x

প্রকাশিত

​মহাকাল আর করোনাকাল পালতোলা নৌকায় চলেছে এনডেমিক থেকে এপিডেমিক হয়ে প্যানডেমিক বন্দরে। ওদিকে একাডেমিক জেটিতে অপেক্ষমান হাজার পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ।​ ​দীর্ঘ সাতমাসের এ যাপন চিত্র মা দুর্গার চালচিত্রে স্থান পাবে কিনা জানি না ! তবে ভুক্তভোগী মাত্রই জানে-

​'চ'য়ে - চালা উড়ে গেছে আমফানে / চ'য়ে - কতদিন হাঁড়ি চড়েনি উনুনে / চ'য়ে - লক্ষ্মী হলো চঞ্চলা / চ'য়ে - ধর্ষিতা চাঁদমনির দেহ,রাতারাতি পুড়িয়ে ফেলা।

​হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানুষটি লালমার্কার দিয়ে গোল গোল দাগ দেয় ক্যালেন্ডারের পাতায়, চোদ্দদিন যেন চোদ্দ বছর। হুটার বাজিয়ে শুনশান রাস্তায় ছুটে যায় পুলিশেরগাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স আর শববাহী অমর্ত্য রথ...। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেকটা জল, 'পতিত পাবনী গঙ্গে' হয়েছেন অচ্ছুৎ!

এ কোন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

সমীরণ চক্রবর্তী

শনিবার, অক্টোবর ২৯, ২০১৬

রুমকি রায় দত্ত

sobdermichil | অক্টোবর ২৯, ২০১৬ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
রুমকি রায় দত্ত



দিনটা ছিল ১৮ই ফাল্গুন।পরের দিন আমাদের স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবস।পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশাল এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল,সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া।এত বড় আয়োজন তাই প্রস্তুতি চলছিল বেশ কিছুদিন আগে থেকেই।সমস্ত অনুষ্ঠান পরিচালনার গুরু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আমাদের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রদের উপর। দ্বাদশ শ্রেণীর দাদাদের সামনেই ছিল উচ্চমাধ্যমিক তাই ওরা ছিল অতিথির ভূমিকায়। স্কুলের যারা, আমারা হস্টেলে থাকতাম তাদের মধ্যে আমি,শুভম,সাহবাজ,উজি,বিবেক ও রমেন এই ছ’জনের উপরেই পড়েছিল সব থেকে বেশি দায়িত্ব।অবশ্য আমাদের হস্টেল সুপার প্রতাপ স্যার আমাদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন।তাঁরই তত্ত্বাবধানে আমরা বেশ গর্বের সঙ্গে সব দায়িত্ব সুষ্ঠ ভাবেই পালন করছিলাম।প্রাক্তন ছাত্রদের আমন্ত্রণ,বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ও পাশের দুটি স্কুলের সকল সদস্যদের আমন্ত্রণ পত্রে নাম লেখা,তা বিতরণ করা, এসব কাজ তো ছিলই সঙ্গে আরো অনেক কাজ।

স্টেজ সাজানোর প্রধান দায়িত্ব ছিল আমার আর বিবেকের উপর।বিবেক আমাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হলেও ওর স্বভাবটা ছিল ভাবুক প্রকৃতির। কাজের মাঝে হঠাৎ উদাস হয়ে যেত। কি যেন ভাবতো। যেন কোথায় হারিয়ে যেত। গায়ে জোড়ে জোড়ে ঠেলা মারলে কেমন যেন চমকে ওঠার মত নড়ে উঠতো, তারপর বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে বলত-‘অমন জোড়ে জোড়ে ঝাঁকাছিলিস কেন? —আমি কি কালা? —ডাকলেই তো হয়’।ওর এমন আচরণে প্রথম প্রথম আমরা অবাক হতাম। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দেখার ফলে ওর এই স্বভাবে আমরা ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম। বিবেকের একটা বিশেষ গুন ছিল। ওর উদ্ভাবনী চিন্তাধারা ছিল একদম আলাদা। প্রায় নতুন নতুন জিনিস বানাতো। সুন্দর ছবি আঁকত। ওর এই সব গুনের কারণেই স্টেজ সাজানোর দায়িত্ব ওর উপর দেওয়া হয়েছিল।

অনুষ্ঠানের মাস খানেক আগে থেকেই আমরা প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছিলাম, সেই কারনে সময়মত আমরা সবাই মিলে অনুষ্ঠানের সব কাজ প্রায় গুটিয়ে এনেছিলাম।যেটুকু কাজ বাকি ছিল সবটায় স্টেজ সংক্রান্ত। অনেক বড় অনুষ্ঠান।শুধু যে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরায় অংশগ্রহন করবে তা নয়,আমন্ত্রিত অতিথিরাও আছে।দর্শকদের বসার জায়গা,স্টেজ আর প্রাধান গেট সাজানো,শুধু সাজানোতো নয়, বেশ আকর্ষনীয় করে তোলা রিতিমতো একটা চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। অনুষ্ঠানের ঠিক তিনদিন আগে মানে ১৭ই ফাল্গুন থেকে শুরু হল আমাদের রাত দিনের পরিশ্রম। রাত জেগে প্যান্ডেল গড়ার কাজ চলতে লাগল। আমরা সারা রাত ওদের সাথে জেগে পাহারা দিতাম।

১৭ই ফাল্গুন রাত ঠিক দু’টো হবে। নিঃস্তব্ধ রাতের পরিবেশে,হাল্কা কুয়াশার চাদরে খোলা মাঠের চারপাশটা ঘেরা। কিছুদূর পর্যন্ত আলোর পরে বেশ একটা ঘোলাটে অন্ধকারে মাঠ ছেঁয়ে আছে। প্যান্ডেলের কাজ চলছে। টুকটাক---ঠুকঠাক প্যান্ডেলের বাঁশে পেরেক পোঁতার আওয়াজ চলছে। খোলা মাঠের চার ধারে ঘুরে সে আওয়াজ যেন ঝনঝন করে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। আমরা পাঁচজন চেয়ার পেতে মাঠের মধ্যে গোল হয়ে বসে গল্প করছি। আমাদের কাজের জায়গায় দুটো হলুদ আলোর বাল্ব জ্বলছে মাত্র। যতদূর চোখ যাচ্ছে কালো অন্ধকার। বিবেকের উপর যেহেতু প্রধান দায়িত্ব তাই ও তদারকির কাজে ব্যস্ত। মাথায় হিম পড়বে বলে সবার মাথায় মাফলার বাঁধা ছিল। আমরা নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল তখন। হঠাৎ দেখলাম, বিবেক ছুটে এসে টান মেরে মাথা থেকে মাফলার খুলে দলা পাকিয়ে বলের মত ছুঁড়ে ফেলল।ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, দরদর ঘামছে। কানের দু’পাশ থেকে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম।দুই কানে হাত দিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল। যেন কোনো বিকট আওয়াজ থেকে নিজেকের কান কে বাঁচাতে চায়ছে। তারপর ছুটে চলে গেল হস্টেলের দিকে।ফাল্গুন চলছে।তখনও রাতের পরিবেশ বেশ ঠান্ডা। ওকে এভাবে ঘামতে ঘামতে ছুটতে দেখে আমরাও ওর পিছনে ছুটলাম। দেখলাম ও সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল। কল থেকে জল পড়ার শব্দ আসতে লাগলো। আমরা ভাবলাম ওর বুঝি প্রবল চাপ ছিল তাই, ছোটো ঘরে গেছে। আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি হঠাৎ দেখি ও বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো, ওর মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভেজা। গা দিয়ে টপ টপ করে জল ঝরছে। এসে ধপ করে বসে পড়ল বিছানার উপর। তারপর বেশ কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। গায়ে হাত দিয়ে ডাকতেই বিরক্ত হয়ে বলল-‘তোদের বললেও শুনিস না কেন বলত’।

[২]

আমাদের কাজ প্রায় শেষের দিকেই ছিল। কাজের সুবিধার জন্য এই ক’দিন স্কুলের দোতলা বিল্ডিং এর চাবি আমাদের কাছে রাখা ছিল। ১৮ তারিখ সন্ধ্যের মধ্যে আমাদের কাজ প্রায় শেষ হয়ে যায়। রাত দশটার মধ্যে বাইরে কাজ সেড়ে আমরা হস্টেলে ঢুকে গেলাম। আটটা-সাড়ে আটটার মধ্যে আমাদের হস্টেলের খাওয়া-দাওয়া সব সাড়া হয়ে যায়। স্বভাবতই আমরা যখন ঘরে ঢুকলাম,হস্টেল প্রায় নিশুতি। আমাদের ঘরে আমি বিবেক আর উজি থাকতাম।ঠিক পাশের ঘরেই থাকত সাহবাজ,শুভম আর রমেন ।আমাদের শুতে শুতে প্রায় রাত এগারোটা হয়ে গেল। কদিনের খাটুনিতে বেশ ক্লান্তই ছিলাম। শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম।

তখন, রাত কত হবে জানিনা। হঠাৎ পাশ ফিরে শুতে গিয়ে দেখলাম,বিবেক নেই। ভালো করে তাকাতেই দেখলাম, ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে ও সিঁড়ির দিকে যাচ্ছে। ওর হাঁটাটা স্বাভাবিক নয়, যেন কোনো এক রহস্য লুকিয়ে আছে। আমিও ওকে অনুসরণ করলাম। বিবেক যাতে চোখ ছাড়া না হয়ে যায় তাই কাউকে না জানিয়েই ওর পিছু পিছু হাঁটতে লাগলাম। বিবেক সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে সোজা চলল আমাদের স্কুলের দোতলা বিল্ডিং এর দিকে। কিছুটা গিয়ে ডান দিকে বেঁকে চলতে লাগলো স্কুলের পিছনের দিকে,যে দিকে পুকুরটা আছে। ঠিক ফিজিক্স ল্যাবের নিচে। ফিজিক্স ল্যাবের জানালার পাশ দিয়ে একটা রেইন ওয়াটার পাইপ ছাদ থেকে সোজা নিচে নেমে এসেছে। দেখলাম বিবেক ঐ পাইপ ধরে সোজা উপরে উঠতে লাগল। কিছুটা উঠে ফসকে গেল। আবার লাফিয়ে ঝুলে পড়ল পাইপটা ধরে। চোখের সামনে এমন ঘটনা দেখে আমি ক্ষণিকের জন্য বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। তারপর ওর দেখাদেখি আমিও পাইপ ধরে কিছুটা উঠলাম।কিন্তু ভারি শরীরের কারণে আর উঠতে না পেরে নিচে নেমে ছুটে গেলাম গেটের কাছে। সব থেকে আর্শ্চয হলাম আমি যে ওকে অনুসরণ করছি এটা যেন ও টেরই পেল না।কেমন রোবটের মত নিজের কাজই করতে লাগল। গেটের কাছে পৌঁছাতেই মনে হল চাবি আমার বালিশের নিচে।ছুটে ঘরে গেলাম। চাবি নিয়ে ফিরে এসে গেট খুলতে যেতেই দেখি গেট খোলা,তালাটা এমনি ঝোলানো।কোনো কিছু ভাবার সময় তখন ছিল না।উন্মাদের মত সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগলাম। যখন ছাদে পৌঁছালাম দেখলাম,বিবেক সেইদনের মত দু’কানে হাত দিয়ে চেপে ধরে হাঁটু গেড়ে বসে। দেখে মনে হল যেন তীব্র কোনো শব্দকে আটকানোর চেষ্টা করছে আর ঘামছে। অথচ দশ-বারো হাত দূরে দাঁড়িয়ে আমি কোনো শব্দ শুনিতে পেলাম না। আমি একপা একপা করে ওর দিকে এগোতে লাগলাম।প্রায় ওর থেকে হাত দেঢ়েক দূরে এসেছি, হঠাৎ মনে হল আমি কোন শব্দাবর্তের মধ্যে চলে এলাম।একটা ক্ষীন,তিক্ষ্ণ শব্দ যেন আমার মাথার কোষ গুলো কে ক্রমশ অবশ করতে শুরু করলো।সব কিছুর মাঝে দেখলাম বিবেক ছাদ থেকে ঝাঁপ দিল।আমি দু’হাতে কান চেপে মরিয়া হয়ে নিচে নামতে লাগলাম।ঠিক ছাদ থেকে দোতলায় নেমেছি,তখন ঝনঝন তীব্র আওয়াজে মাথার শিরা গুলো ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম প্রায়। যেন অদৃশ্য এক আকর্ষণে আমি নিচে নামার সিঁড়ির দিকে না গিয়ে বেঁকে গেলাম আমাদের ফিজিক্স ল্যাবের দিকে। দরজার কাছে এসে দেখলাম ল্যাবের দরজা খোলা। আমি ভিতরে ঢুকতে যাব এমন সময় মনে হল কে যেন আমাকে ধাক্কা মারলো।কিন্তু অদ্ভূত ভাবে আমি নিজেকে সামলে নিয়ে এগিয়ে চললাম,যেন মনে হল কোনো এক অদৃশ্য সুতোর টানে চলমান রোবোটের মত আমি এগিয়ে চলেছি। আমার শরীর যেন নিয়ন্ত্রহীন। আমি ল্যাবের স্টোরের দরজায় হাত দিতেই সেটা খুলে গেল।ভিতরে অন্ধকার।টেবিলের উপর রাখা একটা গোল স্টপ ওয়াচের মত যন্ত্র থেকে সবুজ এক আলো বেরোচ্ছে। সেই আলোতে স্পষ্ট দেখলাম,টেবিলের এক কোনে রাখা আছে অদ্ভূত সব যন্ত্রপাতি,যেগুলির কোনোটিই কখনও আমাদের ল্যাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে আমার মনে পড়ল না। আমি এগিয়ে গিয়ে গোল যন্ত্রটাকে হাতে নিতেই বুঝলাম এই যন্ত্রটায় শব্দের উৎস।যন্ত্রটাকে চোখের সামনে আনতেই মাথার ভিতরে সব কিছু যেন ওলটপালট হতে লাগল।আমি মাটিতে পড়ে গেলাম।

এর পরের ইতিহাস আমি ছাড়া স্কুলের সবারই জানা। পরের দিন সকালে নাকি হস্টেলের ছাত্ররা আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় ফিজিক্স ল্যাব থেকে উদ্ধার করে। সে রাতের পর বিবেকের সাথে আমার আর দেখা হয়নি। তিনদিন পর আমার জ্ঞান ফেরে। পরে সবার কাছে শুনেছিলাম,পরের দিন স্কুলের পিছনে পুকুর পাড় থেকে বিবেক কে প্রায় অর্দ্ধ উন্মাদ অবস্থায় পাওয়া যায়। ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে জলে পড়ায় সে যাত্রায় বিবেক প্রাণে বেঁচে গেলেও তীব্র শব্দ ওর মাথার সবকিছু ওলটপালট করে দেয়।

কিন্তু সব থেকে আর্শ্চযের বিষয় হল ঐ রাতের ঘটনা আমি কারোর সামনে প্রমাণ করতে পারিনি। পড়ে ঘটনা স্থল থেকে আমার বর্ণনা মত কোনো যন্ত্রই পাওয়া যায় নি। এমন কি সেই শব্দ উৎপাদক গোল যন্ত্রটা ও নয়।



Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.