x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

তাপসকিরণ রায়

sobdermichil | আগস্ট ১৫, ২০১৬ |
tapashkiran







দেশের বাড়ির কথা মনে পড়ছে। তখন ভারত, বাংলা দেশ কিংবা পাকিস্তান বলে আলাদা কিছু ছিল না। অখণ্ড ভারত ছিল। ইংরেজ দেশ ছাড়বে ছাড়বে করছে। দেশের বড় খারাপ অবস্থা—দাঙ্গা-ফাঁসাদ লেগেই থাকত। 

আমাদের ঢাকার খিদির পুর গ্রামের কথা। হিন্দু মুসলমানের রায়টের মহল চলছে তখন। এক ভীষণ উত্তেজনার মুহূর্ত চলছিল। প্রাণের ভয়ে আমরা রাত জেগে কাটাচ্ছিলাম। মনে আশঙ্কা, এই বুঝি রায়ট শুরু হয়ে যায়। আত্মরক্ষার জন্যে আমাদের হাতেও থাকতো চাকু, ছুরি, বল্লম এমনি ধরনের হাতিয়ার। কিন্তু ঐ পর্যন্ত, ও সব অস্ত্র দিয়ে যে নিজেদের ঠেকানো যাবে না তা আমাদের ধারণায় ছিল। 

আমাদের গ্রামের এক পাশে রহমান মুন্সির বাড়ি ছিল। তিনি সৎ ব্যক্তি ছিলেন। আমাদের ঘরের সঙ্গে রহমান মুন্সির ঘরের বেশ ভাব ছিল। তখনকার সমাজে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ভাববিচার ফারাকের কঠোরতা থাকলেও বাবার সঙ্গে রহমান চাচার বেশ ভাব ছিল। ওঁদের ঘরে আমাদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। আমি রহমান মুন্সিকে, চাচা বলে ডাকতাম। 

সেই সময়টা যখন রায়েট চলছিল রহমান চাচা বাবাকে বলে ছিলেন, দেখ দীনেশ, কোন সঙ্কোচ করিস না--তোরা আমার ঘরেই কিছু দিন থেকে যা--

তবু বাবা ঘর ছেড়ে কোথাও যেতে চাননি। মনে মনে ভেবে ছিলেন, তেমন অসুবিধা হলে যেতে তো হবেই ! বাবা বলতেন, আর কারও কথা জানি না, রহমানের কথা আমি জানি, ও আমার বন্ধু স্থানীয়, ছোট থেকে এক সঙ্গে বড় হলাম তো ! ওকে আমি চিনি--

সেদিন মাঝ রাতের দিকে গ্রামে হৈ-হল্লা পড়ে গিয়েছিল। আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়ে ছিলাম। ধড়ফড় করে জেগে উঠলাম। যার যার হাতিয়ার নিয়ে ঘরের বাইরে ছুটে এলাম। চীৎকার চেঁচামেচির শব্দ ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছিলো। খানিক পরেই আকাশে আগুনের শিখা আর ধোঁয়া দেখতে পেলাম। সেই সঙ্গে কানে এলো, চীৎকার আর আর্তনাদ। হ্যাঁ, নিশ্চয় রায়েট শুরু হয়েছে। মারকাট চলেছে। বাবা চাপা ভয়ার্ত চীৎকারে সবাইকে ডাক দিলেন, ঘর থেকে আমার মা, ঠাকুমা, পিসি সবাই প্রায় পড়িমরি করে ছুটে বাইরে বেরিয়ে এলো। 

বাবা আদেশের সুরে বলে উঠলেন, তাড়াতাড়ি সবাই রহমানের বাড়ি চলো ! 

দাঙ্গার লোকেরা মনে হল আমাদের কাছাকাছি এসে পড়ছে। আমরা ছুটতে ছুটতে গিয়ে রহমান চাচার ঘরের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাবা জোরে জোরে ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলেন। 

দরজা খুলে গেলো। আমরা হুড়মুড় করে রহমান চাচার ঘরে ঢুকে পড়লাম। এদিকে দাঙ্গাবাজেরা এগিয়ে এসেছে। রহমান চাচা আমাদের সবাইকে ওঁদের পেছনের দিকের একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিলেন। বাবাকে বললেন, দীনেশ, আমি না বলা পর্যন্ত তুই কিন্তু দরজা খুলবি না। বাইরে থেকে আমি তালা লাগিয়ে দিচ্ছি। ততক্ষণে রহমান চাচার বাইরের ঘরের দরজায় ধাক্কা পড়া শুরু হয়ে গেছে। বাইরে অনেক লোকের হল্লা হুজ্জত চলতে শোনা যাচ্ছে। বাইরে থেকে নেগবর আলীর গলা শোনা গেল, রহমান, দরজা খোলো, কাফের গ তুমি ঘরে জাগা দিছ ? নেগবর আলী, গাঁয়ের লোক। তবে লোকটা শয়তান দেমাগের ছিল। তা ছাড়া ওর মগজে ভরমার জাতি বিদ্বেষ ভরা ছিল। হিন্দুদের একদম ভালো চোখে দেখতে পারত না। বলতে গেলে এই নেগবরই দাঙ্গা দলকে উসকিয়ে এই গ্রামে নিয়ে এসেছিল। ওর উসকানিতে এর আগেও এ গাঁয়ে ছোট-খাটো এ ধরনের রায়েট ঘটে গেছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক হাওয়া গরম করার লোক তো থাকেই, সে সঙ্গে স্থানীয় শয়তান, দুষ্ট লোকরাও যোগ দেয়। আর এ ভাবেই শুরু হয় দাঙ্গা।

রহমান চাচা দরজা খুল ছিলেন না। উত্তেজিত মারমুখী লোকগুলি এবার দরজা ভেঙে হুড়মুড় করে ঢুকে গেলো রহমান চাচার ঘরে। ওদের উত্তপ্ত স্পষ্ট-অস্পষ্ট গর্জন, চীৎকার-হুল্লোড় আমরা শুনতে পারছিলাম। রহমান চাচাকে কেউ শাসাচ্ছিল, রহমান তুমারে আমরা সম্মান করি, আবার তোমারে কৈইতাছি-- ঐ হিন্দু কাফের গ তুমি বাইরে বাইর কইরা দাও--

রহমান চাচার দৃঢ় গলা শোনা গেলো, আমি পারুম না, হেরা আমার আশ্রিত, আমার বন্ধুর…

- হা হা হা হাসি দমক, আস্ফালন আমাদের কানে এলো, কেউ বলে উঠল, শেষ বারের মত কইতেছি, ওগো বাইর কইরা দাও ! 
- না, না, না, এক পাও আগাইবা না তুমরা ... রহমান চাচা দৃঢ় গলায় বলে উঠলেন। 
- তা হইলে আমরাই দেখতেছি ...

তারপর সোরগোল, চীৎকারের মাঝে, আল্লা হো আকবর, হল্লাবাজির মধ্যে বেশ জোর একটা আর্তনাদ, মনে হল, রহমান চাচার মৃত্যু আর্তনাদ শুনতে পেলাম আমরা। ভয়ে আমাদের বুক ধুক ধুক করে উঠল। 

মনে হচ্ছিল যেন আমরা বাস্তবতা হারিয়ে ফেলেছি--কোন দুঃস্বপ্নর ঘোরে রয়েছি ! তারপর বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল, কেউ এলো না--আমাদের দরজা ভাঙতে কেউ এলো না। শুধু ঘরের বাইরে চীৎকার কান্নাকাটির আওয়াজ হয়ে চলে ছিল। এ ভাবে ঘণ্টা খানেক কেটে গেলো। কান্নার যাওয়ায় কিছুটা কমে এলো। এক সময় চুপি সারে ঘরের দরজার তালা কেউ যেন খুলে গেল। আমরা ধীরে ধীরে দরজা খুলে পা টিপে টিপে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম, রহমান চাচার মৃতদেহ ঘিরে তার পরিবারের সবাই বিলাপ করছে। বাবাকে দেখে রহমান চাচী চীৎকার করে কেঁদে উঠলো, আপনার বন্ধু আর নাই গো দাদা ! 

আমরা স্তব্ধ হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। সেদিন রহমান চাচা নিজের জীবন দিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে গিয়ে ছিলেন। কেবল আকৃতি ধারণ করলেই কি মানুষ হওয়া যায় ? না কি মানুষের কোন জাত-ধর্ম হয় ? রহমান চাচা ছিলেন মানুষ ধর্মী একজন মানুষ। 


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.