x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৬

তাপসকিরণ রায়

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৬ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
 তাপসকিরণ রায়





স্বামী-স্ত্রী দুজনের ঘর। স্বামী শ্যামাপদ, আর স্ত্রী শুভা। অনেক দিন হল মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। ওরা যার যার পরিবার নিয়ে অন্যত্র বাস করে। ছেলে বিয়ের পর বিদেশে ডেরা বেঁধেছে। ওরা কালে-ভদ্রে কখনও আসে। এখন যাকে বলে টোনা-টুনির ছন্নছাড়া সংসার। শ্যামাপদ চাকরি করতেন, ক’বছর হল রিটায়ার্ড হয়েছেন। 

--কেমন আছেন শ্যামাপদ বাবু ? অবসর জীবন কাটছে কেমন ? সে দিন বাজারে পরিচিত একজন জিজ্ঞেস করছিলেন। 
--ভালো, সৌজন্য মূলক উত্তর দিয়েছিলেন শ্যামাপদ। মনে মনে তিনি বলেন, আমার সংসার হল গিয়ে একটা ক্যাচালের জাগা। 

শ্যামাপদর ছেলে মেয়েরা যতদিন ঘরে ছিল ততদিন মোটামুটি ভাল ছিল। তারপর খালি ঘরে যখন শুধু মাত্র স্বামী-স্ত্রীর বাস শুরু হল তখন থেকেই ক্রমশ ক্যাচালের সূত্রপাত ঘটতে শুরু হল। মানে বাকবিতণ্ডা, কোন্দল, এক কথায় স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া যাকে বলে ! এই তো সেদিন শ্যামাপদর মুখ ফোঁসকে বেরিয়ে গেলো, মেয়ে ছেলের চোপা !

ব্যাস, কথাটা মুখ থেকে বেরনো উচিত হয়নি ভাবতে না ভাবতেই শ্যাম পদর কানে এসে ঠেকল, কি বললে তুমি ? মেয়ে ছেলের চোপা ! আমায় চোপা করতে দেখেছ কোন দিন ? অসভ্য ব্যাটাছেলে কোথাকার --পাশের বাড়ির দাস গিন্নিকে দেখেছ ? পড়তে তার পাল্লায়, একেবারে কাপড়ের কাছা খুলে ছেড়ে দিত ... 

স্ত্রীর শেষের দিকের কথাগুলি শ্যামাপদর মন্দ লাগেনি। স্ত্রী কাছা খুলে দিলে মন্দ কি ? কিন্তু সামাল, সামাল, চোপা, শব্দটা তিনি একটু বেশীই বলে ফেলেছেন, এখন কিছু সময় স্তব্ধ না থাকলেই নয় ! গিন্নির তোলপাড় চলছিল, আমি এত দিন কার ঘর করছি গো—এই সংসারের জন্যে আমি কি না দিন-রাত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে হাড়-মাস কালি কালি করে ফেললাম ... এবার বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা। ঠিক তাই, ফুসফাস শব্দ পাচ্ছিলেন শ্যামাপদ। শুভা চোখ মুছল, তার মানে ঠিক এখন চোখের বৃষ্টিপাত চলছে ! 

এমনটা প্রায়ই ঘটে। শ্যামাপদ আর শুভর মধ্যে। বাক যুদ্ধ, মাঝে মধ্যে তর্ক-যুদ্ধ জেতার সুবাদে নিজেকে নির্দোষ বিচার করতে গিয়ে মুখ থেকে ফসফস কিছু কিছু কথা বেরিয়ে যায় যা কিনা কখনও শ্যামাপদ বলতে চান না। বয়সের ধর্ম, কথা বলার স্পর্ধা, সহ্য শক্তির অভাব এ সব কিছু মিলিয়ে ওদের মনের মধ্যে একটা যুদ্ধ ক্ষেত্রের মহল সব সময় যেন তৈরি হয়েই থাকে। 

শ্যামাপদ এ কথা জানেন। অনেক পরিবারে নাকি এমনটা হয়। তলে তলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ব্যাটল ফিল্ড তৈরি হয়ে থাকে। নিজেদের মধ্যে কোন মীমাংসা নেই, বোজা-বুজির বালাই নেই। আর এ কারণেই সংসার জীবনের শেষ দিকটায় এত অশান্তি। তা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অন্য কারণও যে নেই তা না। এই গিয়ে বয়সে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের দৈহিক শ্রী কমতে থাকে, কাঁকলাস চেহারায় ঝড়ো কাকের মত কামনা-বাসনা বিসর্জনের সময়টাতে পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ-বিকর্ষণ আর কি ভাবে থাকতে পারে ? 

এ ঝগড়া যুদ্ধ থেকে মুক্তি পেতে কে না চায় ? শ্যামাপদ ভাবেন, কিন্তু সামনে দিয়ে কেউ অন্যায় কিছু বলে যাবে আর তিনি চুপ করে থাকবেন ? প্রতিবাদ না করলে মানুষের অস্তিত্ব টিকবে কি করে ? এমনটা তো হতে পারে না। তবু শান্তি কে না চায় ? মাঝে মাঝে মনে হয় সত্যি এই ঝগড়া, লড়াই কেন ? শুভা তো আমার স্ত্রী, তার দুটো কথা শুনলে কিই বা মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে !

শ্যামাপদ ঠিক করলেন, না, এ অশান্তি আর সহ্য করা যায় না। তিনি ভেবে চিন্তে শুভার কাছে গিয়ে প্রস্তাব পেশ করলেন, আমি ঠিক করেছি শুভা-- 

শুভা যেন তৈরি ছিল, বলে উঠল--আবার কি বদ মতলব আঁটলে ?

স্ত্রীর কথায় ঠিকঠাক জবাব মুখে এসে গিয়ে ছিল শ্যামাপদর, তিনি নিজেকে সামলালেন, ভাবলেন, না সংসারের শান্তির জন্যে আগে প্রস্তাবটা পেশ করা জরুরি। তিনি বললেন, আমি ঠিক করেছি সপ্তাহে একটা দিন পালন করবো--

স্ত্রী বলে উঠল, তুমি আবার কি পালন করবে ? ধর্মকর্ম ?

--ধর্মকর্ম না, নিয়ম, নিজেকে বাঁচাবার জন্যে একটা ব্যবস্থা--মৌনতা !

--কেন -- তোমায় মেরে ফেলছে শুনি ? 

ধীর গলায় হাসার চেষ্টা করে শ্যামাপদ বললেন, ঘরের শত্রু, বড় শত্রু ! 

শুভা উত্তেজিত হয়ে উঠল, কি আমি তোমার শত্রু ?

আর বাড়তে দেওয়া যাবে না, শ্যামাপদ চুপ হয়ে গেলেন। আগামী দিন গিয়ে শনিবার, ঠিক করলেন, ওই দিনই তিনি মুখে কুলুপ আঁটবেন। পরদিন শনিবার থেকেই শ্যামাপদ তাঁর নীরবতার ব্রত পালন করা শুরু করলেন। মৌন ব্রত ? না, কোন ব্রত নয়, শান্তির ব্যবস্থা। স্ত্রীর ওই খানখান বাসন পড়ার গলা আর তাঁর ভাল লাগে না। 

শ্যামাপদর দিনচারিতা আগের মতই চলল। নাওয়া, খাওয়া, বই পড়া, রোজের পত্রিকা পড়া, টিভি দেখা—নিত্যদিনের মতই সবকিছু চলছিল। কেবল তিনি বাকশুন্য রয়ে গেলেন। 

স্নানের বেলা পার হয়ে যাচ্ছিলো, স্ত্রীর গলা শুনতে পেলেন তিনি, কি স্নানের সময় হল ?

চুপ থাকলেন শ্যামাপদ। 

খাবার বেড়ে দিয়ে স্ত্রী হাঁক দিল, কি খেতে হবে ? নাকি উপাস ?

কথা বলার ঢং শুনে শ্যামাপদর মুখ উসখুস করে উঠলো, তাঁর মুখ চিড়ে প্রায় বেরিয়ে পড়ছিল, তা হলে তো ভালই হয়--রান্নাবান্না সব চাঙে তুলে দিতে পারো ! মনের মধ্যে সব উত্তর তাঁর গাঁথাই আছে। শুধু মুখ না খোলাটাই বুঝি আজের মৌনতা !

শ্যামাপদ শুনেছেন, সারা জীবনের স্বল্পভাষী মানুষগুলোও নাকি বয়সের তাড়নায় বগবগিয়ে বেড়ান। আর তিনি তো জীবনভর কথা বলে এসেছেন। তাই এ বয়সে কথার পৃষ্ঠে কথার যোগান যেন তাঁর ভিতর থেকে স্বয়ংক্রিয় ভাবেই বেরোতে থাকে ! 

না, রাতে কথা না বলার মানা নেই। যেমন সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত উপোষ করার নিয়ম চলে! সন্ধ্যে হয় হয় করছিল। শ্যামাপদর মনটা কথা বলার জন্যে বড় আকুপাকু করছিল। ঘরের বাইরে রাখা চায়ের খুড়ির চেয়ে সামান্য বড় হবে তাতেই রোগা প্যাকেটে একটা তুলসী গাছ দাঁড়িয়ে আছে, যেন অনেক কষ্টে সেটা বেঁচে আছে। তারই তলে শুভা রোজের মত সন্ধ্যা প্রদীপ দেখাতে যাচ্ছিলো। শ্যামাপদ মনে মনে আনন্দিত হলেন কারণ সন্ধ্যের পরই তো তাঁর কথা বন্ধের উপোষ ভঙ্গ হবে। 

আর কখনও হোক না হোক এই সন্ধ্যে দেবার সময়টায় শুভ বড় ভক্তিমতী হয়ে ওঠে। দিনভর মুখ ঝামটা-ঝামটির পর চক্ষু ঢুলুঢুলু রাখা তার ভক্তি। স্ত্রীর জারণ মুখটা দেখলে শ্যামাপদর যেন তেমন ভাল লাগে না। কারণ বোধহয় এটাই, সারা দিনের দাপাদাপির পর এই পাল্টা ভাবমূর্তি তাঁর কাছে মেকি বলেই মনে হয়। আর এই আজের শেষ বেলায় শ্যামাপদর মুখটা সত্যি ফচকে গেলো, আহা ভক্তিতে একেবারে গদগদ! 

শুভার মিটিমিটি চোখটা মোটা হয়ে খুলে গেলো। তুলসী তলা ভুলে গিয়ে সেও মুখ খুলল, এই, সারা দিনের পরে মিনসের মুখ খুললো--

শ্যামাপদ এবার আর মুখ না খুলে পারলেন না--আমি মিনসে হলে তুমি কি ? --মা---

হঠাৎ মুখ সামলে নিলেন শ্যামাপদ।

শুভা তুলসী তলার কাছে গিয়ে থেমে গেল, আধ শোনা কথা ধরে বলে উঠলো, বুড়োর ভীমরতি ধরেছে দেখছি--বৌকে বলে কি না--মা ! মাথাটা একেবারেই বুঝি গেছে !

শ্যামাপদ স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর মুখ থেকে শব্দটার অর্ধেক উচ্চারণ হবার কারণ তাঁর কাছে মৌন ব্রতের ফল বলেই মনে হল। তাঁর গাল বেয়ে দুষ্টু-মিষ্টি একটা হাসির রেখা নেমে এলো। 



Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.