x

প্রকাশিত

​মহাকাল আর করোনাকাল পালতোলা নৌকায় চলেছে এনডেমিক থেকে এপিডেমিক হয়ে প্যানডেমিক বন্দরে। ওদিকে একাডেমিক জেটিতে অপেক্ষমান হাজার পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ।​ ​দীর্ঘ সাতমাসের এ যাপন চিত্র মা দুর্গার চালচিত্রে স্থান পাবে কিনা জানি না ! তবে ভুক্তভোগী মাত্রই জানে-

​'চ'য়ে - চালা উড়ে গেছে আমফানে / চ'য়ে - কতদিন হাঁড়ি চড়েনি উনুনে / চ'য়ে - লক্ষ্মী হলো চঞ্চলা / চ'য়ে - ধর্ষিতা চাঁদমনির দেহ,রাতারাতি পুড়িয়ে ফেলা।

​হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানুষটি লালমার্কার দিয়ে গোল গোল দাগ দেয় ক্যালেন্ডারের পাতায়, চোদ্দদিন যেন চোদ্দ বছর। হুটার বাজিয়ে শুনশান রাস্তায় ছুটে যায় পুলিশেরগাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স আর শববাহী অমর্ত্য রথ...। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেকটা জল, 'পতিত পাবনী গঙ্গে' হয়েছেন অচ্ছুৎ!

এ কোন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

সমীরণ চক্রবর্তী

শুক্রবার, নভেম্বর ২৫, ২০১৬

কোয়েলী ঘোষ

sobdermichil | নভেম্বর ২৫, ২০১৬ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
 অধিকার



খবর এসে পৌঁছল খুব ভোরবেলায় নার্সিংহোম থেকে। অসীম আর নেই । এই মৃত্যুর জন্য ছিল যেন অনন্ত কাল অপেক্ষা । তখন পুব আকাশে সূর্য উঠেছে । আকাশ জুড়ে এক প্রশান্তি ,মায়া। অনুরাধার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠছে । খুব ধীর গতিতে উঠে শাড়ি বদলাল যন্ত্রের মত । রাতের বাসী চুল হাতে ঠিক করে নিল। গৌতম ট্যাক্সি ডাকতে গিয়েছিল । যাবার আগে বাবাকে বলে গেছে -- নার্সিং হোম যেতে হবে বাবা । এ মৃত্যু আসবে জেনে কারও চোখে কোন জল নেই । 

বাইপাশের ধারে বিরাট নার্সিং হোম । তখন মশারির মধ্যে ঘুমিয়ে আছে অসীম । মুখে কোন যন্ত্রণা নেই । কাঁচের জানলা দিয়ে আলো এসে পড়েছে । দীর্ঘ দিনের লড়াই শেষ । ক্যান্সারের ক্ষত ছড়িয়ে পড়েছিল সারা শরীরে । কতবার বোম্বে ছোটাছুটি, কেমোথেরাপি তবুও কোন লাভ হলনা । বাবা পরম আদরে ছেলের মুখে হাত বুলিয়ে চলেছেন।

আচ্ছা -স্বর্ণালী কে ? নার্সের প্রশ্নে সম্বিৎ ফিরল । কাল সারা রাত শুধু ওই নাম করেছে । একবার দেখতে চাইছিল । আস্তে বলল - ' মেয়ে ' আর আপনি ? 'বৌদি ' -- অনেকবার এলেও এই নার্স তাকে চেনে না। উনার মিসেস কোথায় ? গৌতম বলল -- আসবে , খবর দেওয়া হয়েছে । 

করিডোর দিয়ে শ্বশুরমশাইকে নিয়ে অনুরাধা নার্সিংহোমের বাইরে এল । এখানে বসার জায়গা আছে , পাশেই দেবীমূর্তি । এখন কিছু চাইবার নেই কৃপা বা করুনা। আজ একবার সে হাতজোড় করে বলল -- মা , যদি পরজন্ম দাও তবে একটু ভালবাসা রেখ মা এই ছেলের জন্য।

এখন তিনঘণ্টা অপেক্ষা । সময় ,কাল ,স্রোত -- বয়ে যাচ্ছে নীরবে । দু চোখ বন্ধ করল অনু । কত যুগ আগে যেন সে বউ হয়ে এসেছিল এ বাড়িতে। শ্বশুরমশাই, শাশুড়িমা ছাড়াও দেওর ননদ সব মিলিয়ে ছজন মেম্বার। তখন কুড়ি বছর বয়স, কলেজে পড়তে পড়তে বিয়ে। সারাদিন কাজ, রান্নাবান্না, জলখাবার, ভাত করতে করতে বেলা ফুরিয়ে আসতো। তখন ছিল উনুন -কয়লা, ঘুঁটে, গুলপাকানো কত কাজ। গৌতমের অফিস, দেওর ননদের কলেজ সব নিয়ে হুলুস্থুল। নিজের পড়া, গান, কোনকিছুর আর সময় ছিল না। এরই মধ্যে এসে গেল তার মেয়ে। অসীম পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করত । বলত -- তুমি আমার মায়ের মত । খুব অস্বস্তি , এত বড় ছেলে পায়ে হাত দিলে। না বললে শাশুড়ি মা বলতেন -প্রনাম করতে দাও বৌমা । সম্পর্কে তুমি বড় ।

মনে পড়ছে - সেদিন বিয়ে অসীমের । কোন পণ, কোন উপহার কিচ্ছু নিল না সে। সব খরচ নিজের। নিজের হাতে সাজিয়ে দিয়েছিল রিনিকে । অথচ বিয়ের কদিনের মধ্যেই আলাদা। কিন্তু নিজেদের মধ্যে তা টিকিয়ে রাখতে পারল কই ? একটা সম্পর্ক ভালবাসায় বেঁধে রাখা যায় কিন্তু কোথাও একটা ভাঙন ধরল। সম্পর্কে ছিল না বিশ্বাস, আস্থা । বার বার সংসার ভাঙা, আলাদা হতে হতে একদিন জানা গেল, বিয়ের আগের কোন সম্পর্ক ছিল রিনির । বাচ্চা হতে গিয়ে আর ফিরল না সে । অনেকদিন অপেক্ষার পর অসীম শেষপর্যন্ত ডিভোর্সের কেস করল । এবার বেরোল্‌, রিনির আসল রুপ । বিশাল এক অঙ্কের টাকা দাবী করে বসল সে । যা কোনমতেই দেওয়া সম্ভব নয় । আইন যেমন আছে ,আইনের ফাঁক ফোঁকর আছে । তাই দিয়ে গলে যেতে লাগল সত্য আর জলের মত অর্থ ।

গেট দিয়ে রিনি ঢুকছে । সঙ্গে মেয়ে । কতবছর পর রিনিকে দেখল । বিশেষ পরিবর্তন হয়নি ,বরং আগের চেয়ে সুন্দর । তা হবে নাই বা কেন ? প্রতিমাসে মেয়েকে নিয়ে এসে টাকা নিয়ে গেছে । আদালতের রায় তাই ছিল, যতদিন ডিভোর্স হয়নি ভরণপোষণের সব দায়িত্ব অসীমের। এত বড় মেয়ে হয়ে গেল, কমলা রঙের চুড়িদার পরে বেশ সুন্দরী । অসীমের মতই দেখতে হয়েছে । হাতে পায়ে কালো নেলপালিশ । 

গৌতম ডাকল ওদের । অনু উঠে দাঁড়াল । শ্বশুরমশাইএর পাশে এসে বসল দুজনে। তিনি বললেন -- সব দিয়ে দেব । আমার ছেলেই তো চলে গেল । গৌতম ও সায় দিল -- হ্যাঁ সব -- ওর বাইপাশে কেনা ফ্ল্যাট । ব্যাঙ্কের যত টাকা । ওসব নিয়ে আমরা কি করব ? এবার রিনি মুখ হাতে ঢাকল আর বাবা যে হাত দিয়ে একটু আগে মরা ছেলের মুখে হাত বুলাচ্ছিলেন সেই হাত দিয়ে সেই বউএর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল ।

এই দৃশ্য অনু চোখে দেখতে পারছে না । এ এক বিরাট নাটক ! সে ছেলের মৃতদেহ এখনও তিনতলায় শুয়ে আছে ! যার জন্য -- যে একবার দেখতে এল না, মেয়েকে বাবার সাথে দেখা করতে দিল না সেই মেয়ে --

দমবন্ধ হয়ে আসছে --খুব কষ্ট হচ্ছে !

বৌদি শরীর খারাপ লাগছে ? বাড়ি যাবে ?  -- পিছনে খুড়শ্বশুরের ছেলে চন্দন । সত্যি শরীর এত খারাপ লাগছে । গৌতম বলল - চন্দনের গাড়িতে চলে যাও । আর থেকে কি হবে ? সত্যি ওর আর কি কাজ ! বউ , মেয়ে , বাড়ির আত্মীয় স্বজন সব এসে গেছে । 

গাড়িটা ছুটছে। চোখে মুখে ঠাণ্ডা বাতাস এসে লাগছে। যে ছেলেটার আজ হাসিমুখে বেঁচে থাকার কথা সে চলে গেল । জীবন এত ছোট । যে মেয়েটা সব পেল, নিজের অধিকার কড়ায় গণ্ডায় বুঝে পেল সে কি পেল আর কি হারাল ? জানে না শুধু কি মায়ায় এতক্ষণে চোখের কোল দিয়ে জলের ধারা নামল । 


Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.