x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

শুক্রবার, নভেম্বর ২৫, ২০১৬

অম্লান রায় চৌধূরী

sobdermichil | নভেম্বর ২৫, ২০১৬ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
অবেদ্য









মিতুনদের বাড়ীটা একটু গলির ভিতরে । মানে এক কানা গলির একদম শেষে । গলির শেষ প্রান্তে এক উঁচু পাঁচিল, বেশ ঊঁচু , তার পরে যে বাড়ীটা সেটার সামনের দিকটা মিতুনদের বাড়ী থেকে দেখা যায়না । একদম গেটের সামনেই যে বাড়ীটার পিছন দিক -সেখানে কিছুটা খালি জায়গা আছে – ওদের পিছনের দিকে। ওরা ভিতর বাড়ীর উঠোন হিসাবে ব্যবহার করে। ওটাই মিতুনের সামনে একটু ফাঁকা জায়গা – যেটা কিছুটা শান্তি দেয় মাঝে মাঝে। কা জে ই বাইরের খুব একটা দেখাই যায়না যাতায়াত নেই বলে । প্রায় সব সময়ই জায়গাটা বেশ নিরিবিলি থাকে । বাড়ীতে থাকার বলতে , ও আর উল্লাস । 

ওদের বিয়ে হয়েছে প্রায় দু বছরের কাছাকাছি । মিতুনের - শ্বশুর বাড়ী – সেই বনগাঁতে । এখানে ওরা এই বাড়ীটা কিনেছে নতুন । পাড়াটার যে সুনাম আছে সেটা জানতে পারে উল্লাসের বাবার এক বন্ধুর কাছ থেকে। সেই সুবাদেই এখানে বাড়ী কেনা । যদিও বাড়ীটার পোজিসনটা খুব ভালো নয় । উপায় ছিলোনা -- উল্লাসের কলকাতায় চাকরী তে সেটলড হওয়া , বিয়ে হওয়া , ওদের মধ্যমগ্রামের আদিবাড়ীর ভাগবাটোয়ারা হয়ে যাওয়া – সব হলো এক সাথে । তাছাড়া উল্লাসের বাবা আর মা নিজেদের জায়গা ছেড়ে নড়তে চাইলেননা – ফলে উল্লাসকেই কলকাতায় বাড়ী কিনতেই হলো । ওরা এমনিতে বেশ স্বচ্ছল পরিবার । লক্ষী এবং সরস্বতী – দুজনেই সমান ভাবে ওদের আশীর্বাদ করেছে । বাবা নিজে কলেজের অধ্যাপক , মা তখনকার দিনের গ্রাজুয়েট – শান্তিনিকতনে পড়াশুনো করা। এদিকে বিয়েটাও হঠাৎ করে ঠিক হয়ে গেলো । সময় পাওয়া গেলোনা । তাই তাড়াহুড়োতে কিনতে গিয়ে সব দিক আর বিবেচনা করা হয়ে ওঠেনি । তাছাড়া উল্লাস এই সমস্ত ব্যাপারে একদম কাঁচা , মাথা গলাতে চায়না । বাড়ীটার পুরোটাই ওর বাবার চেষ্টাতেই হলো । খোঁজ নেওয়া বন্ধুর মারফত দিয়ে – বাড়ির সার্চ করান , মালিকের সাথে কথাবার্তা – দরদাম ফাইনালাইজ করা , সবই করলেন উল্লাসের বাবা । উল্লাসের একার চেষ্টায় হলে হয়ত সমস্যা আরো কিছু হতো । ও এক অদ্ভুত প্রকৃতির ছেলে -। মিতুন মাঝে মাঝে ভাবে একে নিয়ে ঘর সংসার করা চলেনা । মাঝে মাঝেই যেন ভাবনার জগতে বিরাজ করে । মানুষ হিসাবে ভালো , অসম্ভব মেধাবী , বিশ্লেষন ক্ষমতা খুব চমৎকার – কিন্তু সব কিছুতেই কেমন যেন একটা আকর্ষনহীন ভাব -- ছাড়া ছাড়া লাগে । সংসারের পক্ষে একেবারেই অনুপযুক্ত। 

উল্লাসের চাকরী – এক নামী কোম্পানীতে – ও নিজেও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। তবে ভীষন ট্যুরে যেতে হয় ভারতের নানান জায়গায় । তাই বাড়ীতে মিতুনকে প্রায়শই একাই থাকতে হয় । খুব ফাঁকা এলাকা । লোকজনের যাতায়াতও খুবই কম । মিতুন বড় হয়েছে এক জমজমাট পরিবেশে । প্রথম প্রথম ওর একটু অসুবিধাই হতো এখানে মানিয়ে নিতে । অবশ্য এখন অনেকটাই সয়ে গেছে । 

এখানে আসার কিছুদিন পর থেকেই মিতুন লক্ষ্য করেছে – যে এই বাড়ীতে ভিখারী বা সাহায্য চাওয়ার লোকজনের আগমন বড্ড বেশী অন্যান্য বাড়ীর তুলনায় । এই গলির ভিতরে থাকা সত্বেও ভিখারীর এত আধিক্য কেন – মিতুল বুঝতে পারেনা । যেন মনে হয় দুনিয়ার যত ভিখারী আছে সবাই এই বাড়ীটাতে আসবেই । প্রথম প্রথম মিতুন বিষয়টাকে অন্য চোখে দেখতো , আজকাল ভাবতে আরম্ভ করছে --- হয়ত ভিখারীর নামধারী কোনো চোর বা অন্য কেউ নানান রকমের উদ্দেশ্য নিয়ে আসে – জায়গাটা নিরিবিলি বলে অথবা পাশে কোনা বাড়ী নেই বলে – একটা সুযোগ নেওয়া যায় কিনা – এটা ভেবে । মিতুন যে একা থাকে প্রায়শই সেটা অনেকেরই জানা – সেটাও একটা কারন হতে পারে। মিতুনের মনে পড়েনা এমন দিন নেই যে দিন কোনো না কোনো ভিখারী আসেনি ওদের বাড়ীতে । 

মিতুনের ভিখারীদের প্রতি একটা এ্যালার্জী সেই ছোটো বেলা থেকে । ঠিক সহ্য করতে পারেনা – বিশ্বাস করতে চায়না ভিখারীদের সাধারন ভাবে । মানতেই পারেনা ওদের কথা – সবটাই গল্প বলে মনে হয় । এঁর পেছনে অবশ্য ছোটো বেলার একটা কারন আছে । 

ও তখন প্রায় ষোলো বছরের , মাধ্যমিক দিয়েছে । বাড়ীতেই থাকে । অফুরন্ত সময় । একদিন দুপুর বেলায় , বাড়ীতে ও একা । মা গেছে পাড়ারই এক মাসীমার বাড়ীতে । মিতুন বসে বসে একটা গল্পের বই পড়ছিল । হঠাৎই গেটের আওয়াজ । ওদের বাড়িতে কেউ এলে – প্রথমে বাইরের বাগানের পরে একটা গেট আছে , সেটা খুলতে হবে । খুললে তবে বাগানে ঢোকা যাবে । সেটার একটা অদ্ভুত আওয়াজ আছে যেটা ওরা বুঝতে পারে । হঠাৎ ঐ আওয়াজটা পেল । উঠে গেলো দরজার দিকে , দেখল এক মাঝবয়সি লোক , হাতে একটা লাঠি , জীর্ণ জামা কাপড় , চুল উস্কখুস্ক - গেটটা খুলে এগিয়ে আসছে ।

মিতুন কে বলল , আমার চাকরী নেই আজ বেশ কয়েক বছর ধরে , বাড়ীতে রুগ্ন স্ত্রী , একটি মেয়ে , সংসার চালানর অন্য কোনো উপায় না পেয়ে এই ভিক্ষা করেই কোন রকমে সংসার চালাই । দয়া করে একটু সাহায্য করবেন । মিতুনের কেমন যেন একটু অনুকম্পা জাগলো -- লোকটিকে দেখে । লোকটি বয়সে ওর বাবার মতনই হবে , চেহারাটাও অনেকটাই ওর বাবার মতনই । এক সময় যে ভালো ভাবে কাটিয়েছে , দেখলে পরে বোঝা যায় । 

মিতুন অনেক্ষুন তাকিয়ে বলল , আমি বাড়ীতে একা আছি , আমার কাছে এই মুহুর্তে কোনো টাকা পয়সা নেই যে আপনাকে কিছু দিয়ে সাহায্য করব । 

হঠাৎ মিতুনের মনে পড়ল , সেদিনই বাবা -- মাকে বলছিলো -- বাবার বেশ কিছু জামাকাপড় অনেক পুরানো হয়ে গেছে , ছোটো হয়ে গেছে ---বাড়ীতে না রেখে কাউকে দিয়ে দিলেই হয় । মা ও কথা মতন জামাকাপড়গুলো এক জায়গায় জড়ো করে রেখেছিল । এটা মিতুন শুনতে পেয়েছিল । মা ওই গুলো সব জড়ো করে রেখেছিল --- পেছনের বারান্দায় একটা বাস্কেটে। 

মিতুন লোকটিকে বলল , আপনাকে আমি কিছু পুরানো জামাকাপড় দিতে পারি , যদি নিতে চান , তাহলে একটু এই দরজার কাছে দাঁড়ান , আমি নিয়ে আসছি । লোকটি রাজী হওয়াতে মিতুন , পেছনের বারান্দায় গেল । বেশ খানিকটা সময় নিলো , কারন – বাস্কেটটা ছিল ওদের পাম্পের ঘরের ভিতর ---- প্রথমে খুঁজে পাচ্ছিলনা , পরে পেল । বেশ কিছুক্ষূন বাদে যখন ও ফিরে এলো , দেখলো লোকটি নেই । দরজাটা খোলা , এমন কি বাইরের গেটটাও খোলা। ওটা সাধারনত সব সময় বন্ধ রাখা হয় , যাতে গরু ছাগল ঢুকে সামনের বাগান টা নষ্ট না করে । 

আশ্চর্য্য ঘরের ভিতরে তাকিয়ে দেখে ওর সেই সুন্দর বড় ব্যাগটা , সোফার উপরই ছিল , ওখানে নেই । ওটা ওকে ওর মামা দিয়েছিল গত বছর । কোথাও বেড়াতে গেলে নিয়ে যায় । টাকা পয়সা ছাড়াও টুকটাক জিনিষ পত্রও রাখা যায় । ঐ ব্যাগের ভিতরে ওর কিছু টাকাও ছিল – নানান লোকের দেওয়া বিভিন্ন সময়ে জমিয়ে রাখা । প্রায় শ পাঁচেক হবে ।

হতবম্ভ হয়ে গেলো - লোকটি ওর বিশ্বাসের একদম দফা রফা করে দিলো । মারাত্মক রাগ হলো – ভাবলো মানুষ এতটাই নীচ হতে পারে – উপকার করার ইচ্ছাটাই সেই থেকে একদম নষ্ট হয়ে গেলো । সেই যে ভিখারীদের প্রতি অবিশ্বাস শুরু হয়েছে – আজও চলছে । মন থেকে মেনে নিতে পারেনা । 

উল্লাস একটু অন্য প্রকৃতির মানুষ । বাস্তব জীবনটাকে দেখে অন্য রকম চোখে । মিতুনের পাল্লায় পরে একটু চুপ চাপ থাকে কিন্তু ওর সেই ভাবটা কখনই যায়না । আসলে উল্লাস বেড়ে উঠেছে , যদিও খুব স্বচ্ছল পরিবারে , কিন্তু ওর কাছে জীবনের কোনটা বেশী প্রিয় সেটাই কোনোদিন ঠিক করে উঠতে পারেনি । কাজেই জীবনের কোনো উন্নতিই ওর কাছে – নতুন মনে হয়নি । আনন্দের মনে হলো কিনা নিজেই বলতে পারেনা - অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে ও চলে –ভাবেইনা এই সব বিষয়ে । অথচ কাজের ব্যাপারে বেশ চৌকস, লেখা পড়ায় সব সময়ই প্রথম হয়েছে , যথেষ্ট বুদ্ধি আছে – কিন্তু চাহিদার মাপ, বিষয় বা আকার টা ও বোঝেনা – কাজেই সন্তুষ্টি ওর সবটাতেই – অসুবিধা বলে কিছু নেই । তাই কোনো বাঁধনও নেই কোনো কিছুর উপরেই - যে কোনো পরিস্থিতি – অবস্থা ওর কাছে সমান লাগে । সাংসারিক খুঁটিনাটি গুলো ও বোঝেইনা – বা বোঝবার চেষ্টাও করেনা – যেমন মাঝে মাঝেই ও টাকা পয়সার গোলমাল করে , হয় হারিয়ে ফেলে নয়তো কাউকে বেশী দিয়ে চলে আসে , অন্য মনস্ক একটা ভাব প্রায় সব সময়ই থাকে । বাজারে ওকে মিতুল কখনো পাঠায়না । গেলেই একটা কান্ড করে আসবে – হয় টাকা হারিয়ে আসবে , নয়ত যেটা আনতে বলা হবে সেটা আনবেনা , অন্য জিনিষ নিয়ে আসবে । এক বার মনে পড়ে মিতুনের , ওরা ফিরছিল শপিং মল থেকে , গাড়ী পার্ক করা ছিলো বেসমেন্টে। গাড়ী নিয়ে বেড়িয়ে খানিকটা এসেছে , একটা সিগনালে দাঁড়াল গাড়ীটা । এক বৃদ্ধা এসে গাড়ীর কাছে দাঁড়াল , হাত পেতে । যেটা আজকাল কলকাতাতে প্রায়শই দেখা যায় । মিতুন আশ্চর্য্য হয়ে গেলো , উল্লাস পকেটে হাত দিয়ে টাকা বের করে দিলো – ওটা একশ টাকা ছিলো । মিতুন কিছু বোঝার আগেই বৃদ্ধা চলে গেল –গাড়ীও ছেড়ে দিলো । উল্লাস বলল , পকেটে ঐ একটা টাকাই ছিল , দিয়ে দিলাম । তাছাড়া একশ টাকায় কি হয় আজকাল , একদিন না হয় উনি একটু ভালো করে খাওয়া দাওয়া করবেন । মিতুন অবাক হয়ে গেলো । কোনো উত্তর দিলোনা। । 

অনেক দিন বাদে উল্লাস বাড়ী ফিরল বেশ লম্বা একটা ট্যুর থেকে । বহুদিন বাইরে থাকলে উল্লাস সব চাইতে মিস করে বাড়ীর খাবার দাবার। কারন বাইরের খাবার এখনো ওর কাছে খুব গ্রহনীয় হয়ে ওঠেনি -- খেতে হয় তাই খায় । খাওয়ার ব্যাপারে ও ভীষন ভাবে বাঙ্গালী।

এবারের ট্যুরটাও বেশ হেকটিক ছিল , ফলে শরীরটাও বেশ টায়ার্ড । এতটাই টায়ার্ড যে মিতুনের সাথেও খুব একটা কথা হলোনা । সন্ধ্যেবেলা ফিরল , একেবারে গুছিয়ে স্নান সেরে – ভাত খেয়ে ---লম্বা ঘুম নিশ্চিন্তে – রাত নটার মধ্যেই । কালকে অফিস যাবেনা – বলা আছে । মিতুন জানে – উল্লাস এরকম দীর্ঘদিন ট্যুরে থাকলে , ফিরে এসে এরকমই করে । ও জানে - দু একদিন বাদে আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে । 

মিতুল ওর স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গিতে – নানান কাজ গুছিয়ে সেই রাত এগারোটায় ঘুমাতে গেলো । 

উল্লাসের ঘুম ভেঙ্গে গেলো খুব সকালে । বহুদিন বাদে সকালে উঠে দেখল – কোনো কাজ নেই। অদ্ভুত একটা অনুভূতি -- এরকম একটা দিন পাওয়া উল্লাসের কাছে একটা ভীষন পাওয়া । ছোটো বেলার কথা মনে পড়ল – বাবা খুব সকালে উঠিয়ে দিতো – ও সময় পড়লে নাকি পড়া খুব তাড়াতাড়ি মুখস্ত হয় আর মনেও থাকে বহুদিন । ও কিন্তু তখন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখত পাখীর উড়ে যাওয়া , গাছের আওয়াজ আর ওদের বাড়ীর সেই ছোটো বেড়াল টা – যে টা ও পড়তে বসলেই কাছে এসে বসত – খুব আদরের ছিলো মা‘র। কেমন অন্য রকম লাগত – সেই দিনগুলি। তাই ভাবলো আজকে বাড়ীতে থেকে - অলসতায় ঢেকে রেখে একটু ক্রিয়েটিভ ভাবনা ভাবা যাক । মাউথ অরগান ওর খুব প্রিয় --- বহুদিনের সাথী – সুরে সুরে ভরিয়ে তোলা যাক আজ। ভাবতে ভাবতে উঠে গিয়ে বারান্দায় বসল । সামনের রাস্তাটা নতুন করে পীচ হয়েছে । সামনেই মিউনিসিপ্যালিটির ইলেকসন , কাজেই এখন কাজের খুব তোড় জোড়। বাড়ীর কোনা দিয়ে এক চিলতে ব্যানার্জী বাবুদের বারান্দাটা দেখা যায়। দেখল ব্যানার্জী বাবু ঘুম থেকে উঠে এসে বারান্দাতে বসেছেন। সামনের মসজিদ থেকে আজানের শেষ সুর শোনা যাচ্ছে । বেশ সুন্দর একটা পরিবেশ , উল্লাস ভাবলো এরকম নিশ্চিন্ত ভাবে বহু দিন এই সকালটা উপভোগ করা হয়নি । 

খবরের কাগজ দিয়ে গেল । উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে হঠাত কলিং বেলের আওয়াজ । মিতুন অকাতরে ঘুমাচ্ছে । উল্লাস উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখে একটি অল্প বয়সী মেয়ে , দেখলেই মনে হয় বেশ কিছুদিন না খাওয়া , জামা কাপড়ের অবস্থা এতটাই খারাপ যে উল্লাসের পক্ষে ওর দিকে তাকাতেই লজ্জা করছিল । মেয়েটা করুন সুরে বলল , আমাকে একটু সাহায্য করবেন , আমার মা খুব অসুস্থ , বাবা নেই , ছোটো একটা বোন । আমরা থাকি ঐ খাল পাড়ের বস্তীতে । মার ওষুধ কেনার টাকা নেই । অথচ রোজ ওষুধ না খেলে , মার বেঁচে থাকাটা সম্ভব নয় । 

উল্লাসের কথাগুলো বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো -- তাছাড়া চেহারার যা অবস্থা , তাতে করে দু বেলা খাবার যে জোটেনা এটা খুবই পরিস্কার। দিন কাল খুবই খারাপ , উল্লাস, ভাবতে লাগল , এরকম বয়েসের মেয়ে – এভাবে একা একা জীবন কাটাচ্ছে – তাও আবার অভাবে – কতদিন ঠিক ভাবে চলতে পারবে কে জানে । একটু মায়াও হলো । 

উল্লাস একটু সময় নিয়ে জিজ্ঞাসা করল , তোমার কত টাকা দরকার । মেয়েটি বলল , ওষুধ কিনবো , আর কিছু খাবারের ব্যবস্থা করব , যা পাই তা দিয়েই কোনো রকমে করতে হবে।

একটু চিন্তা করে ,উল্লাস ঘরের দিকে গেলো , দেখলো ওর পার্সে মাত্র একটা পঞ্চাশ টাকার নোট আর কিছু খুচরো পয়সা । ওটা দিতে ওর মন চাইলনা – আর তাছাড়া, ওষুধ কেনা– বারের ব্যবস্থা –ওতে কি বা হবে । অথচ কাছে আর কোনো টাকাই নেই।সাধারনত টাকা পয়সা সব কিছুই মিতুনের কাছে থাকে । কিন্তু ও যেভাবে ঘুমোচ্ছে ওকে ডাকাটা ঠিক হবেনা। 

এদিক ওদিক খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে – একটা ড্রয়ারের মধ্যে দেখল একটা কানের দুল । ভাবলো এটা ঐ মেয়েটাকে যদি দিয়ে দেই , ও ওটাকে বিক্রী করে ওই টাকা দিয়েই ওর সব কিছুই হয়ে যাবে । দাম জানা নেই , তবে খুব একটা কম কিছু হবেনা । ছোটো হলেও সোনার তো । 

ওটা নিলো হাতে করে । চলে গেল মেয়েটির কাছে । দিয়ে দিলো । বলল, এটাকে বিক্রী করে তোমার বেশ কিছু টাকা হবে তাই দিয়ে তোমার মা’র ওষুধ আর খাওয়া দাওয়া চলে যাবে । 

মেয়েটা নিঃশ্বব্দে নিয়ে চলে গেলো । 

উল্লাস ঘরে ফিরে এসে দেখে ,মিতুল উঠে পরেছে । উল্লাস কে ওই অবস্থায় দেখে মিতুন জিজ্ঞাসা করল, কি হয়েছে উল্লাস , তুমি কার সাথে কথা বলছিলে , বাইরের কেউ এসেছিল । তোমাকে কিরম যেন ব্যাস্ত ব্যাস্ত দেখাচ্ছে । উল্লাস পুরো ঘটনাটা জানালো ।

মিতুন লাফ দিয়ে উঠল , বলল ,তুমি কি করেছো , ঐ কানের দুলটা দিয়ে দিলে। মনে নেই তুমি ওটা আমাকে গত বছর বিয়ের তারিখে দিয়েছিলে, ওটার অনেক দাম । আর তাছাড়া ওটা একটা স্মৃতি , চলে গেলো – তোমার একটুও মনে পড়লনা । বিক্রী করলে পাঁচ হাজারের বেশী পাবে । তুমি এটা কি করলে । এখন কি আর ওটা ফেরত পাওয়া যাবে । সে মেয়ে কোথায় চলে গেছে । ওরকম কত মেয়ে রাস্তায় ঘুরে এই ভাবে জীবিকা নির্বাহ করে । 

উল্লাস , মন দিয়ে শুনলো , হঠাৎ দৌড়ে চলে গেলো বাড়ীর বাইরে । এদিক ওদিক দেখে নিয়ে সোজা পথেই হাঁটা লাগাল । উল্টো দিকের বাজারে তখন বেশ লোক জড় হয়েছে , দোকান পাটও একে একে খুলছে । এরই মধ্যে উল্লাস প্রায় দৌড়েই চলতে লাগল । ডানদিকের প্রথম বাঁকটা ঘোরার সাথে সাথেই দেখতে পেলো এক ভদ্রলোকের সাথে এক রিক্সাওয়ালার ভীষন ঝগড়া হচ্ছে – সব লোকই ওখানে দাঁড়িয়ে পড়েছে । রাস্তাটা সোজা , কিন্তু সামনে টা আটকে গেছে ওদের জটলায় । ফলে সামনের দিকটা দেখা যাচ্ছেনা । উল্লাসও বুঝতে পারছেনা – মেয়েটা কোথায় গেলো । একটু ঠেলে ঠুলে – রাস্তা ফাঁকা করে যেই না বের হয়েছে জটলা থেকে – দেখতে পেলো মেয়েটি বাঁ দিকের রাস্তাটা ধরে হেঁটে চলেছে । খুব তাড়াহুড়ো অবশ্য ছিলনা । উল্লাস প্রায় একরকম দৌড়েই গেলো একেবারে মেয়েটার সামনে । হঠাৎ এই ভাবে উল্লাস কে দেখে , মেয়েটি ভয় পেয়ে গেলো । চমকে উঠে বলল , বাবু আপনি , কিছু হয়েছে। মেয়েটার ভাবনাটা চলে গেলো নিজের দুর্বল জায়গাটাতে -- হারানোর ভয়ে । এরকম হয়েছে ওর জীবনে এর আগে – তাই ওকে একটু বিচলিত লাগলো। 

উল্লাশ ওর ব্যাপারটা বা মানসিক অবস্থাটা বেশ বুঝতে পারল । কাজেই আর সময় না নিয়ে মেয়েটিকে কাছে ডাকল । উল্টো দিকের দোকানটা উল্লাসের চেনা , জিজ্ঞাসা করল , কি হয়েছে দাদা – কোনো সমস্যা । উল্লাস জানাল , না কোনো সমস্যা নয় । একটা জিনিষ একটু দেওয়ার আছে তাই আসা। 

উল্লাস মেয়েটির কাছে গেলো । বলল , শোনো ঐ দুলটার অনেক দাম , যখন বিক্রী করবে , পাঁচ হাজারের কম নেবেনা । তুমি তো জানোনা তাই যাতে না ঠকে যাও তাই তোমাকে সঠিক দামটা জানিয়ে গেলাম । এখন যাও । সাবধানে বিক্রী করো , কোনো অসৎ দালালের হাতে পড়োনা – দামও পাবেনা – জিনিষটাও চলে যাবে । 

মেয়েটি চলে গেলো । উল্লাসও আস্তে আস্তে নিশ্চিন্ত ভাবে বাড়ীতে এলো ।  মিতুনকে সব ঘটনাটা বলল। সব শেষে বলল , এখন আর কোনো ভয় নেই , মেয়েটা সঠিক দামই পাবে ।


মিতুন উদাস হয়ে তাকিয়ে রইল , উল্লাসের দিকে । ভাবল এমন মানুষের পৃথিবীতে মিতুন নিজে কিভাবে রয়েছে । চায়ের জল বসাতে চলে গেল । বাথরুম থেকে উল্লাসের গলা ছেড়ে গানের আওয়াজ পাওয়া গেল ।







Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.