x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৬

অনিন্দিতা গাঙ্গুলী মন্ডল

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৬ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
অনিন্দিতা গাঙ্গুলী মন্ডল


এই ! কোথায় চললি ! সাড়া দিচ্ছিস না যে বড় ? তমোঘ্নর ডাক যেন কানেই পৌঁছচ্ছে না নির্ঝরের । তমোঘ্ন হ্যাঁচকা টান দিয়ে টিশার্টটা খামচে ধরতেই রিফ্লেক্সে একেবারে একশ আশি ডিগ্রি ঘুরে গেল নির্ঝর । দারুন আক্রমনাত্মক । কিন্তু তমোঘ্ন ছিটকে নিরাপদ দুরত্বে সরে গেল । তার গলায় এক রাশ বিস্ময় । আহত বিস্ময়ই বলা চলে ।

কি হল ? হঠাৎ খেপে গেলি কেন ? আমি তো ! নির্ঝরের তখনও যেন হুঁশ আসেনি । চোখে কিসের ঘোর । সামলে নিতে কয়েক সেকেন্ড । সে দুঃখিত হোল । সরি ওহ ভেরি সরি । আচমকা পেছন থেকে এসেছিস, বুঝতে পারিনি । তমোঘ্ন বলল হুঁ কদিন ধরেই লক্ষ করছি তুই খুব অন্যমনস্ক । কি ব্যপার ? এই অবধি বলে সে একটু ইঙ্গিত পূর্ণ হাসল । ওদিকে কি কেস খুব জটিল ? অন্য সময় হলে নির্ঝর এই খুনসুটিটা সহজ ভাবে নিতে পারত । কিন্তু এখন তার মনের অবস্থাটা সেরকম নয় । রুক্ষ স্বরে বলে উঠল তোদের এই এক চিন্তা ছাড়া অন্য কোনও চিন্তা নেই, না রে ? যত ভ্যাদভ্যাদে প্রেমের ন্যাকামি । যা হাট । ভাগ এখান থেকে । আমার পেছন ছাড় । কেন আসছিস বলত ? তমোঘ্ন হাসতে হাসতে দাঁড়িয়ে পরল । নির্ঝর আপনমনে বিড়বিড় করে গালাগালির বন্যা বওয়াতে বওয়াতে হাঁটতে থাকল ।

প্রখর জ্যৈষ্ঠ মাসের দুপুর । রোডের হল্কায় রাস্তার পিচ গলে যাচ্ছে । কিন্তু নির্ঝর এসবের তোয়াক্কা না করে হেঁটে চলেছে । বড় রাস্তায় একটা শাড়ির দোকানের দেওয়াল জোড়া শো কেসের কাঁচে নিজের ছায়াটা দেখতে পেল সে । রুক্ষ, অযত্নে বেড়ে ওঠা চুল । মুখ ভরা দাড়ি । শুধু চোখ দুটো খুব বেশি উজ্জ্বল ও তীক্ষ্ণ । কেন যে নিজেকে দেখে ভয় পেল কে জানে । সেই ছোট বেলায় তার মুখটা কিন্তু একেবারে অন্যরকম ছিল । নরম, পেলব, মিষ্টি । চোখ দুটো বড় বড় ছিল, তবে এমন তীক্ষ্ণ, অন্তরভেদী ছিল না । নিজেকে দেখতে দেখতে মুখ থেকে একটা গালাগাল বেরিয়ে এল । দুপুরের রোদ এত তীব্র যে নির্ঝরের মনে হচ্ছিল মাথায় একটা আগ্নেয়গিরি খুব শিগগিরি লাভা বইয়ে দেবে । দোকানের ম্যানেকুইনটা কালো কুচকুচে । লাল টকটকে বেনারসি পরিয়ে রাখা । যেন কালী ঠাকুর । ধ্যুত আর ভালো লাগছেনা । কিন্তু কি করবেই বা সে । বাড়ি তো যাওয়া অসম্ভব । একা একা ওই ঘরে ঢোকা । নাহ । এসব মাথায় ঘুরতে ঘুরতে নিজের অজান্তে কখন সে পায়ে পায়ে কলেজ স্ট্রিট থেকে বিবেকানন্দ স্ট্রিটের সরু গলিটাতে ঢুকে পড়েছে নিজেই খেয়াল করেনি । আর কি আশ্চর্য ! একেবারে শ্রুতিদের বাড়ি ! কী যে হয় ! মাথাটা অবিশ্বাসে নাড়তে নাড়তে সে বেল দিল ।

দরজা খুলে চোখ মুছতে মুছতে শ্রুতি একবার দেখে নিল নির্ঝর কে । এই কুকুর পাগল করা দুপুর রোদে কি ব্যপার ? নির্ঝর জানতে চায় , তুমি ঘুমচ্ছিলে নাকি ? হুঁ । নির্ঝর চেয়ে দেখল অন্ধকার করে রাখা ঘরটায় বাঁই বাঁই করে পাখা ঘুরছে আর ঘরের ভেতরটা বেশ ঠাণ্ডা । এত ক্ষণ রোদ্দুরে গরমে তেতে এখন এই ঠাণ্ডাটা তার ভালো লাগল না । কেমন যেন শীত করতে লাগল । বলল জানলাটা খুলে দাও না ।
- কী যে, মাথা খারাপ নাকি ? বাইরে বেয়াল্লিশ ডিগ্রি । নির্ঝর কষ্ট করে চাইল । দেখল শ্রুতির ঢিলে ঢালা কামিজের ওপর একটা লাল টকটকে ওড়না । চোখ মুখ ফোলা ফোলা । সুখী মেয়েদের যেমন হয় । তবে চোখ দুটো যেন কীরকম ছোট দেখাচ্ছে । গলার লাল ওড়নাটা যদি একটু চেপে বসে তবে চোখ দুটো বড় হয়ে যাবে। আর তখনই নির্ঝর দেখতে পাবে সত্যিটা কি । শ্রুতি ডেকে ঘরে বসাল। হঠাৎ এদ্দিন পর ? কি ভেবে ? নির্ঝর ওর অস্থিরতা নিখুঁত চাপা দিল। - কি আর ? এমনিই ! আসা বারণ ? শ্রুতি সোফায় বসতে বসতে বলল বারণ আর কি ? তোমাকে ইদানীং সহ্য করা বেশ কঠিন । লেখাপড়া কাজ কর্ম ছেড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ সারাদিন । মুখের যা ভাষা হয়েছে ? তোমার সাথে কোনও যোগাযোগ আর রাখার ইচ্ছে নেই আমার । নির্ঝর হাসে । তবে ঢুকতে দিলে কেন ? – সে চিনি বলে ! আর কি ? নির্ঝর সোফায় আসতে আসতে শ্রুতির দিকে সরে এল । কি হোল ? সরে বোসো । তোমায় আমি আর এত স্পেস দিতে রাজি নই বুঝলে ? – কেন ? আমার টাকা নেই বলে ? – টাকার জন্য নয় নির, তোমার এটিটিউড । বিশ্রি হয়ে গেছে। নির্ঝর আরও সরে আসে । ধীরে ধীরে শ্রুতির পিঠে হাত রাখে । আহ হাত সরাও নির । নির্ঝর নরম ফিসফিসে গলায় বলে এখনও তো নির বলা ছাড়নি । - ওটা অভ্যেস । - তাহলে পিঠে হাত রাখলে অসুবিধে কেন ? ও ও তো অভ্যেস । শ্রুতি হতাশ হয়ে সোফায় চোখ বন্ধ করে শরীরটা এলিয়ে দিল । নির্ঝর অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করল কি হোল ? চোখ বন্ধ করলে কেন ? – ঘুম পাচ্ছে নির । প্লিস বিরক্ত কোর না । - না না চোখ খোল চোখ খোল । আস্তে আস্তে নির্ঝর ওড়না টা চেপে ধরল । খানিক ক্ষণ । শ্রুতির চোখ দুটো খুলে গেল । খুব বড় বড় হয়ে । নির্ঝর মুখের ওপর ঝুঁকে পরে দেখল । নাহ শ্রুতি মিথ্যে বলেছে । জায়গা আছে জায়গা আছে । চোখে সত্যিটা আছে । সোফা থেকে উঠে পড়তে গিয়ে সে দেখতে পেল সোফার অপর প্রান্তে তমোঘ্ন বসে । সে হেসে ফেলল । ওহ তুই তাহলে এখন শ্রুতির বি এফ ? তমোঘ্ন হেসে মাথা নাড়ল । নাহ । ছিলাম, এখন আর নেই । - কেন ? আর পোষাল না ? – উঁহু, সেরকমটা নয় । - তবে ? – মানে একটু আগে পর্যন্ত ছিলাম । এখন নেই । শ্রুতিই তো নেই আর । - কেন ? শ্রুতি কোথায় গেছে ? এই তো শ্রুতি । বলে নির্ঝর শ্রুতিকে একটু ঠেলে দিল । শ্রুতি গড়িয়ে গেল সোফার ওপর । তমোঘ্ন চেয়ার ছেড়ে উঠল না । সেরকমই হেসে বলল - শ্রুতিকে তো আর বাঁচতে দিলিনা । নির্ঝর তাড়াতাড়ি ল্যাচ ঘুরিয়ে বেরিয়ে এলো বাইরে । উঃ কি দম বন্ধ ঘর । চারিদিক আটকানো । আবার উদ্দেশ্য হীন হাঁটা ।

হাঁটতে হাঁটতে একী ! সে কখন থানায় চলে এসেছে ! ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেল একটা উর্দি পরা লোক একটা চেয়ারে পা তুলে দিয়ে ঘুমোতে চেষ্টা করছে । নিশ্চয় নির্ঝর কিছু বলে থাকবে , লোকটা খিঁচিয়ে উঠল – হারামজাদা, এই গরমে জ্ঞান মারতে এসেচ ? কি চাই ? শালা আর সময় পাওনি ? দুপুর বেলায় ? নির্ঝর খুব শান্ত গলায় বলল একটা ডায়েরি নিন । রেনুকা ঘোষ ঠিকানা চারের বি রাধানাথ মল্লিক লেন বয়স ষাট । কাল বিকেল থেকে মিসিং । লোকটা চোখ কুঁচকে নির্ঝর কে একবার দেখল । আপনার নাম ? – নির্ঝর ঘোষ । লোকটা হেঁকে কাউকে একটা বলল এই শিগগির বড় বাবুকে খবর দে । বল রেনুকা ঘোষের ছেলে এসেছে । তারপর নির্ঝরের দিকে জলের বোতলটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল নিন জল খান । কি যে করেন । কোথায় ঘাপটি মেরে ছিলেন ? আপনার মা নিজে এসেছিলেন তো থানায় । নির্ঝর হতবাক হয়ে গেল । মা ? গলা নামিয়ে সে বলল – দেখুন জানিনা কে ষড়যন্ত্র করছে । কিন্তু মা কথা থেকে আসবে ? আপনি মিসিং ডায়েরি টা লিখুন । লোকটা মাথা নাড়তে নাড়তে টেবিলে হাত ঠুকতে লাগল । হুঁ লিখছি লিখছি । তাড়া কিসের ? আচ্ছা বলুন তো মাকে শেষ কোথায় কীভাবে দেখেছেন ? – বাড়িতে । টেবিলে খাবার গোছাচ্ছিল । - আপনার সঙ্গে শেষ কি কথা বলেছেন ? – বলল বাবু, যদি কাল থেকে কোনও কাজে না ঢুকিস তো আমি তোকে আর বসিয়ে খাওয়াতে পারব না । - তারপর ? – তারপর আমার মাথাটা কেমন গুলিয়ে গেল । আমি দেখতে চাইলাম মা মুখে যা বলছে মনেও তাই ভাবছে কিনা । মায়ের চোখ দুটো বড় করে দেখতে ইচ্ছে হল । দেখলাম চোখের ভেতরে অন্য কথা । - মানে নির্ঝর বাবু আপনি আপনার মাকে খুন করেছেন বলছেন ? উর্দি পরা লোকটার গলাটা অসম্ভব ঠাণ্ডা শোনালো । - হুঁ । - তারপর ? – তারপর থেকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি । আপনিই বলুন একা কখনও ঘরে থাকা যায় ? আজ দুপুরে রাস্তায় তমোঘ্নর সঙ্গে দেখা । ও হঠাৎ আমার জামাটা পেছন থেকে টেনে ধরল । ওর সঙ্গে একটু হাতাহাতি হয়ে গেল । ওকে ঠেলে দিলাম আর ও একটা থ্রিসি বাই ওয়ানের তলায় পড়ে গেল । আমি আর দাঁড়ালাম না । - দ্বিতীয় খুন । তারপর ? – আরে না মশাই, ও তো মরেনি । আমি হাঁটতে হাঁটতে কি করে জানিনা শ্রুতিদের বাড়ি চলে এলাম । শ্রুতি বলল নির তোমাকে আমি আর সহ্য করতে পারিনা । আমার মাথায় রোখ চেপে গেল । দেখতে চাইলাম শ্রুতি সত্যি বলছে কিনা । ওর চোখ দুটো বড় করে ফেলতেই দেখলাম ও মিথ্যে বলছে । - বাবা ! আপনি তো জিনিয়াস মশাই । অ্যাঁ ? তিন তিনটে খুন ! – আহ আপনি তো বিট খচ্চর ! তমোঘ্ন শ্রুতির ঘরে বসেছিল । বলছি ও মরেনি । - আচ্ছা আচ্ছা আপনি তবে দুটো খুন করেছেন । এতো ক্ষণে নির্ঝর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল । লোকটা কি গাধা । কিচ্ছু বোঝে না । হুঁ দুটো খুন ।

বাইরে সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে । থানার বড়বাবু ঢুকে এলেন। কি ব্যপার ? কোথায় পেলেন ? উর্দি পরা লোকটা বলল আজ্ঞে নিজেই এসেছে । বড়বাবুর পেছন পেছন ঢুকে এলেন রেনুকা দেবী। এসে নির্ঝরের মাথায় হাত রাখলেন । বাড়ি চল বাবু । নির্ঝর ভয়ে কেঁপে উঠল। ঠিক তখনই শ্রুতির দুপাট্টাটা নজরে এলো। টকটকে লাল। নির বাড়ি চল । পিঠে একটা আলতো হাতের ছোঁওয়া । এই বাড়ি যা । তমোঘ্নর গলা । দেখ মাসিমা চিন্তায় চিন্তায় কি অবস্থা করেছেন । নির্ঝর কুঁকড়ে এত টুকু হয়ে গেল । দুটো হাঁটুর মাঝখানে মুখটা চেপে লুকোতে চাইল । গলা দিয়ে অব্যক্ত একটা আওয়াজ বেরিয়ে এলো । একটা লম্বা কালো রঙের গাড়ি এসে দাঁড়াল । তা থেকে দুটো ষণ্ডা মার্কা লোক নেমে এলো । নির্ঝরের চেপে ধরা হাতে ঢুকে গেল একটা সিরিঞ্জ । হালকা লাগছে মাথাটা । আঃ । গান গাইতে ইচ্ছে করছে । কি যেন গানটা ? আমার প্রানের মাঝে সুধা আছে চাও কি ।


Comments
1 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.