x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

শুক্রবার, নভেম্বর ২৫, ২০১৬

রুমকি রায় দত্ত

sobdermichil | নভেম্বর ২৫, ২০১৬ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
 পরজীবীর উপহার





সব কাগুজে ফরম্যালিটি সেড়ে দেহটা চিতায় তুলতে তুলতে সন্ধ্যে নেমে গেছে। রঘুবীর ডোম তাঁর বাঁশের দন্ডটা দিয়ে গনগনে আঁচের উনুনের মত জ্বলতে থাকা চিতার আগুনটা খোঁচা মেরে উসকে দিতেই গুঁড়ো গুঁড়ো ছাই বৃষ্টির মত ঝরে পড়ল রঘুবীর আর উজানের শরীরে। উজান শেষবারের মত মেঘনার শরীরে ভিজছে। গতকাল সকালেও যে মেয়েটা ছুটে বেড়িয়েছে শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে সেই মেয়েটার শরীর পোড়া ছায়ে ভিজছে উজান। এত কাছে থেকেও উজান বুঝতে পারেনি যে, মেঘনার মনে এতটা গুমোট মেঘ জমে ছিল।

কনকনে শীতের রাত,উজানের শরীরটা হঠাৎ যেন কাঁপুনি দিল। আত্মীয়-স্বজন কাউকে উজান শ্মশানে আসতে দেয়নি, একাই নিয়ে এসেছে মেঘনার নিথর শরীরটা। রাতে বাড়ি ফিরতে পারেনি। সকালে দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়েছিল মেঘনার নিথর শরীর লুটিয়ে পড়ে আছে মেঝেতে।

মেঘনার শরীরটা ধীরে ধীরে পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। উজান চিতা থেকে ঠিক দু’হাত দূরে এসে বসলো। রঘুবীর ডোম আবার খোঁচাল, পোড়া কাঠের গায়ে জমা আগুন ফুলকি হয়ে ছড়িয়ে পড়লো। চিতার আগুনে উজানের শরীর উষ্ণ হতে শুরু করেছে। উজানের চোখ ফেটে জল গড়িয়ে এলো। যেতে যেতেও মেঘনা ওর শরীর পোড়া উষ্ণতা দিয়ে উজানের শীত হরণ করে নিচ্ছে।

ভিতরটা দুমরে মুচরে উঠলো উজানের। এত তাড়াতাড়িতো মেঘনা যেতে পারে না। আরও অনেক গুলো বছরতো উজানের হাত ধরে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিল মেঘনা, কি এমন হলো যে মাঝপথেই হাত ছাড়িয়ে নিল মেঘনা? ---উজান এখনো জানেনা কি সে কারণ। যে মেঘনা সব থেকে ভয় পেত মৃত্যুকে সে ই কিনা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলো! বিস্মিত উজান ফিরে তাকালো মেঘনার চিতার দিকে। কালো ধোঁয়া কুন্ডলী পাকাচ্ছে। উজান পাশে রাখা ছোট্ট ব্যাগটায় হাত ঢুকিয়ে বার করে আনলো একটা সবুজ মলাটের ডায়েরি। ঝাঁপসা চোখের সামনে মেলে ধরলো ঈষৎ হলদে হয়ে যাওয়া প্রথম পাতা।


[২]

তারিখঃ ১০/০৬/১৯৯৮, শনিবার

আজ আমি ১৮ পূর্ণ করলাম, দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসাবে নিজের মতামত প্রতিষ্ঠার সম্পূর্ণ আধিকার পেলাম আজ থেকে। ---সত্যিই কি পেলাম?

কি জানি,জানিনা তো! ---কেউকি পায়? —মানে মেয়েরা ---আমি, দিদি আমার মত মেয়েরা যারা বাবা-মায়ের দুলালী নয়। দু’মাস আগেই মেজদির বিয়ে হয়ে গেল। বড়দি’র তো তারও আগেই হয়ে গেছে। বড়দি’র বিয়ের আগে বুঝিনি, মানে বুঝতে পারিনি। ছোটো ছিলাম, দিদির বিয়ের আনন্দেই মেতে ছিলাম। শুধু ভালো করে মনে আছে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকেই পড়ার টেবিলে বসে মাঝে মাঝেই বড়দি কাঁদতো। কিন্তু মেজদির কষ্টটা আমি বুঝেছি। মেজদি চায়নি এখনি বিয়েটা করতে। ---ও তো পড়াশোনায় খুব ভালো, আমার থেকেও ভালো----ভাইয়ের থেকেও।

সেদিন রাতে বাবা, মাকে বলছিল, ‘মেজদির বিয়েটা দিতে পারলে কিছুটা স্বস্তি, ঘার থেকে দুটো মেয়েকে তো নামানো যাবে’। আমার প্রসঙ্গে যাওয়ার আগেই আমি সরে এলাম। বড় অসহায় লাগছিল নিজেকে। এখনো কি আমার জানতে বাকি আছে আমার পরিণতির কথা!

ভাই হওয়ার পর থেকেই সব ছবিগুলো দ্রুত পাল্টাতে লাগলো। দুই দিদির পর আমি হলে বাবা নাকি খুব কেঁদেছিল। কিন্তু দিদিরা সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করলেও আমাকে বাবা ভর্তি করালো ইংরাজী মাধ্যম এক বেসরকারি স্কুলে। ঠিক তিনবছর পর ভাই হলো। এরঠিক তিনবছর পর আমাকেও পাঠানো হল সরকারি স্কুলে। ভাই আমার ছেড়ে আসা স্কুলে যাওয়া শুরু করলো।

মা তার ছেলের উদ্দেশ্যে এক গালভরা কথা বলেছিল---থাক! সেকথা আর লিখতে ইচ্ছা করছেনা। এটা আর নতুন কি। ---সবাই তো আর বাপের এক মেয়ে হয়ে জন্মায় না।

কিন্তু একটা প্রশ্ন জাগছে মনে,যারা বাপের একমেয়ে, যাদের সব আবদার পূর্ণ হয়, তারা কি স্বাধীন বৃক্ষ? ---যারা রোজগেরে তারাও কি স্বাধীন বৃক্ষ? মেয়েরা কি সত্যিই স্বাধীন বৃক্ষ হতে পারে? ---হ্যাঁ, একটা কথা ঠিক ---রোজগেরে অবিবাহিত মেয়েরা খুবজোড় মাচায় ঝোলা শশা, লাউ, কুমড়ো গাছ হতে পারে।


[৩]

তারিখঃ ০৭/০৩/২০০১, শনিবার

সামনেই থার্ড ইয়ার পরীক্ষা। অনেক বন্ধুর পথ পেড়িয়ে তবে এতদূর আসতে পেরেছি। শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম , আপাতত মাচায় ঝোলা শশা গাছ হয়েই থাকবো। এই তিন বছরে একটা মাচা জুটিয়ে ফেলেছি—‘উজান’। মেজদির বিয়ের পর বাবার মুখে যে কথাটা শুনেছিলাম, সেটা আর বাবাকে বলতে দেব না। উজানের কথা বাড়িতে জানিয়ে দিয়েছি। পড়াশোনা চালিয়ে যাব। আপাতত উজান টিউশন জোগাড় করে দিয়েছে।

উজানের কথা জানার পর বাবা-মা, গারজেন গিরি ফলাতে চেয়েছিল। আমি জানিয়ে দিয়েছি, আমার ভালো-মন্দ সব দায় এখন থেকে আমার। আমি পরজীবীর মত বাবা-মা’র পছন্দের দ্বিগুন বয়সি গাছকে জড়িয়ে জীবন কাটাতে পারবো না।

উজান ডায়েরির পাতা থেকে চোখ তুললো আকাশে। তারাহীন রাতের আকাশ, কালো ধোঁয়ায় কেমন যেন গুমোট ভাব।

রঘুবীর ডোম লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। উজান চমকে উঠলো, মেঘনার পোড়া হাঁটুটা নড়ে উঠলো। উজান ডাকলো—‘রঘুবীর-র’। রঘুবীর পিছনে মুখ ফিরিয়ে বলল---‘বাবু বুঝি আগে কখনো শ্মশানে আসেন নি?’

উজান মাথা নাড়লো। ডায়েরির মাঝে আঙুল ঢোকানো আছে। আঙুল সরিয়ে আবার ডায়েরিটা মেলে ধরলো চোখের সামনে।

তারিখঃ ০৮/০২/২০০৩

উজান ভালো চাকরি পেয়েছে। ভেবে ছিলাম চাকরি করে কিছুদিন শশাগাছের জীবন কাটাবো। কিন্তু উজান আর অপেক্ষা করতে রাজি নয়, তাই বিয়েটা সেড়ে ফেললাম। ভালোই লাগছে নতুন জীবন। উজান বলেছে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে। আমি চাকরি পায়নি তবে টিউশন পড়াই। ইচ্ছাছিল নিজের টাকায় পড়াশোনাটা চালাবো। কিন্তু উজানের জেদের কাছে মনে হচ্ছে হার মানতে হবে। ও চায় না আমি, আমি আর টিউশন পড়াই। ভালোবাসার মানুষের আবদার রাখার মধ্যেও একটা আনন্দ আছে। হঠাৎ করে নিজেকে ভীষণ সুখী মনে হচ্ছে। কিছু পরজীবী আছে যারা পোষক বৃক্ষের সৌন্দর্য বাড়ায়। নিজেকে সেই সুন্দর পরজীবী মনে হচ্ছে।

পড়তে পড়তে উজানও হারিয়ে গিয়েছিল অতীতের মিষ্টি স্মৃতিতে। দেহপোড়া কটু গন্ধে ফিরে এলো বাস্তবে। একরাশ শূন্যতা ভেজা চোখ রাখলো ডায়েরীর পাতায়।

তারিখঃ ০৭/০২/২০০৪, শনিবার

আজ অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় উজান আমার জন্য এক গুচ্ছ লাল গোলাপ এনেছে। কাল আমাদের বিবাহবার্ষিকি। একবছর পূর্ণ হবে। আমি জানি লাল গোলাপেই ও থেমে থাকার ছেলে নয়,আর সেটাই সত্যি। একটা হীরের আংটি পড়িয়ে দিল আমার হাতে। কিন্তু আমি কি দেব? আমার নিজের তো কিছুই নেই। যাই কিনি কোনো না কোনো দিক থেকে সেটা উজানের টাকাতেই কেনা হবে।কি দেব? বাগানের গোলাপ? গাছটা তো উজানের টাকায় কেনা। ছিঃ আমি এসব কি ভাবছি! উজানই তো আমার। ওর সব কিছুই তো আমার। তবুও— এই তবুও কাঁটাটা মন থেকে তুলে ফেলতে পারছিনা। উজান জানলে বলবে—‘তুমি নিজেই তো আমার কাছে সব চেয়ে বড় উপহার’।

কিন্তু সত্যিই কি আমার কাছ থেকে ওর কিছু পেতে ইচ্ছা করে না? যদি না করে,আমার তো ইচ্ছা করে কিছু দিতে। কি দেব--?  আঙুল কেটে এক ফোঁটা রক্ত? খুব ঝগড়া করবো?  হ্যাঁ,ব্যাথা দিতে পারি। ওর শরীরের রক্তটা শুষে নিয়ে ওকে রক্তশূন্য করে দিতে পারি।

উজান ক’দিন আগেই বলছিল ওর এক কলিগের বউ জন্মদিনে বরকে আংটি গিফ্‌ট করেছে। উজান কি সচেতন ভাবেই বলেছে? নাকি এমনি।

ছিঃ ছিঃ—আমি কি সব ভাবছি। কেন এমন হয় মনের মধ্যে জানি না। কটা মেয়ে নিজের উপার্জনের টাকায় বরকে উপহার দেয়? আমি জানি আমার মত মেয়ের সংখ্যায় বেশি। তারা নিজেদের পরাজয়কে যুক্তি দিয়ে খন্ডন করে। আমি পারি না। কি করে পারব। পকেট কেটে,হাত খরচের টাকা জমিয়ে নিজের প্রয়োজন পূরণ করা চলে,যার টাকা তাকে উপহার দিতে গেলে আমি আর আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারবো না।


[৪]

উজান ডায়েরির মাঝে আঙুল দিয়ে আবার একবার তাকায় জ্বলন্ত চিতার দিকে। ওর চোখের তারায় চিতার আগুন নাচে। স্থির দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপ্‌সা হয়ে আসে। কখনো মনে হয়নি, মেঘনা এতটা অভিমানি। আত্মসম্মান বোধটা একটু বেশিই ছিল, কিন্তু সেটা যে ওর মনে এতটা গুমোট তৈরি করে ছিল কখনো টের পায়নি উজান। নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে। সত্যিই কি টের পায়নি নাকি, টের পাবার চেষ্টা করে নি। অস্ফুটে বেরিয়ে আসে ‘ মেঘনা, এ কোন কাঠগড়ায় দাঁড় করালে আমায়’। অস্থির হয়ে ওঠে উজান। আবার ডায়েরি উন্মুক্ত করে ঝুঁকে পড়ে পৃষ্ঠা উল্টায়।

তারিখঃ ০৩ /০৪/২০০৪,শনিবার

উজান নিজের কেরিয়ারে ব্যস্ত। আমার কোনো কাজ নেই খাওয়া আর ঘুমানো ছাড়া। এমাসে উজান আমার হাত খরচের হাজার টাকা কম দিয়েছে। আমি জানি খুব অসুবিধায় না পড়লে ও এমন করতো না। ঘরে বসে বসে একঘেয়ে লাগছিল, একটু বেড়িয়েছিলাম দুপুরে। বাসে উঠতে গিয়েও কেন জানি না ট্যাক্সি নিয়ে নিলাম। বেশ অনেক গুলো টাকা নষ্ট করলাম উজানের। বেশ আনন্দ লাগছিল আমি সৃষ্টি করতে না পারি নষ্ট করতে তো পারি। উজানকে বেশ চুঁষে খাচ্ছি। হ্যাঁ, আমার এমনি মনে হচ্ছে। কি কিনবো ভাবতেই একটা খুব সুন্দর শার্ট চোখে পড়লো। দামি শার্ট। ভাবলাম হোক না উজানের টাকা। সবার মত ভাবতে চেষ্টা করলাম। ভাবলাম উজান তো আমাকে এটা আমার ইচ্ছে মত খরচ করার জন্যই দিয়েছে। কিনে ফেললাম ওর জন্য। তখনও বুঝিনি টাকা দেওয়ার অধিকারের মত আমার ইচ্ছের অধিকারটাও ও নিজের হাতেই রেখেছিল অদৃশ্যে। আমার বোঝার ভুল হয়েছিল। অফিস থেকে ফিরতেই পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলাম ওকে। ওর চোখের সামনে মেলে ধরলাম শার্টটা। ওর চোখের দিকে তাকালাম,কোনো উচ্ছ্বাস দেখতে পেলাম না।

কেন পেলাম না! ও কিছু আনলে আমি তো আনন্দ পাই। ও বলল—‘ কেন শুধু শুধু কিনতে গেলে।এভাবে বাজে খরচ কোরো না’। বলেই আমার নাকটা টিপে দিয়ে চলে গেল,কানে মোবাইল চেপে।

আচ্ছা, যদি এটা আমার নিজের উপার্জনের টাকায় কিনে আনতাম তবে কি ও খুশি হতো? একদিন উজানকে সরাসরি প্রশ্ন করবো।উত্তরটা আমাকে জানতেই হবে।

তারিখঃ ১০/০৪/২০০৪, শনিবার

বিকালে বাইরে কালবৈশাখীর তান্ডব চলছিল,ভিতরে আমার মনে।পারলাম না নিজেকে ঘরে বন্দি রাখতে। ছুটে গেলাম বাইরে,ভিজলাম খুব ভিজলাম।তার মজা এখন টের পাচ্ছি। উজান এখনো ফেরে নি। ইদানিং প্রায় ওর ফিরতে রাত হচ্ছে। হাল্কা জ্বর জ্বর ভাব।নিজে নিজেই ডাক্তারি করলাম।একটা প্যারাসিটমল খেয়ে নিয়েছি। উজানকে কিছুতেই বুঝতে দেব না। জোর করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে।আবার একগাদা টাকা আমার জন্য খরচ হোক এটা আমি চাই না।

তারিখঃ ২৯/০৮/২০০৪, শনিবার

আর ভালো লাগছে না। ঘেন্না ধরে যাচ্ছে এ জীবনে। নিজেদের ভোগ্যবস্তু মনে হচ্ছে। বড়দি বিকালে ফোন করেছিল। খুব কাঁদছিল। ওর ক্লাস সিক্সে পড়া মেয়েটাকে কে যেন মোলেস্‌ট করেছে। শুধু অর্থ নয়,কেমন করে আমরা যেন নিরাপত্তার ব্যাপারেও পরজীবী হয়ে পড়ছি। কোথাও স্বাধীনতা নেই।একদল মানুষ ঠিক করে দেবে কেমন পোশাক পড়বো, কখন ঘর থেকে বেরোবো। নিঃশ্বাসও যেন অনুমতি নিয়ে ফেলতে হবে এবার। দিদি বলছিল জামাইবাবু রোজ ওকে টিউশনে পৌঁছে দেয়, শুধু কালই যায়নি। উজানকে ব্যাপারটা জানাবো কিনা ভাবছি।জানালে হয়তো আমাকে নিয়েও ওর অহেতুক দুঃশ্চিন্তা বাড়বে। আমিও তো সব জায়গায় একাই যায়। আমি চাইনা ওর আর দুঃশ্চিন্তা বাড়াতে। সেদিন, যেদিন দুধ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে সাইকেলের সাথে ধাক্কা লাগলো, উজানকে কাজ ফেলে ছুটে আসতে হয়েছিল আমার জন্য। খুব বিরক্ত হয়েছিল। বারবার বলছিল আমাকে নিয়ে ওর দুঃশ্চিন্তার শেষ নেই। আমি না থাকলে উজান অনেক স্বাধীন নিঃশ্চিন্তের জীবন কাটাতে পারতো। ওফ্‌! এই বোঝার জীবন আর টানতে পারছিনা। নিঃশ্বাটাও কেমন যেন ভারি ভারি লাগছে। কেন? কেন? এ পরাধীনতার জীবন। মনে হয় সব শেষ করে দিই, ধ্বংস করে দিই এই সৃষ্টিকে। সেদিন উজানের চোখেও আমি ভয় দেখেছি।বলছিল ... এখন বাইরের পরিস্থিতি ভীষণ খারাপ। আমি যেন একা একা বাইরে না যায়। কেন বাইরে যেতে হলেও আমাকে কারোর সাহায্য নিতে হবে? কেন ...? আমার কি নেই যে আমাকে অন্যের সাহারা নিতে হবে। আমার একটা স্বাধীন বোধ আছে, ইচ্ছা আছে, স্বপ্ন আছে। তবু আমি পরজীবীর জীবন বাঁচতে বাধ্য। ধুত্‌! এই মুহূর্তে ভেঙে ফেলতে ইচ্ছা করছে এই পেনটা। মনে হচ্ছে টেবিলে ঠুকে ঠুকে ভোঁতা করে দিই নিবটাকে। একদিন দেব---এইভাবেই শেষ করে দেব এই পৃথিবীটাকে। পরজীবী থেকে পরিণত হব মৃতজীবীতে। সব রস শুষে নেব এই মৃত পৃথিবীর শরীর থেকে পরম তৃপ্তিতে।


[৫]

উফ্‌! বুকের ভিতরটা দুমরে মুচরে যাচ্ছে উজানের। এত যন্ত্রণা,এত ঘৃণা জমেছিল মেঘনার বুকে,আর ও ক্ষণিকের জন্যও টের পেল না। ব্যার্থ,---ব্যার্থ মনে হচ্ছে নিজেকে। নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করতে ইচ্ছা করছে এখন ওর। চাইলে কি ও পারতোনা মেঘনার মনের আরেকটু কাছে পৌঁছা্তে? ধীরে ধীরে চিতার আগুনও শান্ত হয়ে আসছে। এরপর শুধু পড়ে থাকবে মেঘনার নাভিকুন্ড। উজানের দুচোখ বেয়ে যেন গলিত লাভা বয়ে চলেছে। উজান আবার ফিরে এলো ডায়েরির পাতায়।

তারিখঃ ০৪/১২/২০০৪,শনিবার

আজ ফোন করতে গিয়ে দেখি ব্যালান্স নেই। ফোনটা আর করা হল না। উজানকে বলেছিলাম, ভুলে গেছে হয়তো! সকালে দুধ আনতে যাবার সময় মোবাইলের দোকানটার দিকে তাকালাম, কিন্তু গেলাম না। থাক,কথা না বললেই বা ক্ষতি কি। আমার কথা বলা মানেই তো আবোল তাবোল গল্প, আমার তো কারোর সাথে কোনো কাজের কথা হয়না! উজানও বোধ হয় তাই বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। তা ভালোই করেছে।

বাড়ি ফেরার পথে আজ আরেকটা পরজীবীকে দেখলাম। গোয়ালা হারুর মাকে দেখলাম, বাছুরটার গায়ে কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কি যেন ফেলছে মাটিতে আর হারু সেগুলোকে ইঁট দিয়ে থেঁতলে থেঁতলে মারছে। আমি জিজ্ঞাসা করতেই হারুর মা বলল ‘ এঁটুলি গো এঁটুলি,বাছুরটার গা থেকে এঁটুলি ছাড়াচ্ছি। এগুলো না ছাড়ালে রক্ত শুষে গরুটাকে একেবারে শেষ করে দেবে গো’।

ফিরে আসার পর থেকেই বড় অস্থির লাগছে। একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে আমাকে। ধ্বংস , একটা পরজীবী শুধু ধ্বংসই করতে পারে,মহা আনন্দে শুষে নিতে পারে পোষোকের দেহের প্রাণশক্তি। সত্যিই উজান, উজানের মত আরও সব পোষোকরা কত মহান । ঘেন্না হচ্ছে, ঘেন্না হচ্ছে আমার নিজের এই এঁটুলি শরীরটার উপর।

নাহ্‌! আর শান্ত থাকতে পারছিনা,অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম বারান্দায়, উজানের ফেরার অপেক্ষায়।  আজ হয়তো আর বাড়ি ফিরবে না। কাল ওর জন্মদিন। কি দেব? কি দিতে পারে একটা এঁটুলি! আমি তো শুধু ধ্বংস দিতে পারি। আমার নিজের কিছুই নেই। জন্মটাও আমার নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল না, কিন্তু, একটা জিনিস কেবল আমার নিজের ‘মৃত্যু’। হ্যাঁ,এই বিশাল বিশ্বে ওই একটি জিনিসের নিয়ন্ত্রন ই আমার হাতে আছে, একান্তই আমার। আমি উজানকে একটা মৃত্যু উপহার দিতে পারি। একটা মৃত্যু ... একটা মুক্তি।



Comments
1 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.