x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

মৌমিতা মিত্র

sobdermichil | জুলাই ২৫, ২০১৬ |
moumita








আহা, মরে যাই। কৃষ্ণেন্দু আমার একমাত্র সন্তান। আমি আমার সন্তানকে তোমার কাছে ভিক্ষে চাইছি। কি ডুপ্লিসিটিবাজ বুড়োরে বাবা। প্রথমে সমাজের ভয় দেখাল। বিস্তর ধমক – ধামক দিল। তাতে যখন কাজ হল না, তখন স্রেফ রামপ্রসাদী ইউ টার্ন। নবলতা একটু লজ্জা পেলেন। তার মুখ বা মনের ভাষাও কেমন যেন মেয়ের মত হয়ে যাচ্ছে। রামপ্রসাদী ইউ টার্ন। কথাটা বেশ এখনকার যুগের মত হয়েছে তো। হাসতে গিয়ে নবলতার চোখ চলকে উঠল। তিনি চোখে আঁচল চাপা দিলেন। এই সিনটা তিনি যতবার দেখেন, ততবারই তাঁর দুচোখ জলে ভরে যায়। বিশেষ করে রীনা ব্রাউন যখন কৃষ্ণেন্দুর বাবাকে ডেকে বলে, সে কৃষ্ণেন্দুর জীবন থেকে চিরকালের মত সরে যাবে, তখন নবলতা আর নিজেকে সামলাতে পারেন না। ঝরো ঝরো চোখে রীনা ব্রাউনকেই গালাগাল করতে শুরু করেন। আশ্চর্য। চলেই তো যাচ্ছিল খিটকেলে বুড়োটা । কেন আবার খাল কেটে কুমীর আনার মত পিছু ডেকে নিজের সুখ খোয়াতে গেলি? একেই বলে, সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়। 

আহ, আবার সপ্তপদী। শেষ দেখেছিলেন গতমাসে। প্রায়শই এ চ্যানেল ও চ্যানেল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেয় সিনেমাটা আর প্রতিবারই নবলতার দেখা চাইই চাই। এই সিনেমা মিস করলে চলে? এসব হচ্ছে স্বর্ণযুগের ছবি। যতবারই দেখেন, মনে হয় বুঝি এই প্রথমবার দেখছেন। উত্তম-সুচিত্রার মত এমন জুটিও কি আর কোনদিন হল না হবে? কি চমৎকার অভিনয়! দুজনে দুজনের দিকে চোখ মেলে চাইলেই সব কথা সারা হয়ে যেত। সেসব দৃশ্য দেখতে দেখতে নবলতারও চোখের পাতা পড়ত না। আজও পড়ে না। তার উপর আবার সপ্তপদী। সারা জীবনে কশোবার যে সিনেমাটা দেখেছেন। প্রথমবার দেখার পর উত্তম কুমারের গলায় কতবার যে স্বপ্নে মালা পরিয়েছেন আর সুচিত্রার দুঃখে রাত্রিবেলায় ঘুমের ঘোরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠেছেন, তার হিসেব নেই। এ নিয়ে পম্পার বাবা তাকে কম ঠাট্টা করেছেন। কতবার বলেছেন, ওয়েস্টার্ণ কান্ট্রি হলে এতদিনে তোমায় ডিভোর্স দিতাম। আমার মত এমন দেবাদিদেব স্বামী থাকতে তুমি কিনা পরপুরুষের গলায় স্বপ্নে মালা দাও? আজও নবলতার কানের লতিদুটো রাঙা হয়ে ওঠে। স্বামীর কাছে যে সব কথা বলতে নেই, কিছু কিছু কথা লুকোতেও হয় সে জ্ঞান – গম্যিও ছিল না নবলতার। আহা, অমন মানুষটাও নবলতাকে ফেলে চলে গেল? তবে নবলতার জীবনে সপ্তপদীর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বলে যদি কিছু থাকে, সে হল ছবি বিশ্বাসের উপর তাঁর আঠেরো আনা রাগ। সপ্তপদী দেখার পর থেকে অমন ডাকসাইটে কন্দর্পকান্তি অভিনেতাও নবলতার চোখে চিরকালের ভিলেন হয়েই রয়ে গেলেন। ‘খিটকেলে বুড়ো’ ছাড়া নবলতা আজও তাঁকে অন্য নামে ডাকেন না। কেন ডাকবেন? আরে বাবা, হিন্দু হোক, মুসলিম হোক, খৃষ্টান হোক, যা-ই হোক না কেন, উত্তম-সুচিত্রা হল উত্তম-সুচিত্রা। তাদের মিলনে তুমি বাঁধা দিতে আসো? খিটকেলে বুড়ো কোথাকার-

‘এই পথ যদি না শেষ হয়...’ চমকে উঠলেন নবলতা। মোবাইল বাজছে। নবলতার প্রিয় বলে এই গানটাকেই পম্পা নবলতার মোবাইলের রিংটোন হিসেবে সেট করে দিয়েছে। তিনি তো শুধু ফোন ধরা আর ছাড়াটা রপ্ত করেই খালাস। নবলতা মোবাইলে চোখ রাখলেন। নীলাভ-সবুজ জোনাক-জ্বলা আলোয় পম্পা কলিং।

-হ্যাঁ বল।
-মা, আজ ইউনিভার্সিটী থেকে ফিরতে দেরী হবে। একজন বন্ধু তার জন্মদিনে পার্টি দেবে আমিনিয়ায়। রাতে যেন আমার জন্য রান্নাবান্না কোর না। বুঝেছো? 
- বুঝলাম।
-ওকে, ছাড়ছি, এখন অনেক কাজ। ভাল একটা বার্থ ডে গিফট কিনতে হবে। এখন সেই নিয়েই জল্পনা কল্পনা চলছে।
- সে যাই চলুক, আমার জানার দরকার নেই। আমাকে শুধু বলে দে কটার পর থেকে আমি চিন্তা করা শুরু করব আর ঘন ঘন ঘড়ি দেখবো।
- উফফ, তোমাকে নিয়ে আর পারি না। শোন মা, আমাকে নিয়ে চিন্তা বা দুশ্চিন্তা কোনটাই করতে হবে না, সেরকম দেরী হলে জামাল আছে, ও আমায় বাড়ি অব্দি পৌঁছে দেবে।
- জামাল? জামাল আবার কে?
-ওফ, কে আবার, আমার বন্ধু, ইউনিভার্সিটীতে আমরা একই ক্লাসে পড়ি। ও না, একটু ক্যাবলা ক্যাবলা, বুকিশ আর গম্ভীর টাইপ আছে। তাই বলছি, সেরকম দেরী হলে ও আমায় কিছুতেই একলা ছাড়বে না। ঠিক বাড়ি অব্দি পৌঁছে দেবে। ওকে? ছাড়ছি।

পম্পা ফোন কেটে দিল। নবলতা ধীরে ধীরে মোবাইল কান থেকে নামালেন। জামাল। জামাল বাড়ি পৌঁছে দেবে। জামাল ক্যাবলা টাইপ। জামাল গম্ভীর টাইপ। আজকালকার ছেলেমেয়ে। একসাথে ওঠাবসা করে। দেরী হলে একজন আর একজনকে বাড়ি পৌঁছে দিতেই পারে। তাছাড়া এ যুগের মেয়ে যে মায়ের জন্য পাত্র নির্বাচনের কাজটা ফেলে রাখবে, এমনটা ভাবতেও খুব একটা ভরসা পান না নবলতা। কিন্তু জামাল? নবলতা কি একটু বেশীই ভেবে ফেলছেন না? জামালের বদলে জয়ন্ত, জয়দ্বীপ বা জমদগ্নি হলে কি তিনি এতটাই ভাবতেন?

নবলতা মোবাইলটা খাটে রেখে টিভির দিকে তাকালেন। ব্রেকের পর সপ্তপদী শুরু হয়ে গেছে। রীনা কৃষ্ণেন্দুর বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। কৃষ্ণেন্দু তার কালসিটে পড়া মুখ নিয়ে রীনাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে চিরকালের মত। আশ্চর্য, নবলতার কিন্তু একটুও কষ্ট হচ্ছে না ওদের জন্য। বরং উত্তম-সুচিত্রার মুখ হারিয়ে গিয়ে বার বার আর একটা মুখ ভেসে উঠছে তার চোখের সামনে। যন্ত্রণাক্লিষ্ট, অপমানিত, পরাজিত, আদ্যন্ত ভেঙ্গে পড়া একজন অস্তাচলে ঢলে পড়া মানুষ- যে তার সন্তানকে ভিক্ষে চাইছে জামালের কাছ থেকে। নবলতা শিউরে উঠলেন।

টিভির পর্দাটা কি তবে আয়না হয়ে গেল? 


Comments
2 Comments

২টি মন্তব্য:

  1. Ekobinsho shotabdite dariye ekono cinema r golpote e edhoroner bach bichar mene neoa somvob.. bastob jibon e sobsomoy TV r porda Ayana r moto e hoy.. bises kore Maa e der kache..

    উত্তরমুছুন
  2. Ekobinsho shotabdite dariye ekono cinema r golpote e edhoroner bach bichar mene neoa somvob.. bastob jibon e sobsomoy TV r porda Ayana r moto e hoy.. bises kore Maa e der kache..

    উত্তরমুছুন

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.