x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

শনিবার, অক্টোবর ২৯, ২০১৬

জিনাত রেহেনা ইসলাম

sobdermichil | অক্টোবর ২৯, ২০১৬ | | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
নারীর অহংকার- ইসমত চুঘতাই







অসামান্য নারীরা ব্যতিক্রমী হন।আর ব্যাতিক্রমীরা সবসময় চর্চিত হননা,ছায়ার দৈর্ঘ্যে ঢাকা পড়ে থাকে প্রতিভার অঙ্কুর।এই নেমে আস ছায়া কোনো প্রতিবম্ব নয়,সমাজের বৈষম্যের এক অপ্রিয় মুখ।এই মুখেই বিলীন হতে থাকে ইসমত চুঘতাই,বেগম রোকেয়াদের মত ব্যাক্তিত্ব যারা পুরুষের সমকক্ষতা অর্জন করলেও মহান ব্যাক্তিত্ব হিসেবে ততটা পরিচিত হন না যতটা হবার কথা ছিল।ডিফোকাসড হয়ে যান খুব দ্রুত। একশ্রেনীর মানুষের লাগাতার প্রচারে বিশুদ্ধ তুলাদন্ড ও প্রতারনা করে। জেন্ডারের আড়ালে মিটে যেতে থাকে কলম থেকে ঝড়ে পড়া স্বার্নাক্ষর যাদের বাঁচিয়ে রাখার কথা ছিল এই সমাজের।

সময়ের কষ্টিপাথরে পুরু্ষ পান সার্বজনীন স্বীকৃতি ,নারী হয়ে যান প্রতিবাদী সমাজের নয় নারী সমাজের নয় এক সীমাবদ্ধ গণ্ডির।যদিও অসামান্যতার মাপকাঠিতে তারা অনেকটাই অন্যরকম।প্রচলিত সিস্টেমের অসাড়তা আর অবজ্ঞার ইঙ্গিতকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গেছে পর্যায়ক্রমে।

ইসমত চুঘতাই ভুলে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া এক বিরল প্রতিভার নাম।এই অসামান্য উর্দু লেখিকাকে খুব কম মানুষ স্মৃতিতে ধরে রেখেছেন।খ্যাতি যদিও তার শিখর স্পর্শ করেছে,বিড়ম্বনাও এনে দিয়েছে অনেক।উদার ও প্রগতিবাদী এই লেখিকা নারীদের সামাজিক,মনস্তাত্বিক,লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে কলম ধরেন।তাদের স্বাধীন জীবনের ও মননের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষন করেন। নারীবাদের ধারনা যখন উপমহাদেশে তেমন সাড়া ফেলেনি তখন তিনি তুলে ধরেন নারীদের ওপর হওয়া নানা বৈষম্যের ডাইমেন্সন ।

চুঘতাই উত্তরপ্রদেশের বাদাউনে জন্মগ্রহণ করেন কিন্তু পিতা প্রশাসনিক কর্মী হবার সুবাদে চাকরী বদলের সাথে সাথে চুখতাই সুযোগ পান একাধিকবার।ধীরে ধীরে ইসমত টমবয় হিসেবে পরিচিত হতে থাকে।তার ফুটবল,হকি,গুলিডান্ডার প্রতি আকর্ষন তার মাকে অত্যন্ত বিব্রত করে তোলে।ইসমত যদি ও তার ভাইদের মূল কালপ্রিট বলে চিহ্নিত করে।ইসমত পরিবারের চ্যালেঞ্জ উপেক্ষা করে নিজের পড়াশুনা ও মেধাকে এক বিশেষ উচ্চতার অঙ্গনে প্রতিস্থাপিত করেন।কলেজ ডিগ্রী লাভের পর তিনি টিচার্স ট্রেনিং ডিগ্রী লাভ করেন আলিগড় থেকে।তিনি পাশ্চাত্য লেখকগণের মধ্যে বার্নাড শ, ফ্রয়েড,লরেন্স এদের লেখনী ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভবানার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন।সর্দার হাসান মিন্টো ও রসিদ জাহানের লেখনী তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।সামাজিক ও আইনি লড়াই একসাথে চালিয়ে যান এই বীরাঙ্গনা।‘লিফাফ’ নামের ছোট গল্প যা তাকে আদালতের চৌকাঠ দর্শন করায়।সেই লড়াই এ তিনি বিজয়ী হন।এই গল্পে তিনি দুই নারীর কথা তুলে ধরেন।একজন স্বামীর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত নারী আরেকজন পরিচারিকা।তার বিরুদ্ধে অবসিনিটির অভিযোগ তুলে নারীসমকামিতার অশ্লীলতা প্রদর্শনের বিরুদ্ধে ক্ষমা চেয়ে নেবার শর্ত রাখা হয়।ইসমত তা উপেক্ষা করেন ও কোর্টে তার লেখনীর স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে অভিযোগকারীদের পরাস্ত করেন। 

ইসমতের ছোট গল্পগুলি মেয়েদের বেড়ে ওঠার সাথে সাথে অক্টোপাসের মত আঁকড়ে ধরা নানান সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতার একদম বন্ধ করা বিবরণীর জলন্ত দলিল।উত্তরপ্রদেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের নিয়ে চুঘতাই এর আত্মজীবনী সাহিত্য ভান্ডা্রের এক মূল্যবান সম্পদ বলা যেতে পারে।‘কাগজি হ্যায় পাইরাহান’ তার চরিত্র ও ব্যাক্তিত্বের প্রকৃত প্রতিফলন।তার প্রতিবাদী কন্ঠস্বর প্রতিফলিত হয়েছে ছত্রে ছত্রে।

চুঘতাই এর আত্মজীবনী তার আদর্শের দর্পন।এখানে তিনি তার ব্যাক্তি,সমাজ ও নারী ভাবনার পুর্ন প্রতিফলন ঘটান।জীবনের বড় অবলম্বন ছিল তার দাদা ও বাবা।মা তার দিকে জুতো তাক করতেন কিন্তু লক্ষ্যচ্যুত হয়ে যেত এ কথার তিনি অবতারণা করেন এইখানে।তিনি ‘লিফাফ’ নিয়ে অকারন বিতর্ক ওঠায় বিরক্তি প্রকাশ করেন।সমসাময়িক উর্দু কবিতা জগতে পুরুষ সমকামিতার উল্ল্যেখ থাকলেও মহিলা সমকামিতা একদম চর্চার বাইরে ছিল।লিফাফশ যে জার্নালে প্রকাশিত হয় সেখানেই ‘চায়ে কি পিয়ালি’তে পুরুষের সমকামিতার ছোঁয়া ছিল কিন্তু তা নিয়ে সে সময় কেউ আলোড়ন তোলেনি।অগোচরে থেক যায় সে লেখা তা মিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।কিন্তু চুঘতাইকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় আদালতে।এই বৈষম্য চুখতাই কে বিচলিত করে।তিনি তার আত্মজীবনীতে একজন সংস্কারকামী নারীবাদী হিসেবে সামন্ততান্ত্রিক অত্যাচারী অনুশাসনের শিকার সব নারীদের পক্ষে প্রতিটি অভিমত কে জাষ্টিফাই করেন।পরিবর্তন জরুরী এবং তা ধীর গতিতে বাঞ্ছনীয় নয় তাও দীপ্তকন্ঠে ঘোসষনা করেন।স্বামী নির্যাতিত ও বঞ্চিত নারীদের অসহায়ত্ব ও আঞ্চলিক উর্দু স্পোকেন সমাজের নারীদের অবস্থান তুলে ধরায় তার কোনও জুড়ি ছিল না।‘থোড়ি সি পাগল’ চুখতাই এর স্বতস্ফুর্ত লেখনীর দলিল।ছোটো গল্প লেখনীর মধ্যে দিয়ে সাহিত্য জগতে তিনি এক উল্ল্যেখযোগ্য স্থান দখল করেন।বঞ্চিত ও নির্যাতিত নারীদের কাহিনী সমালোচকদের সন্তুষ্ট করতে না পারলেও তার ক্ষুরধার লেখনী তার অস্ত্বিত্বকে সুদৃঢ করে।

তার অনান্য শক্তিশালী লেখনী তলোয়ারের ধারের মত সমালোচনায় দুই ধার কাটতে কাটতে গেছে।কিন্তু তার লেখনীর বিষয় ও অপরাজেয় মননের প্রতি সকলের ছিল অগাধ শ্রদ্ধা।‘তেরিলা কির’ ছিল তার এক অনন্য সাধারন দৃষ্টান্তমূলক উপন্যাস।জিদ্দি ,মাসুম,সওদাই,দিলকি দুনিয়া শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা অর্জন করতে ব্যার্থ হলেও নারীকেন্দ্রিক লেখা তিনি দৃঢতার সঙ্গে চালিয়ে যান।

বহুমুখী ক্ষমতার অধিকারিণী চুখতাই সিনেমার স্ক্রিপ্ট ও ডায়ালগও লেখেন।স্বামী মুম্বাই এর সিনেমা পরিচালক হওয়ার সুবাদে তিনি এই কর্মকান্ডের নিজেকে নিয়োজিত করেন।তিনি নাটক লিখতে শুরু করলেও প্রশংসা পান কিন্তু ছাপ ফেলতে ব্যার্থ হন।তার ভাই এর মৃত্যুর পর তিনি লেখেন ‘দৌজখ’।এই নাটক এক সাধারন জীবনের দলিল কিন্তু আক্ট আর সিনের যথাযথ বিন্যাস ও স্পষ্টা না থাকায় তার সাফল্য ও জনপ্রিয়তা অধরা থাকে।

ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে তিনি গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন।হিন্দু মুসলিম বিভাজন রেখাকে তিনি পদাঘাতে উড়িয়েছিলেন,তিনি বালক কৃষ্ণকে প্রকৃত সন্তানের মত আলিঙ্গনে ধরে রাখতেন।তিনি ধর্মে গনতান্ত্রিকতায় বিশ্বাস করতেন।ইসলাম নিয়ে তার কোনও গোঁড়ামি ছিল না।বোরহা এক সামন্ততান্ত্রিক ভাবনার প্রতিফলল বলে তিনি বিশ্বেয়াস করতেন।

ট্রেড ইউনিয়ন ও এই আন্দোলন নিয়ে তার লেখার ধারনা সীমিত ছিল। মার্ক্সবাদী দর্শন নিতে তার চর্চা ততটা স্পষ্ট ছিল না।অর্থনৈতিক সমস্যা ও শ্রেনীসংগ্রাম নিয়ে তার ছোটগল্প উল্লেখযোগ্য ভাবে চর্চিত হয়নি যদিও তার বামপন্থী কানেকশন ছিল সর্বজনবিদিত। 

তিনি ছিলেন প্রতিবাদী। প্রগতিশীলতার অভাব ও নারী উন্নয়নেরর ধীর গতিকে তিনি আক্রমন করেন। পর্দা প্রথার বিরুদ্ধে তিনি তার ক্ষোভ বা বিরক্তি তিনি উগড়ে দেন।সমাজের নিপীড়ন ও বৈষম্যকে এক নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়ে প্রতিবাদ শাণিত করেন।সমসাময়িক প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক লেখিকা কোথাও আগুনের অভাবে যেন জ্বলে উঠতে পারেনি। আলো হয়ে দেখা দিয়েছিল শুধু ভোরের শেষটুকুতে। চুখতাই কে না জানলে উর্দু ছোটোগল্পের চর্চা শেষ হতে পারে না। উর্দুসাহিত্য জগতের সুবিশাল দিগন্ত অধরা রয়ে যায় ইসমতের উদারমনা প্রগতিশীল দর্শন ও প্রতিবাদী কলমর স্পর্শ ছাড়া।

আজকের সমাজজীবনে তার নিরপেক্ষতাবোধের আদর্শ ও অন্যায়প্রথার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা,অকপটে সমাজের ইভিলসের দিকে নির্ভয়ে প্রতিবাদের নিশানা সাধা,নারী প্রগতির স্বার্থে আপষহীনভাবে মত প্রকাশ করে সিস্টেমের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া প্রাসঙ্গিকতার স্বাক্ষর বহন করে।

ইসমতের জীবনের ১৯১৫-১৯৯১ এই লম্বা দৈর্ঘ্য একটা কংক্রিট মাইলস্টোন ।এক অনুপথ সংগ্রামের।এক একটি মুহুর্ত আসলে হাজার প্রতিকূলতার নীরব সমাবেশ।তিনি নারীদের নিয়ে আফসোস করে বলে যান- 

‘A future that most women would die for, she runs away escaping her dreams of spitting (chewed betel leaf) in a 'golden spittoon'.




Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.