x

প্রকাশিত | ৯৪ তম মিছিল

কান টানলেই যেমন মাথা আসে, তেমন ভাষার প্রসঙ্গ এলেই মানুষের মুখের ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারের কথাও মনে পড়ে যায়, বিশেষত আজকের দিনে। ভাষা দিবস মানেই শুধু মাতৃভাষা নিয়ে আবেগবিহ্বল হয়ে থাকার দিন বুঝি আজ আর নেই!

কেননা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা মাথায় বসে আছেন, বিশেষত যাঁরা রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাভােগী এবং লােভী, তাঁদের মুখের ভাষা এবং তার প্রয়ােগ আজ ঠিক কতটা শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় সেটা শুধু ভাবার নয়, রীতিমতো শঙ্কার এবং সঙ্কটের।

সবই কি তবে মহৎ ভাবনা, অনুপ্রেরণার জোয়ার? নাকি রাজনৈতিক কারবারিরা 'সুভাষিত' শ্রবণাতীত বয়ানে নিজেদের অক্ষমতার মদমত্ত প্রকাশ করছেন? সাধারণ ছাপােষা মানুষ বিস্ফারিত চিত্তে এই ভাষাসন্ত্রাস,এই ভাষাধর্ষণ দেখতে শুনতে ক্লান্ত। এর থেকে উত্তরণের উপায় এখনও অবধি কোনাে ভাষা দিবস দেখাতে পারেনি। এবারের ভাষা দিবসের কাছেও কি সেই উপায় আছে? নাকি এই খেলা হবে, চলবে ... মেধাহীন গাধাদের দৌলতে?

চলুন মিছিলে 🔴

সোমবার, আগস্ট ১৫, ২০১৬

শ্রীশুভ্র

sobdermichil | আগস্ট ১৫, ২০১৬ | | মিছিলে স্বাগত
suvro








বৃটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন ভারত অতিক্রম করে এল সাত সাতটি দশক। একটি দেশের পক্ষে খুব একটা বেশি সময় না হলেও একেবারেই কম সময় নয় কিন্তু। মধ্যবর্তী সময়ে নানান ঘটনার ঘনঘটার ভিতর দিয়ে ভারতবর্ষ আধুনিক যুগে পা রেখে দাঁড়িয়ে! কিন্তু প্রশ্ন জাগে আমরা ভারতীয়রা কতটা আধুনিক হতে পেরেছি? পেরেছি কি স্বাধীনতার মর্য্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে? পেরেছি কি আধুনিক উন্নত বিশ্বের সমগোত্র হয়ে উঠতে! বিশ্বসভায় তাদের সাথে একাসনে বসতে? পরিসংখ্যানতত্ব অনুযায়ী হয়ত নানা মুনির নান মত হতে পারে! কিন্তু এটাও ঠিক আজকের ভারত অনেকগুলি ভারতেরই মুখচ্ছবি। সেখানে টাটা বিড়লা আম্বানীদের ভারতের সাথে আসি যাই মাইনা পাই এর ভারত থেকে একশ দিনের কাজের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ভারতও রয়েছে। শোষক ও শোষিতের ভারত, ঠগবাজ ও ঠকে যাওয়াদের ভারত। গুছিয়ে নেওয়া ও না গুছিয়ে নিতে পারার ভারত সব একসাথেই স্বাধীনতার সাতটি দশক অতিক্রম করে ফেলল। কিন্তু ভেবে দেখার সময় এসেছে স্বাধীনতার জন্যে শহীদ হওয়া হাজার হাজার মানুষগুলি স্বাধীনতার যে স্বপ্নগুলি দেখেই আত্মত্যাগ করেছিলেন একদিন, আজকের এই এতগুলি রকমের ভারত কি সেই স্বপ্নগুলিরই সার্থক প্রতিচ্ছবি? না কি স্বাধীন ভারতের সাতটি দশক সেই স্বপ্নগুলি থেকে ক্রমাগত দূরবর্তী পথে গড়িয়ে যাওয়ারই প্রতিচ্ছবি? স্বাধীন ভারত আজকে সমৃদ্ধি উন্নয়নের যে ধাপে অবস্থান করছে, সেটাই কি সাত দশকের স্বাভাবিক ও কাম্য অর্জন? বিশেষ করে এই একই সময়সীমায় চীনের তাক লাগিয়ে দেওয়ার মত প্রভূত উন্নতি! যুদ্ধ বিদ্ধস্ত জাপানের বিস্ময়কর ভাবে ঘুরে দাঁড়ানো! প্রভৃতি বিষয়গুলি কি আমাদের ভেবে দেখার সময় আসে নি?

স্বাধীনতার স্বরূপ ও বিকাশ সকল দেশেই একভাবে সম্ভব হয় না! হয়ওনি! অন্তত ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই সেটা অনুধাবন করা অসম্ভব নয়! কিন্তু তবু ভারতবর্ষের মতো সুপ্রাচীন এবং উন্নত সভ্যতার একটি ভূখণ্ড সম্বন্ধে আশার মাত্রাটি তীব্র হওয়ারই কথা! বিশেষ করে ভারতবর্ষ এবং চীনের প্রাচীনত্বের ঐতিহাসিকতা প্রায় সমান্তরাল যেখানে! আর ঠিক এই জায়গাতেই অনুসন্ধান করা প্রয়োজন কোন কোন বিষয়ে আমাদের দূর্বলতা রয়ে গিয়েছে আজও! যে যে বিষয়গুলি আমাদের কাম্য সমৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে প্রবলভাবে! দূর্ভাগ্যের বিষয় ভোট সর্বস্ব রাজনীতির যাঁতাকলে পড়ে আমাদের অবস্থা হয়েছে, থোর বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোরের মতোই!

আধুনিক ভারতের এই সংসদীয় গণতন্ত্র নিয়ে আমাদের যে গর্ব সেই গর্বের অন্তরালে প্রকৃত বাস্তবতাকে কি আমরা চোখ কান বুঁজেই ভুলে থাকতে চাই না? গণতন্ত্রের মূল কথা কি? জনগণের সার্বিক উন্নয়ন। শাসন ক্ষমতার প্রতিটি স্তরেই জনগণের অবাধ অংশগ্রহণ। রাষ্ট কর্তৃক জনগণের সুরক্ষা সমৃদ্ধি সুশাসন নিশ্চিতকরণ। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার এই সাত দশকে এই বিষয়গুলি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে ঠিকমত? ভেবে দেখতে হবে সেইটি। প্রতিদিনের খবরের কাগজে আমরা যে ভারতবর্ষের ছবি দেখতে পাই, সেই ছবিগুলি আমাদের সামনে ঠিক কোন সত্য তুলে ধরে? বস্তুত আমরা সবাই জানি আজকের ভারতবর্ষে গণতন্ত্র আর প্রহসন এই শব্দদুটি এমনই সার্থক ভাবে জুড়ে গিয়েছে যে এই দুটিকে আর আলাদা করা যাচ্ছে না কিছুতেই। কথাটা একটু ভুল হয়ে গেল না কি? এই দুটি শব্দকে কি সত্যিই আর আলাদা করতে চায় আজকের ভারত? চাইলে তবেই না পারা আর না পারার প্রশ্ন! ভারতীয় গণতান্তিক প্রহসনের দুইটি দিক। এক দিকে এই প্রহসনের ননীমাখন খাওয়ার জন্যে সংসদীয় সিঁড়ির প্রতিটি ধাপেই পরস্পরকে কনুইয়ের গুঁতোতে কাৎ করে ফেলে পরের ধাপে উঠে আরও বেশি পরিমাণে মাখনের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম। যাকে গালভরা পরিভাষায় বলা হয়ে থাকে রাজনৈতিক ভাবে মোকাবিলা। আর অন্য দিকে গণতন্ত্রের গড়িয়ে পড়া উচ্ছিষ্ট ননী মাখন খাওয়ার জন্যে আপামর জনসাধারণের দীর্ঘ লাইন। হ্যাঁ সেই লাইনেও কেবলই বেলাইন প্রবণতায় সকলেই চলেছে সকলের আগে। এই কি বিগত সাত দশক ব্যাপি সময় সীমায় স্বাধীন ভারতের মূল চিত্র নয়? আর এই চিত্রেরও বাইরে পড়ে থাকে আরও একটি বিস্তৃত ভারত। একশ দিনের কাজের লাইনেও যাদের দাঁড়ানোর উপায় রাখা হয় না। যে ভারতকে আমাদের করে কম্মে খাওয়া আমারটা আমি গুছিয়ে নিয়েছি বলতে পারা ভারতবর্ষের সাথে মেলানো যায় না কোনভাবেই। স্বাধীনতার সাত সাতটি দশক তাদের উপর দিয়েও বয়ে চলে গিয়েছে কিন্তু।

অন্য বস্ত্র বাসস্থান। স্বাস্থ্য শিক্ষা জিবিকা। যে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রতিটি জনগণের এই মৌলিক অধিকারগুলি সুরক্ষিত নয়, সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থা যে তন্ত্রের উপরেই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, কোন দেশের পক্ষেই তা কাম্য হতে পারে না। সাত দশকের স্বাধীন ভারত যে এই প্রাথমিক ও প্রধান বিষয়টিতেই পিছিয়ে পড়ে রয়েছে, পিছিয়ে পড়ে রয়েছে বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশগুলির থেকে সেই বিষয়ে কারুরই কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। অনেকেই ভাবতে পারেন বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতবর্ষকে নিঃস্ব করে দিয়ে চলে যাওয়ার পর, সেই শূন্য অবস্থান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে গেলে সাতটি দশক যথেষ্ট নয়। তাঁদেরকে একটু, একই সময় সীমায় চীন জাপান জার্মানীর উত্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়াই হয়তো যথেষ্ট। কিন্তু আমাদের ভেবে দেখার সময় এসেছে কেন একই সময় সীমায় আমরা এই তিনটি দেশ থেকে এত পিছিয়ে রয়েছি। আজকে কেউই উন্নত বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে চীন জাপান জার্মানীকে এক সাথে রাখলেও ভারতবর্ষকে সেই সারিতে স্থান দিতে পারে না? আজকে ভাবতে হবে এই লজ্জার উৎসটি ঠিক কোথায়? ঠিক কোন কোন কারণগুলি জনগণের সার্বিক ও কাম্য উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে? কেননা একটি দেশে কজন টাটা বিড়ালা আম্বানী বেড়ে উঠলো সেটাই শেষ কথা নয়, শেষ কথা দেশের আপামর জনসাধারণের জীবন যাপনের মান স্বাস্থ্য শিক্ষা ও গড় আয় ও ব্যায় ক্ষমতা এবং সঞ্চয় ও বিনিয়োগে অংশগ্রহণের সামগ্রিক চিত্রই। আমাদেরকে সেই সেই কারণগুলির উপরেই জোর দিতে হবে, যেগুলি এই বিষয়গুলি থেকে জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশকেই ক্রমাগত দূরবর্তী অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে। 

পরিসংখ্যানবিদরা নানান পরিসংখ্যায় অনেক তর্ক করতে পারেন। রাজনীতিবিদরা সেই পরিসংখ্যানের নির্বাচিত খতিয়ান দেখিয়ে জনসাধানরণকে বিভ্রান্ত করতে পারেন নানান ভাবে। কিন্তু খুব সাধারণ ভাবেই একটি কথা বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয় জনসাধারণকে জনসম্পদে পরিণত করতে না পারলে কোন দেশই কোনভাবে কাম্য উন্নয়ন ঘটাতে পারে না। এখন ভারতবর্ষের মুশকিল হচ্ছে জাতি ধর্ম সম্প্রদায় ভাষা ও শ্রেণী বিভক্ত এই ভূখণ্ডে জনসাধারণ বলতে কেউই অখণ্ড কোন সত্ত্বা অনুভব করনে না। করতে পারেন না। ঠিক যেমনটি করতে পারে চীন জাপান জার্মানির মতো দেশগুলিও। যারা বিগত সাত দশকেই উন্নত দেশগুলিকে ধরে ফেলেছে সার্বিক ভাবেই। ভারতীয় ভূখণ্ডে এই বোধ জাত পাত শ্রেণী বিভাজিত মানসিকতায় খণ্ডিত। তাই সমগ্র জনসাধারণের কথা মাথায় রাখতে পারি না আমরাও। সব রকম দুর্নীতির প্রসঙ্গ ছেড়ে দিলেও, এই মূল জায়গাটিতে এসে আমরা বিভ্রান্ত সকলেই। বিশ্বের অন্যান্য দেশের থেকে ভারতবর্ষের বৈশিষ্ট, এটি একটি দেশ নয়! অনেক দেশের সমাহার! এটি একটি ভূখণ্ড। সঠিক ভাবে বলতে গেলে ভারতীয় উপমহাদেশ। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ তার শাসন ও শোষনের সুবিধার্থে ভারতবর্ষকে একটি শাসনতন্ত্রে বেঁধে ছিল! এই যে এত বিভিন্ন জাতি সংস্কৃতি ভাষা সমন্বিত এতগুলি দেশ মিলে ভারতবর্ষ, তাকে একটি সাধারণ শাসনতন্ত্রের অধীনে একটি দেশের রূপ দিলে দেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় জাতীয়তাবাদী স্বরূপটি ঠিকমতো গড়ে উঠতেই পারে না! বিশ্বে কোনো কালেই এমন নজীর নেই কোথাও! ফলে সবাই যে যার আখের গুছিয়ে নিতেই ব্যস্ত! যে কোনো দেশ একজাতি এক সংস্কৃতি এক ভাষা না হলে, তার কোনো জাতীয়তাবাদী দেশীয় চরিত্র গড়ে ওঠে না! এটাই ভারতবর্ষের মূল প্রতিবন্ধকতা! আর ঠিক এই কারণেই সমগ্র জনসাধারণ বলতে যে সমগ্রতার অনুভব জেগে ওঠার কথা, তা জায়মান নয় কোন ভারতীয়রই চেতনায়। সেই কারণেই জনসাধারণ মানেই যে জনসম্পদ নয়, জনসাধারনকে যে জনসম্পদে রূপ দিতে হয় প্রতিনিয়ত নিরন্তর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, সেই বোধ ও ন্যূনতম প্রাথমিক ধারণাটুকুও গড়ে ওঠেনি আমাদের। না, স্বাধীনতার সাত সাতটি দশক অতিক্রম করেও নয়। আর সেইটাই প্রতিফলিত হয়ে থাকে আমাদের সকল পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সকল অর্থনৈতিক প্রকল্পসহ যাবতীয় কার্যক্রমে। 

এখন প্রশ্ন হলো, জনসাধারণকে জনসম্পদে পরিণত করার প্রাথমিক শর্তগুলি কি কি? আগেই বলা হয়েছে অন্য বস্ত্র বাসস্থান, স্বাস্থ শিক্ষা জিবিকার কথা। প্রাথমিক এই মৌলিক অধিকারগুলি প্রতিটি দেশবাসীর জন্যে সুরক্ষিত করতে না পারলে জনসম্পদ আসবে কোথা থেকে? প্রতিটি উন্নত দেশ কিন্তু এই জায়গাতেই হাত দিয়েছিল সকলের আগে। কথায় বলে গোড়ায় জল না দিয়ে আগায় জল দিলে আখের লাভ হয় না আসলেই। আমাদেরও হয়েছে ঠিক তাই। আর এইখানেই রাষ্ট্রের প্রাথমিক কর্তব্যই হলো স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উপর সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া। যাতে প্রতিটি দেশবাসীকে এই স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুরক্ষার আওতায় নিয়ে আসা যায় সমান গুরুত্বে। জনসম্পদ উন্নয়েনের এইটাই চাবিকাঠি। এর কিন্তু কোন বিকল্প নাই। না স্বাধীন ভারতের নজর কোনদিনই এইদিকে পড়ে নিই। অনেকেই তর্ক করতে পারেন বিভিন্ন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার খতিয়ান দেখিয়ে। বলতে পারেন সরকারী বিদ্যালয় ও হাসপাতাল থেকে শুরু করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কথাও। বলতে পারেন সরকারী স্বনির্ভর নানার পরিকল্পনার কথাও। এমনকি বলতে পারেন দু টাকা কেজি চালের মতো বিভিন্ন সরকারী দান খয়রাতির কথাও। না এর কোনটাই যে যথেষ্ট ও কার্যকরি নয় আদৌ, সেই চিত্রই আসলে স্বাধীনতার প্রথম সাত দশকের প্রধানতম চিত্র এই ভারতবর্ষের। 

একটি পরাধীন ভূখণ্ডের স্বাধীনতা যখন অর্জনের পথে না হয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের পেছনের দরজা দিয়ে হয়, তখনই সেই ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ ঠিক হয়ে যায়। যতদিন না সেই ভূখণ্ডে প্রকৃত সমাজ বিপ্লবের সূচনা হচ্ছে। ভারতীয় এই ভূখণ্ডে যাকে আমরা ভারতবর্ষ বলে একটি সংসদীয় গণতান্তিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় দেখতে পাচ্ছি; ঠিক সেইটিই ঘটেছে। আর তাই এখানে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে বৃটিশের বদলে যে শ্রেণীর হাতে ক্ষমতার পতকা উঠেছে, তাদের স্বার্থ রক্ষার্থেই ভারতীয় সংবিধান তার বর্তমান আকৃতি পেয়েছে। এই মূল সত্যটি না বুঝলে বাকি সব অর্থহীন। তাই একটি দেশের জনসাধারণের সার্বিক উন্নয়নের যে চিত্র আমরা উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশের ক্ষেত্রেই দেখতে পাই, ভারতবর্ষে তা দেখা যায় না। যায়নি স্বাধীনতার সাত সাতটি দশকেও। আর সেই কারণেই বর্তমানে রাস্ট্রীয় সরকারী বরাদ্দের যৎসামান্নই নির্ধারিত হয় স্বাস্থ্য শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রেও। এবং সেই বরাদ্দও নানান ধরণের দূর্নীতির বেড়াজাল ডিঙিয়ে বৃহত্তর জনসাধারণের কাছে যেটুকু গিয়ে পৌঁছায় তাতে আর যাই হোক জনসম্পদ তৈরীতে তা আদৌ যথেষ্ট নয় কোন ভাবেই। তাই প্রতিবছর এই প্রধানতম জায়গাটিতেই বিপুল ঘাটতির বোঝা নিয়ে ধুঁকতে থাকে সেই ভারতবর্ষই যে ভারতবর্ষকে আমাদের করে কম্মে খাওয়া আমারটা আমি গুছিয়ে নিয়েছি ভারতবর্ষ অনুভবই করতে পারে না। স্বাধীন ভারতের এও এক বড়ো ট্র্যাজেডি। 

স্বাধীন ভারতের বিগত সাতটি দশক প্রতিটি দেশবাসীর জন্যে সামাজিক সুরক্ষার বন্দোবস্ত করার বিপরীতে সমাজের এক শ্রেণীর মানুষের জন্যে দূর্নীতির রামরাজত্বে অংশগ্রহনের ছাড়পত্র পাইয়ে দেওয়ার এক বিচিত্র ইতিহাস। এবং সেই ইতিহাসকেই সাইনিং ইণ্ডিয়ার প্রচারে বেশ সফল ভাবেই কাজে লাগানোর ধারাবাহিকতায় উদ্যোগী প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলই। কেননা প্রত্যেকেরই লক্ষ্য একটই। ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে জনগণের টাকার উপর একছত্র অধিকার কায়েম। তাই প্রতিটি দলই আদতে পূর্ববর্তী সরকারের সার্থক অনুসরণকারী। গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাসের এই হলো সাত দশক ব্যাপি মেগা শো। মেগা হিট। ঠিক এই মেগা হিট মেগা শোয়ের অন্তরালে পড়ে রয়েছে সেই ভারতবর্ষ যাদের কাছে স্বাধীনতা মানে একটি বিশেষ দিনের বিশেষ পতাকা উত্তলন ছাড়া আর কিছুই নয়। কোনরকম পরিসংখ্যান তথ্যের খতিয়ান দেখিয়েও ঢাকা দেওয়ার উপায় নেই এই চরম সত্যকে। 

দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির যে গল্পে আমাদেরকে বিভোর রাখা হয় প্রতিদিন, তাই যদি সত্য হতো, তবে তো কথাই ছিল না। কিন্তু আমাদের এই নাগরিক জীবনের চারপাশে আমরা প্রতিদিন যে বিত্ত বৈভবের আস্ফালন থেকে উদ্ভাসন প্রত্যক্ষ করি, তাতে করে আমাদের নাগরিক ঠুলি পড়া চোখে ভারতীয় সমৃদ্ধির গল্প যতই সত্য হয়ে উঠুক, সেই সত্য দিয়ে ঢাকা দেওয়া যাবে না সমগ্র ভারতবর্ষের সামগ্রিক দৈন্যদশাকে। জনসাধারণের দশ শতাংশ মানুষের স্বচ্ছলতার চিত্রে যারা ভুলে থাকতে অভ্যস্থ বাকি অংশের বৃহত্তর চিত্রটিকেই, তাদের আর যাই হোক দেশপ্রেমিক বলা যায় না কোন ভাবেই। এটাই আমাদের অন্যতম অসুখ। আমরা বস্তুতু কেউই দেশপ্রেমিক হয়ে উঠতে পারিনি বিগত সাত দশকব্যাপি তথাকথিত স্বাধীনতার চর্চাতেও। কিন্তু কেন? এই বিষয়টির মূল গুরুত্বও ভারতবাসী হিসেবে আমাদের চেতনায় ধরা দেয়নি আজো। বস্তুত ঐতিহাসিক ভাবেই ধরা দেয়নি। দেয়নি ইতিহাসের অতি স্বাভাবিক নিয়মেই। ভারতবর্ষ একটি সমগ্র দেশ হিসাবে আমাদের চেতনায় কখনোই জায়মান হয়ে ওঠে নি। কিন্তু কেন? 

জাতীয়তাবোধের উৎসরণ ব্যতীত স্বাধীনতার সুফল দেশের সর্ব শ্রেণীর জনগণের জন্য সুনিশ্চিত করা যায় না! যেতে পারে না! বিশ্বের সমস্ত উন্নত দেশগুলির উন্নয়ণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাজাতির প্রতি প্রীতি ও ভালোবাসাই দেশীয় উন্নতির ভিত্তি সরূপ! আর সেই স্বাজাত্য প্রেমই পারে গোটা জাতিকে এক সূত্রে বেঁধে রাখতে! ঠিক এইখানেই পিছিয়ে পড়েছে ভারতবর্ষ! এতগুলি স্বতন্ত্র জাতি তাদের স্বাতন্ত্র অতিক্রম করে ভারতীয় জাতীয়তার মোহ কল্পনায় ঐক্যবদ্ধ হবে, সে নেহাতই কষ্টকল্পনা! স্বভাবতঃই তা হয়ওনি! আর সেই একতাবোধের অভাবেই ভারতীয় জাতিসমূহে দূর্নীতির প্রাদুর্ভাব! দুঃখের বিষয়, এই সরল সত্যটি আমরা আজও বুঝি না! 

স্বাধীনতার পর গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে এই যে দূর্নীতির ব্যাপক বিকাশ তার মূলে এই কারণগুলিই মূল নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছে! একদিকে দারিদ্র্য বৃদ্ধি ও অন্যদিকে এক শ্রেনীর বিত্তশালীর হাতে দেশের সম্পদের উপর একচ্ছত্র অধিকার! আর সেই অধিকার চর্চার জন্যই সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা! দেশের সার্বিক বিকাশের পক্ষে যা প্রধান অন্তরায়! ফলে অন্ন বস্ত্র বাসস্থান সহ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলি আজও সুরক্ষিত নয়! আজও প্রতিটি ভারতীয়র শিক্ষার অধিকার, সুস্বাস্থের অধিকার, জীবিকার অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক সুরক্ষিত নয়! সামাজিক সুরক্ষার ধারণা এদেশে এখনো গড়ে ওঠেনি! গড়ে ওঠেনি নাগরিক দায়িত্ব ও কর্ত্তব্যবোধের সুনিশ্চিত ধারণাও!

মানুষের প্রাথমিক প্রয়োজনগুলি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির পাশা খেলা স্বাধীন ভারতবর্ষের মূখ্য চরিত্র! যেহেতু কোনো জাতীয়তাবাদী চরিত্র গড়ে ওঠেনি স্বাধীন ভারতের পরিসরে, তাই রাজনৈতিক দলগুলির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিরোধ করার মতো উপযুক্ত শক্তি গড়ে উঠতে পারে না দেশের মর্মমূল থেকে! এটাই গ্রেট ইণ্ডিয়ান ট্র্যাজেডী! এবং এখানেই ভারতবর্ষের প্রধান দূর্বলতা! রাজনৈতিক দলগুলিকে হাত করে দেশীয় সম্পদের উপর বৈদেশিক স্বার্থের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা ঠিক এই কারণেই সহজ! বস্তুত বিশ্বায়নের ঢক্কানিনাদের ধূয়ো তুলে এই কাজটিই বর্তমানে প্রায় শিল্পের পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে! উন্নততর ভারতের নকল ফেস্টুনের আড়ালে! 

ফলত ভারতের স্বাধীনতা যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল দেশের আপামর জনসাধারণের মনে, তা যে আজও অধরাই রয়ে যাবে, সে তো কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়! এটাই ঘটার ছিল! কিন্তু প্রশ্ন হল, আমরা কি করব? ভবিষ্যত প্রজন্মের হাতে এই অন্ধকার ভারতবর্ষই কি উপহার দিয়ে যাব? না কি আমাদের নাগরিক কর্ত্তব্য বোধের মানবিক তাগিদে, অন্ধকারের উৎসের দূর্বলতাগুলি দূর করে আমাদের সাধ্যমত আলো প্রজ্জ্বলনের প্রয়াসে সামিল হব যৌথ উদ্যোগের ঐক্যসূত্রে! সামাজিক পরিসর থেকে রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর সকল স্তরে এই বোধ সম্ভূত আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ না নিলে, ইতিহাস হয়তো আমাদের কখনোই ক্ষমা করবে না কোনোদিনই!


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.