x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

রুমকি রায় দত্ত

sobdermichil | অক্টোবর ২৯, ২০১৬ |
রুমকি রায় দত্ত





আমার জন্ম থেকে কিশোরীবেলা কেটেছে একটা দ্বীপের মত স্থানে ‘ফরাক্কায়’। দ্বীপ এই কারনেই বললাম, আমাদের ব্যারেজের কোয়ার্টার গুলোকে মাঝখানে রেখে চারিদিকে বইছে গঙ্গাধারা। প্রকৃত গঙ্গাকে ক্যানালের মাধ্যমে একে অপরের সাথে সংযোগ করা হয়েছে। জাতীয় সড়কের সাথে একমাত্র সংযোগ রক্ষা করেছে ক্যানালব্রিজ। চারিদিকে গাছ-গাছালি,মরশুমে পরিযায়ী পাখিদের ছুঁয়ে যাওয়া,গঙ্গার স্নিগ্ধ হাওয়া,মধুরাস্ফুট ধ্বনি---এমন প্রাকৃতিক পরিবেশে আমি বড় হতে হতে প্রকৃতি যেন কখন আমার মধ্যে বাস করতে শুরু করে।

আমার জীবনের প্রথম ভ্রমণের শুরুও হয় এই স্থান থেকেই। তখন আমার বয়স ছয়-সাত হবে। মাসটা জুলাই। হঠাৎ বাড়িতে এলো আমার মায়ের ন’কাকা-কাকিমা আর তার ছেলে মেয়ে। ভীষণ মজা,কত আনন্দ হবে! ঠিক হলো সামনে যে রবিবার সেই দিন আমরা যাবো ‘বারহারওয়া’ (barharwa). ওখানে বিন্দুবাসিনি পাহাড়ের উপর রয়েছে বিন্দুবাসিনি মন্দির। বারহারওয়া আসলে পশ্চিমবঙ্গের গা-ঘেঁষা প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের অন্তর্গত সাহিবগঞ্জ জেলার একটা প্রসিদ্ধ স্থান। এর পূবদিক ছাড়া বাকি তিনদিক রাজমহল পাহাড়ে ঘেরা। এখানে অবস্থিত পাথর খনির কারণে পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলি থেকে পাথরের গাড়ি আসা যাওয়া করে। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা এত উন্নত ছিলনা। ফরাক্কা থেকে সেখানে যাওয়ার মাত্র দুটি উপায় ছিল, হয় ট্রেন নয়তো ক্যানাল পেড়িয়ে পাথর নিতে আসা খালি ট্রাকের পিছনে চেপে যাওয়া। কিন্তু ট্রেনে যাওয়ার একটা সমস্যা ছিল, স্টেশনে ট্রেনটি দাঁড়াতো না, স্টেশন ছাড়িয়ে কেবিনের কাছে কয়েক সেকেন্ডের জন্য গতিরোধ করতো, আর ঠিক সেই সময় চাপতে হতো ট্রেনে। সেটা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ তাই বাড়ির বড়োরা সিদ্ধান্ত নিল ট্রাকে চেপে যাওয়ার। 

দাদুরা চারজন আর আমার মা-বাপি,দিদিভাই আর আমি। সঙ্গে আমার স্যার, সেও আমাদের পরিবারের এক সদস্যের মতই ছিল। অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন উপস্থিত। আমরা সকাল সকাল স্নান সেড়ে, আলুসিদ্ধ, ঘি-ভাত খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম বারহারওয়ার উদ্দেশ্যে। বাড়ি থেকে ক্যানালপাড় বেশি দূর নয়, মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম, দেখলাম ঘাটে বাঁধা নৌকা। ক্যানাল খুব চওড়া নয়, আমাদের পৌঁছাতে হবে ওপারে। নৌকায় চাপার মিনিট কয়েকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম ওপারে। পাড় থেকে উপরে উঠতেই দেখলাম, সামনে শুয়ে ছালওঠা,বিবর্ণ কালো সর্পিলাকার পিচের রাস্তা। মায়ের অনাদৃত সন্তানের মত সারা অঙ্গে ধুলো মেখে। আগেই বলেছি যোগাযোগ ভালো নয়,তাই শুরু হলো চাতকের মত পথ চাওয়া কখন একটা পাথর আনতে যাওয়া খালি ট্রাকের দর্শণ মিলবে! এদিকে রোদের তেজ ক্রমশ বাড়ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা খালি ট্রাক আসতে দেখা গেল।হাত দেখাতাই সেটা থেমে গেল। কিন্তু আমরা ন’জন। ভিতরে জায়গা হবে না। অগত্যা সবাই ট্রাকের পিঠে। দাদু আমাদের তুলে ধরতে লাগলো আর বাপি উপর থেকে টেনে তুলতে লাগলো। গন্তব্যের কথা আর আলাদা করে বলতে হলো না ড্রাইভারকে কারণ এপথে এমন দৃশ্য বিরল নয়। ট্রাক ক্রমশ ধূলোর কূহকজাল ভেদ করে এগিয়ে চললো গন্তব্যের দিকে। ঘন্টা খানেক কি একটু বেশি সময়ই হবে সবার মাঝে হুল্লোড়ে কিভাবে যেন কেটে গেল। গাড়ি হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়তেই সামনে তাকিয়ে দেখলাম একটা স্টেশন, লেখা আছে ‘বাররাওয়া স্টেশন’। সবাই একে একে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াতেই নাকে সুড়সুড়ি দিতে লাগলো খাবারের সুগন্ধ। সামনেই ঝুড়িতে রাখা ইয়া বড় বড় সামোসা, মানে যাকে আমরা বলি সিঙ্গারা সঙ্গে চাটনি। অপূর্ব সে স্বাদ।যেমন সামোসা তেমনি চাটনি। খাওয়া পর্ব সেড়ে স্টেশনের বাইরের দিকে আসতেই দেখলাম সামনেই টাঙ্গা স্ট্যান্ড। (টাঙ্গা একপ্রাকার একটি ঘোড়ায় টানা গাড়ি যার দু’টো বড় আকারের কাঠের চাকা থাকে। পিছনের দিকে বসার চারকোনা জায়গা। প্রতি কোন থেকে একটা করে কাঠের খুঁটি দিয়ে মাথায় চালা। সামনের পাদানি অংশে চালক বসে, তার দু’পাশ থেকে দুটি কাঠের দন্ড ঘোড়ার সাথে লাগানো আর লাগাম চালকের হাতে। মাথার চালাটিতে সুন্দর নক্সা আঁকা থাকে। ) স্টেশন থেকে বিন্দুবাসিনি পাহাড়ে যেতে হলে তখন এটাই ছিল একমাত্র বাহন। 

আমরা দুটি গাড়িতে ভাগ করে উঠে বসলাম। চালকের হাতে ধরা লাগামে টান দিতেই ঘোড়া চিঁহি—চিঁ—হি করে সামনের পা-দুটি সামান্য উপরে তুলে আবার মাটিতে নামালো। চালক বাঁ-হাতে ধরা চাবুকটা ঘোড়ার পিঠে মারতেই ঘোড়াটি শুরু করলো ছোটা। আমাদের দুটি গাড়ি ছাড়াও দেখলাম পিছনে আরোও কয়েকটি গাড়ি ছুটে চলেছে । ঘোড়ার ক্ষুরের টগবগ আওয়াজে কেমন যেন একটা ছন্দ আছে। পথের ধুলো উড়িয়ে ছুটে চলতে লাগলো ঘোড়াগাড়ি।পিছনে তাকিয়ে দেখলাম পাশের ঝোঁপ গুলো যেন সরে সরে যাচ্ছে। পথটা লেজের মত শুয়ে আছে। মাঝে মাঝে পড়ে আছে ঘোড়ার শরীরের বর্জ্যপদার্থ।

ক্রমশঃ 

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.