x

প্রকাশিত

​মহাকাল আর করোনাকাল পালতোলা নৌকায় চলেছে এনডেমিক থেকে এপিডেমিক হয়ে প্যানডেমিক বন্দরে। ওদিকে একাডেমিক জেটিতে অপেক্ষমান হাজার পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ।​ ​দীর্ঘ সাতমাসের এ যাপন চিত্র মা দুর্গার চালচিত্রে স্থান পাবে কিনা জানি না ! তবে ভুক্তভোগী মাত্রই জানে-

​'চ'য়ে - চালা উড়ে গেছে আমফানে / চ'য়ে - কতদিন হাঁড়ি চড়েনি উনুনে / চ'য়ে - লক্ষ্মী হলো চঞ্চলা / চ'য়ে - ধর্ষিতা চাঁদমনির দেহ,রাতারাতি পুড়িয়ে ফেলা।

​হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানুষটি লালমার্কার দিয়ে গোল গোল দাগ দেয় ক্যালেন্ডারের পাতায়, চোদ্দদিন যেন চোদ্দ বছর। হুটার বাজিয়ে শুনশান রাস্তায় ছুটে যায় পুলিশেরগাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স আর শববাহী অমর্ত্য রথ...। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেকটা জল, 'পতিত পাবনী গঙ্গে' হয়েছেন অচ্ছুৎ!

এ কোন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

সমীরণ চক্রবর্তী

শুক্রবার, নভেম্বর ২৫, ২০১৬

দেবাঞ্জন ঘোষ

sobdermichil | নভেম্বর ২৫, ২০১৬ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
শেষ গদ্য








সবাই একসাথে হই-হই করে উঠল । দূর থেকেই হাতটা তুলেছিলেন শঙ্করীপ্রসাদ, কাছে এসে সুপ্রভাত জানালেন। " সাথে কে ছিল দাদা ? " আটা-চাকী দোকানের চাকীদা প্রশ্নটা ছুঁড়েই দিল। হাওড়া শহর , শঙ্করীপ্রসাদদের শহর। টেলিফোন ডাইরেক্টরীতে খোঁজ করলে তা বিলক্ষণ ঠাওর করা যায়। তবে এ শঙ্করীপ্রসাদ, এ বই এর বাইরে। প্রবাসী তিন দশক ধরে, শেষমেষ বাঁচার ইচ্ছে নিয়ে হাওড়া শহরে ফিরে এসেছেন। 

বোটানিকাল গার্ডেন, সময় পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ, সকাল। অক্ষয় ক্লাবে সবাই হাজির। অক্সিজেন ভর্ত্তি বাগানে সকলের কথাতেও অক্সিজেন। শঙ্করীপ্রসাদ মুখ খুললেন," ঐ ভদ্রমহিলা আজই প্রথম, ডাক্তারবাবুর নির্দেশে হাঁটা শুরু করলেন। ""আর দাদা একইসাথে আপনার সাহায্যও চাইলেন ? " চাকীদার কথায় একবার মৃদু হেসে, বললেন বিখ্যাত এই ব্যক্তি, " এতদিন উনি সকাল সকাল উঠে পুজোপাঠ নিয়ে থাকতেন, তাই একটু দ্বিধায় আছেন, ওদিকটাতে অবহেলা হয়ে গেল বোধহয়.....আর হ্যাঁ, একপাক ঘুরে এখানেই আসবেন, সকলের সাথে পরিচয় করতে, আমি বললাম ...... উত্তর আর সবাই দিলেও দিতে পারে ....। "" কি চাকীদা! তাহলে সবাইকে যেমন বোঝান চাকীর আটাই উত্তম যে কোন প্যাকড আটার থেকে.....আমাদের মধ্যে আপনিই সাত সকালে হাঁটার উপকারিতা...." বলতে বলতে ফিক ফিক করে হেসে উঠল বিলেত ফেরৎ, নবীন, ডাক্তার দেবাশীষ চক্রবর্ত্তী।

দোকানের চাবির গোছখানা এক আঙ্গুলে সবে এক পাক ঘুরিয়ে সটাং থামিয়ে দিলেন চাকীদা, " আপনি থাকতে আমি ! " এবার মুখ খুললেন ইংরাজীর শিক্ষক মানব মুখোপাধ্যায় " দেখ চাকী তুমি সবসময় ঘূর্নায়মান স্ট্যাটাস প্রত্যক্ষ কর, তার জীবনেও যে স্পিনটা এসেছে তোমার চাইতে কে ভাল বোঝাতে পারবে? " কানে কথাটা যেতেই এক পাক ঘুরতে ঘুরতে বোটানিকালের বোটানিক্সটাকে মাথায় করে চাকীদা চোখ মেলালেন মানব স্যারের চোখে, " এত গাছের সালোকসংশ্লেস থেমে যাবে স্যার, সায়েন্স সময়কে পিছন দিকে নিয়ে যাবে, ঘোর অন্ধকারে, আমি যদি বোঝাতে শুরু করি, এতে করে গম উৎপন্ন বন্ধ হয়ে যাবে, আমার চাকী আর ঘুরবে না ... " থামিয়ে দিল সত্যজিত , " আপনার নয় দাদা...গমকলের বলুন ", " আরে ঐ হল , ইউনিভার্সের বল তার চেয়ে... । " " কিন্তু উত্তর দেবে কে ? অবশ্য যদি উনি জানতে চান ? চাকীদা নিশ্চই করে একটু রিল্যাকসড, না কি ? " শঙ্করীপ্রসাদ নজর করলেন, মহিলা তাদের দিকেই ক্রমশ এগিয়ে আসছেন। 

সকল মানুষের সকাল সকাল নাটকের প্রথম অঙ্ক নিজের নিজের মত হলে খুব ভাল হয়। বোটানিকাল গার্ডেন সেরকম এক মঞ্চ, প্রান খুলে হাসা - কাঁদা, শেয়ার করা, চনমনে হয়ে ওঠার বাগান। প্রকৃতি, উদ্ভিদ ও প্রানীর মনের মিলন ক্ষেত্র। কিন্তু এক পাক একা-একা ঘুরে, প্রথমদিন, শঙ্করীপ্রসাদের আমন্ত্রনই সরস্বতীকে এক-পা, এক- পা করে এগিয়ে দিল শঙ্করীপ্রসাদদেরই দিকে। নিজের মত করে দিনটা শুরু করতে পারেনি সরস্বতী, জীবন ও জীবিকার মাঝে একা একাই দাঁড়িয়ে আছে অনেককটা বছর। 

কাছাকাছি এসে হাত তুলে নমষ্কার করলেন সবার উদ্দেশ্যে, কথাও বললেন নিজে থেকেই, " ওনার সাথে আলাপ হয়েছে, আপনাদের সাথে আলাপ করতে এলাম। " আরও কিছু বলার ছিল তার, তার আগেই মানব স্যার থামিয়ে দিলেন, " হাঁটবেন , প্রতিদিন হাঁটবেন, এই সময়েই , দেখবেন আমাদের মত অভ্যাস হয়ে যাবে " সাজেশন না দিয়ে আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। " রাত্রে রুটিই উত্তম খাবার, ভাত ব্যাপারটাকেই দুরে রাখবেন, হাঁটা থামানোর প্রশ্নই উঠবে না। " কার কি প্রশ্ন, আর কে কি উত্তর দিচ্ছে। চাকীদাকে থামাতে বাধ্য হলেন শঙ্করীপ্রসাদ, খবরের কাগজ থেকে চোখ সরাতে একপ্রকার বাধ্যই হলেন, " হাঁটার জন্যই তো ওনার আসা এখানে, সময়টা ওনাকে ভাবাচ্ছে। " " হ্যাঁ , হ্যাঁ , সময়টা আমাকে একটু চিন্তায় ফেলেছে, সকাল সাতটায় আমাকে কাজে বেরিয়ে পড়তে হয়, সন্ধ্যে সাতটায় ফেরা। লোহা ঢালাই ঘরে আমার স্বামীর মোল্ডিং লেবার কন্ট্রাক্ট এর ব্যবসা। ওনার জায়গাটা এখন আমাকেই সামলাতে হয়। " এই কথাটা যেন ভোরবেলায় বলা হয়নি সরস্বতীর , শঙ্করীপ্রসাদকেও ভাবাল। " বালিতে ছাঁচ তৈরী করে , গরম গালা লোহা দৌড় করিয়ে নতুন নতুন মালের জন্ম। খিস্তি - খেউড়ের বন্ধু সব। একটু ভুল..মানে ভুল, হয় বাতিল তো না হয় মুখ লোকান। চিন্তা ধরানো দিন পার করা। ভারতবর্ষের চারদিক থেকে লোকে দৌড়ে আসে, একেবারে রে রে করে, কত ক্ষতিই না তাদের হয়ে গেল, আমাদের ক্ষতিটা কারুর চোখেই পড়ে না। স্বামীর ব্যবসায় অন্যের খিস্তি খেয়ে কাজ শিখলাম.... নেশা ধরে গেল। অনেক রোগও বাসা বাঁধল। "

সরস্বতী একবার পাঁচিলের বাইরের দিকটা তাকাল। " ঐ কলেজের ছেলে-মেয়েরা মালের রোগ দেখতে যায়। ওরাই আমার রোগ দেখতে পেল...তারপর ডাক্তারখানা, আর এই হাঁটতে বেরোন। " অক্ষয়তৃতীয়াতে যে ক্লাবের বার্ষিক পুজো হয় , তার সব সদস্য এই মুহূর্তে হতভম্ভ, তবে শঙ্করীপ্রসাদ একটু হলেও বেশী....ভোরের আলোয় কেমন দেখেছিলেন বা এখন কেমন দেখছেন.....ভোরের শোনা কথাগুলোতেই তাঁকে একটু অন্যরকম লেগেছিল। এখন সামান্যতেই হাঁপিয়ে যান শঙ্করীপ্রসাদ, একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল, সাথে স্বগোতক্তি, " শিল্প অক্ষয় হোক। " জীবনের শেষ প্রান্তে এসে শৈল্পিক মনটা দিয়ে শিল্পীকে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলেন। শিল্পীর জীবনটা আরএকটু কাটাছেঁড়া করতে মন চাইল , " তাহলে আপনার স্বামী..... ।" কথাটা শেষ হতে দিল না সরস্বতী, " দিনটা শনিবার ছিল , ঢালাই চলছিল , আমাদের ফ্লোরে একটা বড় মালের ঢালাই ছিল, হাজার কেজি , ছাঁচের কাছে বড় ডাবুটা, কিউপোলা ফার্নেসের ঝর্না থেকে পঁচাত্তর কেজি ডাবু করে মাল আনা চলছিল..ডাবুর দৌড়ে উনিও ছিলেন..তবে পেছন দিকে..ঝর্নার কাছ থেকে দৌড় শুরু করেছিলেন ..কিছুটা গিয়েই ডাবুর তলাটা ফেঁসে গেল..গালা মাল পড়ল..ওনার দৌড়ের পা পড়ল তাতে..বেলচা করে কোনমতে পড়ে যাওয়া পোড়া শরীরটা উদ্ধার হয়েছিল..শেষে কাটাছেঁড়া শরীরটা বাড়ি ফিরল........."

" অনেক গল্প , সময় নষ্ট করে কত আর শুনবেন ? ভীতু মনটা আমাকে ছেড়ে পালায়নি কোনদিনের জন্য। তাইতো ভোরে উঠে পুজো করে দিন শুরু করতাম , ডাবুতেও খুব যত্ন করে মাটি লেপি, ছেলেগুলোর যাতেকরে কোন বিপদ না হয়। " এবার শঙ্করীপ্রসাদের চোখ গেল নিজের কলেজের দিকে...' IIEST ' ... শিল্প সন্ধানের শুরু যেখানে , শিল্পীর সন্ধানও ........ । প্রবাসে থেকেও সরস্বতীর আরাধনা থেকে নিজেকে সরাননি, কত বই লিখেছেন তার কোন হিসেব নেই, কত মানুষকে লেখা লিখতে সাহায্য করেছেন , এ সাধনাও প্র্যাকটিক্যাল । পৈতৃক ভিটেতে পচানব্বই বছরের পুরোনো সরস্বতী বন্দনা , ফেলে আসা চল্লিশ বছরে চারবারই যেতে পেরেছেন , যার সামনে হাতেখড়ি দেওয়া , Practical আক্ষেপটা Practical সরস্বতীকে দর্শন করে নিজের আরাধনার কথা মনে পড়ে গেল। কিন্তু স্বয়ং , আরাধ্যা দেবী চাইছেন আরাধনা করতে , তার কি হবে ? সবাই চুপ। যেন শঙ্করীপ্রসাদই উত্তর করবেন , অতীতে অনেক সমস্যায় তাই হয়েছে। অগত্যা শঙ্করী আজ সময় চাইলেন.......

" আপনাকে কাল না হয় জানাব। "
" আগামীকালতো আমার আসা হবে না। "
" কেন ? "

" আজ কারখানায় রক্ষা কালী মায়ের পুজো। সেই থাকতে শুরু হয়েছিল, বাবু কোনকিছুতেই বাধা দেন না। সবাই আনন্দ করে, খুব আনন্দ...সব পাতে রাধাবল্লভী, আরও কত কি। এক রাতের পুজো। ভোরের আগেই বিসর্জন। বাবুর ছেলেরা সারা রাত থাকেন , বিসর্জনের পথে ওনারাও নাচেন, আমিও, রাত-ভোরের অন্ধকারে বাঁধাঘাটে বিসর্জন হয়। আজকের রাতটা.....আমার । পাড়া , প্রতিবেশী , বাড়ি আর কোন কথা বলে না । ছেলে যায় আনতে, বাড়ি ফিরে পুজোয় বসি। "

" ও আচ্ছা ? তাহলে আবার পরশু ? "
" চেষ্টা করব। "

বোটানিকাল গার্ডেনের এই ট্রাডিশনই বহাল, প্রতি চরিত্রের কাছে । যে যার পরিধিতে পাক খায়। একে একে সেই পথে পা বাড়ালেন সক্কলে। 

শঙ্করীপ্রসাদের কাছে অক্ষয় উত্তর আছে কিনা কারুর জানা নেই। প্রাচীন বটগাছটার কাছে এসে তিনি থামলেন। গতরাতে খাবার টেবিলে পুত্র অর্নিবান বলছিল, " পত্রিকা থেকে সম্পাদক কাকু ফোন করেছিলেন। আমি নাকি তোমাকে রাইটিং প্যাড কিনে দিচ্ছি না বলে উনি লেখা পাচ্ছেন না ............ । " ধীরে ধীরে সেলুলার ফোনটা বার করে নম্বর ডায়াল করলেন ,....

" দাদা আমি জানতাম আপনার ফোন পাবই পাব। "
" নিজের অধিকারে এবার নিজেকে লেখা থেকে সরিয়ে নিলাম , গল্প শোনার পালা ভায়া , গল্প বলার মানুষ খুঁজে পেয়েছি ..... । "
" দাদা ! কি বলছেন দাদা ? আমার কোন অপরাধ...... ? "
" কি বলছ ভায়া , কারুর অধিকারে কোনই অপরাধ নেই , তোমার এ অধিকার আছে শিল্প সন্ধানের , শিল্পীর সন্ধানও তুমি পেয়ে যাবে। "

এদিকের গেটটা থেকে কারুর জোর গলার আওয়াজ কানে এল, চাকীদা দৌড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, কান থেকে যন্ত্রটা নামালেন, চিৎকার ভেসে আসছে , " দাদা আমি চললাম, গত রাতে চাকীটা জ্যাম হয়ে গেছে, পরশুর কথাটা মাথায় রাখবেন দাদা.....আমি চললাম। " শঙ্করীরও অপেক্ষার শুরু , আর এইটুকু বিদ্যে তার আছে ...বন্দনা সঠিক হলে সরস্বতীরও প্রসাদ থেকে তিনি বঞ্চিত হবেন না। 



Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.