Header Ads

Breaking News
recent

সুশান্ত কুমার রায়

সুশান্ত কুমার রায়








সময়ের আবহে আমাদের অনেক কৃষ্টি কালচার একদিকে যেমন আমরা হারিয়ে ফেলেছি, তেমনি দীর্ঘ সময়ের পথ পরিক্রমায় আবার অনেক নতুন নতুন কৃষ্টি-কালাচার যুক্ত হয়েছে আমাদের সংস্কৃতিতে। তথ্য প্রযুক্তির ডামাডোলে, মানুষের প্রয়োজনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে পুরনো অনেক কৃষ্টি-কালচার ক্ষয়ে গেছে আবার কোনোগুলো বিস্মৃত না হয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে অপার সম্ভাবনার বিষয়বস্তু হয়ে দাড়িয়েছে। আবার কোনটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তেমন কোন গুরুত্ব বা সুফল বয়ে না আনলেও সাংস্কৃতিক মূল্য বিচার্যে সেটির গুরুত্ব আজও অপরিসীম। 

কলাগাছের কথাই আসা যাক। কলাগাছ চেনে না বলা যায় এমন লোক পাওয়া খুব দুষ্কর । আর কলা একটি অতি পরিচিত ও সুস্বাদু ফল। কলাগাছ একটি হার্ব জাতীয় সপুষ্পক উদ্ভিদ। বাঙালির অতি প্রিয় ফল কলার কথা এখন থেকে দুহাজার বছর পূর্বের বৌদ্ধ ইতিহাসে পাওয়া যায়। অনেকে ধারণা করেন, ফলটির প্রচীনত্ব আরও অনেক বেশি। কলা অনার্য ভাষার শব্দ। খনার বচনে লঙ্কেশ্বর রাবণের কলার চাষকে জড়ানো হয়েছে। খনা বলে ভাদ্র মাসে রচয়ে কলা / সবংশে মরলো রাবণ শালা...॥ কিংবদন্তীর রাজা লঙ্কেশ্বর রাবণ কলার চাষ করতেন, তাই যদি হয়ে থাকে, তবে কবেকার কথা, ভাববার বিষয়। সাধারণত গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে কলা জন্মে। কলা এর আদি নিবাস দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা থেকে খ্রীষ্টপূর্ব ৬০০ সাল নাগাদ ভারতে আসে এবং সেখান থেকে পরবর্তীতে বিভিন্ন্ উষ্ণমন্ডলীয় দেশে কলা বিস্তার লাভ করে। সপ্তম শতকে বাংলাদেশে নিবিড় কলার চাষ হতো। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে আজও এক প্রকার জংলী কলা দেখা যায়। ভারতে কৃষি সভ্যতার ইতিহাস অন্তত পাঁচ হাজার বছরের। অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠীই মধ্য ও পূর্ব ভারতবর্ষে কৃষির প্রবর্তন করে। 

প্রাচীন সাহিত্য থেকে জানা যায় চাঁদ সওদাগরের সুবৃহৎ বাগানে বহু প্রকার কলা গাছ ছিল। এদেশে কলা চাষের লিখিত প্রমাণ রয়েছে খ্রিষ্টীয় পূর্ব ৬০০-৫০০ অব্দে বৌদ্ধ ইতিহাসে। কলা Musaceae পরিবারের Musa গণের অর্ন্তভূক্ত অপ্রকৃত নরম কান্ডবিশিষ্ট একটি উদ্ভিদ। পৃথিবীর নানা দেশে প্রায় তিনশত জাতের কলা জন্মে। আমাদের দেশে সর্বত্রই সারা বছর কলা জন্মে। তবে রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, গাইবান্ধা, ফরিদপুর, খুলনা, যশোর, নোয়াখালী, রাঙ্গামাটি, বরিশালসহ অনেক জেলায় প্রচুর পরিমাণে কলা উৎপাদিত হয়। আমাদের দেশে যেসব কলা উৎপাদিত হয় তার মধ্যে সাগর কলা )(Musa cavendhisi, Musa oranta, সাধারণ কলা (Musa paradisiaca) এবং বীচিকলা বা অ্যাইটা কলা (Musa sapientum sylvestris),সবরি, চিনিচম্পা, সিঙ্গাপুরি এবং মাহের সাগর উল্লেখযোগ্য। গুড়িকন্দ (Rhizome) থেকে বৃত্তাকারে কান্ডবেষ্টিত অবস্থায় কলার পাতা গজায়। কলাগাছের পাতা একক, সরল, বেশ বড় আকারের এবং প্রশস্ত। দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩৬৫ সে.মি. এবং প্রস্থে ৬১ সে.মি. পর্যন্ত হয়ে থাকে। আগেরকার দিনে ছাতা যখন অপ্রতুল ছিল তখন গ্রামগঞ্জে কান্ডসহ কলার পাতা ছাতার বিকল্প হিসাবে ব্যবহৃত হতো। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা কলা গাছের পত্রবৃন্ত দিয়ে (দন্ড) ঘোড়া ও পটকা এবং পাতা দিয়ে চশমা, বাঁশি ও ঘড়ি প্রভৃতি খেলনা তৈরি করে থাকে। সনাতন ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নিকট এ উদ্ভিদের প্রতিটি অংশই পবিত্র বলে মনে করা হয়। ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান সমূহের সাজ সজ্জায় প্রধান প্রবেশ পথের দুদিকে দুটি কলার গাছ পুঁতে রাখা হয় যা প্রাচুর্যের প্রতীক হিসাবে গণ্য করা হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপুজায় একটি স্বল্প বয়স্ক গাছকে নতুন শাড়ি পড়িয়ে নভপত্রিকার প্রতীকরূপে পূজা করা হয়। 

কালীপূজায় কলাগাছ পুঁতে কলাগাছের চারিদিকে মাটির তৈরি দিয়ারে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা হয় কার্তিকী অমাবস্যা তিথিতে। ঘোর ঘুট্টি অন্ধকারে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের দৃশ্য গ্রামে খুবই মনোমুগ্ধকর। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সর্বত্রই কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপান্বিতা কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও বিষহরি পূজায় কলার পটুয়া দিয়ে ভেলা তৈরি করে পুকুর বা নদীর জলে শোলার প্রতিমা ভাসিয়ে দেয়ার রীতি অতি প্রাচীন। বর্ষাকালে বন্যা প্রবণ অঞ্চলে কলাগাছ দিয়ে ভেলা তৈরি করা হয়। আর এই ভেলায় যাতায়াতের একমাত্র সম্বল হয়ে দাড়ায়। সহজলভ্য ও পরিবেশ বান্ধব হওয়ায় ফতেয়া, শ্রাদ্ধ, পূজা-পার্বণাদি, মহানাম যজ্ঞানুষ্ঠাদিতে প্রসাদ বিতরণে কলার পটুয়া বা পাতা সুদীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কলাগাছ হাতির প্রধান খাদ্য বা খোরাক হলেও কচি কলাগাছ কুচিকুচি করে মাছ সহযোগে রান্না করে মানুষের তরকারি খাওয়ার প্রচলন সুদূর প্রাচীন। বীচিকলা বা অ্যাইটা কলা খাওয়ার পর সেই কলার ছাল বা বাকলা কড়া রৌদ্রে শুকিয়ে তা আগুনে পুড়িয়ে ছাই তৈরি করা হতো। সেই ছাই পরিস্কার কাপড়ে বেঁধে জলে ভিজিয়ে রাখা হতো। সেটাকে আঞ্চলিক ভাষায় তখনকার দিনে ছ্যাকাপাড়া বলা হতো। সেই ছ্যাকাপাড়া জল দিয়ে ছ্যাকা (এক ধরনের তরকারি) ও পেলকা রান্না করতো সেই সময়কার দিনে বাঙালি রমণীরা। 

শুধু তাই নয় কাপড় ধৌত করার কাজে কলাগাছের ছোবড়ার ছাই পটাশিয়াম সমৃদ্ধ হওয়ায় এর ব্যবহার ছিল সাবানতুল্য। কলার গাছের পটুয়া কড়া রৌদ্রে শুকিয়ে তা দিয়ে ছ্যাকাপাড়া দিয়ে কাপড়-চোপড় ও কাঁথা ধোয়ার রীতি সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যিক। নব দম্পতির শুভ পরিণয়ে বিয়ে বাড়িতে কলাগাছ দিয়ে এখন সুদৃশ্য ও মনোরম গেট ও ছায়ামন্ডপ তৈরি হচ্ছে অতি সশ্রয় ও সহজলভ্যে। প্রতিটি কলাগাছ সাধারনত একটি পুষ্পমঞ্জুরিপত্র (মোচা) উৎপাদন করে। তবে কখনো কখনো একের অধিক পুষ্পমঞ্জুরিপত্র পরিলক্ষিত হয়। কলার মোচা বা মঞ্জুরিপত্র তরকারি হিসাবে খুবই সুস্বাদু ও উপাদেয়। কলার পুষ্পমঞ্জুরি বা মোচা নিয়ে বহুল প্রচলিত একটি ধাঁধা আজও মানুষের মুখে মুখে ফিরে আড়াবাড়ি থেকে বেরুলো টিয়ে / সোনার টোপর মাথায় দিয়ে। পুষ্পমঞ্জুরির নিচের অংশে স্ত্রী ফুল এবং উপরের দিকে পুরুষ ফুল থাকে। এক সময় নিচের দিকে নোয়ানো পুষ্পমঞ্জুরি কলার কাঁদিতে রূপান্তরিত হয়। প্রতিটি কাঁদিতে ৫-১৫টি গুচ্ছ এবং প্রতিটি গুচ্ছে ৬-২০টি একক লম্বাটে ফল ধরে। অনেক সময় পাশাপাশি দুটি ফল আংশিক একীভূত অবস্থায় দেখা যায় যাকে যমজ এবং আঞ্চলিক ভাষায় আমরা জামটিয়া কলা বলে থাকি। 

বৈজ্ঞানিক কোন ভিত্তি থাক বা না থাক কথিত ও প্রচলিত আছে যে, যামটিয়া কলা কোন বিবাহিত পুরুষ খেলে তাঁর স্ত্রীর সন্তান ‘লব-কুশ অর্থাৎ যমজ হয়। সেই জন্য যমজ কলা বিবাহিত পুরুষকে খেতে দেয়া হতো না তবে কোন বিধবা মহিলার খেতে কোন বিধি নিষেধ ছিল না। মালভোগ কলা ও দেশি গরুর খাঁটি দুধ দিয়ে হাতের মোগরা বা কব্জি ডুবিয়ে দুধ-ভাত না খেয়ে বাঙালি পরিতৃপ্ত হতো না। বীচিকলা বা অ্যাইটা কলাসহযোগে গম বা চালের গুড়া ভিজিয়ে জলপান খাওয়া হতো আগের দিনে। অথনৈতিকভাবে কলা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কলাকে নিয়ে লিখিত হয়েছে খনার বচন- যদি কলা রুয়ে না কেটো পাত / তাতেই কাপড় তাতেই ভাত”। অর্থাৎ কলাগাছ রোপণ করে যদি তার পাতা না কেটে সঠিকভাবে পরিচর্যা করা যায় তাহলে তাতেই সংসারের ভাত ও কাপড়-চোপড়ের চাহিদা বা প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। কাঁচাকলা সবজি হিসাবে খুবই উপাদেয়। সুস্বাদু ফল ও সবজি হিসাবে কলার ব্যবহার ও কদর ব্যাপক। কলাতে যথেষ্ট পরিমাণে শর্করা, সামান্য পরিমাণে প্রোটিন ও চর্বি আছে। কলা থেকে তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর ও উপাদেয় খাবার। আর পাকা কলার সাথে চিনি বা গুড় মিশিয়ে বাঙালি রমনীরা পিঠা তৈরিতে সিদ্ধহস্ত প্রাচীনকাল থেকেই। পাকা কলা থেকে তৈরি হয় মদ, বিয়ার ও সিরকা। শুধু তাই নয় পাকা কলার শুকনো গুড়া শিশু খাদ্য হিসাবে চকলেট ও বিস্কুট তৈরির উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়। আর কলা যদি আমাদের কাছে সুস্বাদু ও গুরুত্বপূর্ণ না হতো তাহলে বোধ করি বৃদ্ধাঙ্গুল উচিয়ে অন্যকে কলা দেখনোর প্রয়োজন ছিল কী ?




কোন মন্তব্য নেই:

সুচিন্তিত মতামত দিন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.