিসেপশন লাউঞ্জে , যে ছোকরা রিসেপশনে এসে নিজের নাম পিকলু চক্রবর্ত্তী বলবে তাকে ধরে-বেঁধে নিয়ে যেতে হবে দিদির কাছে । দিদির ছায়াসঙ্গী মাধাই এর ওপর এমনটাই নির্দেশ । মাধাইএর অনুভূতিটা অবশ্যএকটু হলেও অন্যরকমের ...সব নির্দেশই নিশীথ রঞ্জনের নির্দেশ । কাঁচের ভেতর থেকেই সে দেখল , গেট থকে সুপ্রতীমের গাড়িটা ক্রমশ ঢুকে আসছে । সিঁড়ি দিয়ে উঠেই সুপ্রতীম মাধাইকে বলল , " একে দিদির কাছে নিয়ে যাও , এর নাম পিকলু চক্রবর্ত্তী ।

ছ-তলার লম্বা করিডোরে পিকলু আর মাধাই দাঁড়িয়ে আছে , রবীন্দ্রসংগীতের সাথে হলুদ আলো আর ব্ল্যাক মার্বেলের ডিফারেন্ট কালারের ভেনগুলো এক মায়াবী পরিবেশে ভাগ বসাচ্ছে । মধুছন্দা স্বয়ং দরজা খুললেন , " এসো পিকলু , ভেতরে এসো , মধাই তুই নীচে গিয়ে বোস , আমি তোকে ফোন করলে সুপ্রতীমদার রুমে যাবি একবার , ও খুব আপসেট আছে , তোর ফোনটা ওর হাতে দিস.....। " এরকম হতবাক আর ফ্যাকাশে মুখ এর আগে কখনও হয়নি পিকলুর । 

" কি খেতে ভালবাস ? কফি না চা ? ছোটবেলায় খুব মিষ্টি খেতে ভালবাসতে , এখনও সেরকম ? আচ্ছা পিকলু , তোমাদের বাড়িটা সেই লালদীঘি পুকুর পাড়েই আছে তো ? "

" আমরা আর যাব কোথায় ! " কথা বেরোচ্ছে মুখদিয়ে ঠিকই , কিন্তু অবিশ্বাস্য ঘটনা , এরপরের কথা পিকলুর উল্টো হয়ে যেতে পারে, নিজের কানটাকেই বিশ্বাস করতে পারছে না ।

" তোমাদের গ্রামে সব একরকমই আছে ? দুর্গা-বাড়ি , রাধা- বল্লভ মন্দির , নীলকুঠি , আর চাঁদনী ! রাজার পুকুর-বাড়ির পুকুর-লাল দীঘি-রাধা বল্লভ ?শিব-দালানের গায়ে গাছ জন্মায় এখনো ? "

" আপনি জানলেন কি করে এ-সব ? কখনওতো আসেননি আমাদের গ্রামে । আমার না হয় মনে নেই , আর তাছাড়া আপনার একটা ছবিও আমারনাদেখানয় ! "

" সবটাই বলব তোমাকে , আমারও তোমার কাছ থেকে কিছু জানার আছে , নাও কফি-টা খাও , আর কফি খেতে খেতে শোন । "

" আমার থেকে আপনিই বেশী জানেন , আরও জানার থাকলে আমার বাবা বলতে পারতেন । "

" কে , রাম কাকু ? "

আজ অবধি যত শ্যুটিং পার্টি এসেছে কালিকাপুরে তারা সবাই পিকলু চক্রবর্ত্তীর খোঁজ করেছে ,কেউ প্রথম, তার বাবার কথা বলল । হটাৎ করে একটা সাহস কোথা থেকে এসে যেন পিকলুকে জাপটেধরল । এতক্ষনের ভয় কফির কাপে চুমুক দিয়ে একটু হলেও কাটল , " বাবা চা খেতে খুব ভালবাসতেন । "

" আমি একবার জামসেদপুর থেকে ফকিরার চানাচুর পাঠিয়েছিলাম । উনি আমাকে দুর্গা-পুষ্প পাঠিয়েছিলেন । পুজোর পর বাড়ি থেকে ফিরে পেয়েছিলাম । ও হ্যাঁ , তোমাকে বলাই হয় নি , আমি টাটানগরের মেয়ে , এই শহরে টাটানগর থেকে পড়তে এসেছিলাম । সব থাকার মধ্যেও যে অভাবটা চেপে ধরত আবার ঠেলে ফেলেও দিত সেটা বাবার সাথে সাহিত্য সংক্রান্ত প্রতিদিনের আলোচনা । প্রবাসে থেকেও সেটাই ছিল আমাদের সংস্কৃতি , আর সবাইকে সাথে করে অবশ্যই । এখানে সাথ দিল তোমাদের গ্রামের রাসবিহারীদা । সাহিত্যের আবেগে বছরগুলো কি ভাবে যে পেরিয়ে গেল....সাহিত্যিককে অভাবে রেখে ফিরেও গেলাম । পিকলু যে করেই হোক ওনার কোলকাতার ঠিকানাটা আমাকে একটু যোগাড় করে দাও । কালিকাপুরে ফিরতেই যখন হচ্ছে , তাও আবার ওনারই উপন্যাসকে সম্বল করে । কাউকে বলতে পারিনি ঠিকানার কথা , সুপ্রতীমকেও । আমি নিজে পীযূষ আর পায়েলকে ওর কাছে পাঠাব , ওরা একটু পরেই হাওড়াতে নামবে । "

" তার আর দরকার হবে না । " পিকলু নিজের ভয়টাকে এক নিমেষে ঠেলে দিল মধুছন্দার দিকে । ম্যাডামের মুখের দ্রুত পরিবর্তন লক্ষ্য করল সে , আর সে রূপ নিজেই সহ্য করতে পারল না , এ মুখে কোন অভাব বরদাস্ত করবে না পিকলু চক্রবর্ত্তী । বাবা গত হয়েছেন , কিন্তু কানে কানে শিখিয়ে গেছেন এই মন্ত্র , " দুর্গা আরতি এমন হবে , মা যেন হাসেন । " আরতি শেষে যে নীরবতায় প্রনাম সারা হয় পিকলুরও সেই কাজ সমাপ্ত , এবার নীরবতা ভাঙার পালা , আনন্দ আসছে ধেয়ে.......

" আমিতো দাদাকেই নিতে এসেছি , সন্ধ্যে ছ'টায় সরাইঘাট এক্সপ্রেসে নামছেন । একসাথে গ্রাম ঢুকব । আমি আর রাসবিহারী রায় । নিজেই এই গল্পের স্রষ্টা , তার পূর্বপুরুষের সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ রূপ দর্শন করতে আসছেন.............."

জামসেদপুর-টাটানগরের সেই মধুছন্দা , দু-হাতে করে বাচ্ছা মেয়ের মত ফোনের রিসিভারটাকে ধরেছে , ধীরে ধীরে ঠোঁট নাড়িয়ে বলছে ," কোথায় থাকিস মাধাই , তোকে বোলপুর পাঠান মানেই তুই বেপাত্তা , ফোনটা রাসবিহারীকে দে তাড়াতাড়ি.............

সরি , সরি সুপ্রতীম...........

সুপ্রতীম , খন্ডহরে তুমি রূপ দিতে নির্দেশ দিয়েছো , এবার আদেশ দেবে না ? আজই যদি অনুমতি পাও । "

" পিকলু , সন্ধ্যে হলে এখনও জঙ্গলের ভয় আছে ? সাথে তুমিতো আছ , পারলে দাদাকে বোল , আধ-ঘন্টার জন্য একবার হোটেল ঘুরে তারপর নিজের গ্রামে যেতে । "





Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.