x

প্রকাশিত | ৯২ তম মিছিল

মূল্যায়ন অর্থাৎ ইংরেজিতে গালভরে আমরা যাকে বলি ইভ্যালুয়েশন।

মানব জীবনের প্রতিটি স্তরেই এই শব্দটি অবিচ্ছেদ্য এবং তার চলমান প্রক্রিয়া। আমরা জানি পাঠক্রম বা সমাজ প্রবাহিত শিক্ষা দীক্ষার মধ্য দিয়েই প্রতিটি মানুষের মধ্যেই গঠিত হতে থাকে বহুবিদ গুন, মেধা, বোধ বুদ্ধি, ব্যবহার, কর্মদক্ষতা ইত্যাদি। এর সামগ্রিক বিশ্লেষণ বা পর্যালোচনা থেকেই এক মানুষ অপর মানুষের প্রতি যে সিদ্ধান্তে বা বিশ্বাসে উপনীত হয়, তাই মূল্যায়ন।

স্বাভাবিক ভাবে, মানব জীবনে মূল্যায়নের এর প্রভাব অনস্বীকার্য। একে উপহাস, অবহেলা, বিদ্রুপ করা অর্থই - বিপরীত মানুষের ন্যায় নীতি কর্তব্য - কর্ম কে উপেক্ষা করা বা অবমূল্যায়ন করা। যা ভয়ঙ্কর। এবং এটাই ঘটেই চলেছে -

চলুন মিছিলে 🔴

সোমবার, আগস্ট ১৫, ২০১৬

সুশান্ত কুমার রায়

sobdermichil | আগস্ট ১৫, ২০১৬ | | | মিছিলে স্বাগত
sushanta









বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের এই দৃশ্যমান জগতে আমরা যে চিরায়ত লীলার অভিজ্ঞতা লাভ করে থাকি তাকে প্রকৃতি হিসেবে অভিহিত করা হয়, তবে তা শিল্প হিসেবে নয়। প্রকৃতির এই অপার রূপরহস্য-লীলা ও সৌন্দর্য-মহিমা অবলোকন করে যখন কেউ হন বিমুগ্ধ আবার কেউ হন বিস্মিত, সৌন্দর্য পিপাসু মনে তখন সেটিকে সে তাঁর নিজের মধ্যে আপন করে নেয়ার বা পাওয়ার এক আকাঙ্খা, অভিপ্সা ও আসক্তি জন্মায়। সময় ও বিবর্তনের সেই ধারাবহিকতায় সে চায় এই নৈসর্গিকতাকে একটি স্বাভাবিক রূপ দিতে। আর এরই মধ্য দিয়ে জন্ম হয় শিল্প নামের সেই শৈল্পিক শব্দটি। অর্থাৎ শাশ্বত-সত্য, চিয়ায়ত ও চিরন্তন নয়নাভিরাম, নৈসর্গিক প্রকৃতিকে শিল্পী যখন তাঁর নিজস্ব সত্তা, শক্তি, মেধা, বুদ্ধি, মনন ও অভিজ্ঞতার আলোকে সৃষ্ট রং, রূপ, রস, রেখা, শৈলীর মাধ্যমে শব্দ বা রূপকের আশ্রয়ে প্রকাশ করে থাকেন আর সেই অনুভুতি যখন অন্যের মনে সঞ্চারণের মাধ্যমে একটি রেখাপাত বা পরিচয়বোধের সঞ্চার ঘটায় তখন তাকে আমরা শিল্প বা আর্ট অভিধ্যায় অভিসিক্ত করে থাকি। অন্য কথায় দৃশ্য বা অদৃশ্যকে শিল্পীর শৈল্পিক রূপ-রসবোধে চিত্তরসে রসায়িত করে যে স্থিতিশীল রূপ মহিমা দান করা হয় তাই শিল্প। চারুশিল্প, কারুশিল্প ছাড়াও রয়েছে নানা ধরনের শিল্প। যে শিল্পের সৌন্দর্য সৃষ্টি করে সে হচ্ছে শিল্পী বা কারিগর। শিল্প মাত্রই রূপ-বিলাসী ও নান্দনিক। স্রষ্টা ( যিনি সৃষ্টি করেন ) কর্তৃক সৃষ্ট রূপই হলো শিল্প। শিল্পীসত্তা, শিল্পবস্তু ও সমাজ তিনটি বিষয় গভীরভাবে একে অপরের সাথে মেল বন্ধনে আবদ্ধ। শিল্পীসত্তা, শিল্পবস্তু এবং সমাজের সম্পর্ক নির্ণয়ে একটি মতের কথা দেবী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় লেখেন এভাবে-‍ শিল্পীর ও শিল্পকর্মের সামাজিক ও ঐতিহাসিক আপেক্ষিকতা একটি অতি প্রচলিত মত। তা বলে সকলে এ মত মানেন না। 

কেউ কেউ বলেন, শিল্পী বিশেষ যুগ ও সমাজের মানুষ হলেও তাঁর সৃষ্টি সকল যুগ ও সমাজের কাছে স্বীকার্য, আনন্দদায়ক ও উপভোগ্য। শিল্পী বিশেষ যুগের মানুষ হলেও তার শিল্প কর্মে সংশ্লিষ্ট যুগের সমাজের পরিবেশ প্রভাব থাকলেও তাতে তাঁর শিল্পকর্মের রস আবেদন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে না। প্রকৃতপক্ষে প্রথম মানুষ যখন প্রকৃতির অপার রূপ-রস-গন্ধ ও এর সৌন্দর্যের স্রোতকে উপলব্ধি করেছিল তখনই সে চেয়েছিল সেই অনুভুতিকে বিশ্বসৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে অন্যের মনে সঞ্চারিত করতে আর তারই সূত্র ধরে প্রেম মোহিত প্রতিটি সৃষ্টির সম্মিলন ঘটাতে। কারণ মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির এটিই দাবি। কিন্তু প্রকৃতি মানুষে মানুষে এ ধরনের সম্মিলন ঘটানোর জন্য বিশেষায়িত নয় বরং প্রকৃতি কেবল সবার মনে তার রসবোধের সঞ্চার ঘটাতে পারে। আর সেটিও একেক জনের ক্ষেত্রে এক এক ধরনের হওয়াটা খুবই স্বাভবিক। এজন্যই এই অনুভুতি সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার নিমিত্তে তাকে সৃষ্টি করতে হয়েছে শিল্পের। মানুষ না থাকলে শিল্পসৃষ্টির প্রশ্নই উঠতো না। শিল্পের ইতিহাস ও মানব সভ্যতার ইতিহাস একই ধারায় প্রবাহিত ও স্নাত। 

তাই শিল্প মানুষে মানুষে কেবল অনুভুতির সঞ্চার ঘটিয়েই ক্ষান্ত থাকলেও এই সম্মিলন সম্ভব ছিল না। শিল্পের মূল উদ্দেশ্য এখানে পরিস্ফুটিত হয়েছে আর তা হলো পরিচয়বোধ-সঞ্চার যাকে বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ শিল্পের মাধ্যমে শিল্পী মন ও দ্রষ্টার মনের পরিচয় হয় এবং তা হয় অত্যন্ত গভীর ও সুদৃঢ়। ফলশ্রুতিতে দেখা যায় শিল্পের সৌন্দর্য দেখে দ্রষ্টা শিল্পী মনের অতি কাছাকাছি আসে এবং ফলে শিল্পী তার আত্মপরিচিতি আবিষ্কারের পথ খুঁজে পায়। মানুষ একান্তই অনুকরণপ্রিয়। সাধারণ মতে এই অনুকরণের প্রবৃত্তি হতেই শিল্পের জন্ম। তবে অনেকের মতো গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর মতে একে কেবল অনুকরণাত্মক বলা যুক্তিসঙ্গত নয়। শিল্পীর মনের স্পর্শবিহীন অনুকরণ কেবলই যান্ত্রিক, তা কখনই শিল্প হতে পারে না। শিল্পীর অন্যতম উদ্দেশ্য যেহেতু বাহিরকে আপন অন্তরে বন্দী করা এবং নিজের অন্তরকে আবিষ্কার করা। তাই শিল্প এর সঙ্গে মনের মালিন্য বা সংযোগ অবশ্যম্ভাবী। তাই এটি শিল্পের এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যা অদৃশ্য ও অনধিগম্য শিল্প তাকে দৃশ্যমান-অধিগম্য করে। শিল্প ক্ষণস্থায়ী জীবনের চঞ্চল স্রোতকে ক্ষণ সৌন্দ্যর্যের মাঝে বন্দী করে দীর্ঘস্থায়ী, সুদূরপ্রসারী, অবিনশ্বর, সুষমা আভায় আলোকিত করে স্থিতিশীলতা দান করে। কারণ জীবনে থাকে চঞ্চলতা আর শিল্পে থাকে স্থিতি। জীবন শেষ হয়ে যায় কিন্তু শিল্প এই সসীম জীবনের ক্ষণ সৌন্দর্যটিকে মধুপানে শান্ত শ্রীদান করে চিরদিন-চিরকালের ভূবন রচনা করে রাখে। 

সুতরাং শিল্প চলমান জীবনের স্থিতিমান মুহুর্তের চিরন্তন প্রকাশ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় শিল্প চিরায়ত রূপ লাভ করেছে এভাবে- হে মহাসুন্দর শেষ, হে বিদায় অনিমেষ, হে সৌম্য বিষাদ / ক্ষণেক দাড়াও স্থির মুছায়ে নয়ন নীড়, করো আশীর্বাদ”। দ্রষ্টা যখন তার সুক্ষ্ম অন্তরদৃষ্টি, আবেগ-অনুভূতি ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা দিয়ে কোন রূপ-সৌন্দর্য্যকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে গ্রহন করে তখনই রূপবন্ধ এর আবির্ভাব বা অভ্যূদয় ঘটে। একে মানব মনের অহংবিৎরহম য়ঁধষরঃু বলা হয়। মূলত শিল্পীর একটি গুণের কারণেই এক এক ধরনের গুণগত মানের সৃষ্টি হয়। এই গুণটিই হলো শিল্পীর মনের বিশেষত্ব এবং নির্বিশেষ মনোভূমি। শিল্পী চান দ্রষ্টা হিসেবে প্রথমে তিনি যে অনুভূতি আপন অন্তরে লালন ও একান্তভাবে গ্রহন করেছিলেন তাকে অন্তরের বাইরে স্থিতি বা সত্তা প্রদান করতে। কারণ সেই অনুভুতিগুলো একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত নয় বরং এর একটি সার্বজনীনতা আবশ্যক। এখানে ব্যক্তিগত আবেগ অনুভুতির সঞ্চারণই হলো বিশেষ অভিধা আর তাঁকে ছড়িয়ে দেয়াই হলো শিল্পের নির্বিশেষ পরিচয়। একে অন্যভাবেও চিহ্নিত করা যায়- শিল্পের সৃষ্টি তখনই সাথর্ক হয় যখন বাস্তব জীবনের কোন একটি উপকরণের অসংখ্য নির্বিশেষ রূপবন্ধের মধ্যে কেবল একটি বিশেষ রূপবন্ধের বিশেষায়িত আলোচনা সম্ভব হয় এবং এই বিশেষের মাধ্যমেই নির্বিশেষের ব্যঞ্জনা লভিত হয়। অর্থাৎ শিল্পে নির্বিশেষ বলতে উপকরণগত সাধারণত্ব বুঝায় না। আর নন্দনতত্ত্ব বলা হয়।

এটি দর্শনের একটি শাখা যেখানে সৌন্দর্য, রূপ, রস, স্বাদ, সৌকর্য, শিল্প,সৌন্দর্য সৃষ্টি ও উপভোগ নিয়ে আলোচনা করা হয়। একটা কথা ধ্বণিত হয় যে শিল্পকে সঙ্গায়িত করা যায় না। আসলে কোন কিছুকে শিল্প, সৌন্দর্য, সুধা, রূপ, রস ও নান্দনিকতার আদলে বা মাপকাঠিতে সূত্রাবদ্ধ করা যায় না । গন্ডীতে বেধে রেখে সঙ্গায়িত করা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। শিল্প বা সৌন্দর্য শুধু অনুভব করার ব্যাপার মাত্র। চোঁখে যাকে যেমন দেখায় তেমনি। তবে বিজ্ঞানে শিল্প বা কলার সার্বজনীন কোন সঙ্গা হয়তো সেভাবে নেই। কিন্তু শিল্প বা শৈল্পিক অনুভূতিকে ব্যাখা করা বা বোঝা যায় না এমনটি স্বীকার করে না বিবর্তন বিজ্ঞান। আরও বৈজ্ঞানিকভাবে বললে বলতে হয় নন্দনতত্ত্ব হলো মানুষের সংবেদনশীলতা ও আবেগের মূল্য এবং অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ এবং স্বাদের বিচার নিয়ে বিস্তর আলোচনা। বিশেষজ্ঞরা বলেন- নন্দনতত্ত্ব শিল্প, সংস্কৃতি এবং প্রকৃতি নিয়ে সুক্ষ্ম ও সমালোচনামূলকভাবে আলোচনা। বাংলায় নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে বেশকিছু লেখকের বই আছে। সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, অতুলচন্দ্র গুপ্ত, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সুধীর দাশগুপ্ত, নীহাররঞ্জন রায়, বিষ্ণু দে, নন্দলাল বসু, সাধন কুমার ভট্টাচার্য প্রমুখ বিশিষ্ট জনের। তবে কোন শিল্পই সবার মনে একই রকম দাগ কাটতে বা রেখাপাত করতে সমর্থ হয় না- রুচির ভিন্নতা, বোধের গভীরতা, দৃষ্টির তীক্ষèতা থেকেই। তবে শিল্প ও নন্দনতত্ত্ব ছিল- আছে এবং থাকবে চিরকাল। সময় থেকে সময়ান্তে, যুগ থেকে যুগান্তরে এবং কাল থেকে কালান্তরে পরিভ্রমণ করবে নতুন নতুন তত্ত্ব- উপাত্ত, রূপ-রস, সৌন্দর্য ও নন্দনতত্ত্বের নান্দনিকতায়।


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

�� পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ শব্দের মিছিলের সর্বশেষ আপডেট পেতে, ফেসবুক পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.