Header Ads

Breaking News
recent

রুমকি রায় দত্ত

বিন্দুধামে বিন্দুবাসিনি ও আমরাঃ







পথে চলতে চলতেই দেখতে পাচ্ছিলাম পাহাড়ের অবয়ব,যেন মাথা তুলে তাকিয়ে আছে আমাদেরই পথ চেয়ে। সুউচ্চ পাহাড় একে বলা যায় না। পাহাড়ের একেবারে চূড়ায় রয়েছে বিন্দুবাসিনি মন্দির। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে যে পথ মন্দির পর্যন্ত গিয়েছে ওই পথে উপরে এসে দেখলাম মন্দিরের দরজা বন্ধ সামনে পর্দা ঝুলানো। অম্বুবাচী চলছে তাই মায়ের মুখ দর্শন করা যাবে না। আমরা ঘুরে ঘুরে মন্দিরের গায়ে অতুলনীয় শিল্পকর্ম দেখতে লাগলাম। বেলা একে একে মন্দিরের চার পাশে ভিড় বাড়তে লাগলো। মন্দির থেকে কিছুটা দূরে দেখলাম একটা বড় গাছের সমগ্র শরীর থেকে ঝুলে আছে লাল সুতোয় বাঁধা ঢিল। লোকে মনস্কামনা জানিয়ে বেঁধে গেছে, পূরণ হলে আবার এসে খুলে দিয়ে যাবে।

বিন্দুবাসিনি মন্দির আসলে হিন্দুদের একটি শক্তিপীঠ। এই মন্দিরে ত্রিদেবী মূর্তি পুজিত হয়। মহাদেবী দূর্গা,মহাদেবী লক্ষ্মী, মহাদেবী সরস্বতী ত্রিদেবী রূপে পুজিত হয়, যারা আদ্যাশক্তি মহামায়ার অভিন্ন অংশ।এই মন্দিরকে ঘিরে কিছু পৌরাণিক কাহিনি প্রচলিত আছে। এমনটা মনে করা হয় দেবী সতির তিন ফোঁটা রক্ত থেকে গড়ে উঠেছে এই মন্দির,তাই এখানে দেবী বিন্দুবাসিনি নামে পরিচিত আর মায়ের এই মন্দিরকে মাথায় ধারণ করে আছে বলে পাহাড়টার নাম হয় বিন্দুবাসিনি পাহাড়। অনেকে আবার একে বিন্দুধাম ও বলে। অতিপ্রাচীন এই মন্দিরটি একসময় তার প্রকৃত গুরুত্ব প্রায় হারাতেই বসেছিল। কিন্তু স্বামী হরিহরানন্দ গিরি,যিনি এই অঞ্চলে পাহাড়ি বাবা নামে পরিচিত তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মন্দিরটি আবার তার পুরানো গৌরব ফিরে পায়।

ছোটো থেকে অজানার প্রতি এক তীব্র আকর্ষন বোধ করতাম। কিন্তু তখনও পর্যন্ত আবিষ্কারের গন্ডি বাড়ির প্রাচিরের বাইরে যাওয়ার সুযোগ পাইনি। যা কিছু ছিল ওই বাগানের ঝোঁপে বা মাটির নিচে। মন্দিরের চারপাশ বেশ নির্জন। সবাই ঘুরে দেখতে, নিজেদের মধ্যে গল্প করতে ব্যস্ত তখন। হঠাৎ আমার চোখে পড়লো চাতালের ঠিক পাশদিয়ে ঝোঁপ-ঝাড় ঘেরা একটা সরু রাস্তা ঢাল বেয়ে নিচে নেমে গেছে। কাউকে কিছু না বলেই স্যারের হাত ধরে এগোতে লাগলাম সেই পথে,পথের শেষের খোঁজে। মনে তখন অদ্ভূত এক আনন্দ, যেন আমিই প্রথম ঐ পথটা আবিষ্কার করলাম। আশ্চর্য সৌন্দর্য সেই পথের, পাহাড়ি বনপথের নির্বাক নির্জনতায় কি যেন একটান, কি যেন একভাষা।

কিছুটা নিচে নামতেই দেখলাম একটা বড় গাছের নিচে ছড়ানো পুঁথির মত চকচকে ছোটো ছোটো ফল,যার কিছুটা লাল আর কিছুটা কালো। সামনে তাকিয়ে দেখলাম, এঁকেবেকে পথ মিশেছে আর একটা উঁচু টিলার পাদদেশে। দু’পাশের ঝোঁপে ছোটো ছোটো রঙিন জঙ্গল ফুল। মুঠোয় ভরতে লাগলাম তাদের আর এগিয়ে চললাম ঐ পথটার শেষে টিলার পাদদেশের দিকে। কেমন যেন একটা থ্রিল অনুভব হচ্ছে মনে। নিচে দাঁড়িয়ে ভাবছি, অভিযাত্রীদের মত পাহাড়ে উঠবো কিন্তু ততক্ষনে পিছনে বাড়ির সবাই এসে হাজির। অগত্যা পিছনের পথ হাঁটা। সূর্য তখন অস্তাচলের পথে। ফিরতে হবে সেই ট্রেনেই কারণ ফেরার সময় আর খালি ট্রাক পাওয়া সম্ভব নয়, তখন ফিরতি পথের প্রতিটি ট্রাকের পিঠে পাথারের বোঝা। আবার টাঙ্গায় চেপে স্টেশনে ফেরা। ট্রেন ফরাক্কা স্টেশনে ঢোকার ঠিক আগেই ক্ষণিক গতি রোধ করে যেন অলিখিত স্টপেজ। ট্রেনের গার্ড,ড্রাইভার সবাই জানে এপথেও কিছু নিত্যযাত্রী আছে এভাবেই ট্রেনথেকে লাফিয়ে নেমে মিশে যায় সড়কপথের সাথে, বেঁছে নেয় যে যার নিজের নিজের ঘরে ফেরার পথ। আমরাও সেই সব নিত্যযাত্রীদের সাথে সঙ্গী হয়ে পা বাড়ালাম ঘরের পথে।



১ম পর্ব পড়ুন







কোন মন্তব্য নেই:

সুচিন্তিত মতামত দিন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.