x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

শনিবার, অক্টোবর ২৯, ২০১৬

দেবাঞ্জন ঘোষ

sobdermichil | অক্টোবর ২৯, ২০১৬ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
দেবাঞ্জন ঘোষ






অফিস বিল্ডিং এর দোতলার নিজের চেম্বারের জানালা থেকে লোকটাকে দেখতে পেল সুব্রত । অনেক বছর পর , কি মনে করে ....এটাই ভাবছে । দাঁতের ফাঁকে আর একবার কাঠিটাকে প্লেস করল ... একটা স্বগতোক্তির জন্য আবার টুথ-পিক টা হাত সমেত নামাতে হল , " এই সেই অভিজিত মুখোপাধ্যায় !"

জানালা থেকে ফিরে চেয়ারে বসতে বসতেই লোকটা ঘরে প্রবেশ করল । গেট থেকে সাহেবের চেম্বার, এই পথ পেরোতে অনেকের চোখে পড়তে হয়েছে লোকটাকে। চেম্বারের দরজা থেকে একটু বেশীই লম্বা পথ সুব্রতর টেবিল পর্য্ন্ত , টেবিলের কাছাকাছি এসে একটু তাড়াতাড়ির সাথেই কথাটা বলল, " কিরে ! আমাকে বুঝতে বা চিনতে তোর কোন অসুবিধা হয়নি তো?" সুব্রত এটাই ভাবলো, এতগুলো কথা বোঝাতে গেলে ও ঠিক ঠিক গুছিয়ে বলতে পারবে না, শুধু বলল, " তোকে ভুলে যাব ভাবলি কি করে? আর তাছাড়া, মাঝের পনের-কুড়ি বছরই না , দেখা হয় নি ? স্কুল শেষের তিন-চারটে বছর অনেকবারই দেখা হয়েছে ,আমাদের ।" উল্টোদিকের চেয়ারে বসে , সামনের দিকে বেশ খানিকটা ঝুঁকে আগন্তুক কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু এই ওয়াল টু ওয়াল কার্পেট পাতা সাহেবের চেম্বারে , সাহেবের কথাই সঙ্গত কারনে আগে এসে পৌঁছয় পঞ্চাশ আসনের ডিসকাসন জোনে । কোন কোনদিন , এর ব্যতিক্রম হয় । বার বার উঠে দাঁড়াতে যায় সুব্রত আর ততবারই ধমক খেতে হয় বড় সাহেবের । ঐ কদিন চেম্বারের পরিবেশটা অন্যরকম হয় । বড়সাহেব সুব্রতকে তার কক্ষে কোনদিনই ডেকে পাঠাননি । তিনি খুব ভাল করে জানেন, রেসের মাঠের ঘোড়াকে রেসের মাঠেই গিয়ে দেখতে হয়...লাভ-লোকসান কিছুটা হলেও সামনা-সামনি বোঝা যায়। আজও সুব্রতর চেম্বারের ভাষা, আর সকলের চেনা সাহেবের থেকে একটু আলাদা। মরিয়ম কফির কাপটা অভিজিতের সামনে নামাতে নামাতে একটু হলেও আঁচ করতে পারল অ্যামবিয়েন্সটা। 

এটা সুব্রতর অভ্যাস , দুপুরে লাঞ্চের পর মিনিট কুড়ি বড়সাহেবের আদেশগুলো একবার মাথায় বসিয়ে নেয়.....কিন্তু আজ সেটা হচ্ছে না , ভেতর ভেতর একটু চঞ্চলতা চলে আসছে , এই চিন্তা থেকে নিজেকে একটু হলেও মুক্ত করল সে, " তুই সোজা অফিসে চলে এলি ?"

স্কুলের সহপাঠী অভিজিত আবার পুরো শরীরটাকে পেছনদিকে ঠেস দিতে দিতে , এত বড় ঘরের এদিক ওদিক একবার তাকাতে তাকাতেই বলা শুরু করল, " শুভর সাথে যোগাযোগ করেছিলাম, দেখাও করলাম.....আসলে মায়ের পেসমেকার বসাতে হবে , অনেকগুলো টাকার দরকার , শুভ বলেছিল এক লাখ টাকা দেবে , হঠাৎ কোন অসুবিধার কারনে ও দিতে পারল না , দেখলাম তোর কাছে আসা ছাড়া আমার আর কোন উপায় নেই , আমি পোস্ট-ডেটেট চেক তোকে দিয়ে রাখব , না করিস না !" সুব্রত কি বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না , " কবে বসবে পেসমেকার ?" " কাল , " উত্তর দিল অভিজিত ।

" তুই ঐ ফরেন কম্পানীটাতেই আছিস ?" এতক্ষনে সুব্রত ভাল করে অভিজিতের মুখটা দেখল। অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে মিলল দুজনার দৃষ্টি । সুব্রত বলল ," আমি তোকে পঞ্চাশ হাজার দিচ্ছি , তুই চেকগুলো লিখে দে।" হাত বাড়িয়ে নিজের নাম আর তার সাথে জুড়ে দেওয়া ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর লেখা কাগজটা এগিয়ে দিল। 

" অনেক উপকার করলি আমার ।" আরও কিছু বলতে চাইল অভিজিত , একটা সাদা দিস্তা খাতা খুলতে খুলতে ধমক দিল সুব্রত " যা নিজের এত জরুরী কাজটা আগে করতে যা , আর আমাকেও আমার কাজটা করতে দে।" চারখানা চেকের পাতা টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়াল আগন্তুক বন্ধু লোকটা , অভিজিত মুখোপাধ্যায় , আর মৃদুস্বরের সাথে সুব্রতকে বলল , সুব্রতর চোখ তখনও টেবিলের খাতাটার দিকে , " হ্যাঁ রে স্কুলের সেই খাতাটাকে এখনও ছাড়তে পারিসনি !" " না রে পারিনি , এটাই আমার সব সময়ের ..... বড়সাহেবও এই খাতাতেই আমাকে নম্বর দেন । " উঠে দাঁড়াল সুব্রত, গেট স্লিপটা সই করে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল বন্ধুকে ।

*

আট মাসের মাথায় গিয়ে ঘটনাটা সুব্রতকে একটু ভাবাল। এমাসের টা নিয়ে অভিজিতের সবগুলো চেক বাউন্স করেছে । অত প্রকাশ করার মানুষ সুব্রত নয় । চেকগুলো নিজের অফিস ব্যাগে রেখে দিয়েছে। কোনদিন না কোনদিন বন্ধু নিজেই আসবে । স্কুল জীবনেও মনের দিক থেকে খুব বড় ছিল সে।

*

ডিসেম্বর মাসের সকাল । অফিস কাম প্ল্যান্ট মুখী গাড়িতে বসে সুব্রত । রাস্তার প্রতি মোড়ে ব্যস্ততার চিত্রটা মাইক্রন লেবেলে হলেও একটা চেঞ্জ লক্ষ্য করে ও , যত সময় গড়ায় । আরও ব্যস্ততা কামনা করে সুব্রত সকলের জীবনে । হঠাৎ একটা মোড়ে সুব্রত গাড়িটা থামাতে বলল , শ্রীকান্ত মোড়ের মাথা থেকে বেশ খানিকটা এগিয়ে গাড়িটা থামাতেই সুব্রত বাঁ দিকের দরজা খুলে নেমে গেল। সামনের বাস ছাউনি তে অভিজিত বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। সামনে গিয়ে দাঁড়াল সুব্রত। 

" বন্ধুর টাকাটা মেরে দিলি ? "

" কটা দিন অপেক্ষা কর , আমি নিজে গিয়ে তোকে দিয়ে আসব। একটু অসুবিধার মধ্যে আছি। " সুব্রত হাতটা তুলে না বলার ভঙ্গিতে সরসরি জানিয়ে দিল অভিজিতকে ," না , তোর অফিসে আসার কোন প্রয়োজন নেই.....তুই এই সময় করে অফিস যাস তো ?....আমি যোগাযোগ করে নেব ।" সবকিছু যেন বুঝিয়ে দিল ,আর তাছাড়া এইসময় অনেক মানুষের ভীড়ও। আবার সামনে গাড়িটাও রাখা আছে, তাড়াতাড়ি হাঁটল সুব্রত গাড়ির দিকে। 

গাড়িতে এসে বসল সুব্রত , গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। ইচ্ছে গেল নিজেকে একটু আলাদা করে রাখতে। ডিসেম্বর মাস তাও এ.সি চালিয়ে দিতে বলল , কাঁচ উঠে গেল সব। ভিতর থেকে বাইরেটা দেখতে খুব ভাল লাগছে সুব্রতর। দামী গাড়ির ভিতরের বিলাসিতা কোথাও যেন আলাদা করে থাবা বসাচ্ছে বাইরের জগত থেকে আলাদা করার জন্য। 

যার এত নির্ভরতা এত মানুষের ওপর , সে কি করে আলাদা করবে নিজেকে ? 

কিন্তু এ কি করল সুব্রত সাতসকালে ? নিজের মনেই প্রশ্নে জড়িয়ে ফেলল নিজেকে। কেন এভাবে বলতে গেল অভিকে ? তাও আবার সবার সামনে , কি ভাবল অভিজিত ? কি মতিভ্রম হল তার ? আর অভি যেটা করেছে সেটা গর্বের , মায়ের জন্য এই কাজ সব সন্তানের করা উচিত। মায়ের প্রতি ঋণ কি কোনকিছুতে মেটার ? সুব্রত একবার মনে করার চেষ্টা করল সকালে প্রেসারের ওষুধ খেয়েছে কিনা ? বাস ছাউনি তে অভিকে দেখতে না পেলেতো এ ঘটনা ঘটার ছিল না ।

এক সেকেন্ডে স্বাভাবিক হয়ে গেল সুব্রত। এটাই ওর গুন । লজ্জিত হয়ে এ.সি বন্ধ করতে বলল । কাঁচগুলোও একটু করে নামাতে বলল , ওরটা বাদ দিয়ে , বাইরের ফ্রেসনেসটা যাতে গাড়ির ভেতর এসে পৌঁছয় । একেই বলে মর্নিং ফ্রেসনেস । জীবনে কতকগুলো অপরিহার্য্য অনুভবের মধ্যে এটা একটা । অনুভূতির পাখনা ডানা মেলল এবার.....অভিদের বাড়ি খুব যেত সুব্রত। ওর মা খুব ভালবাসতেন , এক এক সময় মনে হত এর ওপর আর ভালবাসা হয় না। কতকিছু নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতেন । সুব্রত চশমাটা চোখ থেকে খুলে রাখল । আবার পরে নিল । না , শরীরেতো সেরকম কোন অসুবিধা ফিল করছে না । আবার একবার মনে করার চেষ্টা করল , প্রেসারের ওষুধটা খেয়েছে কিনা। 

" তোর কাছে এইভাবে টাকা চাওয়াটা , আমার একেবারেই ঠিক কাজ হয়নি ।" গাড়ি অনেকক্ষন হাইওয়েতে উঠে পড়েছে । নিজের কাজের গতির সাথে এই গতিটাকে একবার তুলনা করে প্রতিদিন । আজ পরিবেশটা একটু আলাদা। " আমায় ক্ষমা করিস বন্ধু। তোর মায়ের খবরটাও একবার নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম না। তোর চাইতে আমি বেশী ঋণী হয়ে পড়লাম অভি,কখনও পারলে মাকে বলে দিস , পঞ্চাশ হাজার টাকাটা চেয়ে আমি বড় ভুল কাজ করেছি। " স্বগতোক্তি থামল সুব্রতর , শ্রীকান্তর মুখ থেকে তিনবার স্যার ডাকটা শুনে। 

প্রতিদিনের অভ্যাস , এই মাতৃমন্দিরে এসে গাড়ি থামে। সুব্রতর প্রনাম সারা হলে , আবার গাড়ি চলতে শুরু করে । এখান থেকে প্ল্যান্ট পাঁচ কিলোমিটার। 

সেই ছোটবেলায় নিজের মাতৃদেবীকে অনেকভাবে বোঝাত সুব্রত , কেন অভিদের বাড়িতে যেতে হবে , কি কি নোট্স নিতে হবে .... যেটা কোনদিন বলতে পারে নি , সেটা রিনির কথা........

অভিজিতের বোন রিনি , প্রতিদিনের আড্ডায় যোগ দিত , অভির বাবা-মা কখনও না করেন নি। সাত্ত্বিক আডডা আরও জমে উঠত অন্যের স্বাধীনতার প্রান স্পন্দনে। রিনির ভাল নামটাও কোনদিন জানা হয়ে ওঠেনি। একবার অভিদের পাড়ার ঘরোয়া নাটকে সুব্রতর অভিনয় করার কথা ছিল.....ফাইনাল রিহার্সের দিন সুব্রত কিছুতেই টাইটা বাঁধতে পারছিল না , রিনিরও পাঠ ছিল একই সিনে , পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিনি সাহায্য করেছিল ..... খুব কাছ থেকে রিনিকে দেখেছিল সুব্রত , ঠোঁট দুটো দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে বলেছিল রিনি , " শিখে নিও টাই পরাটা আমার কাছে , পরে তোমার কাজে লাগবে। " এই কথাটা চাউর হয়ে গেছিল বন্ধুমহলে ভীষনভাবে.....সেই থেকে রিনি আর কোনদিন কোন কথা বলেনি , নাটকও বন্ধ হয়ে গেছিল..........

সুব্রত অনুভব করল গাড়ির গতি কমে আসছে, চোখের সামনে প্ল্যান্টের অটোমেটেড গেটটা খুলে যাচ্ছে , সবাই এ্যাটেন্শন পজিশনে ,ঘাড়ের ওপর বড়সাহেবের নিঃশ্বাসটা পড়ছে টার্গেট সীটটাকে সাথে করে। আর রিনির নিঃশ্বাসটা সরাসরি ঠোঁটের ওপর।



Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.