x

প্রকাশিত | ৯২ তম মিছিল

মূল্যায়ন অর্থাৎ ইংরেজিতে গালভরে আমরা যাকে বলি ইভ্যালুয়েশন।

মানব জীবনের প্রতিটি স্তরেই এই শব্দটি অবিচ্ছেদ্য এবং তার চলমান প্রক্রিয়া। আমরা জানি পাঠক্রম বা সমাজ প্রবাহিত শিক্ষা দীক্ষার মধ্য দিয়েই প্রতিটি মানুষের মধ্যেই গঠিত হতে থাকে বহুবিদ গুন, মেধা, বোধ বুদ্ধি, ব্যবহার, কর্মদক্ষতা ইত্যাদি। এর সামগ্রিক বিশ্লেষণ বা পর্যালোচনা থেকেই এক মানুষ অপর মানুষের প্রতি যে সিদ্ধান্তে বা বিশ্বাসে উপনীত হয়, তাই মূল্যায়ন।

স্বাভাবিক ভাবে, মানব জীবনে মূল্যায়নের এর প্রভাব অনস্বীকার্য। একে উপহাস, অবহেলা, বিদ্রুপ করা অর্থই - বিপরীত মানুষের ন্যায় নীতি কর্তব্য - কর্ম কে উপেক্ষা করা বা অবমূল্যায়ন করা। যা ভয়ঙ্কর। এবং এটাই ঘটেই চলেছে -

চলুন মিছিলে 🔴

সোমবার, আগস্ট ১৫, ২০১৬

মিঠুন চক্রবর্ত্তী

sobdermichil | আগস্ট ১৫, ২০১৬ | | মিছিলে স্বাগত
mithun

পলাশডাঙ্গা গ্রামের শেষ প্রান্তের মাঠে ছোট খাটো একটা রেল স্টেশন। আর তাকে ঘিরেই ধীর গতিতে বর্ধিষ্ণু একটা বাজার। প্রতিদিন সকালে মাছ, মাংস, সবজি সহ বিভিন্ন রকম জিনিসপত্র নিয়ে বাজার বসে।এখানে এই সময়ে প্রচুর মানুষ বাজার করার জন্য বা একটু আড্ডা দেওয়ার জন্য জড়ো হয়।  আজ সকাল থেকেই মেঘটা ভারী হয়ে নীচে নেমে এসেছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ ভালো রকম বৃষ্টি শুরু হল। বৃষ্টির মধ্যে একহাতে বাজারের থলে আর অন্য হাতে ছাতা ধরে যতটা সম্ভব ভেজা থেকে রক্ষা পাওয়া যায় তার চেষ্টা করতে করতে নির্মল বাবু এসে দাঁড়ালেন একটি মাছের দোকানের কাছে। সরু সরু কাঠের  হালকা কাঠামো তৈরি করে উপরে পুরু কালো রঙের পলিথিন চাপানো। মাঝে কিছুটা জল জমে নীচের দিকে নেমে গেছে।একটা ছোট কাঠি দিয়ে নীচ থেকে পলিথিন তুলে তুলে সেই জল বাইরে ফেলছিল তরুণ মাছ ব্যবসায়ী পিন্টু মন্ডল। 'বাবা পিন্টু আমাকে তিনশোর মতো বেছে বেছে ট্যাঁরা মাছ দিয়ে দাও তো' ---নির্মল বাবু ছেলেটির উদ্দেশ্যে বললেন। তৎক্ষণাৎ পিন্টু নির্মল বাবুর দিকে তাকিয়ে খুব আন্তরিক ভাবে বলে উঠল---' স্যার আসুন আসুন , পুরো ভিজে গিয়েছেন যে, এখানে একটু বসুন '। বলেই একটা কাঠের ছোট টুল কাঁধের গামছা নিয়ে মুছতে লাগল।একটা ভীষণ শব্দ তুলে হর্ণ দিতে দিতে শহর অভিমুখে বেরিয়ে গেল বেলা দশটার এক্সপ্রেস।

- দেখেছো বাবা বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে কত বেলা হল, আর বসার সময় নেই, দাও দাও তুমি একটু তাড়াতাড়ি কিছু মাছ বেছে দাও।
- 'আচ্ছা স্যার আপনি একটু দাঁড়ান আমি এক্ষুনি বেশ ভালো সাইজের কিছু মাছ বেছে দিচ্ছি।

পিন্টু নির্মল বাবুর ছাত্র। মাধ্যমিকে ব্যাক পেয়ে পড়াশোনা ছেড়ে বাবার ব্যবসায় হাত করে নিয়েছে। নির্মল বাবু মাছ নিয়ে টাকা মিটিয়ে বেশ তাড়াহুড়ো ভাবে বাড়ির পথে পা বাড়ালেন। রাস্তায় জল জমেছে খুব। এখনো বৃষ্টি ভালোই হচ্ছে।কিছুটা যাওয়ার পর পাশের চায়ের দোকান থেকে মন্টু দাস হাঁক দিয়ে ডাকলেন---- ' ও মাস্টার কাকা একটু অ্যা দিকে আইসেন ত।কিছু কতা বইলবার ছিল।

- কী কথা মন্টু?  আমার যে বড্ড দেরী হয়ে গেছে।
- গটা পাঁচেক মিনিট হলেই হব্যাক গো কাকা, বেশীক্ষণ আটকাইব নাই।

নির্মল বাবু মন্টুর চায়ের দোকানে এগিয়ে গিয়ে বললেন, বল হে মন্টু কী বলবে? চায়ের দোকানে আগে থেকে কয়েকটি ছোকরা বসেছিল। ছোট টিনের ছাউনি দোকানের মধ্যে সিগারেটের ধোঁয়া এবং গন্ধ তখনও ভরপুর। ছেলে গুলির মধ্যে দু'জন নির্মল বাবুর ছাত্র,লাল্টু আর গণেশ। ছাত্র হিসেবে দু'জনেই বেশ ভালোই ছিল। গ্যাজুয়েশন করে বিভন্ন জায়গায় চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোন শিকে ছিঁড়েনি। এখন তাদের একটি রাজনৈতিক দলের হয়ে বিভিন্ন মিছিল, ধর্মঘটে এবং সভায় পতাকা হাতে দেখা যায়।নির্মল বাবু তাদের দেখে জিজ্ঞেস করলেন,  ' তোমরা সব  ভালো আছো তো বাবা? 'কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে দু'জনে ঘাড় নাড়ল।

- মাস্টার কাকা আমার জমিন টার ব্যাপারে একটু কতা বইলব, সরকার আমার জমিন টা চাইছ্যা কাইরখানা হব্যাক বলে। দাম অ দিব্যাক ভালই, আর একটা চাকরি অ দিব্যেক বইলছ্যা। কী কইরব বলেন ত?
- ভালোই তো, দিয়ে দাও আমাদের বাঁকুড়ার এই লাল মাটিতে চাষের অবস্থা তো এমনিতেই ভালো নয়। এতে তোমারও লাভ আর গ্রামেরও উন্নতি হবে। গ্রামে বিজ্ঞান লক্ষ্মী ঢুকে পা ফেলে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সময় কী দিন ছিল ভাবো তো, লণ্ঠনের টিম টিম আলো, কোন রুগীকে শহরের হসপিটালে নিয়ে যেতে হলে গরুর গাড়ি, বেশির ভাগ রুগী মারা যেত তখন। তারপর ধরো কারও খবর পাওয়ার জন্য দীর্ঘ মেয়াদী চিঠি। আমার বাবা তো আমার হাতে আগুন টুকুও পেলেন না।আর আজ দেখো ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, একদিনে কলকাতা গিয়ে আবার ফিরে আসা যায়,সবার হাতে মোবাইল ফোন, এরপর কারখানা হলে আমাদের গ্রামের আর্থিক এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় আরও বিরাট পরিবর্তন হবে।  দিয়ে দাও মন্টু দিয়ে দাও। গ্রামকে শহরের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলো।

- আপনার সাইথে কতা বইলে বিশাল বঝা কাঁধ থেকেন ন্যামে গ্যাল মাস্টার কাকা। আসল কতা আমরা ভাল থাইকতে চাই। সে চাইষ কইরাই হোক আর কাইরখানায় কাজ কইরাই হোক।

পুরো রবিবারটাই বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে কেটে গেল। পরদিন কোথাও কোন বৃষ্টির ছিঁটে ফোঁটা নেই।পূবের আকাশ লাল করে কী মনোরম সূর্যোদয়! ভোর পাঁচটায় রোজই নির্মল বাবু উঠে পড়েন বিছানা থেকে। তারপর বাড়ির সামনের ফাঁকা মাঠে কিছু হালকা ব্যায়াম । তাই এই আঠান্ন বছর বয়সেও শরীরে সেরকম বয়সের প্রভাব পড়েনি। বাড়ি ফিরে প্রতিদিনের মতো আজও হাত মুখ ধুয়ে ঢুকে পড়েন পড়ার ঘরে।স্বামী বিবেকানন্দের জীবনীমূলক একটা গ্রন্থ তাক থেকে তুলে নিয়ে চেয়ারে বসে নীরবে পাঠ করতে লাগলেন অত্যন্ত মনযোগে। আর এই সময়েই রোজ গিন্নী মৈত্রী দেবী একটা বড় কাপে করে দিয়ে যান চা।পড়ার  মাঝে মাঝে একটু করে হালকা চায়ে চুমুক। ঘড়িতে ঠিক ন'টা বাজতেই উঠে পড়েন। এরপর স্নান করে খাওয়া দাওয়া সেরে স্কুলে রওনা দেন।

পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক নির্মল ব্যানার্জ্জী যখন ক্লাস নেন প্রতিটি ছাত্র -ছাত্রী মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনে। এবং ব্ল্যাকবোর্ডে কোন একটি বিষয়কে যখন তুলে ধরেন তাঁর সুন্দর হস্তাক্ষরে, মনে হয় সমস্ত বিষয়টাই মূর্ত হয়ে ধরা দিয়েছে ব্ল্যাকবোর্ডে।এমন একজন শিক্ষক আর দু'বছর পরেই অবসর নেবেন ভাবলেই স্কুলের ছাত্র -ছাত্রী এবং অভিভাবক মহলের মন ভারাক্রান্ত হয়ে যায়।

এরপর বেশ কয়েক মাস পরে আরও একটি রবিবার।আর কয়েকদিন পরেই দুর্গা পূজো। প্যান্ডেলের জন্য বাঁশ নেমে গেছে পূজো মন্ডপের মাঠে। সকলের মনেই একটা যেন প্রভাব পড়ে গেছে এখন থেকেই। আর একটা আনন্দের বিষয় কারখানা তৈরির কাজও শুরু হয়ে গেছে বেশ জোর কদমে। গ্রামের যুবক বেকার ছেলেরা এখন থেকেই বিভিন্ন জায়গায় জটলা করে আলোচনা করছে কতক্ষণ কাজ করতে হবে! কী ধরণের কাজ হবে! যদিও একই আলোচনা তবুও বার বার বিভিন্ন স্থানে ফিরে ফিরে আসে নতুন ভাবে। আর তাদের চোখ স্বপ্নালু হয়ে ওঠে।
                                     
সেদিনও দুপুর থেকে আকাশে জমাট বাঁধা কালো মেঘ। নির্মল বাবু দুপুরের দিকে খাওয়া দাওয়ার পর ডেক্সটপে হালকা সাউন্ডে আগমনী গান ছেড়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে একটু চোখ বুজেছিলেন। হঠাৎ করে বাইরের রাস্তায় ভীষণ চিৎকার চেঁচামেচি শুনে তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে বেরোতে গেলেন। স্ত্রী মৈত্রী দেবী ও একমাত্র ছেলে নির্জন তাঁকে বাধা দিল। নির্জন ছাদের থেকে দেখে এসেছে দু'টো রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রচুর ঝামেলা হচ্ছে। সকলের হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র। যে কোন সময় একটা বিশাল দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। নির্মল বাবু আঁতকে ওঠেন। এই এত বছরের জীবনে এমন ঘটনা কখনো ভাবতেও পারেননি এই গ্রামে। আটকাতে হবে, যেভাবেই হোক আটকাতে হবে। নির্মল বাবু জোর করে বেরিয়ে পড়লেন রাস্তায়। দু'টো দলেই অনেক লোক। অকথ্য ভাষায় গালি ছুঁড়ে দিচ্ছে পরস্পরকে। এত লোক এল কোথা থেকে! প্রায় অধিকাংশই অপরিচিত, বাইরের লোক। তার মধ্যেই একটি দলে নির্মল বাবু দেখলেন লাল্টু আর গণেশ কে। আর একটি দলে তার অতি প্রিয় ছাত্র অম্বুজ সামনে দাঁড়িয়ে শ্লোগান দিচ্ছে। অম্বুজ লেখা পড়ায় যেমন ভালো ছিল, তেমনি ভালো আবৃত্তি করত। মাঝে মাঝেই অম্বুজের কাছে নির্মল বাবু রবি ঠাকুরের 'নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ' কবিতাটি শুনতে চাইতেন। আহা! কী মিষ্টি গলায় আবৃত্তি করত অম্বুজ।

- সরে যান মাস্টার মশাই, এটা রাজনৈতিক ঝামেলা আপনি জড়াবেন না ' অম্বুজের গলা! হ্যাঁ অম্বুজেরই তো। কী গুরু গম্ভীর!

না, মাস্টার মশাই দু'টো দলের মাঝখান থেকে সরে দাঁড়ান নি। যে ভাবেই হোক গ্রামে যে ঘটনা কক্ষনো ঘটেনি তা তিনি ঘটতে দিতে চাননি। তবুও বিকেলের দিকে  একটা ঘটনা ঘটল। কোন একটা দলের ছোট্ট ধাতব যন্ত্রের গর্জন এবং একটা মানুষের মৃদু আর্তনাদ স্তব্ধ করে দিল গোটা গ্রামটাকে সন্ধে নামার আগেই। অনেক রাত্রি পর্যন্ত থমথমে কালো আকাশের নীচে পড়ে রইল মাস্টার মশাইয়ের রক্তাক্ত লাশ। কাউকে হাত দিতে দ্যায়নি পুলিশ।একটা ভারী বর্ষণ নিয়ে রাত্রি নামল পলাশ ডাঙ্গার রাস্তায় এবং এখনোও আকাশের দিকে পলকহীন তাকিয়ে থাকা মাস্টারমশাই এর গভীর ক্ষত বুকে। কিছু পরে পলাশডাঙ্গার মাথার উপরের কালো আকাশটাতে নির্মল বাবুর সুন্দর হস্তাক্ষরের মতো একটা একটা করে নক্ষত্র ফুটতে লাগল। ঠিক যেন সবার প্রিয় মাস্টারমশাই এই বিশাল ব্ল্যাকবোর্ডে আজ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে একটা বিষয়কে মূর্ত করে তুলছেন। 



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

�� পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ শব্দের মিছিলের সর্বশেষ আপডেট পেতে, ফেসবুক পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.