x

প্রকাশিত ৯৬তম সংকলন

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

রুমকি রায় দত্ত

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৬ |
রুমকি রায় দত্ত





আমি বললাম-‘ ইহ জন্মে শকুন্তলার কপালে আর দুষ্মন্ত সুখ জুটলো না। দুর্বাসার অভিশাপ তার প্রাণপ্রিয় প্রাণসখার প্রাণ হরণ করলো’।

সে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল—‘কিন্তু দুষ্মন্তর তো প্রাণ যায়নি,স্মৃতিভ্রষ্ঠ হয়েছিল মাত্র। অঙ্গুরিয় প্রদর্শন করা মাত্র ভুরভুর করে পূর্বকথা সব মনে পরে তারপর দু’হাত প্রসারিত করে সখি সখি বলে মুখ গোঁজে শকুন্তলার বুকে’।

আমি বললাম-‘আরে সে তো মহাকবি কালিদাস লিখেছিলেন তার মহাকাব্যে। আমার কি ভাই অত এলেম আছে যে, মহাকাব্য লিখবো?---আর ঘাসের মত যে ভাবে কবি লেখক জন্মাচ্ছেন—যা লিখতে যায় তা ই দেখি কেউ না কেউ লিখে ফেলেছেন। আর তাছাড়া এটা তো রিমেকের যুগ, তাই একেবারে কালিদাস কেই বেঁছে নিলাম। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রদের নিয়ে সৃষ্টি করেছি নতুন মোড়কে এক নতুন ‘দুষ্মন্ত-শকুন্তলা’ প্রণয় গাঁথা। শুনবে নাকি?---তবে মন দিয়ে শোনো’।

[২]

দূরে দেখা যাচ্ছে ছোট্ট পর্ণকুটির। মাথার উপরে খোলা আকাশ।

চারিদকে সবুজ বৃক্ষরাজি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। চকচক করছে কচি সবুজ পাতার চিবুক।নির্জন বনে এই পর্ণকুটির যেন প্রাণস্পন্দন হয়ে জেগে আছে ।কুহু-কু-হু-উ কোকিলের সুমিষ্ট কন্ঠস্বরের প্রতিধ্বনিতে ছিন্ন হচ্ছে ভোরের নিস্তব্ধতা। আশ্রমবাসী তরুণ ঋষিদের কানে এই সুমিষ্ট স্বর প্রবেশ করতেই জেগে উঠেছে তারা। পূবদিকে বকুল গাছের নিচে তখন ধ্যানমগ্ন ঋষি দুষ্মন্ত। শিশু সূর্যের পবিত্র কিরণ অন্ধকারের বলয় রেখা ভেদ করে এসে পড়েছে ঋষি দুষ্মন্তের দেহে।রাঙা দেহপল্লব ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে। চকচক করছে সোনার মত।প্রতিদিন রাত্রি শেষ প্রহরেই স্নান সাড়েন ঋষি।

প্রভাত স্নানের সময় আজ হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়ায় অনেকটা সময় বিফলে যায়। সেই থেকে ধ্যানমগ্ন হয়ে রয়েছেন ঠিকই কিন্তু চিত্ত স্থির রাখতে পারছেন না। কেমন যেন একটা আনমনা ভাব,শরীর জুড়ে অস্থিরতা। মনে ভাবছেন এ বিহ্বলতার কি বিশেষ কোনো কারণ আছে? কাকে শুধাবেন তিনি? এ গভীর অরণ্যে তার সমবয়সী এমন কেহ নাই যে, তার কাছে মনের অস্থিরতা ব্যক্ত করা যেতে পারে। শিষ্যরা সব কচি।তাদের কাছে ব্যক্ত করা বুঝি অরণ্যে রোদন হবে।ঋষি আর চোখ বন্ধ রাখতে পারলেন না। ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকালেন দূরে দন্ডায়মান পলাশ গাছটার দিকে। মনে মনে বললেন-‘বসন্ত এসে গেছে’। তবে কি বসন্তই এই চিত্ত চাঞ্চল্যের কারণ ?

যুগে যুগে মুনি ঋষিরা সংযমের কথা বলে এসেছেন। কিন্তু ঋষিরা সংযম ব্রত পালন করতে শুরু করলে ঋষি কুলের বৃদ্ধি ঘটবে কি করে?

চিত্তের মত চোখের মণিতেও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে ঋষি দুষ্মন্তর । দৃষ্টি গিয়ে স্থির হল কুটির প্রাঙ্গণে, ঋষিপত্নি কুন্তলা মুখ নিচু করে ফুল তুলছেন। তার পুরুষ্টু শরীরে ভরা যৌবণ,খোলা পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে ভেজা কালো একঢাল চুল। তার চকচকে নাসিকা শিখরে সূর্য কিরণ পিছলে পিছলে যাচ্ছে। হাওয়ায় তার কোঁকড়া কুন্তলকেশ মৃদুমন্দ দুলছে।

ঋষি দুষ্মন্ত বলে উঠলেন—‘ হে ঈশ্বর,অপূর্ব তোমার সৃষ্টি, তুমি নারী রূপে এমন এক বাদ্যযন্ত্র সৃষ্টি করেছ যে, ঋষির হৃদয়েও সুর তোলে’।
এই বলে তিনি আবার ধ্যানমগ্ন হওয়ার বিফল চেষ্টা করতে লাগলেন।

[৩]

স্বামী,

কুন্তলার সুরেলা কন্ঠস্বর শুনে এমন মুখভঙ্গি করলেন ঋষি যেন তিনি ধ্যানমগ্ন ছিলেন।ধীরে ধীরে চোখ খুললেন দুষ্মন্ত। সম্মুখে সদ্যস্নাত কচি পাতার মত দাঁড়িয়ে কুন্তলা। ঋষির হৃদয় পত্নিকে গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ করতে ব্যকুল হয়ে উঠলো।

কুন্তলা বলল—‘স্বামী, আপনার চরণ বন্দনা করবো। আমায় সুযোগ দিন’।

ঋষি দুষ্মন্ত পা দু’খানা বাড়িয়ে দিলেন দেবী কুন্তলার দিকে। দেবী কুন্তলা এক ঘটি স্বচ্ছ জল তার পায়ে ঢেলে আঁচল দিয়ে মুছিয়ে তাঁর চরণ বন্দনা করে, পা দু’টিকে রাখলেন একটি ফুল সাজানো থালার উপরে। তারপর অঞ্জলি ভরে ফুল নিয়ে ঋষির চরণে নিবেদন করে চরণে মাথা ঠেকালেন।

ঋষি তাঁর দুই হাতে দুই বাহু স্পর্শ করে তাকে তুলে নিলেন পায়ের উপর থেকে। বললেন—‘দেবী, তোমার স্থান আমার চরণতলে নয়, আমার হৃদয় মাঝে।

গুরুর প্রণয় দৃশ্য দেখা মহাপাপ। শিষ্যরা গুরু আর গুরুপত্নির নিবিঢ় আলাপনের সময় ধারে কাছেও থাকে না। সকলে চলে গেল যে যার কাজে। ঋষি দুষ্মন্ত আশ্রম জনহীন দেখে পত্নিকে আরও নিবিঢ় ভাবে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলেন। কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে জনহীন মনে হলেও সেখান যে আরও একটি প্রাণ জেগে আছে সেটা সকলের অজানা রইল।

দেবী কুন্তলা স্বামীর আলিঙ্গন পাশ ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালেন। হরিণের মত চপল পায়ে ছুটে গেলেন কুটিরে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে জোড়ে জোড়ে নিঃশ্বাস নিতে লাগলেন। তার পুরুষ্টু বক্ষদ্বয় হাঁপরের মত ওঠানামা করতে লাগলো। অপূর্ব সুবাস ছড়ানো বস্তুটিকে একটা থালায় রেখে তার উপরে পলাশ ফুল সাজিয়ে তুলে নিল নিজের হাতে।

ঋষি দুষ্মন্ত তাকিয়ে দেখলেন—কুন্তলা চপল কন্যার মত দুলকি চালে এগিয়ে আসছেন তাঁর দিকে, হাতে পলাশ ফুলের থালা। দেবী কুন্তলা যত এগিয়ে আসতে লাগলেন সুন্দর সুবাস তত বাতাসে ছড়াতে লাগলো।সেই সুবাস ঋষির নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করতেই কেমন যেন আনচান করে উঠলো ঋষির দেহমন।

দেবী কুন্তলা ধীরে ধীরে এসে থামলেন ঋষির সামনে। পাত্রটি নামিয়ে রাখলেন ঋষির পায়ের সামনে।

ঋষি চমকে উঠলেন। বললেন—‘ এ কিসের সুবাস? অপূর্ব এই সুবাসে আমার চিত্তে যে যন্ত্রণা বোধ হচ্ছে দেবী’।

আঁতকে উঠলেন দেবী কুন্তলা। বললেন—‘তবে থাক স্বামী, আমি এই বস্তুকে তবে দূরে ফেলে আসি’। 

ঋষি আঁতকে উঠে বললেন – ‘না না দেবী কুন্তলা এমন কাজ করো না। এ গন্ধে আমার মস্তিস্ক শিথিল হয়ে আসছে। আমার ধমণীতে রক্ত প্রবাহ দ্রুত হয়ে উঠছে। আমার দেহে সৃষ্টি হচ্ছে এক আবেশ। আমি হারিয়ে যাচ্ছি কোনো এক অতল গভীরে। ---যেন দীর্ঘকাল ধরে আমি এরই প্রতিক্ষায় ছিলাম’। তারপর প্রাণ ভরে সুবাসমাখা নিঃশ্বাস বায়ু গ্রহণ করে বললেন,---‘দেবী,এ বস্তু তুমি কোথায় পেলে?’

দেবী কুন্তলা কেমন যেন অপরাধীর মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বামীর মুখের দিকে চেয়ে। স্বামীর প্রশ্নে কাচুমাচু মুখে বললেন,  -- ‘ আজ প্রভাতে নিদ্রা ভঙ্গের পর হঠাৎ এই সুন্দর সুবাস আমি অনুভব করি। গন্ধের উৎস সন্ধানে উপস্থিত হই কুটির প্রান্তে। দেখি মুসিক সেখানে মাটি তুলে এক বিরাট গর্তের সৃষ্টি করেছে। আর ঐ গর্তের মধ্যে পড়ে থাকা বস্তুটির থেকেই নির্গত হচ্ছে এই সুন্দর সুবাস’। এই পর্যন্ত বলেই কুন্তলা পলাশ ফুল সরিয়ে ঐ বস্তুটি হাতে নিয়ে তুলে ধরে স্বামীর সামনে।

বস্তুটি দর্শন মাত্রই ঋষি দুষ্মন্ত ঝটিতে উঠে দাঁড়ালেন আসন ছেড়ে।তারপর চিৎকার করে বললেন ‘মৃগনাভি’! তাঁর সমস্ত মস্তিস্ক জুড়ে তখন তোলপাড় চলছে। অস্পষ্ট সব ছবি ছায়ার মত চোখের সামনে ভেসে উঠছে।একটা সুন্দর তপোবন—কতগুলি মুখ।কিন্তু এমন স্থানে তো তিনি ইহ জন্মে কখনো যাননি! বিষ্ময়ের ঘোর লাগা ঋষি দুষ্মন্ত অস্ফুটে বলে উঠলেন—‘তবে কি সেই সাত জন্ম ধরে বয়ে বেড়ানো অভিশাপ আজ পূর্ণ হলো? হে ঈশ্বর’ বলে তিনি একটা দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে আবার আসন গ্রহণ করলেন।

দেবী কুন্তলা স্বামীর এই অস্থির আচরণ দেখে স্থানুর মত দাঁড়িয়ে ছিলেন এতক্ষণ।স্বামীকে আসন গ্রহণ করতে দেখে লুটিয়ে পরলেন স্বামীর পায়ে। ঋষি দুষ্মন্ত পত্নি কুন্তলার চিবুকে হাত রেখে বললেন,--‘দেবী, আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে। এবার আমার বিদায় নেওয়ার পালা।সাত জন্ম ধরে যে প্রতীক্ষায় বারবার এই ধরাতলে এসেছি আজ সেই প্রতীক্ষার অন্তিম লগ্ন উপস্থিত’। দেবী কুন্তলা স্বামীর পা দুটি জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠেন।

ঋষি দুষ্মন্ত বলেন ‘ যাওয়ার আগে তোমার মনের সব প্রশ্নের অবসান ঘটাতে চাই।তবে শোনো কি সে কাহিনি আর কি সে অভিশাপ’।

দেবী কুন্তলা উঠে বসেন। ঋষি দুষ্মন্ত দূরে পলাশ গাছের দিকে তাকিয়ে শুরু করেন তাঁর কাহিনি।

[৪]

শকুন্তলা তখন সদ্য যৌবনে পা রাখা এক যুবতি। ভোরের শিশির মাখা পদ্মকলির মত তরতাজা আধ ফোটা এক কলি। বাঁধন ছাড়া হরিণীর মত সারা দিন সখিদের নিয়ে বনে বনে ঘুরে বেড়ায়। আশ্রমে সেদিন শকুন্তলা একাই ছিল।পিতা কহ্ন মুনি দীর্ঘ মাস যাবৎ আশ্রমে অনুপস্থি। তীর্থে গিয়েছেন।

এরই মধ্যে রাজা দুষ্মন্ত অরণ্যে এসেছেন মৃগয়া করতে। সারাদিন হরিণের পিছনে ছুটে পথ হারিয়ে চলে এসেছেন আশ্রমের কাছে। শকুন্তলা তখন সখিদের নিয়ে জলকেলিতে মত্ত। তৃষ্ণার্ত রাজা দুষ্মন্ত সরোবরের সন্ধানে এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াছেন।সরোবরের জলে শকুন্তলার জলকেলির কলকল-খলখল আওয়াজ শুনে ছুটে এলেন সেই দিকে। দেখলেন সরোবরের জলে পা ডুবিয়ে এক রূপবতী কণ্যা বসে আছে। আর এক সখি তার অবিন্যস্ত, অবাধ্য বক্ষ দ্বয়কে এক টুকরো সাদা বক্ষ বন্ধনীর আড়ালে আবদ্ধ করার বৃথা চেষ্টা করছে। যুবক রাজার শরীর-মন আনচান করে উঠলো।ঐ নারীকে নিজের আলিঙ্গনে আবদ্ধ করার আকাঙ্ক্ষায় আকুল হলেন তিনি। প্রেমরসে সিক্ত রাজা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন, যে কোনো উপায়েই হোক তিনি ঐ নারীর হৃদয় হরণ করবেন। 

ইতপূর্বে সখিদের মুখে ঐ যুবতির নাম শুনে তিনি জেনে ফেলেছেন ঐ যুবতির নাম শকুন্তলা। সয়নে-স্বপনে ঐ যুবতির নাম জপতে জপতে বেশ কয়েকটা দিন যে পার করে ফেলেছেন সে হুঁশ তাঁর লোপ পেয়েছে তখন। যুবতি ও তার সখি রাত্রিতে কুটিরে প্রবেশ করার পর তিনি কুটিরের দাওয়ায় রাত্রিবাস করে, প্রভাত হওয়ার আগেই সরে আসতেন সেখান থেকে ।সারা দিন আড়ালে থেকে লক্ষ করতেন শুকুন্তলাকে আর ব্যাকুল হতেন তাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়।

একদিন প্রভাতে রাজা সরোবরের জলে নেমে স্নান করছেন। জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শুনে ছুটে আসে শকুন্তলা আর তার সখি। অর্ধনগ্ন,জলে ভেজা রাজা দুষ্মন্তর রূপ মুগ্ধ করে শকুন্তলাকে। সে মায়াবী হরিণ চোখে তাকিয়ে থাকে রাজার দিকে। বুকের ভিতর তখন তার উথাল-পাথাল। রাজা দুষ্মন্ত জল থেকে লক্ষ করে শকুন্তলার বক্ষের ওঠা-পড়া। নিজেকে স্থির রাখতে পারে না। ছুটে এসে শকুন্তলার পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে তাকে প্রেম নিবেদন করে।

কহ্ন মুনির ফিরে আসার অপেক্ষায় না থেকে তার অনুপস্থিতেই রাজা দুষ্মন্ত বিবাহ করেন শকুন্তলাকে। সে বিবাহের সাক্ষী থাকে কেবল শকুন্তলার সখীরা। সারা তপবনের যত্রতত্র কেবল একে অপরকে প্রেম নিবেদন করেই তাদের দিনের পর রাত আর রাতের পর দিন কেটে যায়।

দীর্ঘ মাস কেটে গেছে রাজা দুষ্মন্ত তপবনে শকুন্তলার কুটিরে রয়ে গেছেন। প্রণয় ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। একটি মুহূর্ত আর তারা একে অপরকে ছেড়ে থাকতে পারেন। একদিন দুপুরে সরোবরের ধারে গাছের ছায়ার এসে বসেছে শকুন্তলা। দুষ্মন্ত পিছন থেকে এসে একটা সাদা পদ্মকলি গুঁজে দিলেন শকুন্তলার খোঁপায়। তারপর শকুন্তলার প্রশস্ত ঊরুতে মাথা রেখে শুয়ে বললেন,--‘প্রিয়ে, এবার তো রাজধানী যাত্রা করার সময় এসে গেছে’। শকুন্তলা খুশিতে দুলে উঠলো। পিতৃগৃহ ত্যাগ করে শ্বশুরালয়ে যাবে ,এতো ভারি সৌভাগ্যের কথা। শকুন্তলা বলল—‘প্রিয়, আমরা তবে কবে যাত্রা করবো?’

সত্য কথাটা জানাতে গিয়ে রাজার বুক কেঁপে উঠলো, কিন্তু সে নিরুপায় তাই, নিজের ব্যাকুলতাকে সামলে নিয়ে বলল—‘ এখন কেবল আমি যাব। তুমি এই তপবনে থাকবে আমার অপেক্ষায়’।

শকুন্তলা বলল—‘প্রিয়, আপনি চিরটাকাল এখানে থেকে যেতে পারেন না?’

রাজা দুষ্মন্ত বললেন,--‘তা কি করে হয় প্রিয়ে, সেখানে যে আমার সন্তানসম প্রজারা অনাথের মত দিন কাটাচ্ছে’।

শকুন্তলা দুষ্মন্তকে কপট রাগ দেখিয়ে বলল—‘ তবে যান, আপনি আজই চলে যান। এখানে এই হতভাগিনী আপনার বিহনে প্রাণ ত্যাগ করুক’।

দুষ্মন্ত শকুন্তলার চিবুকে হাত রেখে বলল—‘ ও কথা বলো না প্রিয়ে। তোমাকে ছাড়া এ হতভাগ্য জীবন বৃথা। তোমার পিতৃদেব তীর্থ থেকে ফিরে এলেই আমি তাঁর অনুমতি নিয়ে তোমাকে রাজধানী নিয়ে যাব’।

শকুন্তলা ছলনার রাগ দেখিয়ে রাজাকে ছেড়ে যাওয়ার উপক্রম করতেই রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে দুই বাহুর ভাঁজে তুলে নেয়। তারপর তার কপাল, চিবুক ও ওষ্ঠে চুম্বন করে তাকে শুইয়ে দেন কচি ঘাসের বিছানায়। সূর্য তখন অস্তাচলের পথে। রক্তিম সূর্যালোক এসে পড়েছে শকুন্তলার দেহে। রাজা দুষ্মন্ত আপন ওষ্ঠ নামিয়ে এনেছেন শকুন্তলার নাভিকমলে।

ঠিক এমনই সময় ঋষি দুর্বাসা প্রবেশ করলেন কুটির প্রাঙ্গণে। প্রণয় খেলায় মাতোয়ারা দুই নারী-পুরুষ টেরই পেলেন না ঋষির উপস্থিতি। কোপনস্বভাবের ঋষি নিজের ক্রোধ সংবরণ করতে পারলেন না। ঋষির হুংকারে প্রণয় খেলায় ইতি ঘটিয়ে ঋষির পায়ে লুটিয়ে পরলেন দুই জনে।কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। ঋষি দুর্বাসার অভিশাপে মৃত্যু কোলে ঢলে পড়েছেন দুষ্মন্ত আর শকুন্তলা পরিণত হয়েছে মৃগনাভির সুগন্ধে।

[৫]

কথা থামিয়ে আবার উঠে দাঁড়ালেন ঋষি দুষ্মন্ত। মৃগনাভির গন্ধে আজ সেই অভিশাপ মুক্তি ঘটেছে। ঋষি দুষ্মন্ত দেবী কুন্তলার হাত থেকে মৃগনাভিটি নিজের হাতে তুলে নিলেন। তারপর বললেন—‘ দেবী, এই সেই মৃগনাভি। আমার পরম আকাঙ্ক্ষিত শকুন্তলা এই নাভিকুন্ডের সুবাস হয়ে অপেক্ষায় আছেন। আজ আমাদের অতৃপ্ত দুই আত্মার মিলনক্ষণ উপস্থিত’। ---বলেই তিনি গভীর নিঃশ্বাসের সাথে বারে বারে সেই সুগন্ধ গ্রহন করতে লাগলেন। সুবাস ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ল ঋষি দুষ্মন্তর রক্তে, অস্থিতে,মজ্জায়। ধীরে ধীরে মিশে গেল শকুন্তলা তারঁ দুষ্মন্তর দেহের সাথে।


এতদূর বলেই আমি থেমে গেলাম। তাকে দেখে মনে হল আরো কিছু শোনার জন্য যেন সে অপেক্ষা করছে।
সে বলল---‘তারপর?’
আমি বললাম –‘তারপর আবার কি? সেটাতো মেগা সিরিয়াল যারা করবেন তাদের কাজ’।
সে বলল—‘একটু গুরুচণ্ডালী দোষ দেখছি যে’।
আমি বললাম--- ‘ওটায় তো। –এখনতো এমনটাই চলছে। বাংলার সাথে হিন্দি—উড়িয়া-ইংরাজি। আমিতো শুধু সাধু-চলিত কে মিক্স করেছি’।




Comments
2 Comments

২টি মন্তব্য:

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.