x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

শুক্রবার, নভেম্বর ২৫, ২০১৬

বিদিশা চক্রবর্তী

sobdermichil | নভেম্বর ২৫, ২০১৬ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
মায়ানমারের গল্প






ধর্মের ধ্বজাধারী কিছু বিড়ালতপস্বী যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন এসবই স্বাভাবিক নয় কি? যেমন ইসলামের ভেকধারী কিছু স্বার্থান্বেষী দুনিয়াতে ইসলাম ছাড়া কোনো ধর্মকে টিঁকতে দেবে না বলে স্থির করেছে, তেমনি মায়ানমারের বৌদ্ধ ভেকধারী স্বার্থান্বেষীরা মায়ানমারের কি শুধু বৌদ্ধ রাজত্ব কায়েম করতে চায়?  আর আমরা শুধু দাড়িওয়ালা দুষ্টু, টুপিওয়ালা দুষ্টু বলে চেঁচিয়ে মরি!! 

মায়ানমারের গল্প
মায়ানমারের রাজধানী হল 'নেপিদ'। অনেকে ইয়াংগুন কে মায়ানমারের রাজধানী বলে মনে করে। কিন্তু ইয়াংগুন হল মায়ানমারের বৃহত্তম শহর। ৮৪৮-১২৮৭খ্রী: পর্যন্ত এখানে প্যাগান সাম্রাজ্য ছিল, তারপর ১৪৮৬-১৭৫২খ্রী: পর্যন্ত তৌঙ্গু রাজবংশ এবং ১৭৫৩-১৮৮৫ খ্রী: পর্যন্ত কোনবাউং রাজবংশ রাজত্ব করে। ১৯৪৮ সালের ৪ই জানুয়ারি মায়ানমার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি পায়।২০১০ সালের ২১এ অক্টোবর দেশটির জাতীয় সংগীত ও নতুন জাতীয় পতাকা প্রবর্তন করা হয়।

বর্ত্তমানে মায়ানমারে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা (officially) প্রচলিত আছে। রাষ্ট্রপতি থেইন কিয়াও এবং উপরাষ্ট্রপতি সাঁই মাউক খাঁ। ২০১৫ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী মায়ানমারের জনসংখ্যা ৬০০৭৭৬৮৯ (প্রায়)। মায়ানমারের মুদ্রার নাম ক্যত। এখানকার প্রধান ভাষা বর্মী। মায়ানমারের প্রাচীন নাম ব্রহ্মদেশ।দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই রাষ্ট্র টির বর্তমান আনুষ্ঠানিক নাম হল 'মায়ানমার প্রজাতন্ত্র'।

মায়ানমার এর মোট আয়তন ৬৭৬,৫৫২ বর্গ কিমি(প্রায়)। উত্তর দক্ষিণে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২০৮৫ কিমি। পূর্ব পশ্চিমে এর এর সর্বোচ্চ বিস্তার প্রায় ৯০০ কিমি। উপকূলীয় এলাকাটি নিম্ন মায়ানমার এবং আভ্যন্তরীণ অংশটি উর্ধ মায়ানমার নামে পরিচিত। দেশটির প্রধান ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য হল অশ্বখুরাকৃতি পর্বতসজ্জা এবং ইরাবতী নদীর উপত্যকা। উত্তরের( অর্থাৎ উর্দ্ধাংশের) পর্বতগুলির সর্বোচ্চ শৃঙ্গ 'হকাকাবো রাজি' যার উচ্চতা ৫,৮৮১মিটার (প্রায়)। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।

'হোকাকাবো রাজি' ছাড়াও আরো দুইটি পর্বতমালা উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত। আরাকান ইয়োমা পর্বতমালাটি মায়ানমার ও ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে একটি প্রাচীরের সৃষ্টি করেছে। মায়ানমার এর পশ্চিমে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগ এবং ভারতের মিজোরাম। উত্তর-পশ্চিমে ভারতের আসাম,নাগাল্যান্ড ও মণিপুর অবস্থিত। মায়ানমারের সীমানার উত্তর-পূর্বাংশের ২,১৮৫ কিমি জুড়ে আছে তিব্বত ও চীনের ইউনান প্রদেশ। দক্ষিণ পূর্বে রয়েছে লাওস ও থাইল্যান্ড। দক্ষিণ-পশ্চিম এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং আন্দামান সাগরের সাথে মায়ানমার এর প্রায় ১,৯৩০ কিমি উপকূল রেখা রয়েছে। 

প্রায় ১৩ হাজার বছর আগে বর্তমান মায়ানমারে জনবসতির অবস্থান ছিল বলে মনে করা হয়। পিউ নামের উপজাতিরা ১ম শতকে বার্মা এলাকাতে দক্ষিণ দিকের ইরাবতী ভ্যালী দিয়ে প্রবেশ করে। অপর দিকে উত্তর দিক দিয়ে মুন জাতি প্রবেশ করে। ৯ম শতকে মিরানমা জাতি ইরাবতী উপত্যকার উপরে বসবাস শুরু করে।

১৩ শতকের দিকে মায়ানমারে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন রাজ্য সৃস্টি হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: আভা, আরাকান, হানথাবতী প্রভৃতি। টউনগু সাম্রাজ্য প্রথম ১৫শ শতকে বার্মাকে একত্রীকরণ করে। ১৮শ শতকে ব্রিটিশরা বার্মা দখল করে নেয়। ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৬২ সালে দেশটিতে প্রথম সামরিক সরকার ক্ষমতায় অসীন হয়।

খ্রীস্টপূর্ব প্রথম শতকে পিউদের আগমন ঘটে। খ্রীস্টিয় অষ্টম শতকে তারা নানঝাও রাজ্যের আক্রমণের শিকার হয়। খ্রীস্টিয় নবম শতকের পূর্বে কোনসময়ে বর্মীরা বর্তমান তিব্বত থেকে ইরাওয়াদি উপত্যকায় আসা শুরু করে। ৮৪৯ সালের মধ্যে তারা প্যাগানকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী রাজ্য গড়ে তোলে যা একসময় বর্তমান মায়ানমারের প্রায় সম্পূর্ণ এলাকাজুড়ে বিস্তার লাভ করে। ১১০০ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহৎ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষাংশে কুবলাই খান প্যাগান রাজ্য দখল করেন। ১৩৬৪ সালে বর্মীরা তাদের রাজত্ব পুনরুদ্ধার করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিয়ানমারে জাপানিদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি। রেঙ্গুন তথা বার্মা ১৯৪২-৪৫ খ্রীঃ পর্যন্ত সময়ে জাপানিদের দখলে ছিল। জাপানিদের তত্ত্বাবধানেই তৈরি হয়েছিল বার্মা ইনডিপেনডেন্ট আর্মি।

মায়ানমারের বৃহত্তম শহর রেঙ্গুন এর নামটি ১৯৮৯ সালে সামরিক শাসকেরা পরিবর্তন করে রাখেন ইয়াঙ্গুন। ২০০৫ সালের নভেম্বরে ইয়াঙ্গুন দেশের রাজধানীর মর্যাদা হারায়। বর্তমানে বার্মা বা মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুন থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে অত্যন্ত পরিকল্পিত নতুন শহর নাইপেডুতে। সুদীর্ঘ সামরিক শাসনের ইতি ঘটিয়ে ২০১৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে গণতান্ত্রিক সরকার চালু হয়েছে।

মায়ানমারের গল্পএবার রোহিঙ্গা দের গল্প। রোহিংগা আদিবাসী জনগোষ্ঠী পশ্চিম মায়ানমার এর রাখাইন প্রদেশের একটি উল্লেখযোগ্য নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। এরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত। রোহিংগাদের আলাদা ভাষা থাকলেও তা অলিখিত অর্থাৎ সরকারী বেসরকারী কোনো জায়গাতেই রোহিংগা ভাষার উল্লেখ নেই। বর্তমান মিয়ানমারের রোহিং (আরাকানের পুরনো নাম), বুথিডং(ওরা বুদ্ধিডং বলে), আকিয়াব, মংডু, কিয়ক্টাও, মাম্ব্রা, পাত্তরকিল্লা এলাকায় রোহিংগা জনগোষ্ঠীর বসবাস। ইতিহাস ও ভূগোল বলছে, রাখাইন প্রদেশের উত্তর অংশে বাঙালি, পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। তাদের কথ্য ভাষায় চট্টগ্রামের স্থানীয় উচ্চারণের প্রভাব রয়েছে। উর্দু, হিন্দি, আরবি শব্দও প্রচুর রয়েছে। খুব কান করে শুনলে কিছু কিছু বাংলা শব্দ ও পাওয়া যায়। ওরা স্বামীকে বলে 'জামাই', ভাড়া বা ট্যাক্স কে বলে 'টিয়াঁ'। কিছু রোহিঙ্গাকে খুব কাছ থেকে দেখার এবং পরিচয় হওয়ায় তাদের ছোট ছোট বিষয় গুলি লক্ষ্য করার সুযোগ হয়েছে। আর একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি, মেয়েরা বিয়ের আগে অর্থাৎ কুমারী অবস্থায় 'বেগম' আর বিয়ের পর 'খাতুন' সারনেম ব্যাবহার করে। বাঙালী মুসলিমদের ঠিক উল্টো। মেয়েরা ছেলেদের মতই কোমরে গিঁট দিয়ে লুঙ্গি পড়ে (লুঙ্গিগুলো ছেলেদের মত নয়, কিছুটা মেয়েদের লং স্কার্ট এর মত), উপরে সালোয়ার এর আপার টা পড়ে, কেউ সালোয়ার কামিজ ই পড়ে। আর ছেলেরা লুঙ্গি, প্যান্ট-শার্ট সবই পড়ে।

রাখাইনে দুটি সম্প্রদায়ের বসবাস ‘মগ’ ও ‘রোহিঙ্গা’। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মগের মুল্লুক কথাটি বাংলাদেশে পরিচিত। দস্যুবৃত্তির কারণেই এমন নাম হয়েছে সম্ভবত। ইতিহাস বলে় যে, ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহিঙ্গা স্বাধীন রাজ্য ছিল। মিয়ানমারের রাজা বোদাওফায়া এ রাজ্য দখল করার পর বৌদ্ধ আধিপত্য শুরু হয়। 

এক সময়ে ব্রিটিশদের দখলে আসে এ ভূখণ্ড। তারা মিয়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করে। কিন্তু তার মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এই ভুল ইচ্ছাকৃত কিনা সেটা একটা বড় প্রশ্ন।

১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করলে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়। সে সময়ে পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। এই জনগোষ্ঠীর কয়েকজন পদস্থ সরকারি দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়।

সামরিক অভ্যুত্থানের পর সামরিক জান্তা তাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার করা হতে থাকে। নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া হয়। হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা। সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়। 

বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতে থাকে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ নেই। বিয়ে করার অনুমতি নেই। বিয়ে করতে গেলে ট্যাক্স দিতে হয়। যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় দেড় থেকে দু লক্ষ টাকা। স্ত্রী মারা গেলে তিন বছর কাল একজন রোহিঙ্গা কে অপেক্ষা করতে হয় দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য। সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ। এমনকি গৃহপালিত পশুর বাচ্চা হলে তাদের ও ট্যাক্স দিয়ে সরকারী খাতায় নিবন্ধন করতে হয়।

মায়ানমারের গল্পপ্রতিনিয়ত বাড়ি বাড়ি সরকারী কর্মচারী এসে নথিভুক্ত নাম মিলিয়ে নেন। কেউ বাড়িতে সে সময় অনুপস্থিত থাকলে তার নাম কাটা পড়ে যায়। অর্থাৎ বাড়ির বাইরে থাকা সেই ব্যক্তিটি সরকারি হিসাব মোতাবেক মৃত অথবা বহিরাগত হয়ে গেল। কেউ বাইরে কাজ করতে গেলে তার রোজগার এর সিংহভাগ ক্যাম্পে ক্যাম্পে ট্যাক্স দিতে দিতেই শেষ হয়ে যায়। অল্পসল্প দূরত্বে কোথাও কাজে গেলেও ট্যাক্স দিতে হয়। 

মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার না করায় সকল প্রকার নাগরিক ও মৌলিক সুবিধা হতে বঞ্চিত রোহিঙ্গারা। মায়ানমারে ভ্রমণ, শিক্ষা, চিকিৎসার জন্য পরিচয় পত্র থাকাটা খু্ব জরুরি বিষয়। কিন্তু মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের পরিচয় পত্র ইস্যু করে না, ফলে, এমনিতেই পিছিয়ে পড়া রোহিঙ্গারা আরো পিছিয়ে পড়ছে।

সব দেশেই নাগরিক দের জন্য পরিচয়পত্র থাকে। কিন্তু সেগুলো সবসময় সংগে না নিয়ে গেলেও চলে। কিন্তু মায়ানমারে সবসময় পরিচয়পত্র ধরনের কিছু নির্দিষ্ট নথি সংগে রাখা বাধ্যতামূলক। আবার যে কোনো মূহুর্তে সেগুলো কেড়ে নিয়ে তাদের বহিরাগত বানিয়ে দেওয়া হয়।

মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের অনেকের কাছেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী 'কালা' নামে পরিচিত। বাঙালিদেরও তারা 'কালা' বলে। ভারতীয়দেরও একই পরিচিতি। এ পরিচয়ে প্রকাশ পায় সীমাহীন ঘৃণা।

মায়ানমার সরকারের ভূমি ও সম্পত্তি আইন অনুসারে বিদেশীরা কোন সম্পত্তি ও ভূমি মালিক হতে পারে না। রোহিঙ্গারা মায়ানমার সরকারের দৃষ্টিতে অবৈধ অভিবাসী তথা, বিদেশী। তাই, রোহিঙ্গারা কোন ভূমি বা, স্থায়ী সম্পত্তির মালিক হতে পারে না। বর্তমানে যেসকল ভূমিতে রোহিঙ্গারা বসবাস করছে, মায়ানমার সরকার যেকোন মুহুর্তে সেগুলো দখল করে নিতে পারে।

মায়ানমার সরকার আইনের মাধ্যমে রীতিমত অসহনীয় করে তুলেছে রোহিঙ্গাদের জীবন। রোহিঙ্গারা সরকারী চাকুরী করতে পারে না, সরকারী কোন দপ্তরে রোহিঙ্গা কোন পরিষেবা পায় না, ব্যাংকে লেনদেন করতে পারে না, সরকারী চিকিৎসা কেন্দ্রের সেবা গ্রহণ করতে পারে না,পরিষেবা পাওয়ার (বিদ্যুৎ, পানীয় জল, জ্বালানী) জন্য আবেদন করতে পারে না, স্বপরিচয়ে শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে ভর্তি হতে পারে না। প্রায় ৮০% রোহিঙ্গা বাস্তবিক অর্থে অশিক্ষিত।

প্রায়ই মায়ানমার সরকার কর্তৃক রোহিঙ্গা নিপীড়ণের খবর পাওয়া যায়। রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক শ্রমিক হিসেবে খাটানো হয়। প্রায়শই স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন লোকালয়ে হানা দেয়। শহরের সৌন্দর্য্য বর্ধন, সরকারী জমি অধিগ্রহণের নামে রোহিঙ্গাদের অনেকগুলো মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়। এর মধ্যে প্রাচীন কিছু মসজিদও আছে। অনেক রোহিঙ্গাদের ব্যবসা দখল/বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য 'গ্যাটো' এর ব্যবস্থা করেছে। রোহিঙ্গাদের জন্য বেশ কয়েকটি বিশেষ বসবাসের স্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা থেকে ওরা অনুমতি ছাড়া বের হতে পারে না। সেই গ্যাটোগুলোর ভিতরে আবদ্ধ মানবেতর জীবনযাপন করে রোহিঙ্গারা। চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য পরিষেবার ব্যবস্থা এই গ্যাটোগুলোতে থাকলেও, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ও নিম্নমানের।

মায়ানমারের গল্প
রোহিঙ্গাদের বিয়ে করার জন্যও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি লাগে। এছাড়া দুটোর বেশি সন্তান নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রশাসনের অনুমতি না নিয়ে বিয়ে করায় ও দুটির বেশি সন্তানের জন্ম দেওয়ায় রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। যেসব পরিবারের সন্তানরা সরকারের 'গ্যাটো ব্যবস্থা' তালিকাভুক্ত নয় তাদের জীবন রীতিমত দূর্বিসহ। এরা গ্যাটোগুলোতে থাকতে পারে না।

আবার গ্যাটোর বাইরেও থাকতে পারে না, কারণ মায়ানমারের নাগরিক নয় ওরা। অবস্থাটা ওদের এমন যে, মায়ানমার সরকার ওদের কোন অস্তিত্বই স্বীকার করে না। এইসব পরিচয়হীন রোহিঙ্গারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারত, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের পথে পা বাড়ায়। নৌপথে সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে অসংখ্য রোহিঙ্গা ডুবে মারা গেছে।

রোহিঙ্গাদের প্রতি যা করছে মায়ানমার সরকার, তা সমগ্র মানবতার বিরুদ্ধেই অপরাধ। এক হাজার বছরের বেশি সময় ধরে আরাকানে বিকশিত হতে থাকা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সুবিধা না দেয়া, গ্যাটো সৃষ্টি করে সেখানে অমানবিক পরিবেশে থাকতে বাধ্য করা, জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োগ করা, বিচারবর্হিভূতভাবে গ্রেফতার করা, মালিকানাস্বত্ব, সার্বজনীন শিক্ষা, চিকিৎসা, উপযোগ সেবা ও মৌলিক মানবাধিকার হতে বঞ্চিত করার মাধ্যমে নির্মমতার শেষ সীমানাটুকু অতিক্রম করেছে মায়ানমার সরকার। 

মায়ানমার সরকারের নিপীড়নের সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে রাখাইনসহ অন্যান্য বৌদ্ধ আরাকানীদের উস্কানি দিচ্ছে মায়ানমার সরকার যা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বে বৌদ্ধ মৌলবাদকে সরাসরি ইন্ধন ও মদত যোগাচ্ছে। 

১৯৯১-৯২ সালে আড়াই লক্ষাধিক মুসলিম রোহিঙ্গা শরণার্থী মায়ানমারের সামরিক জান্তার নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তাদের অনেকেই বিশ বছর যাবৎ বাংলাদেশে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ সরকার তাদেরকে দু'টি ভাগে ভাগ করেছে। শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থানকারী স্বীকৃত রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের সাথে মিশে যাওয়া অস্বীকৃত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী রয়েছে। কক্সবাজারের নয়াপাড়া এবং কুতুপালং এলাকার দু'টি ক্যাম্পে প্রায় ত্রিশ হাজার রোহিঙ্গা বাস করছে।

আরাকান রাজ্য থেকে গত কয়েক মাসে রোহিঙ্গাদের উপর ব্যাপক নির্যাতনের ফলে তাদের বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে।

প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গারা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসছে সীমান্তে। কিছু খাচ্ছে গুলি, কিছুদেরকে বাংলাদেশ সরকার পুশব্যাক করে ফেরৎ পাঠাচ্ছে। আবার কিছু শিক্ষিত মানুষ রোহিংগাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছে। কিন্তু সীমান্ত খুলে দেওয়াতেই কি সব সমস্যা মিটে যায়? সেই দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থার উপর এটা কি অযাচিত চাপ নয়? কেন হাজার বছর ধরে বিকশিত এক জনগোষ্ঠী 'নিজভূমে পরবাসী'? এর উত্তর কে দেবে? 

সমস্যার গোড়ায় না গেলে কোনো সমস্যারই সমাধান সম্ভব নয়। মূল সমস্যা ভাসমান শরণার্থী বা অবৈধ অভিবাসী নয়। মূল সমস্যা রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমারের সামরিক জান্তার চরম অমানবিক, অযৌক্তিক মনোভাব ও আচরণ। জান্তা যদি এই রোহিঙ্গাদের নিজ দেশের নাগরিকের মর্যাদা দিত, তাহলে এ সমস্যারই উদ্ভব হতো না। যারা সাগরে ভাসছে অথবা ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ রোহিঙ্গা। অন্যরা বাংলাদেশি হতে পারে। তারা অনেকেই বৈধ পথে অন্য দেশে যেতে পারত। তাদের অসচেতনতা অথবা মানবপাচারকারী দালালদের খপ্পরে পড়ে বর্তমানে তাদের মানবেতর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। এই অপকর্মে যেমন জড়িত আছে বাংলাদেশিরা, তেমনি জড়িত আছে মিয়ানমার আর থাইল্যান্ডের মানবপাচারকারীরা। 

বিশ্ব মুরব্বিরা এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য যদি মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এ অঞ্চলে ভয়াবহ জঙ্গিবাদের উত্থান অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে আর তাতে গোটা বিশ্বের শান্তি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। সময় থাকতে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সদিচ্ছার পরিচয় দিতে হবে। আমরা কেউ দ্বিতীয় পাকিস্তান চাইনা, চাইনা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। দেখতে চাই না সংবাদপত্রে প্রকাশিত সমূলে উৎপাটিত শৈশব, কোনো শিশুর রুগ্ন করুণ মুখ। 

মানবতার এতবড় অপমান বুঝি সারা পৃথিবীতেই বিরল। কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে সমকামীদের পক্ষে বিশ্বের অনেকে গণস্বাক্ষর করেছিলেন। যে কোনো ব্যাপারেই মোমবাতি মিছিল আর নগ্ন হয়ে প্রতিবাদ তো এখন আকছার চোখে পড়ে। আর রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সেই তাঁদের মৌনব্রত একটি গর্হিত অপরাধ নয় কি? 



Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.