x

প্রকাশিত | ৯২ তম মিছিল

মূল্যায়ন অর্থাৎ ইংরেজিতে গালভরে আমরা যাকে বলি ইভ্যালুয়েশন।

মানব জীবনের প্রতিটি স্তরেই এই শব্দটি অবিচ্ছেদ্য এবং তার চলমান প্রক্রিয়া। আমরা জানি পাঠক্রম বা সমাজ প্রবাহিত শিক্ষা দীক্ষার মধ্য দিয়েই প্রতিটি মানুষের মধ্যেই গঠিত হতে থাকে বহুবিদ গুন, মেধা, বোধ বুদ্ধি, ব্যবহার, কর্মদক্ষতা ইত্যাদি। এর সামগ্রিক বিশ্লেষণ বা পর্যালোচনা থেকেই এক মানুষ অপর মানুষের প্রতি যে সিদ্ধান্তে বা বিশ্বাসে উপনীত হয়, তাই মূল্যায়ন।

স্বাভাবিক ভাবে, মানব জীবনে মূল্যায়নের এর প্রভাব অনস্বীকার্য। একে উপহাস, অবহেলা, বিদ্রুপ করা অর্থই - বিপরীত মানুষের ন্যায় নীতি কর্তব্য - কর্ম কে উপেক্ষা করা বা অবমূল্যায়ন করা। যা ভয়ঙ্কর। এবং এটাই ঘটেই চলেছে -

চলুন মিছিলে 🔴

সোমবার, আগস্ট ১৫, ২০১৬

রুমকি রায় দত্ত

sobdermichil | আগস্ট ১৫, ২০১৬ | | মিছিলে স্বাগত
rumki






বাংলোর ঠিক আধমাইল পর থেকেই শুরু হয়েছে জঙ্গল। বনবাংলোর সামনের বেশ খানিকটা অংশ সবুজ ঘাসের গালিচা পাতা,মরশুমি ফুলে সুসজ্জিত। উত্তরবঙ্গে অফিসের কাজে মাঝে মাঝেই আসতে হয় অরিন্দমকে। অরিন্দম বাগচী,উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসার। প্রতিবারই এই বনবাংলোতেই অরিন্দমের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। বিশেষ অতিথি তাই খাতির যত্নও বেশ করে সবাই। ওকে দেখলেই সবাই যেন খুঁজে পেতে কাজ বার করে। দিনে বার কয়েক ঘর ঝাঁট দেওয়া,বিছানার চাদর নোংরা না হলেও সকাল বিকেল পাল্টানো, সিগারেট,ড্রিংস বা ওঁর কোনো কিছুর দরকার আছে কিনা,এক কথায় কাজ না থাকলেও জোড় করে কাজ করা। আসল রহস্যটা অবশ্য অন্যখানে। কেউ সামান্য কাজ করলেও অরিন্দম বেশ মোটা রকমের বকশিস দেয়।

গতকাল প্রায় মাঝরাত হয়ে গিয়েছিল এখানে এসে পৌঁছাতে।কুয়াশার কারণে ফ্লাইট লেট ছিল। এরজন্য অবশ্য অরিন্দমের বিশেষ অসুবিধা হয়নি। অফিসের কাজে যে জন্য এসেছে, শুধু সেই কাজটুকু করা ছাড়া নিজের জন্য তাকে কোনোকিছু ভাবতে হয় না। সেসব ভাবনা সরকারের।এয়ারপোর্ট থেকে বাইরে আসতেই সোজা উঠে পড়ে গাড়িতে।শীততাপ নিয়ন্ত্রিত অত বড় গাড়ি,ড্রাইভার আর অরিন্দম ছাড়া কেউ ছিলনা। বেশ হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করেই এসেছে। এয়ারপোর্ট থেকে প্রায় ঘন্টা দুয়েকের জার্নি।মাঝে বেশ কিছুটা সময় ঘুমিয়ে নিয়েছিল অরিন্দম। গাড়ি যখন বনবাংলোয় ঢোকে তখন প্রায় রাত একটা বাজে। অত রাতে অরিন্দম কিছু খায় নি শুধু গরম জলে হাত-পা ধুয়ে ফ্রেস হয়ে শুতে যাওয়ার আগে দু’পেগ হুইস্কি। তাতে ভালো কাজ হয়েছে। ঘুমটা বেশ গাঢ়ই হয়েছে। সকালে বনবাংলোর কেয়ারটেকার সনাতন বাবুর ডাকাডাকিতে যখন ঘুম ভাঙে তখন সূর্য দিগন্ত ছেড়ে বেশ খানিকটা উপরে উঠে গেছে।

অরিন্দম স্টিল কালারের সার্টিনের রাত পোশাক পড়ে, হাল্কা ওজনের রবারের চপ্পল পায়ে নির্দয়ের মত নরম ঘাসের বুকে পা রেখে এসে বসলো সুসজ্জিত লনে।

এই পঞ্চাশেও মন রোমান্টিকতায় পরিপূর্ণ।ফেব্রুয়ারীর সকালের হাল্কা ঠান্ডায় মিঠে রোদে পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকতে থাকতে শরীরটা নেচে উঠতে চায়লো অরিন্দমের। বেতের চেয়ারে হেলান দিয়ে সামনের দিকে সামান্য পা ছড়িয়ে দিল। পা থেকে চপ্পল খুলে নরম ঘাসে ধীরে ধীরে পা ঘষতে লাগলো।ঠিক তখনই মনে হল ঋতুশ্রীর কথা। ঠিক এমন করেই ঋতুশ্রীর কচি গালে নিজের দাড়ি ঘষতে ঘষতে ডুবে যায় ঋতুশ্রীর মৃদু শীৎকারের শব্দে আর ওর গভীর আশ্লেষের মাঝে।

‘সাহাব, চায়ে পিজিয়ে’---নেপালী ছেলেটির কন্ঠস্বরে সম্বিৎ ফিরে আসে অরিন্দমের। সে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলে—‘ রাখ দো, ম্যায় খুদহি বানালুঙ্গা’। তারপর পকেটে হাত দিয়ে পার্স বের করে ছেলেটির দিকে টাকা বাড়িয়ে দিতে দিতে বলে, --‘ বোলো রাজু ভাই, ঘরমে সব ঠিকঠাক হ্যায়?’

রাজু মাথা নেড়ে বলে ‘হ্যাঁ সাব, সব ঠিক হ্যায়’। তারপর সামনের দিকে হাত জোড়ো করে ট্রেহাতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর জিজ্ঞাসা করে ‘ সাব, নাস্তেমে আপ কিয়া লেঙ্গে?’ 

অরিন্দম হাত নেড়ে বলে ‘ বাদমে পুছনা,আভি তুম যাও’। 

নেপালী ছেলেটি চলে যেতেই পকেট হাঁৎরে বার করে মোবাইল।প্রথমেই নিজের স্ত্রী সোমাকে ফোন করে। অরিন্দমের মত পাকা ঘুগুরা যা করে আরকি।আগে ঘর কি ভাবে ঠিক রাখতে হয় এটা এদের ভালো ভাবেই জানা। ওপাশে সোমার গলাটা পেয়েই অরিন্দম মুখস্থ করা ডাইলগের মত বলতে থাকে –‘হ্যালো ডার্লিং, কি করছিলে এতক্ষণ বলতো? --- তোমাকে তো অনেক্ষণ ধরেই ট্রাই করছি’।ওপাশ থেকে ভেসে আসা সোমার উত্তরটা শেষ করার অপেক্ষায় না থেকেই আবার বলতে শুরু করলো---‘ আই মিস্‌ ইউ।এই নিরিবিলি একান্তে তোমাকে কাছে পেতে খুব ইচ্ছা করছে।মনে হচ্ছে প্রাণ ভরে তোমার শরীরের ঘ্রাণ নিই’।

হঠাৎই রোমান্টিকতা থেকে ব্যস্ততায় ফিরে আসে অরিন্দম,যেন সোমার জন্য মাপা সময়ের বাইরে আর একটি কথাও বলতে চায়না এমন ব্যস্ততার ভান করে কেটে দেয় লাইনটা।

তারপর মোবাইলটা হাতে নিয়ে ডায়াল করতে করতে উঠে দাঁড়ায়।অপেক্ষার সময় ধৈর্য্য না ধরতে পারা মানুষেরা যেমন ইতস্তত পায়চারী করে, ঠিক তেমনই পায়চারি করতে থাকে অরিন্দম। রিং হয়ে বাজতে বাজতে থেমে যায়,আবার রিং করে অরিন্দম। ওপাশে ফোনটা রিসিভ করার সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ে অরিন্দম।আয়েস করে একটা পায়ের উপর তুলে দেয় আরেকটা পা, তারপর ফিসফিসে স্বরে বলতে থাকে আমার তুলতুলে খরগোশটা এতক্ষণ কি করছিলো?’ ফোনের ওপ্রান্ত থেকে তুলতুলে খরগোশের সদ্য ঘুমভাঙা গলায় উম্‌-ম্‌-ম্‌ শব্দ শুনতে শুনতে শক্ত হয়ে ওঠে অরিন্দম। ওর সবচেয়ে আদরের খরগোশটার বয়স মাত্র পঁচিশ।অরিন্দমের পুরো অর্ধেক।যতবার এই তুলতুলে মাংসে মুখ লাগায় অরিন্দম ততবার যেন নতুন স্বাদ জাগে।সবে দু’বছর হলো অরিন্দম মুখ বদলেছে।আগের খরগোশের সাথেও মাঝে মাঝে যোগাযোগ রাখে অরিন্দম।একে একে সব কামিনিদের মুখ ভাসতে থাকে অরিন্দমের সামনে।

[২]

দুপুরে অফিসের কাজ সেরে অরিন্দম এসে বসেছে বনবাংলোর জঙ্গলমুখি ঝুল বারান্দায়।সূর্যও দিগন্তরেখার দিকে দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে। অরিন্দম একটা পাতলা চাদর জড়িয়ে একদৃষ্টে দেখতে থাকে সূর্যটার সমর্পন। হয়তো কিছুটা উদাস হয়েই পড়েছিল। কাচের গ্লাসের টং টং আওয়াজে ঘুরে তাকালো পিছনে। কেয়ারটেকার সনাতন আর বেয়ারা ছেলেটি,হাতে হুইস্কির বোতল আর খালি কাচের গ্লাস।

সনাতন বেয়ারাটিকে জিনিসগুলো রেখে চলে যেতে বলে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলো অরিন্দমের সামনে।এটা ওটা কিছু অপ্রাসঙ্গিক কথার মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে পৌঁছে যায় আসল বক্তব্যে।

‘স্যার, এবারতো ম্যাডামকে আনলেন না’।

অরিন্দম সনাতনের কথার কোনো উত্তর দিল না,দিতে চায়লো না।

গত কুড়ি বছরে অরিন্দম এই বাংলোয় অন্তত পঁচিশ-ত্রিশবার এসেছে।সনাতন কেয়ারটেকার থেকে বেয়ারা কারোর কাছেই অজানা নয় অরিন্দমের নারী আর সুরাবারির প্রতি আসক্তির কথা। ---ম্যাডামদের মুখ মাঝে মাঝেই বদলেছে।কখনো অরিন্দম নিজেই ম্যাডাম সঙ্গে এনেছেন আবার কখনো সনাতন কেয়ারটেকারে উপরই আস্থা রেখেছে। গত দুইবার সঙ্গে ঋতুশ্রী এসেছিল।এবারে শেষ মুহূর্তে ওর আসাটা স্থগিত করতে হয়।

অরিন্দম বাঁ-হাত বাড়িয়ে বোতল থেকে একটু হুইস্কি গ্লাসে ঢেলে এক চুমুক দিল তারপর ড্রিংসের স্বাদ নিতে নিতে বলল---‘ দেখবেন, যেখান সেখান থেকে তুলে আনবেন না । যা চাইবেন তাই পাবেন কিন্তু-----এই পর্যন্ত বলার পরই সনাতন ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল---‘ সে ব্যাপারে আপনাকে ভাবতে হবে না স্যার। এত বছর আসছেন, আমি আপনার টেষ্ট ভালোই বুঝে গেছি স্যার’। 

সনাতন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো,কিছুটা এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসে বলল—‘ স্যার একটা ষোলো বছরের পুরানো মাল আছে। আপনার জন্যই জোগার করে রেখেছি’।

সনাতন এরপর অরিন্দমের উত্তরের অপেক্ষা না করেই চলে গেল।অরিন্দমকে সে ভালোই চেনে।খাঁটি হলে দামে আটকাবে না।

[৩]

পুরানো সুরার নেশায় মত্ত অরিন্দম একহাতে বোতল আর গ্লাস ধরে উঠে আসে ঘরে। টিউব লাইটের জোড়ালো আলোতে নেশার ব্যাঘাত ঘটছে দেখে ফোনটা হাতে তুলে রিসেপ্‌শনে ফোন করে বলে, লাইট বন্ধ করে ক্যান্ডেল লাইট পাঠাতে। রিসিভার রাখতেই বন্ধ হয়ে যায় আলো।একেই জঙ্গল,তার উপর পাহাড়ি এলাকা।ন’টা বাজতে না বাজতেই চারদিক নিশুতি যেন। বাইরের বারান্দায় বসেই আটটার মধ্যেই হাল্কা ডিনার সেড়ে ফেলেছে অরিন্দম। মিশমিশে অন্ধকারে গা শিরশির করে ওঠে অরিন্দমের। কয়েক পল নিঃশ্চুপে জোনাকি আর ঝিঁঝিঁর ডাকে কেটে যায়। দরজায় মৃদু টোকা। অরিন্দম এলোমেলো পায়ে উঠে গিয়ে খুলে দেয় দরজা। একটা সাদা মোমবাতির শিখা মৃদু দুলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দূর হয় অন্ধকার। মোমবাতির শিখা যত এগিয়ে আসতে থাকে তত স্পষ্ট হতে থাকে একটা চকচকে কালো সরল মেয়ের মুখ। মৃদু হেসে বলে—‘ বাবু,তু ভয় পেইং ছিলি?’ তারপর ওর পুরুষ্টু নিতম্ব দুলিয়ে ঘরে ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। এবার একটু হিন্দি টোনে বলে,--‘ ডর মাৎ’।

অরিন্দম বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে মেয়েটির দিকে। মেয়েটির শরীরে জড়ানো মোটা সুতির কাপড় আর জংলী প্রিন্টের ছোটো হাতা, ছোটো পিঠের ব্লাউজ। অরিন্দম খাটের উপর আধশোয়া হয়ে শুয়ে পড়ল। মেয়েটি মোমবাতির আলোটা উঁচুতে তুলে ধরতেই চকচকে কালো মুখটা যেন রহস্যময় হয়ে উঠলো।উজ্বল সাদা চোখের মধ্যে কালো মণিটা তিরতির করে নড়ছে। নেশায় বুঁদ অরিন্দম যেন জাটিঙ্গা আর ঐ মেয়ে আগুন। অরিন্দমের আগুনে পুড়ে মরতে ইচ্ছা করছে। এক টানে মেয়েটিকে বিছানায় ছিটকে ফেললো। মেয়েটির কানের কাছে মুখ ঠেকাতেই চোখের সামনে যেন নেমে এলো একরাশ কুয়াশা। দু’হাতে চোখ কচলালো।নাহ্‌ আবার ভেসে উঠলো নদীটা। তিরতির করে বয়ে চলেছে নদী। স্বচ্ছ জলের নদী, মাঝে মাঝে বালির মুখ জেগে তৈরি হওয়া আলপনা। দূর থেকে কোমর দুলিয়ে হেঁটে আসছে কালো মেয়ে। অরিন্দম চিৎকার করে ডাকলো ---‘ এ-এ-এ লেড়কি, ইস নদীকা নাম কিয়া হ্যায়?’

মেয়েটি মুখে হাত দিয়ে হি হি করে হেসে বলল—‘ কোওয়েল’।

অরিন্দম আবার বলল—‘ অউর তুমহারা নাম?’ 

মেয়েটি এবারও হেসে বলল---‘ কোয়েল’। মেয়েটি কলসী ঘুরিয়ে কাঁখে চড়ালো।ঝিনিক করে নুপুরের শব্দ তুলে দু’পা এগিয়ে যেতেই অরিন্দম আবার ডেকে বলল---‘ কোওয়েল, ইঁহা পর রহনে কা জাগা মিলেগা?’

মেয়েটি দু’পা দৌড়ে গিয়ে চিৎকার করে বলল—‘ইঁহা পর রহেনা হ্যায় তো পিছে আও’।

অরিন্দম জল থেকে উঠে এলো।

[৪]

‘এ বাবু, তু থামলি কেনে?’----অরিন্দমের মাথাটা ঝিনঝিন করে উঠলো।

মেয়েটি আবার বলল---‘ আই বাবু, সোহাগ কর। তু খুশি হবি তবে তো টাকা পাবক। দূর বাংলার গেরাম থেকে চা বাগানের কামে এলাম।তবু অভাব ঘোঁচে লাই রে’। মেয়েটি অরিন্দমকে ঠেলা মরতেই অরিন্দমের গা-মাথা ঝনঝন করে উঠলো। দু’হাতে মেয়েটির মুখ আঁকড়ে ধরে চোখ টেনে ভালো করে তাকালো মেয়েটার মুখে। মেয়েটার মুখ থেকে জ্বলে উঠলো একটা জ্বলন্ত হ্যারিকেন। ঝুমঝুম নুপুর বাজিয়ে সেই মেয়েটা এসে ঢুকলো অরিন্দমের ঘরে। কাঁচের চুরিতে সাজানো হাতটা টেবিলের এদিক ওদিক ঘুরছে। অরিন্দম মেয়েটার হাত ধরে টেনে নিল নিজের কাছে।অরিন্দম নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনলো মেয়েটির বুকে,ধীরে ধীরে মিশে যেতে লাগলো মেয়েটি শরীরের সাথে।

‘কি রে বাবু,সোহাগ কর’----আবার অরিন্দমের মাথাটা ঝনঝন করতে লাগলো। বিছানায় শুয়ে থাকা মেয়েটির ঠোঁটের ওঠাপড়া লক্ষ করছে অরিন্দম।এক নদী জলের মাঝে ভাসছে কোয়েলের মুখ---অরিন্দম লক্ষ করছে-----স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে----‘বাবু,আব মেরা কিয়া হোগা?---কওন মুঝসে সাদি করেগা? ----তু লওট কে আয়েগি না?----মুঝে তু ভুল তো নেহি জায়েগি না?’

অরিন্দম আঁতকে উঠল।ঠেলা মেরে সরিয়ে দিল বিছানায় শুয়ে থাকা মেয়েটিকে। বাথরুমের সামনে লাগানো বেসিনের কাছে গিয়ে জল ছিটালো মুখে চোখে। বাবু,---চমকে উঠলো অরিন্দম।আসতে আসতে মাথাটা ঘোরালো পিছনের দিকে।সায়া-ব্লাউজ পড়া মেয়েটি বুকের কাছে কাপড়টা ধরে বসে আছে মাটিতে। অরিন্দম বড় বড় পা ফেলে ছুটে গেল টেবিলে রাখা ওয়ালেটটার দিকে। একথোক টাকা বার করে ছুঁড়ে দিল মেয়েটির দিকে। দুহাতে মাথাটা চেপে ধরে শুয়ে পড়লো বিছানায়।

[৫]

নিচ থেকে বয়ে চলেছে হাজার মানুষের স্রোত।কিছুক্ষণ আগেই ফিরে এসেছে কোলকাতার অফিসে। অদ্ভূত এক অবসাদ যেন ঘিরে ধরেছে। অরিন্দম হাতে পেপারওয়েট নিয়ে সেটা ঘোরাতে ঘোরাতে ভাবে অবসাদ নাকি অপরাধ বোধ? ভালো লাগেনা অরিন্দমের। চেয়ারের পিছনে শরীরটাকে হালকা ভাবে ছেড়ে দেয়। মাথার পিছনে হাতটা রেখে বন্ধ করে চোখটা।---নাহ্‌, কিছতেই বন্ধ করতে পারছে না চোখটা। জুতোয় বেঁধা কাঁটার মত খচখচ করছে ,বুকের ভিতরে কি যেন একটা----একটা অতীত!

‘স্যার, ঘোষ বাবু একবার দেখা করতে চান।পাঠিয়ে দেব?’----একরাশ বিরক্তি নেমে আসে অরিন্দমের। না বলতে গিয়ে থেমে যায়। মাথা নেড়ে বেয়ারাকে পাঠিয়ে দিতে বলে।

আধ ঘন্টা ধরে বকবক শুনে অবসাদ যেন বেড়ে যায় অরিন্দমের। আজ আর কোনো কাজ ভালো লাগছে না। কোটটা কাঁধে ফেলে উঠে পরে।আজ সোজা বাড়ি ফিরবে। দরজার হাতলটা ধরে টানতেই বেজে ওঠে টেলিফোন। অরিন্দম হাতল ছেড়ে রিসিভার কানে তোলে।

ওপাশ থেকে ভেসে আসে----‘কি করছ বলতো?--- মোবাইলটা বন্ধ কেন?’

অরিন্দমের মনেই নেই কখন মোবাইল চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে।---বলে—‘ সরি ঋতু,একদম মনেই ছিলনা মোবাইলে চার্জ দেওয়ার কথা।---সরি ডার্লিং’

ঋতু বলে, ‘অফিস থেকে বেরোবে কখন?’

অরিন্দম একটু যেন চুপ করে যায়,এক বার ভেবে নেয় বাড়ি ফেরার কথাটা ঋতুশ্রীকে জানাবে কিনা।

কি হলো চুপ করে গেলে যে?

অরিন্দম আমতা আমতা করে বলল---‘এই তো বেরোচ্ছিলাম’।

ঋতুশ্রী একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে বলে,---‘ওকে,চলে এসো তবে,আমি তোমার জন্য ওয়েট করছি।

অরিন্দম বাড়ি ফেরার কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারেনা। অন্য দিন হলে সোহাগের বন্যা বয়তো। ঋতুর বাড়িতে গেলে অরিন্দম ড্রাইভাকে ছুটি দিয়ে নিজেই গাড়ি চালায়। গাড়িতে ঢুকে চাবি ঘোরাতেই গাড়ি ছুটে চলল ঋতুশ্রীর বাড়ির দিকে।

ডোর বেলে হাত লাগানোর আগেই এক হ্যঁজকা টানে অরিন্দম হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লো ঋতুর ফ্ল্যাটে। দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে ঋতু সোফায় বসা অরিন্দমের গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো।–অরিন্দমের গলায় ঘারে ওর তীক্ষ্ণ নখের ঘোরাফেরা চলতে লাগলো। অন্য দিন হলে অরিন্দম ঝাঁপিয়ে পড়তো ঋতুর গায়ে। আজ যেন সেই স্বতস্ফূর্ত বোধটাকে খুঁজে পাচ্ছেনা অরিন্দম।---ঋতু কি বুঝতে পারছে?---ঋতুর কাছ থেকে নিজেকে লুকাতে অরিন্দমও উন্মাদনা জাগার ভান করতে লাগলো। ঋতুর শরীর ক্রমশ জেগে উঠতে শুরু করেছে। তৃষ্ণার্ত হরিনীর মত অপেক্ষার প্রহর গুনছে ঋতুশ্রী।-----দুটি পরিণত নর নারী যৌন উন্মাদনার চরম মুহূর্তে পৌঁছানোর আগেই শিথিল হয়ে ঢলে পড়লো অরিন্দম। হেরে গেল অরিন্দম ----জীবনে প্রথমবার। জুতোর কাঁটাটা যে জেগে আছে। অতৃপ্ত হরিণীর মুখে অস্ফুট শব্দ----‘অরিন্দম,তুম বুঢ্‌ঢা হো গ্যায়ে’।



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

�� পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ শব্দের মিছিলের সর্বশেষ আপডেট পেতে, ফেসবুক পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.