x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

শুক্রবার, নভেম্বর ২৫, ২০১৬

আখতার মাহমুদ

sobdermichil | নভেম্বর ২৫, ২০১৬ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
ভাবনার এপিঠ-ওপিঠ









স্বপ্নটা এভাবে সত্যি হবে, ভাবিনি। কতদিন স্বপ্ন দেখেছি ওর পাশে বসে আছি রিক্সায়, নানান অর্থহীন গল্প করতে করতে পুরো শহর ঘুরছি। আজ অনেক দিনের স্বপ্নটা সত্যি হয়েছে। আমরা আজ এক রিক্সায়। কিন্তু এভাবে কল্পনাটা সত্যি হোক তা চাইনি। আমার স্বপ্ন এমন নিরানন্দ ছিল না। রূপা জবুথবু হয়ে বসে আছে। একটি কথাও বলছে না। ডুবে আছে নিজের ভাবনায়। জানি ভেতরে ভেতরে খুব পুড়ছে ও। কষ্ট পাচ্ছে। অথচ আমি পারছি না ওর কষ্ট মুছে দিতে। আমি খুব দুর্বল মানুষ। আমার পেরে ওঠা খুব সীমিত। রূপাকে চিনি আজ প্রায় ছ-সাত বছর। এই দীর্ঘ সময়ে আমার মনে হয়না ওকে কোনদিন বোরকা পরতে দেখেছি। অথচ আজ রুপা বোরকা পরেছে। নিয়তির উপহাস বোধহয় একেই বলে। রূপা পর্দাপ্রথার কট্টর সমালোচক ছিল।

ডাক্তারের চেম্বারে যখন পৌঁছালাম তখন গনগনে দুপুর। অ্যাপয়েন্টম্যান্ট করাই ছিল। আমরা চেম্বারে ঢুকতেই তিনি রূপাকে ইশারায় একটা পর্দা ঘেরা রুমে যেতে বললেন। রূপা গেল। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। মিনিট বিশেক বাদে রূপাকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন তিনি সেখান থেকে। রূপাকে বাইরে বসতে বলে আমার মুখোমুখি বসলেন তিনি।

‘আপনি ওর স্বামী?’
অস্বস্তির সাথে বললাম, ‘জ্বি না। আমাদের বিয়ের কথা চলছে।’
‘ওঃ।’
কেমন দেখলেন ম্যাডাম?’
‘ক্ষত প্রায় শুকিয়ে এসেছে। তবে পোড়া দাগ থেকে যাবে। বামগালের কিছু অংশ আর বাম বুকের ওপরে বেশ অনেকখানি জায়গায়।’
‘কোনভাবেই দূর হবে না দাগগুলো?’

‘না, এসিডের পরিমান সম্ভবত বেশি ছিল। আর সঠিক সময়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়নি। ফলে ত্বকের গুরুত্বপূর্ণ কিছু টিস্যু পুড়ে গেছে। প্লাস্টিক সার্জারী ছাড়া দ্বিতীয় উপায় নেই। দেশের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। তাহলে হয়তো নিখুঁত ত্বক ফিরে পাবেন তিনি।’

ফেরার পথে রূপা একবার শুধু জিজ্ঞেস করল, ‘আমার দাগগুলো থেকে যাবে তাই না?’
রূপার চোখে তাকালাম আমি। ডাগর ডাগর চোখে অদ্ভুত মায়া। শুধু মুখটা....... হয়তো আমার চোখ দেখেই সে উত্তরটা বুঝে নিল। চুপ করে গেল। রূপাকে বাসার কাছে নামিয়ে দিয়ে আমি আমার কাজে চলে গেলাম। বাসায় ফিরলাম একেবারে রাতে। ফিরেই পড়লাম আমার ভয়ঙ্কর রাগী বাবার সামনে। আমি একটা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের অংকের শিক্ষক। আমার বয়স ত্রিশ চলছে। তবু সেই শৈশব থেকে এখনও পর্যন্ত বাবার রাগী মুখ দেখলে বুকের ভেতর গুড়ুম গুড়ুম শুরু হয়ে যায়। হাত-পা কাঁপতে থাকে। গলা শুকিয়ে আসে। কথা গুলিয়ে যায়।

বাবা দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, ‘হারামজাদা, কোথায় গিয়েছিলি আজ?’
মিনমিন করে বললাম, ‘কোথাও যাইনি তো!’
‘আমার সাথে মিথ্যে? তুই আজ ওই মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাসনি? আমি নিজে দেখেছি তোকে ডাক্তারের চেম্বার থেকে ওই মেয়ের সাথে। কেন গিয়েছিলি, বিয়ের আগেই পেট করে দিয়েছিস?’
‘বাবা! রূপার পোড়া দাগগুলো দূর হবে কিনা সেটা জানতে গিয়েছিলাম। আর পেট করে দেয়ার কথা আসছে কেন, ওটাতো ত্বক বিশেষজ্ঞের চেম্বার!’

‘চো-ও-ও-প। কি প্রয়োজনে? ওই পোড়া মেয়েকে বিয়ের শখ এখনো আছে তোর? ওদের জানিয়ে দিবি এ বিয়ে হবে না। কালই জানাবি।’ বলেই বাবা গটগট করে নিজের রুমে চলে গেলেন। মা এতক্ষণ বসে সব শুনছিলেন। তিনি, কে জানে কেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেলেন বাবার পিছু পিছু। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম একা। সিদ্ধান্তহীন।

আমাদের পাড়ার ছেলেদের হার্টথ্রব ছিল রূপা। অমন সুন্দরী মেয়ে দ্বিতীয়টি ছিল না পাড়ায়। ওর প্রণয়প্রাথীর সংখ্যা ছিল অগণিত। আমিও রূপাকে চেয়েছি, সেই শুরু থেকেই যখন ওরা এই এলাকায় প্রথম আসে। কখনো রূপাকে বলা হয়নি সে কথা। ভয় পেতাম ওর অসাধারণ রুপের দ্যুতিকে। কিন্তু, কিভাবে কিভাবে যেন বাবা আমার চাকুরি পাবার পর রূপার সাথেই আমার বিয়ে ঠিক করে ফেললেন। বিয়ের কথাবার্তা সব পাকা। শুধু দিন-তারিখ ঝুলে ছিল রূপার ছোট চাচার জন্যে। তিনি আমেরিকায় থাকেন। তিনি দেশে এলেই বিয়ে হয়ে যাবে। রূপার বাবার আর্থিক অবস্থা খুব ভাল নয়। রূপার বিয়ের সমস্ত খরচ রূপার চাচা দেবেন বলে ঠিক করা আছে। এর মাঝেই ঘটল দুর্ঘটনাটা।

রূপার প্রণয়প্রার্থীদের মধ্যে বড়লোকের কিছু বখে যাওয়া ছেলেও ছিল। রূপার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে শুনে তাদের মধ্যে একজন এসিড ছুঁড়ে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে আমার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। সেই ছেলে পরে শুনেছি দেশের বাইরে চলে গেছে গ্রেফতার এড়াতে।

আমি দুর্বল পুরুষ। কাপুরুষও বলে কেউ কেউ। বাবার মতের বাইরে গিয়ে কিছু করা আমার সাধ্যের বাইরে। এছাড়া আমি পারিবারিক শৃঙ্খলায় বিশ্বাসী। বাবার কথা অগ্রাহ্য করে শৃঙ্খলা ভাঙা উচিত হবে না। আবেগতাড়িত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া টিনএজারদের সাজে, আমার মত প্রাপ্ত বয়স্ক একজন পুরুষের নিশ্চয় সাজে না? রাতেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেল আমার, রূপাকে বিয়ে করার মানে হয় না। ওর প্রতি আমার ভালবাসা পিতৃআদেশের চেয়ে তীব্র নয় সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।

পরদিনই রূপাদের বাসায় গেলাম কথাটা বলতে। রূপা আমার সামনে এল চাদরে মুখ ঢেকে। আমি কিছু বলার আগেই সে বলল, ‘আমি জানি কি বলতে এসেছেন আপনি। আপনার বাবা সকালে বাবাকে কল করেছিলেন। আপনাদের মত তিনি জানিয়ে দিয়েছেন।’

‘আমি... আমি দুঃখিত রূপা। বাবার অমতে আমি কিছুই করতে পারব না।’

‘আপনার দুঃখিত হবার কোন কারণ নেই। যা স্বাভাবিক তাই ঘটছে। আমি খুব নিয়তি বিশ্বাস করি জানেন? আমার নিয়তিতে এমনটা লেখা ছিল বলেই আজ আমি অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এখানে অন্য কারো হাত নেই। আপনি এবার আসুন।’

বাইরে বেরিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। যাক কোন রকম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি ছাড়াই কাজটা হয়ে গেল। একটু খারাপও লাগছে, রূপার চোখে জল দেখব আশা করেছিলাম। অথচ কী স্বাভাবিক ভাবে কথা বলেছে সে, যেন কিছুই ঘটেনি। যেন বিয়ে ভেঙে যাওয়া ডাল-ভাত। যাকগে, আমার কী!

এর দিন সাতেক পর রূপারা কোথায় যেন চলে গেল বাসা বদলে কাউকে কিছু না জানিয়ে। ব্যাপারটা আমার জন্যে ভালই হল। কেননা এরপর থেকেই রূপাকে দেখলে হয়তো আমার ভেতর অপরাধবোধ কাজ করত। যা ঘটে আসলে মঙ্গলের জন্যেই ঘটে। এদিকে বাবা মাসখানেকের মধ্যেই আমার জন্যে আরেকটি পাত্রী খুঁজে বের করে ফেললেন। আমাকে মেয়ের ছবি দেখানো হল। রুপের দিক থেকে বিচার করলে এই মেয়ে রূপার ধারে কাছেও যায় না। তবে অত সুন্দরী না হলেও মুখে মিষ্টি একটা লাবণ্য আছে। আমি মত দিয়ে দিলাম।


দু’বছর পর-

আমি নিজেকে বলি সুখি মানুষ। আমি খুব পয়সাওয়ালা নই আবার গরিবী অবস্থাও আমার নয়। আর বউ পেয়েছি একদম মনের মত। বন্ধু-বান্ধবরা প্রায়ই প্রশংসা করে বলে, আমার বউয়ের তুলনা নেই। আসলেই নেই। রেশমা খুব শান্ত মেয়ে। আমাকে কোনদিন কোনো ব্যাপারে অভিযোগ করেনি। আমারও অভিযোগ করার মত কোন ত্রুটি নেই রেশমার। আমাদের একবছরের একটি ছেলে আছে, নাম- অনন্ত। যখন যা চেয়েছি ওর কাছে পেয়েছি। ভালবাসা দিতে বউটি আমার কৃপণ নয়। বাপের বাড়ি থেকে টাকা-পয়সা, এটা ওটা আনার ব্যাপারেও দিল খোলা। আবার যখন যা খেতে চাই তা যত দ্রুত সম্ভব তৈরী করে খাওয়ায়। রান্নার হাতও অসাধারণ আমার বউটির। বউভাগ্য আমার সত্যিই দারুন। এছাড়াও আমার টাকা-পয়সা বাঁচাবার ব্যাপারেও দারুণ মাথা খাটায় সে। সাধারণ গৃহবধুদের চেয়ে একটু বেশি বুদ্ধিমান সে। আমি প্রায়শই ভাবি, আমার মত সাধারণ মানুষের কপালে এমন একটি অসাধারণ বউ জুটল কী করে!

বউ-বাচ্চা নিয়ে বেরিয়েছিলাম শপিং-এ। কেনাকাটা শেষে বেরিয়ে আসছি, এসময় একটি নারীকণ্ঠ ডেকে উঠল- ‘আদিত্য ভাই.... আদিত্য ভা-ই-ই-ই...’

ফিরে দেখি সানগ্লাস চোখে এক মেয়ে। ঝলমলে দামী শাড়ি পরণে। সে হাসিমুখে এগিয়ে এসে বলল, ‘কেমন আছেন?’
‘রূপা!’
‘চিনতে পারলেন তাহলে। আমি তো ভেবেছিলেন চিনবেনই না।’
‘ত...তু...তুমি মানে তোমার মুখ, কিভাবে!’
চোখ থেকে সানগ্লাস নামিয়ে আরেকদফা হাসি ছড়াল সে মুখে। সে হাসি ফালা ফাল করে কাটল যেন আমার হৃদয়।

‘আমার ছোট চাচা, ওই যে আমেরিকায় থাকত? তিনি আমাকে ওখানে নিয়ে গিয়ে সার্জারী করিয়ে এনেছেন। আপনাদের ওখান থেকে বাসা ছেড়ে দেয়ার ছ’মাসের মধ্যেই।’

‘ওঃ আচ্ছা আচ্ছা।’

রেশমাকে দেখে চোখে যেন বিদ্রুপ খেলে গেল রূপার চোখে। ‘এই বুঝি আপনার গিন্নি। পরিচয় করিয়ে দেবেন না?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়। রেশমা, এ হচ্ছে রূপা, আমাদের প্রতিবেশি ছিল।’
রেশমা হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাল আছেন?’

আমার গা জ্বলে গেল রেশমার হাসি দেখে। কেমন গেঁয়োভূতের মত হাসছে। অত দাঁত কেলিয়ে হাসার কী প্রয়োজন? বাচ্চাটাকেও কোলে নিয়েছে কেমন বিচ্ছিরি ঢংয়ে। ইচ্ছে করছে দু ঘা লাগিয়ে দিই।

‘রূপা তুমি বিয়ে করোনি?’
রূপা হাত উঁচু করে দেখাল, ‘ওইযে আমার বর।’

গ্রীক দেবতাদের মতন মুখের গড়ন, চোখে সানগ্লাস, পরণে স্যুট-টাই। একটা প্রাডোর ড্রাইভিং সীটে বসে অধৈর্য ভঙ্গীতে তাকিয়ে আছে এদিকে।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী করে?’

‘বিজনেসম্যান, সিঙ্গাপুরে কাপড়ের ব্যবসা আছে ওর। আচ্ছা আসি। বাসায় বেড়াতে আসবেন।’ বাড়ির ঠিকানাটা লিখে দিয়ে গেল, তার বরের ঝকঝকে ভিজিটিং কার্ডের পেছনে। যাবার আগে বলে গেল, বেড়াতে গেলে অনেক কথা হবে!

বিদায় নিয়ে চঞ্চলা হরিণীর মত গিয়ে উঠে বসল সে গাড়িতে। গাড়ি ছেড়ে দিলে একবার এদিক তাকিয়ে হাত নাড়ল রূপা। রেশমাও দেখাদেখি পাল্টা হাত নাড়তে থাকল। 

গর্জে উঠলাম, ‘অসভ্য মহিলা কোথাকার! গেঁয়োভূতের মত এভাবে হাত নাড়ছ কেন?’

রেশমা ভীষণ অবাক চোখে দেখল আমাকে। আমি ওর দিক থেকে চোখ সরিয়ে অপসৃয়মাণ প্রাডো গাড়িটার দিকে তাকিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। গাড়িটা যেন পেছনে রেখে গেছে রূপার অসহ্য রূপের দ্যুতি। আমি বোধহয় মেয়েটাকে সত্যিই ভালবাসতাম।




Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.