x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

শনিবার, অক্টোবর ২৯, ২০১৬

কোয়েলী ঘোষ

sobdermichil | অক্টোবর ২৯, ২০১৬ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
 কোয়েলী ঘোষ


দুর্গা এসেছিল একেবারে অজ পাড়াগ্রাম থেকে । গায়ের রঙ কালো হলেও মুখখানি ঢলঢলে, লাবণ্য যেন ঝরে পড়ছে । ডুরে শাড়ি, এক মাথা সিঁদুর ,কপালে লাল টিপ । রীনা নতুন ফ্ল্যাট কিনে এসেছে । সারাদিন শুধু কাজ করে করে হাঁপিয়ে পড়ত । কোথায় কাজের লোক পাবে ? কাকেই বা বলবে ? শেষ পর্যন্ত কাঠের মিস্ত্রি সনাতনকেই বলল -- 'একটা কাজের মেয়ে দিতে পারো ? একটা শান্ত মেয়ে ?'

আমি তো এখানে থাকি না বৌদি -- যদি বলেন গ্রামের মেয়ে খুঁজে দেখব । 

রীনার সারাদিনের লোকের দরকার ছিল না । বলল -- আচ্ছা ,তুমি নিয়েই এসো , এখানে সবাই নতুন ,পাঁচ বাড়ি কাজ পেতে অসুবিধে হবে না । পরের দিনই দুর্গাকে নিয়ে এসে হাজির । রীনা একবার দেখেই ভালবেসে ফেলল । ফ্ল্যাটেই দু বাড়ি কাজ জোগাড় করে দিল । দুর্গা ভোরের ট্রেন ধরে এসে কাজ করে বিকেলে ফিরত। দুপুরবেলা একটু অবসরে মাদুর পেতে ঘুমাত। রীনার কাজ সারা হলে গল্প হত দুজনে । 

গ্রামের সব মেয়েদের গল্পই প্রায় এক । সকাল সকাল বিয়ে দিয়ে বাবা মায়ের দায় সারা । তারপর শ্বশুরবাড়ি । বাবা মা ভাই বোন সব ত্যাগ করে আবার অন্য বাবা ,মা্ , দেওর ,ননদ , ।

কেউ আপন নয় গো বৌদি , যার জন্যে তুমি করে মরবে সেইই -- 

এর সত্যতা রীনা কি জানে না ? কিন্তু আর ওসব সে মনে করতে চায় না -- গল্পের বইটা হাতে নিয়েও রীনা আনমনা হয়ে পড়ত । সব স্মৃতি সুখের নয় , তবুও অলস দুপুরে মনে পড়ে যায় । চোখ জড়িয়ে আসতো কখনও ।এমনি করে দুর্গা আর রীনার বন্ধুত্ব হয়ে গেল । আসলে রীনারও কথা বলার কেউ নেই ।একে একে সংসার ছোট হয়ে এসেছে । শুন্য ঘর আর ভেসে আসা কলরব ।

খেতে বসে দুর্গা হাসত, 'জানো বৌদি, শহরে তোমরা যা কিনে খাও , আমরা খেত থেকে তুলে খাই । গাছে গাছে পেঁপে ,মাঠের টাটকা শাক । দুর্গা এরপর ভালবেসে খেত থেকে আলুর শাক তুলে এনে দিত । আলুর শাক যে পিঁয়াজ রসুন দিয়ে খেতে এত চমতকার রীনা জানত না ।হাতের কাজ টেনে নিয়ে করা , সময়ে অসময়ে এক কাপ চা করে দেওয়া । বিকেলে রুটি করে বাড়ি ফিরত দুর্গা ।

কদিন দুর্গা কাজে আসে না । কি করে খবর পাবে ওর জানা নেই । কাঠের কাজ শেষ করে সনাতন কবেই অন্য কোথাও কাজ নিয়েছে । বেশ কদিন বাদে দুর্গা এল , যেন এক ঝড় বয়ে গেছে । 

এসে মাটিতে বসে পড়ে বলল -- বৌদি দুদিন থাকতে দেবে ?
কেন রে ? কি এমন হল ? 

দুর্গা হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল । এতক্ষণ খেয়াল করেনি ,গলায় হাতে কপালে লাল লাল জমাট বাঁধা রক্তের দাগ ।কান্না থামলে বলতে লাগল -- শহরে কাজে আসি বলে কত মুখ জান বউদি ? ভাত দেবার মুরোদ নাই কিল মারবার গোঁসাই ! কদিন হল দুর্গার ভাসুরের মেয়ে বাড়ি থেকে পালিয়েছে । বাড়ির লোকের ধারনা ,দুর্গাই শহরে ভাগিয়েছে । মেয়েটি যে এতদিন এক ছেলেকে ভালবাসত সে কথা কেউ বিশ্বাস করল না । ঘরে বন্ধ রেখে মারধর --তারপর সুযোগ পেয়ে পালিয়ে আসা । রীনার খুব রাগ হল --'থেকে যা তুই এখানে -- আর যেতে হবে না । 

থাকতেই হবে বউদি । কুথায় যাব ? শুধু ছেলে মেয়েগুলোর কথা ভেবে -- আবার কান্না -- 

দুদিনও গেল না । ফ্ল্যাটের দরজায় ছেলে মেয়েদের পৌঁছে দিয়ে গেল স্বামী । দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে অথই জলে পড়ার কথা ! তার বদলে দুর্গার দুচোখে আগুন -- বেশ হয়েছে , ছেলেমেয়েগুলো যে ভাত পাবে না ,কেউ দেখবে না ,এ আমি জানতুম । স্বামীর চোখের সামনে ভাঙল হাতের শাঁখা, মুছল সিঁদুর, সুন্দর লাল টিপটা পর্যন্ত । অমন শান্ত মেয়েটার কি ঝগড়া ! রীনাও বেরোল -- শুনুন ,এখানে ঝগড়া নয় । নিন্দে হবে, এতো তোমার বাড়ি নয় । শেষ পর্যন্ত পুলিশের ভয় দেখাল। গজগজ করতে করতে, গাল মন্দ করতে করতে ফিরে গেল স্বামী দেবতা ।

শুরু হল লড়াই । কোথায় ঝুপড়িতে দুর্গা ঘর ভাড়া করল, ছেলে মেয়েগুলোকে স্কুলে ভরতি করল । আরও বাড়িতে কাজ নিল । প্রতিদিন মেয়েটা মলিন হয়ে যেতে লাগল । চোখের তলায় কালি, মুখের সেই হাসি আর নেই।

একদিন রীনার স্বামী অফিস থেকে এসে বলল- ওই দুর্গা -- তোমার আদরের কাজের মেয়ে দেখে এলাম ব্রিজের তলায় দাঁড়িয়েছে বুঝলে ? নষ্ট মেয়ে ! কাল থেকে যেন আর না দেখি --

রীনা ঝাঁঝিয়ে উঠল -- কে নষ্ট করল ? কাকে বল নষ্ট মেয়ে ? এই বাজারে এতগুলো পেট চালিয়ে, তাছাড়া নিশ্চয়ই কেউ ওকে এ পথে নামিয়েছে । আমি তো সব জানি --

ওসব কথা না বলে অন্য মেয়ে দেখ ,আমার ঘরে যেন না আসে --বদনাম হয়ে যাবে । 

দুর্গার বিসর্জন হয়ে গেল। যাবার আগে রীনা আলমারি থেকে কটা ভাল শাড়ি  বের করে দিল, কটা তুলে রাখা পিতলের বাসন , পায়ের নূপুর -- এগুলো তার নিজের, কোনদিন এত শাড়ির ভাঁজ খুলে পড়া হয়নি ।

'রেখে দে তোর মেয়ের বিয়েতে দিবি । আর তো কিছু দিতে পারব না । মাঝে মাঝে আসিস ।'মনটা কেন এত কাঁদে ! একটা মেয়েকে আশ্রয় দেবার কোন ক্ষমতা নেই তার । 

দুর্গা এখন রঙ মাখে, হাতে মোবাইল , যে বলে তার সাথে না কি দীঘা বেড়াতে যায় । খবর হাওয়ায় ভাসে । দুর্গা ব্রিজের তলায় দাঁড়ালে কোন গাড়ি এসে তুলে নিয়ে যায় । সেই গ্রামের মেয়েটা এখন বাজারের ।

**

অনেকদিন পর দুর্গার সাথে দেখা । দেখা হতেই সেই আগের মত হাসি । 
- কেমন আছিস রে? 
- ভাল আছি গো । আর কোন চিন্তা নেই । মেয়ের বিয়ে দিলাম ,ছেলেটা কারখানায় চাকরি পেয়েছে গো বউদি । আর তারপর -- 
- কি রে তারপর ? 

এতদিনে সত্যি সত্যি সব গেল । গেরাম থেকে খপর পাঠিয়েছিল, তখন শেষ অবস্থা -- আমাকে দেখে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছে। কি করব বল ,আমি কি পারি ? তিনমাস গু মুত সব ঘাঁটলাম গো বৌদি ।

দুর্গার চোখে জল । জল নয় ,ভোরের শিশির । ওপরে উদার উন্মুক্ত নীল আকাশ । সামনে দাঁড়িয়ে দশভুজা করুনাময়ী দুর্গা । বেজে উঠল ঢাকের আওয়াজ । দুর্গা ঈশ্বরী ! তার বোধন, আবাহন, বিসর্জন কিছু নেই ।

ঘরে ঘরে দুর্গা ,লক্ষ্মী ,সরস্বতী । শুধু দেখার চোখ নেই বলে আমরা দেখতে পাইনা ।চিনতে ভুল করি । 




Comments
1 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.