x

প্রকাশিত

​মহাকাল আর করোনাকাল পালতোলা নৌকায় চলেছে এনডেমিক থেকে এপিডেমিক হয়ে প্যানডেমিক বন্দরে। ওদিকে একাডেমিক জেটিতে অপেক্ষমান হাজার পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ।​ ​দীর্ঘ সাতমাসের এ যাপন চিত্র মা দুর্গার চালচিত্রে স্থান পাবে কিনা জানি না ! তবে ভুক্তভোগী মাত্রই জানে-

​'চ'য়ে - চালা উড়ে গেছে আমফানে / চ'য়ে - কতদিন হাঁড়ি চড়েনি উনুনে / চ'য়ে - লক্ষ্মী হলো চঞ্চলা / চ'য়ে - ধর্ষিতা চাঁদমনির দেহ,রাতারাতি পুড়িয়ে ফেলা।

​হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানুষটি লালমার্কার দিয়ে গোল গোল দাগ দেয় ক্যালেন্ডারের পাতায়, চোদ্দদিন যেন চোদ্দ বছর। হুটার বাজিয়ে শুনশান রাস্তায় ছুটে যায় পুলিশেরগাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স আর শববাহী অমর্ত্য রথ...। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেকটা জল, 'পতিত পাবনী গঙ্গে' হয়েছেন অচ্ছুৎ!

এ কোন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

সমীরণ চক্রবর্তী

সোমবার, জুলাই ২৫, ২০১৬

সোনালি মুখার্জী

sobdermichil | জুলাই ২৫, ২০১৬ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
sonali




ছোট বেলা থেকে রেলব্রিজ টাই আমার আইডেন্টিটি। ওকেই সবচে বেশি চিনি। প্রতাপাদিত্য রোড থেকে রেলব্রিজ এর তলা দিয়ে এসে ডান দিকে গলিতে ঢুকলেই, বাড়ি এসে গেছি। ও ব্রিজের ইঁটগুলোকে অব্ধি চিনি।

প্রতাপাদিত্য রোডের দিকে ব্রিজের ও দিকটা ভারি আপন জায়গা। সামনেই একটা মস্ত উঁচু কদম গাছ।তার ডালপালা ছুঁয়ে একটা বড় বাড়ি। নীচে ফার্নিচারের দোকান। একটা মনিহারি দোকান।দোকানের পাশে সরু প্যাসেজ। ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে উঠলে দোতলার ঘর। ভিতরে বারান্দা,খাবার টেবিল,রান্নাঘর। বাঁ হাতের ঘরের মধ্যে দিয়ে গেলে বাইরের খোলা বারান্দা।সেখানে সিমেন্ট দিয়ে তৈরি হরপার্বতীর মূর্তি।

এ বাড়িতে থাকতেন ঠাকুরদা ঠাকুরমা, তাঁদের আমি সন্তোষকাকুর বাবা মা বলেই চিনতাম। দাদুর সঙ্গে বিশেষ দেখা হত না।ভিতর দিকের শোবার ঘরে থাকতেন। কিন্তু দিদাকে দেখতাম সব সময়েই। খুব গোলগাল, দাপুটে মানুষ ছিলেন। ভারি ভালবাসতেন বাবা কে।খুব গল্প হত।আমি বাবার পাশে চুপটি করে বসে শুনতাম সে গল্প।বাবার পাশে আছি,এইতেই ভারি ভাল লাগত।

আগে সেখানে দেখা হত মীনাপিসি, তাঁর ডাক্তার বর রজনীকাকু আর মেয়ে কৃষ্ণকলিদির সঙ্গে। মীনাপিসি বলতাম, কারন তিনি বাবার বন্ধু সন্তোষকাকুর বোন।প্রফেসর, ভারি সুন্দর দেখতে,বিরাট লম্বা বেণী। তাঁর বর রজনীকাকুও বাবাদের বন্ধু, কিন্তু পরে মীনাপিসিকেই বিয়ে করে ছিলেন।

রজনীকান্ত চতুর্বেদী। অলইন্ডিয়া রেডিওর জনপ্রিয় সেতারবাদক, ভাল চিকিৎসক, আর সাহিত্য, বিশেষত ইংরেজি সাহিত্যে অসাধারণ দখল।টকটকে সোনার মত গায়ের রং, টিয়া পাখির মত নাক, পাতলা লাল ঠোঁট। মেয়ে কৃষ্ণকলিও এই রকম সাংঘাতিক সুন্দরী। দেখলে উত্তর ভারতের রাজকন্যা মনে হত।অনেক অনেক পরে,খুব সুন্দর একটা ভাই ও হয়েছিল।

এ বাড়ির নিচে, পাশের এক তলায়  চা আর আড্ডার বড় দোকান ছিল।এখন আর নেই। তার পাশে, উঁচু তাক পেতে রামবিলাসের পান সিগারেটের দোকান। সেটা এখন ও আছে। বাবারা চারমিনার আর চা দিয়ে সেখানে যে আড্ডা তৈরি করতেন এই জায়গাটুকু ঘিরে, তাতে স্বদেশ আর বিদেশের সাহিত্য,সিনেমা, সংগীতের অপূর্ব নির্যাস আমায় বুদ্ধিজীবী বাচ্চা করে তুলেছিল। পরে ওই দোতলার ফ্ল্যাটে দেখা হত সন্তোষ কাকু,দীপালি কাকিমাদের সঙ্গে। 

এবাড়ির ঠাকুমাকে দেখলে মনে হত মেম সাহেব।ভীষন ধবধবে সাদা গায়ের রং আর নীলচে ধূসর চোখ।অমন চোখ বাঙালির দেখা যায় না। বাংলা করে শাড়ি পড়তেন।খুব মেজাজি গিন্নী। সন্তোষকাকুরা সবাই ওমনিই দেখতে ছিলেন। আমি ছোট বেলায় জন কেনেডির ছবি দেখে ভাবতাম সন্তোষ কাকু।

দীপালি আমারো মায়ের নাম।আর দুই বন্ধুর কাছাকাছি সময়ে বিয়ে হয়েছিল। বৌভাতের দিন কাকিমাই সাজিয়েছিল মাকে, সব সময় গল্প শুনতাম। ওনাদের তিন খুদে,সিরাজরা দুই ভাই,এক বোন।বোনটা ছোট্ট বেলায় খুব রোগা ছিল।কিন্তু মুখখানা একে বারে ঠাকুমা,আর ঠিক তেমনি কথা বলতে ভাল বাসত অনর্গল। ঠাকুমা বাড়িতে কথা বলার লোক না পেলে হামেশাই আমাদের বাড়ি চলে আসতেন।সেটা সকালে হলে মা সেদিন অফিসে লেট।কিন্তু তাই বলে গল্প থামানো যাবে না।যা জাঁদরেল মানুষ।

দাদু, দিদা দুজনের শেষকাজই ঐ বাড়িতে হয়েছে। বেশ মনে আছে দিন গুলো। 

দীপালি কাকিমা ও তাঁর নিজস্ব ক্যারিশমাওয়ালা জাঁদরেল গিন্নী ছিলেন। তাঁকে দেখলে রাশিয়ান সুন্দরীদের মনে পড়ত।লালচে চুল।গোল লাল গাল।গোল গোল হাত পা।খুব ব্যাস্ততার মধ্যেই মায়ের সঙ্গে গল্প হত। রাস্তাঘাট বা কখনো কাজের লোকের খোঁজে আমাদের বাড়িতে।

মা এক আমাকে নিয়েই অস্থির। অথচ কাকিমা সিরাজ, সৌকত আবার বুইয়াকেও সামলান এই ভেবেই আমি একেবারে যাকে বলে " অ--ড" হয়ে থাকতাম। তার ওপর এক বড় পরিবার, এবং সংসারের সব কাজের দায়িত্ব,বাজারহাট..... কাকিমা সব সময় দৌড়াচ্ছে। বাবা গল্প করতেন যখন মায়ের সঙ্গে কানে আসত, ছেলেমেয়েদের মাটিতে পা দিয়ে চলতে শেখাচ্ছেন।

আমার বাবা, তাঁর বাবাকে হারিয়ে ছিলেন ১৮ বছর বয়েসে।মা, ছোট দুই বোন আর দশের ও কম বয়েসী দুই ভাইকে নিয়ে শুরু করেছিলেন তাঁর লড়াই। ঠাকুরদা ছিলেন বিলিতি জাহাজ কোম্পানি, আর.এস.এন এর ক্যাশিয়ার। ১৮ ছোঁয়া ছোট্ট ছেলে, হেড অফ দা ফ্যামিলি হয়ে সেখানেই কাজে ঢুকল।নইলে বাড়ির সবাই খাবে কি? কিং স্কাউট, পণ্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের গাণ্ডা বাঁধা প্রিয় শিষ্য তরুন তবলচী, অলইন্ডিয়া প্রাইজ পাওয়া অভিনেতা,বলাই ভট্টাচার্য অফিস শুরু করলেন।

তাঁর বন্ধু প্রমোদ চক্রবর্তী, অরুণ মজুমদার, সন্তোষ মুখার্জি, ডঃ রজনীকান্ত চতুর্বেদী, মানিক ব্যানার্জী যাঁরা কলেজ করছেন, আর কলেজে ডিগ্রী নিয়ে ফেলেছেন, তাঁর হাত ধরে রইলেন। যেন লেখাপড়া বন্ধ না হয়,গান বাজনা অভিনয় আনন্দ থেমে না থাকে। এ বন্ধুবৃত্তের কোন উপমা নেই।এর মিষ্টি উত্তাপ আর নিরাপত্তার ওম নিয়েই আমি বড় হয়েছি। কিন্তু বড় হয়ে, অনাত্মীয় মানুষের এত বড় ভালবাসার সাংস্কৃতিক বন্ধন কমই দেখেছি। আমার গয়নাগাটির মধ্যে এটি এক দুর্লভ মানিক্য।

বাবার কাছে তবলা শিখতেন অনেকেই।সন্তোষকাকু ও ছিলেন সে দলে।তাই ওঁদের বাড়িতে অনেকেই বাবাকে ডাকতেন গুরু। তখন কিন্ত আজকালকার মত বন্ধুদের গুরু ডাকার চল ছিলো না। দুজনে একসঙ্গে পড়াশুনোও করতেন। কারন বাবা প্রাইভেটেই পড়ে বাংলা অনার্স উইথ ডিস্টিংশন, স্পেশাল পেপার ইংলিশ নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে ফেলেছিলেন। তো,দুই বন্ধুর পড়াশুনো হত। ইংরেজির মাস্টার মশাই হতেন আরেক প্রানের টুকরো প্রমোদকাকু।

আবার নানা প্রকার এক্সপেরিমেন্টও হত।কখনো তারাপীঠের শ্মশান, কখনো দক্ষিণেশ্বর, কখনো দেশের বাড়ি কৃষ্ণনগর, শান্তিপুর। আর সন্তোষকাকুর গাড়ি চালানোর হাত ও শখ দুইই এ ক্লাস, তাই দুই বন্ধুর যথেচ্ছ ঘুরে বেড়ানো। আমি এসব গল্প শুরু হলেই জানতাম এর পর কনক্লুশানে কি আসবে।

সেই যে,আমার ছোট পিসিমা অপু,মানে অপর্না,যাকে বড় করে আমার বাবাই বিয়ে দিয়ে ছিলেন,তিনি বাড়িতে এসে ছিলেন প্রথম মা হবেন বলে। তা, আমার আভাদিদি যেদিন পৃথিবীতে আসবেন ঠিক করলেন, সেদিন তুমুল বৃষ্টি। রেলব্রিজএর তলায় গলাজল। পিসিমাকে নিয়ে বাবা হাসপাতালে যাবেন কি করে? ছাতা মাথায় প্রায় সাঁতার কেটে সন্তোষকাকুকে ডাকলেন। তারপর দুজনে রাস্তা পেরিয়ে এখন যেখানে ডাইংক্লিনিং আপ্যেরেল,আগে মেলোডির রেকর্ড এর দোকান ছিল,তার পাশের পেট্রলপাম্পে পৌঁছলেন। সেখানে ও এক হাঁটু জল। ভীষন দুর্যোগ। পাম্পের গাড়ি সব চেক করতে করতে একটি পাওয়া গেলো লক না করা।চাবি শুদ্ধু। কাকুর গাড়ি দুরের কোন গ্যারাজে ছিলো। অত নষ্ট করার মত সময় ছিল না হাতে। সেই অচেনা গাড়ি, পাম্প থেকে চালিয়ে আমাদের রেলব্রিজের গলির শেষ প্রান্তে ঠাকুরমার ঘরের সামনে নিয়ে আসা হল। পিসিমাকে পেছনের সিটে নিয়ে চল্লেন দুই বন্ধু। স্টার্ট বন্ধ করা যাবেনা। তা হলে হয়ত আর চালু হবে না ইঞ্জিন। জল ঠেলে নৌকোর মত পৌঁছেছিল গাড়ি।হাসপাতালে ফুটফুটে মেয়ের মা হয়েছিলেন পিসিমা।

প্রায় ভোর রাতে দুই বন্ধু পাম্পে ফেরত নিয়ে এলেন।বাবা পয়সা দিয়ে পেট্রোল ভরে দিয়ে এসে ঠাকুমাকে সুন্দর নাতনি হবার খবর দিয়ে ছিলেন। কত কত দিন পর, প্রায় চল্লিশ বছর পরেও বন্ধুর সংগে এই দুরূহ এডভেঞ্চার বাবার চোখের সামনের ভাসে। 

লোকাচার আর বেড়ে ওঠা প্রত্যেক গোষ্ঠীর কিছু নিজস্ব রীতিনীতি, সামাজিক নিয়ম, সময়ের সিঁড়ি বেয়ে তৈরি হয়েছে। আমার মা জননী, লাল পাড় শাড়ি, ফর্সা হাতে ধবধবে শাঁখা পলা আর টুকটুকে সিঁদুর পড়ে থাকতেন সব সময়। অফিসে যাবার সময় ও মাথা থেকে ঘোমটা সরত না।

অথচ পড়াশুনো, চলাফেরায় মানে ইংরিজি উচ্চারণ বা নভেল পড়ার নেশা, আমার ইস্কুলের  প্রজেক্ট অথবা চীজ,কর্নফ্লেক্স দিয়ে ব্রেকফাস্ট, কেটে গেলেই টিটেনাস ইংজেকশান, আর ভ্যাকসিন, এসবে একেবারে মেমসাহেব। সেটা বাইরের মধ্যবিত্ত পাড়া চট করে টের পেতো না।শুধু বুঝতো কোথাও আমি,আমরা অন্য রকম। সমীহের বেড়া লক্ষ্মণের গন্ডি কেটে রাখত আমাদের ছোট্ট সংসারের চার দিকে।

আমি এত দিনে পিছু ফিরে দেখতে বসে খেয়াল করছি চারপাশের পরিবারের থেকে মা বাবা কতটাই অন্যরকম, কত কস্মোপলিটান।তখন ভাবতাম সবাই এমনই বড় হয়। বাবা মাকে সবাই জানত ট্রাডিশন মেনে চলা মানুষ। আমায় বাঙালির প্রথা সব শিখিয়েছেন। আকাশপ্রদীপ জ্বালাই হোক,বা পুজোর আলপনা। মৃত্যুকে সম্মান জানিয়ে, মৃত মানুষকে স্পর্শ করে এলে তাই এখনও বাড়িতে ছোটদের বলি ভিতরে ঢোকার আগে আগুন দাও, তেতো কিছু দাও, লোহার জিনিষ ছুঁয়ে ভিতরে ঢুকব। ঢুকেই স্নান সারব। এইটাই নিয়ম।

আমার ছেলে প্রশ্ন করে কেন নিয়ম?
আমি ভাবতে বসি। হাইজিনের অংশ তো আছে।তা ছাড়া....
তখন দেখি, হ্যাঁ,পূর্বজ বাঙালির  ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমায় শিখিয়ে তো গেছেন দুই জন,কিন্তু এনফোর্স? এর সঙ্গে, রোজ কব্জি অব্ধি নানা ধরনের মরা টিসু মেখে খালি হাতে লাশ কেটে আসা ১৮ বছরের পুপুর তো কোন যোগ নেই। কোন লোকাচার, মৃত্যু সম্বন্ধে কোন ট্যাবু, মৃত দেহ সম্বন্ধে কোন ভীতি তার বাড়িতে তো ছিল না। বাড়ি ফিরেই ডেটল জলে জামাকাপড় ভিজিয়ে রেখে চান সেরে আসা স্বাভাবিক ভাবেই পরিচ্ছন্নতার নিয়ম মেনে ছিল।

কিন্তু এই বাড়ির মেয়ে যে রোজ লাশ রাখা লম্বা বাক্সের ওপরেই বসে বন্ধুদের সংগে ঠ্যাং দুলিয়ে দুলিয়ে টিফিন খায় ,খালি হাতে কাঁচের বয়াম থেকে বের করে কত যুগের বাসি মড়ার লিভার বা কিডনি নিয়ে ক্লাসে পড়ে শুনে আসে, কই কোন রিয়্যাকশান তো ছিল না।!

জলখাবার খেয়েই ফার্স্ট ইয়ারে একবাক্স খুলে রাখা কঙ্কালকে টেনে এনে যে হাড়টা পড়ানো হয়েছে ক্লাসে, তাকে নিয়ে বই খুলে খাটে বসে পড়তাম পড়তে। আনাটমিটাই সবচেয়ে বেশি মুখস্ত করতে হয়।পার্ক সার্কাস অব্ধি যাতায়াত আর কলেজের ক্লান্তিতে লম্বা হাড্ডিতে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়তাম কত।

বাবা মা অফিস থেকে ফিরে দেখতেন মোটকা গ্রে'স আ্যানাটমি আর হাড় মাথায় ঘুমোচ্ছে কন্যা। বাবা মশাই স্বভাবসিদ্ধ ভংগীতে বলতেন, মোটা বই মাথায় দিয়ে ঘুমোলে ডাইরেক্ট পড়ারা ভিতরে ঢুকে যায় কি বল? মা বলতেন,খাবার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়।বিছানা তো ধামসাচ্ছ আমার। ব্যাস।ও টুকুই।

অবশ্য লাশ কাটার গল্প শুনতে শুনতে রাতে খাবার টেবিলে বাবা মনে করাতেন, আগেকার দিন হলে লোকেরা আমাদেরকেই শব সাধনাকারী তান্ত্রিক বলত। শিব, আমাদের প্রথম দিকের ভিষগ, চিকিৎসক। তাই তাঁকে শ্মশানচারী, অস্থিধারী ইত্যাদি বলেছে মূর্খ আমজনতা। পরে ফোরেন্সিক ক্লাসে টক্সিকোলজি পড়তে গিয়ে এ কন্সেপ্ট আরও ঠিক মনে হয়েছে। সাপের বিষ, ধুতরাফুল ফল, ইত্যাদি চিকিৎসাবিদ কেই জানতে হয়। বিজ্ঞানমনস্কতা, স্বচ্ছ চিন্তা এর সঙ্গে লোকাচারের  কখনো সংঘাত বাধেনি আমার বড় হবার রাস্তায়।

এইটাই স্বাভাবিক বড় হওয়া বলে ভেবেছি। আজ চারপাশে তাকিয়ে মনে হচ্ছে,  সব ছোটরা এত সহজ করে বড় হয় না। হলে আরও অনেক সরল রেখায় চিন্তা করতে পারা মানুষকে সমাজে দেখতে পেতাম।



বাবামশাই এটা একটা স্ট্যান্ডিং জোক ছিল আমাদের।

------ দেখো, রবীন্দ্রনাথএর আমল হলে, আমায় তোমার বাবামশাই বলে ডাকতে হত।আমি ছোট করে বলতাম, মা আর ' বা। ক্লাস থ্রিতে পড়ি।এক দিন বিকেলে, বাবা বললেন ডায়রি আছে না? বললাম, হ্যাঁ তো।
- নিয়ে এসো।
যত্ন করে বানান ঠিক করে দিয়ে ডিক্টেশান দিয়ে লেখালেন : 
দিলওয়ালে দিল গির হুয়া
ক্যা শোচ রহা হ্য তু
সুখ অউর দুখ কো সমঝ বরাবর,
তু ধীরজ ধর সাধু
কিয়ুঁ শোচ রহা ক্যা শোচ রহা হ্য তু?
খোটি দুনিয়া ভালে বুরে কি
কর না সকে পহছান
জ্ঞানবান পর কীচ উছালে
মূরখ কো দে মান
তু অপমান কো মান সমঝ কর পোঁছ ডাল আঁসু
কিয়ুঁ শোছ রহা ক্যা শোচ রহা হ্য তু?
হাসিখুশি অউর রোনাধোনা জগ কে ঝুটে খেল
তন মন নে যো বসা হ্য
সব সে বড়া তো উসিসে মেল
মন পর পা কাবু
সাধু, মন পর পা কাবু...........

ভুলে যাবার উপায় ছিল না।কখনো লোড শেডিং হলেই বাবা শুনতে চাইতেন গানটা। সুর কথা যে খানে ভুলে গেছি সঙ্গে গেয়ে দিতেন।এমন গুরু অনেক সৌভাগ্য করে পেয়েছি, যিনি কখনওই বকেননি।  ৩৬ বছর বয়েস অব্ধি অভ্যেস করা গান কবিতাদের ভোলার উপায় নেই।

২০০৪ এ বাবা কে আর হাতের কাছে পাচ্ছি না,জীবনের নানা ওঠাপড়ায় তেতো লাগছে, ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে চোখ বুজে অভ্যাসেই গুনগুন করছি। ভাবছি পাকাবু কি কোন উর্দু বা ফারসি কথা? সাধু কে পাকাপোক্ত হতে বলেছে? তখন লেখাটা ভেসে উঠল চোখে।আরে, পা কাবু.....মনের ওপর লাগাম কষতে বলেছে।

চোখ খুলে উঠে বসলাম। বুঝলাম কেন বাবামশাই ক্লাস থ্রির ক্ষুদে পুপুর হাতে গুপ্তধনএর ম্যাপ দিয়ে গেছেন। তিনি জীবনকে চিনতেন। জানতেন পুপুর একদিন একা ঘরের কোনে এই সম্পদের দরকার হবে।

আমার সকল পাঠের মহাগুরু, তুমি আমায় আচার্যের পায়েও পৌঁছে দিয়েছ, মহাশ্মশানে পাশে দাঁড় করিয়ে দেখিয়ে দিয়েছ পঞ্চভূত কেমন সহজ সুন্দর ভাবে মিলিয়ে যায় নিজের নিজের জায়গায়। আর ২৬ মে ২০০৪ এর সন্ধ্যায় আলতো একটি শান্ত দীর্ঘশ্বাসে নিজের বিছানায় শুয়ে শিখিয়ে গেছো,

কেন রে এই দুয়ার টুকু পার হতে সংশয়
জয় অজানার জয়

আমি যে তোমার ঘাড়ে চড়ে থাকা, কোলে বসে থাকা, একসাথে ট্যাং ট্যাং করে ঘুরে বেড়ানো মানুপুপু হবার সৌভাগ্য পেয়েছি, তার জন্যেই জীবনের পায়ে লুটিয়ে প্রনাম জানাই।




Comments
2 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.