x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

মৌ দাশগুপ্ত

sobdermichil | আগস্ট ১৫, ২০১৬ |
moudasgupta




১।

 - স্বাধীনতার মানে জানিস বিলু?
 - জানিনা আবার? রাস্তায় দেদার কাগজের তেরঙ্গা ঝোলে যেদিন গো , হুই হোতায় মাইকে গান টান হয় ,কত লোক চেঁচিয়ে মেচিয়ে কত কটা বলে ,বিনিমাগনা বোঁদে জিলিপি ও দেয় আর হি হি হি ,আর জোরে জোরে বলে কি " বোঁদে না খেয়ে মাতা গরম" ।


২।

- আজ কি পুজো গো সারিদিদি?
- পুজো? কই জানি নাতো ।
- তাহলে এই যে আজ অনাথআশ্রমের সবাইকে সকাল সকাল উটে সেজেগুজে তৈরী থাকতে কইলে ,মাইক বাজলো ,নোকজন এলো , ভালোমন্দ খেলাম, নতুন পিরানও পেলাম একটা, তাও বলছ পুজো না?
- দূর বোকা মেয়ে আজ হল গিয়ে আমাদের স্বাধীনতা, বুঝলি?

৩।

 - কি ব্যাপার দাদুভাইরা? এখনই চাঁদার বই নিয়ে ঘুরছ? পুজোর তো ঢের দেরী ...
- কাল স্বাধীনতার জন্য ক্লাবের কাঙালীভোজন দাদু ।
- স্বাধীনতার জন্য? 
- ঐ স্বাধীনতা দিবসের জন্য ,দুটো তো একই ।
- তাই বুঝি? তা বলো দেখি স্বাধীনতার হীনতায় কে বাঁচিতে চায় কার লেখা?
- বলেছিলাম চাঁদু এ মাল বড় কিচাইন করবে । কবে কোন স্কুলের হেডমাস্টার ছিল তাই ধুয়ে এখনও বুড়ো জল খাচ্ছে , এই যে দাদু ভালোয় ভালোয় মাল্লু ছাড়ো নয়ত ।
- নয়তো?
- নয়তো ঐ বাগানে টব ফুলগাছ বিক্কিরি করে পয়সা তুলে নেব রে । তারপর রাতবিরেতে কিচাইন হলে আমাদের দায় নেই কিন্তু ।
- বুঝলাম দাদুভাইরা এতদিন আমিই স্বাধীনতার ভুল মানে শিখিয়ে এসেছি ।

৪।

- গল্প বলো দিদুন , রাজারাণী পক্ষীরাজ ।
 - এই সাতসকালে গল্প? মা যে বকবে সোনা ,যাও পড়তে বোসো ,তোমার ম্যাথের স্যার এক্ষুণি এসে পড়বেন ।
 - তুমি কি বোকা দিদুন , আজ তো পনেরোই আগস্ট গো, আমাদের স্বাধীনতার দিন, আজ আমার ছুটি, স্কুলে ছুটি, টিউশন ক্লাশের ছুটি । আঁকা শেখায় ছুটি, সাঁতার শেখায় ছুটি, নাচের মিসও আজ ছুটি দিয়েছেন, কি মজা বলো?  আজ আমি ইচ্ছেমত খেলব, ঘুমাবো, গান গাইবো, টিভি দেখব, এখন আমার খুব গল্প শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে দিদুন, একটা রাজা রাণীর গল্প বলো না ।

৫।

- দিলু  , আজ কাগজ কুডাতে যাবি না?
 - না ,আজ সত্যমামার দোকানের সামনে ঐ সাদা সবুজ কমলা কাগজের পতাকাগুলো বেচবো , দুডজন বিকতে পারলে মামা একটাকা করে দেবে বোলেচে ,বিকেলে দ্যাক না সেই পতাকাগুনোই ছিঁড়েখুঁড়ে গিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকবে নে ,তখন কুড়িয়ে নিয়ে কেজি দরে বেচলে আবার পয়সা ।


৬।

- এই শুনছ ,মজা দেখবে এসোনা ,কি পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছ তখন থেকে ।
 - আরে বাবা আজ পনেরোই আগস্ট বলে ফোকটে একটা ছুটি পেয়েছি , একটু ঘুমাতে তো দাও । বিকেল থেকে তো সিনেমা বাপের বাড়ি মার্কেটিং করে মাথা খাবে।
 - শোনোই না, শীলবাবুদের ভাঙা বাড়ীটায় নীড় বলে যে বুড়োবুড়িদের থাকার জায়গাটা আছে না সেখানে তো একেবারে মেলা বসে গেছে , গাড়ি চেপে লোকজন আসছে যাচ্ছে, মাইক বাজছে, গেটের সামনে দাঁড়িরে কেউ কেউ আবার ফটোও তুলছে, দেখবে চলো।
- ধুত্তেরি ও তো বছরে দুবার তিনবার এমনিই দেখতে পাই, পয়সায়ালা ঘরের বাবুবিবি লোকাল পাট্টির দাদারা সব ঘোলা জলে মাছ ধরতে আসে তো, নতুন পুরোনো কাপড়জামাটামা দেবে, কি মিষ্টি ফলটল তারপর দেবার সময় হাসিমুখে ঘাড় বেঁকিয়ে ফটো টটো তুলবে ।
- তারপর?? তারপর আবার কি? ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেবে, কি কাগজ টাগজে ছাপা হবে , সস্তা পাবলিসিটি , সকাল সকাল দিলে তো ঘুমটা চটকে , কি বলে বিয়ে করলে পুরুষদের আর স্বাধীনতা তাকে না , তা সে পনেরোই আগস্টই হোক কি অন্যদিন!!

৭।

কেন যে ছাতার পনেরোই আগস্টটা ওয়ার্কি. ডে তে পড়ে!! উনি তো বেলা এগারোটা অব্ধি বিছানায় গড়িয়ে ছুটি কাটাবেন আর আমার হবে ওভারটাইম দে , খালি এটা রাঁধো আর ওটা রাঁধো , তার ওপর বাচাচাদের ছুটি , তাল মেটাও , ননদ নন্দাই দুজনের ছুটি বলে আবার বিকেলটাও ঘরে আটকে থাকো , ধুত্তেরি ,স্বাধীনতার দিনেও দেখি আমার আর স্বাধীনতা নেই!! ।

৮।

- ও কেদারকাকু আজ হাপপেলেট ঘুগনি আর পাউরুটির সাতে একটা মামলেটও দিও গো ।একদম গরমাগরম ।
- কি ব্যাপার রে তপাই? লটারি জিতেছিস নাকি?
- না গো ,আজ ঐ কি য্যানো স্বাধীন দিন তিন কি আছে না গো তোমাদের , হেব্বি ফৃল বিকিয়েছি আজ , এক্কেবারে কিলোদরে । দোকানের স্বপনদাও তাই আজ হেব্বি খুশ । নগদ বিশ টাকা দ্যাছে , আরে খালি ভাট বকায় , তাড়াতাড়ি মামলেটটা দ্যাও দিহিন ।


৯।

সকালবেলা বাজার যাচ্ছি দেখি মোড়ের মাথার মিউনিসিপালিটির স্কুলমাঠে কিকাঁাদের ভীড়। কি ব্যাপার? ও হরি, আজ তো ১৫ই আগস্ট! এ তাহলে তেরঙ্গা পতাকা তোলার ভীড়, ধরে একটা টান, তারপর ফুলের পাপড়ীগুলো ঝরঝর ঝরলেই, কচিকাঁচাদের গলা ছাপিয়ে মাইকে তারস্বরে দেশভক্তির গান, একটা কলা, দুটো লজেন্স, কি একমুঠো বোঁদে, সাথে ফ্রী ভাষণ। আমাদের আমাদের সময়েও ছিলো তো। তারপর ঐ স্কুলঘরে ভিতরে দেওয়ালে টাঙানো নেতাজী, গান্ধী, জহরলালের ছবিতে টাটকা ফুলের মালা চড়বে। আজ দেদার বিকোচ্ছে তিনরঙ্গা ফেস্টুন,টুপি,পতাকা,রিস্টব্যান্ড। স্কুলফেরতা কে যেন শার্টের বুকপকেটে একটা কাগজের তেরঙ্গা আটকে দিয়ে গেল সেফটিপিন দিয়ে , আজ আকাশটা তিনরঙা না হলেও অনেক তিরঙ্গা আকাশের পটভূমিকায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে দেখছি।
‘এ্যয় মেরে প্যারে বতন…’


১০।

এবার ১৫ই আগস্ট সোমবার। শপিং মলে আর ক্রেডিট কার্ডে আত্মহারা আমি ভাবছি যাক বাবা,, আরেকটা দিন এক্সট্রা ছুটী তো পেলাম । তবে আর কি, গা ভাসাও দেশপ্রেমের জোয়ারে, ‘লেট আস সেলিব্রেট’ আজ তবে পিকনিক হয়ে যাক, নাকি থিয়েটার,কি সিনেমা দেখা? বাড়ীতেই একটা জম্পেশ গেট টুগেদার, অথবা, দুপুরে মাংসভাত শেষে বিকেল অবধি বেশ জমাটি ঘুম, আপাতত ফেসবুক খুলে সেলিব্রেশন নিয়ে বন্ধুরা কে কি বলে শুনে নিই। মা নলেনগুড়ের পায়েস বানাচ্ছেন বোধহয়, গন্ধটা হাওয়ায় ভাসছে,রন্নাঘর থেকে যাতে শোনা যায় তাই টিভির ভল্যুমটা বাড়ানো আছে,গানটা বেশ ভালো লাগছে শুনতে তো,‘ভারত আমার ভারত বর্ষ,স্বদেশ আমার স্বপ্ন হে,’রবীন্দ্রসঙ্গীত? নাকি আধুনিক? আমার বস বাংলা গান টান অত আসে না,তবে বেশ দেশভক্তির স্মেল আছে, আজকের মত ফেসবুক স্ট্যাটাস হয়ে যাক! ওয়াও! পোস্ট করতে না করতে এতো লাইক, কমেন্ট!

১১।

সাতসকাল থেকেই পাড়ার মোড়ে দেশাত্মবোধক গান চলছে। গান গাওয়া আর শোনা ছাড়া আজ কিই বা আর করার আছে সারেগামাপা আর ডান্স বাংলা ডান্সের লোগোধারী বাঙালীর?! বিরক্ত মুখে বেরিয়ে এলাম বাড়ীর বাইরে। ভীড় সর্বত্র, দেশসুদ্ধ সবাই প্রানপনে দেশের সেবা করছে,বিনামূল্যের চিকিৎসা শিবির, বস্ত্র বিতরন কেন্দ্রে, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ঝলকাচ্ছে স্থানীয় অমুকবাবু, তমুকবাবু'দের সুখীসুখী গর্বিত মুখে। অনাথআশ্রম, হাসপাতাল কি বৃদ্ধাশ্রমে, ত্রাণশিবিরে, মিডিয়ার ভীড় সাইরেন বাজিয়ে যাচ্ছে মন্ত্রী আমলাদের সরকারী গাড়ী।

চোখা চোখা কথার চিনির মোড়কে প্রজাতন্ত্রের বক্তৃতা দিতে যাচ্ছেন নেতারা  সাজছে মিডিয়ার চোখ ঝলসানো আলো আর বিনোদনের মুফত বানিজ্য। এদিকে আজো বৈষম্য আমাদের সঙ্গী, “নগরীর এক প্রান্তে খাদ্য কিন্তু খিদে নেই, অন্য প্রান্তে খালিপেটে জ্বলছে খিদের আগুন কিন্তু খাদ্য নেই,” মহাজনী টিপ ছাপে গায়ে গতরে বাড়ছে চাষীর ক্ষেতের সবুজ শীষ, খাল পাড়, রেল লাইনের ধারবরাবর বাড়ছে বাস্তুহারাদের ভীড়, বিদ্যাসাগরের নাম না জানলেও বিদ্যাবালানের কাটআউট দরমার দেওয়ালে, রাংতামোড়া নেশার ধোঁয়ায় ম্লান হচ্ছে আগামী দিনের সকাল। লাল জলে, মাদকের ঘোরে বেচা কেনা হচ্ছে মানুষের নীতিজ্ঞান, অপুষ্টি, অশিক্ষা,আবাদিতে বাড়ছে আগামী প্রজন্ম।‘অমিতাভ’ লিখে  শূন্যস্থান পূরন করতে দিলে চা দোকানের বিল্টু ‘বুদ্ধ’ লেখে না,লেখে ‘বচ্চন’। ইমামি ফতোয়া,  গান্ধীবাবার ছবি ছাপা নোটে মাপা হচ্ছে ভোটের পারানি, থাক এত ভাবতে ভাবতে হয় ভবা পাগলা হয়ে যাবো নয় ভবানীপন্ডিত!! তার চেয়ে বরং জেনেশুনেও কানুনের দেবীর মত চোখবন্ধ করে একদিনের জন্য আদর্শ দেশপ্রেমিক সাজি।

‘মেরে দেশপ্রেমীয়ো, আপসমে প্রেম করো দেশপ্রেমীয়ো।‘

১২।

আজো ঘরে নেই বাড়ীর একমাত্র রোজগেরে ছেলেটা। আশেপাশের সব বাডীতে সবাই মিলে কেমন একটা ছুটির দিনের মেজাজে রয়েছে। পাঁচবছরের সবেধন নীলমনি নাতনির হাত ধরে প্রভাতফেরী ফেরত রামানন্দবাবুর মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়। ওদের বি এস এফ ক্যাম্পেও আজ স্বাধীনতাদিবসের প্রভাতফেরী হয়েছে নিশ্চয়ই। রামানন্দবাবুর ছেলে আনন্দমোহন আমার ছোটবেলার বন্ধু। আপাতত আসামের করিমগঞ্জে পোস্টেড। সীমান্তে কোথাও মাইনাস কুড়ি, কোথাও চল্লিশ ছুচ্ছে পারদ,অতন্দ্র পাহারায় আনন্দের মত খাকি পোশাকের ক‘টি মানুষের মত মানুষ,বাড়ী ছেড়ে, পরিবার ফেলে যাদের রোজ মৃত্যুর সাথে লুকোচুরী, আপনার আমার স্বার্থে দেশের সীমানার সুরক্ষায় জেগে ভারতীয় সেনা, ওরা আছে বলেই নিশ্চিন্ত আমার দেশে ধর্মের বোলবালা, ডাস্টবিনে কন্যাভ্রূণ,নারী নির্য্যাতন, ধর্ষন,ডাইনি হত্যা, আরো কত কি, ওরা আছে বলেই পুরো দেশ উৎসবে মগ্ন আর কাগজকলম নিয়ে প্রলাপ লিখছি আমি।
"মিলে সুর মেরা তুমহারা…’



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.