x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

সোমবার, জুন ২০, ২০১৬

দেবরাজ দাশগুপ্ত

sobdermichil | জুন ২০, ২০১৬ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
debraj









দেশে বেকার সমস্যার সুদিন চলছে এবং শিল্প কারখানার ধূসর মরুভুমি এই অঞ্চলে প্রবাদবাক্য হবে ‘দুর্দশার মহানায়ক বেকারত্ব’।তবু বি এস সি পাশ সার্টিফিকেটের দাম আছে। ইংলিশ মিডিয়াম প্রাইভেট স্কুলের সাইন্স টীচারের পোস্ট পেতে তেমন আকাশ পাতাল এক করতে হল না। পত্রিকায় ‘টীচার ওয়ান্টেড’ বিজ্ঞাপন দেখে এপ্লাই করার পর প্রিন্সিপালের সাথে সরাসরি ইন্টারভিউ ,ম্যানেজিং ডাইরেক্টরের সাথে টেলিফোনিক ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে চাকরিটা হয়ে গেল।

একটা স্কুলে প্রিন্সিপাল এবং ম্যানেজিং ডাইরেক্টরই সবচে গুরুত্বপূর্ন ব্যাক্তি। কিন্তু প্রথম দিনেই বিপ্লব বুঝে নিয়েছে একটি কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক, স্কুলের প্রিন্সিপাল হলেন একটা খাম্বা বা কলাগাছ। আর ম্যানেজিং ডাইরেক্টর একজন হস্তী। তার নাম সে আগে শুনেনি।হোটেল ,কন্ট্রাকটরি, বিভিন্ন ব্যাবসার বাড় তো তার গুনেই। আজ সেই ম্যানেজিং ডাইরেক্টরের সাথে সরাসরি প্রথম দেখা হবে।

বিপ্লবের মনে হল সেও কম গুরুত্বপুর্ন নয়, পড়ানো ও ছাত্রদের প্রতি একটা ভালবাসাই তাকে এখানে নিয়ে এসেছে।যদিও অন্য প্রায় সকলের চিন্তাভাবনা একই সূত্রে গাঁথা,মাস্টার্স করে এক বছর মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ এর কাজ করল।তারপর দুই বছর ধরে বেকার।

এখন ফাল্গুনের শুরুতে ভোরবেলা ঠান্ডা কিছুটা পরে, কিন্তু মিলিয়ে যায় তাড়াতাড়ি। আবার দিনের বেলা রোদের মেজাজ এত চরমে উঠে মনে হয় দেশটায় জলবায়ু পরিবর্তন সত্যি একটা ইস্যু। প্রাইভেট স্কুলে ক্লাসের মান যাই হোক না কেন,ডিসিপ্লিনের ক্লাস নেওয়া হয় সেখানে। বিপ্লব ঘর থেকে যখন বেরোয় ব্লেজারটা পড়ে যেতে তো ভাল লাগে, কিন্তু দুইটার দিকে যখন স্কুল শেষ হয় তখন তা বয়ে বেড়ানো নির্বুদ্ধিতা বলে মনে হয় । তবু বিপ্লবের মনে হচ্ছে ব্লেজারটা পড়ে যাওয়াই ভাল,তাকে বেশ একজিকিউটিভের মত দেখায়।

বাসার লোকেরা মোটামুটি সন্তুষ্ট, সরকারী চাকরির জন্য চেষ্টা করছি - এই বাহানায় বিপ্লব অলস দিন কাটিয়েছে বলেই তাদের বিশ্বাস । শেষ পর্যন্ত একটা কিছুতে যে যাচ্ছে তাই ভাল। তার বয়সী ছেলেদের জন্য এখন বিয়ের আলাপ দেওয়া হচ্ছে! একসময় রাজনীতিও হাতছানি দিয়েছিল। এই বরাক উপত্যকায় উন্নয়নের অভাব, বেকারত্ব , দুর্নীতি ইত্যাদি উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল তরুন হৃদয়ে। দিন বদলের শ্লোগান দিয়েছিল বিপ্লব । কিন্তু দেশের ক্ষমতার মসনদে পালাবদলের সাথে সাথেই বুঝতে পেরেছিল এসব শ্লোগান ফাকা বুলি ছাড়া কিছু নয়। আর দেশের দিন বদল তো ভাল কথা , কিন্তু নিজের দিন বদলের চেষ্টা নিজেকেই করতে হবে।

স্কুলে ভাল পারফর্ম করতেই হবে । ঘর থেকে বেরোনোর আগে নিজেকে এই কথাটা আরেকবার বলল। বিপ্লব যখন স্কুলে ঢুকে তখন অনেক বড় বড় কথা বলেছে। যে কাজ তার ভাল লাগে না সে পেশাতে সে অনেক টাকার বিনিময়েও যাবে না , ছাত্র পড়াতে তার ভাল লাগে ইত্যাদি আরো অনেক বাক্য সে ব্যাবহার করেছে চাকরীটা পাওয়ার সময় । এমনকি অন্য টীচারদের সামনেও প্রথম পরিচয়ের সময়, নিজেকে বড় করে হাজির করার জন্য নয়, কথাগুলো মনের কথা ছিল। তার মধ্যে একজনের ডাকনাম হ্যাপী।

হ্যাপী শুধু হেসে হেসে বিপ্লবের কথা শুনেছিল। এমনকী এখনও সে বিপ্লবের সাথে কথা কম বলে মুখে আলতো হাসিটাই ধরে রেখেছে। তাতে বিপ্লবের বুকে দুরু দুরু বাড়ে ছাড়া কমে না। আর তাই সকাল্ বেলা প্রথম যখন দেখা হবে নিজেকে যথাযথ সুন্দর উপস্থাপন করাটাও জরুরী।

গেট পার করে বারান্দায় পৌছতেই হ্যাপীকে দেখল বিপ্লব। মনে মনে ভাবল , তার সাথে চোখাচোখি হলেই ওকে গুড মর্নিং উইশ করবে। কিন্তু তার আগেই আরেকজন টীচার মাহমুদ হাসানের সাথে দেখা হয়ে গেল। মনের বাসনাটাকে লুকিয়ে বিপ্লব মাহমুদ হাসানের সাথেই দু একটা কথা বলল।

স্কুলের পরিবেশের সাথে বিপ্লব বেশ তাড়াতাড়ি নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। আগে সে শুধু দু একটা প্রাইভেট টিউশনি করেছে ।কিন্তু স্কুলের ক্লাসে পড়ানোর আলাদা আনন্দ সেটা সে বুঝতে পারছে। স্কুলে তার চেয়ে সিনিয়র টীচারও আছেন । তাদের কয়েক জনের দৃষ্টি সন্দেহজনক বলে মনে হল।দুই পিরিয়ড যখন শেষ হল , ক্লাস বদলের ফাঁকে হ্যাপি নিজেই এল বিপ্লবের সামনে। বয়সে জুনিয়র হবে , মাস্টার্স পাশ করে যোগ দিয়েছে । বলল, আমাকে একটা হেল্প করবেন?

বিপ্লব ঘোরের মধ্যে ছিল। মুখ থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এল, কি?
এম ডি স্যার আমাকে বলেছেন এই স্কুলে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখার জন্য।
বিপ্লব বুঝতে পারল না তাকেও কেন এই কাজ করতে বলা হয়নি? এম ডি যে সমস্ত শিক্ষকদের সাথে মিটিং করবেন সে খবর অবশ্য জানা। বিপ্লব বলল,সেটা তো ভাল কথা।
আমার খুব নার্ভাস লাগছে। হাতের কাগজের দিকে চোখ বুলাতে বুলাতে হ্যাপী বলল।
বিপ্লব কিছু বলল না , মেপে চলাটা জরুরী বলে মনে হল।
হ্যাপী বলল,মোটামুটি একটা লিখেছি ।আপনি একটু দেখে দেবেন লেখাটা?

অন্য এত টীচার থাকতে সোজা বিপ্লবের কাছেই !হ্যাপীর কথায় বিপ্লবের এবার নিজেরই কিছুটা নার্ভাস লাগতে লাগল।হ্যাপীর লেখা রচনা পরীক্ষা করার যোগ্যতা কি বিপ্লবের আছে ? আর তাকেই বা বলছে কেন ? বিপ্লব একটু আমতা আমতা করছিল।
হ্যাপী ধরিয়ে দিল লেখাটা ।

দুপুরের টিফিনে আবার হ্যাপীকে একা পেয়ে গেল বিপ্লব। রচনাটা ফেরত দিয়ে বলল, ভাল হয়েছে।
হ্যাপী বলল, কোনো বানান টানান ভুল নেই তো?
বিপ্লব শুধু প্রুফ রীডার হতে চায়নি। তবে বলল, না তেমন চোখে পড়ছে না।
আরো এক দুইটা কথা বলার পর হ্যাপী হয়ত চলেই যেত , কিন্তু বিপ্লব দম নিয়ে বলল, যখন একটা গতি হল জীবনে, চলো একদিন কফি খাই।

বোকামির চূড়ান্ত হচ্ছে বলে মনে হল যখন হ্যাপী বলল, পরশু আবার আমার এক বান্ধবীর বার্থডে। না গেলে খুব মাইন্ড করবে।

কথা বার্তাগুলো যখন কোনোরকম শেষ হল , বিপ্লব নিজেকেই গালি দিচ্ছিল , দ্য গ্রেট স্টুপিড। হ্যাপী মেয়েটি নিশ্চয়ই ভেবেছে তাকে ইম্প্রেস করার জন্য খুব বাজে প্ল্যান বানিয়েছে বিপ্লব। তবে ভাঙ্গা রাস্তা, শীতকালে ধূলা আর বর্ষায় কাদার জন্য বিখ্যাত এই শিলচর শহরে কাপে কফি ঢেলে হার্ট সাইন একে দেয় এমন দোকান যে আছে তা সে জানে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে , হ্যাপীকে কেন সোনার হরিনের মত মনে হচ্ছে, যেন হঠাৎ করেই সামনে এসে পড়েছে?

মনে প্রশ্ন জাগল ,কেউ কি দেখেছে তাদের ? মনে হল একটু দূরেই একটা ছায়া যেন সরে গেল। প্রিন্সিপাল, না কোনও সিনিয়র শিক্ষকের?

মিটিং বসেছিল প্রিন্সিপালের রুমেই । এম ডি’র নাম অলক মজুমদার । প্রিন্সিপাল তাকে পরিচয় করিয়ে দেবার পর বেশীর ভাগ কথাবার্তা অলক মজুমদারই বললেন।বিপ্লব দেখল, বেশির ভাগ শিক্ষকদের মুখই যেন অজানা এক কারনে একটু তটস্থ। কিন্তু অলকবাবু কাউকে শাসানোর মত কোন কথাই বলেননি। অলক মজুমদার বললেন, এখন যে প্রাইভেট স্কুলদের মধ্যেও কম্পিটিশন সেটা আর বলার কি । কিভাবে স্কুলটাকে আরো ভাল করা যায় সেটাই আমার চিন্তা ।আপনাদেরও মতামত দরকার।

এগুলো হয়ত ফরম্যাল কথাবার্তা। শিক্ষকেরা সবাই চুপ থাকাকেই নিরাপদ মনে করে মাথা অনুন্নত রাখলেন। অলক মজুমদার বললেন, আপনাদের মনে যদি কোন মতামত বা পরামর্শ থাকে , আমাদের বলতে পারেন।

এবারেও শিক্ষকেরা চুপ থাকাই নিরাপদ মনে করল। অলক মজুমদার বললেন , আমাদের একটা টীম হয়ে কাজ করতে হবে।

সে কি অন্য টীচারদের চেয়ে আধুনিক , এনার্জেটিক ও ডায়নামিক নয়? এটাই তো সুযোগ নিজেকে আরেকটু প্রমান করার ?বিপ্লব আর থেমে থাকতে পারল না। স্যার, আমিও এ ব্যাপারে কিছুটা ভেবেছি। আমি কি বলতে পারি?
বাঃ , খুব ভাল। অন্তত আপনাদের মধ্যে একজন আছে যে স্কুলটাকে নিয়ে চিন্তা করে।সমবেত শিক্ষক সহ অলক মজুমদারের চোখে বিস্ময়,বলুন বলুন। সব আমাদের খুলে বলুন।

বিপ্লব বলল, আমি মনে করি আমরা ছাত্রদের কাছ থেকে ভাল তখনই আশা করতে পারব যখন আমরা টীচাররা আমাদের বেস্ট সার্ভিস দেব। সেজন্য আমরা যাতে টাইম টু টাইম নিজেদের ডেভেলাপ করতে পারি সে বিষয়টাও বেশ গুরুত্বপুর্ন। ম্যানেজম্যান্ট এ বিষয়টাও যেন মাথায় রাখে।

বিপ্লবের কথায় কিছুটা গম্ভীর পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে গেল। বলছে কি ছেলেটা? এ কি আন্দোলনের ডাক নয়? শেষ পর্যন্ত আজকাল যা সোশাল স্ট্যাটাসের মাপকাঠি ,সেই প্রাইভেট স্কুলেও ইউনিয়ন বাজী!

আর কেউ তাদের মতামত জানায় নি । অলক মজুমদার অন্য প্রসংগে চলে গেলেন ।বিপ্লব ভাবছিল , এতজন টীচার , আর বিষয়টাও কত সাধারন। অথচ একজন টীচারও কিছু বলল না? যতটুকু টেনশন নিয়ে মিটিং শুরু হয়েছিল তার চেয়ে  বেশী টেনশন নিয়ে শেষ হল।মিটিংয়ের পর হ্যাপীর সাথে কথা হল না।

বাসায় বাবা জিগ্যেস করেই ফেললেন , স্কুলে যে যাস ,বেতন কত?
বিপ্লব জানাল, প্রথম ছয় মাস ট্রায়াল পিরীয়ড চলবে। তারপর পুরা বেতন চালু হবে।
বাবা জানতে চাইলেন, ট্রায়ালের সময় কিচ্ছু দেবে না ?
স্টাইপেন্ড দেবে। বিপ্লব জানাল ।

বাবা আর নিরুৎসাহিত করতে চাইলেন না ছেলেকে । শুধু বেতনের পরিমান দিয়ে তাকে যাচাই নাই করা হল।কিন্তু বিপ্লব বুঝতে পেরে গেছে ছেলেদের উপার্জনই আসল । বা জীবনের সফলতা । এই বাসায় তাকে যে তেমন কেউ পাত্তা দেয় না , সবকিছু বাবা বা বড়ভাইয়ের কথায় চলে তার কারন বিপ্লবের জীবনে সফলতা কম ।

বেশ কিছু দিন থেকে একটা প্ল্যান তার মাথায় আসছে । যদি সে স্কুলের চাকরিতে সেটল হয়ে যেতে পারে, তবে সেও কিছুটা বিজনেস শুরু করতে পারে । হয়ত কোচিং সেন্টার চালু করল । এটাই এখন ফান্ডা।এটাই ইম্পর্ট্যান্ট। ভাল উপার্জন। কারো সামনে দাড়াঁতে হলে আগে নিজের পরিচয় গড়তে হবে। কিন্তু কার সামনে দাড়াঁতে চায় সে? নিজের সামনে? সমাজের?  নাকি আদর্শ, স্বপ্ন ও সত্যের?

বহু মানুষের জীবনের গতিপথ অনেকটাই মসৃন। কিন্তু বন্ধুর পথের যাত্রী বিপ্লবের আফশোস কম নয় । কেন যে সে জার্নালিজম আর মাস কমিউনিকেশন নিয়ে পড়তে গেল? কেন যে সে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ল,যার সার্টিফিকেটের কোন দাম নেই ? বর্তমান সময়ে বিপ্লবের রাস্তা বিভিন্ন দ্বিধায় পরিপূর্ন।

এভাবেই দিনগুলো যাচ্ছিল। মাথা থেকে অনেক আজগুবি চিন্তা দূর করা গেছে স্কুলে যোগ দিয়ে। বিপ্লব মোটামুটি নিশ্চিত, ছয় মাসের ট্রায়াল সে ভালভাবেই উতরে যবে। এমনকী অলক মজুমদারের কাছেও সে নিজের একটা ভাল রেকর্ড তৈরী করতে পেরেছে বলে তার বিশ্বাস। সেদিনের মিটিংয়ে অলকবাবু জানালেন, উনি কিছুদিন পরেই আবার আসছেন।

স্কুলে আসা যাওয়া আর হ্যাপীর সাথে দেখা হলে অল্প হাসি এবং অল্প কথার মধ্যে কোন ব্যাতিক্রম হচ্ছিল না। কিন্তু বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেলে নিয়মের ব্যাতিক্রম অপেক্ষা করছিল প্রিন্সিপালের রুমে। দরজা ঠেলে ঢুকতেই অবাক হল বিপ্লব। প্রিন্সিপালের চেয়ারে প্রিন্সিপাল বসা নেই । সে সীটে বসে আছেন অলক মজুমদার । প্রিন্সিপাল পাশে অন্য একটি চেয়ারে বসা। আরো অবাক করার বিষয় হল হ্যাপীও সেখানেই বসা ছিল। এতক্ষন ওরা কোনো একটা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলোচলা করছিল ,সেটা প্রিন্সিপাল আর অলক মজুমদারের মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছিল।

প্রিন্সিপালের ঈশারায় বিপ্লব হ্যাপীর পাশের চেয়ারে বসল। দুজন তরুন শিক্ষকের উপস্থিতি ,এমনও হতে পারে ভালো কোনো সংবাদ অপেক্ষা করছে।

অলক মজুমদার হ্যাপীর দিকে তাকিয়ে বললেন , তোমার রচনাটা আমি সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে লেখাটা ভাল হয়েছে।
ঠিক আছে স্যার।হ্যাপীর গলা স্বাভাবিক।বিপ্লব আশ্বস্ত হল।
অলক মজুমদার হ্যাপীকে বিদায় দিলেন । যাওয়ার সময় তাকে একটা ডায়রী গিফট করলেন । এটা তাদের গ্রুপ ওব কোম্পানীজ এর ডায়রী।

কেমন আছ বিপ্লব ? হ্যাপী যখন দরজাটা লাগাল তখন বললেন অলক মজুমদার।
হ্যাঁ, ভাল।
তোমাকে একটা সুখবর দেওয়ার আছে।
ভীষন উৎসাহ নিয়ে বিপ্লব জানতে চাইল , কি স্যার?
আমাদের স্কুলের নামের সাথে ইন্টারন্যাশনাল শব্দটা যোগ হবে। অলক বাবুর মুখটা আলোকিত হল,নাও আওয়ার স্কুল উইল বিকাম এন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল।

ওঃ!সেটা তো খুব ভাল খবর।বিপ্লব বলল এবং চেষ্টা করল খুশী হতে,যদিও সে আশা করছিল সুখবরটা শুধু তার জন্যই হবে।
আচ্ছা, তোমাকে একটা কথা বলার ছিল। অলকবাবু একটু থেমে সোজা তাকালেন বিপ্লবের চোখে, তোমার শরীরে খুব বাজে গন্ধ।
বিপ্লব কি বলবে বুঝতে পারছিল না।
অলক মজুমদার ড্রয়ার থেকে একটা ডিওড্র্যান্ট বের করে বিপ্লবকে দিলেন। বললেন, এটা ব্যাবহার করিও। এটা আমার গিফট।

থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। মুখ থেকে কিভাবে যেন বের হয়ে গেল কথাটুকু অপবাদটা স্বীকার করেই। রুম থেকে বেরোতেই মনে হল জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মুখ থেকে সরে এসেছে সে। অন্য কেউ হলে হয়ত তাকে কিছুটা জবাব দিয়ে দিত । কিন্তু সদ্য বেকারত্ব পেরোনো বিপ্লবের মনে আত্নবিশ্বাসের অভাব আর অলক মজুমদারের ব্যক্তিত্ব দারুন ।তিনি যে গ্রুপ অব কোম্পানীজ এর সাথে আছেন তাদের কাছে বিপ্লবের মত চাকর নিশ্চই কিছু না।

সারাটা দিন ক্লাস নেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন গালি বিপ্লবের মাথায় জন্ম নিচ্ছিল , সত্যি কি তার শরীরে বাজে গন্ধ? এক দু বার সে এদিক ওদিক চেয়ে আড়াল খুঁজে বগল তলার গন্ধটা শুঁকতে চাইল । গরমের দেশের মানুষেরা একটু আধটু ঘামতেই পারে, কিন্তু সেটা কোনো ইস্যু হতে পারে? হ্যাপীও চোখের সামনে পড়ল না সারাদিন । অলক মজুমদারের কথা শুনে বিপ্লবের চেহারা অন্ধকারে ছেয়ে গেছিল। ভাবছিল,অলক মজুমদার হ্যাপীকেও ডেকেছিলেন , তাকে কি বললেন তিনি?

সেই থেকে পুরনো চিন্তা আবার বিপ্লবের মাথার মধ্যে এসে ভর করেছে। সরকারী চাকরির চেষ্টা করতেই হবে । অলক মজুমদার কি তাকে অপমান করার জন্যই কথাগুলো বলেনি? আর পাশে বলদ প্রিন্সিপাল চুপ থেকে কথাগুলো শুনেই গেল শুধু। আবার মনকে কিছুটা বুঝ দেয়, এ ধরনের সমস্যা প্রাইভেট চাকরিতে লেগেই থাকে । স্কুল বলে তবু কিছুটা মান সম্মান থাকে ।

কথাগুলো বলার জন্য মনটা কেমন করছিল। ভেতরটা খুব ভারী লাগছে । বাড়িতে এসব কথা বলার মত নয় । আর বন্ধুদের যে আড্ডাটা ছিল সেখানে তো যাওয়া কমে গিয়েছে, তাদের কাছে বলা নিজেকে আরো নীচে নামানোর সামিল । এতদিন সে বেকার ছিল বলে অন্য বন্ধুদের কাছে তার সম্মান খুব একটা উপরের দিকে ছিল না।এই মুহুর্তে হ্যাপীর সাথে কথা হলে ভাল লাগত । সে বুঝত ব্যাপারটা । আর জানাও যেত তাকে ওরা কি বলেছে? স্কুলে হ্যাপীকে দেখতে পেলেও এসব প্রসংগ তোলার সাহস হয় না।

বিপ্লবের দিন এভাবেই কাটে। সরকারী চাকরির ব্যাপারে মনোনিবেশ ঢিলা পরে যায় সারাদিন স্কুলে বকবক করার পর।বাসায়ও কয়েকজনকে পড়ায়। কিন্তু একটি প্রাইভেট ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়িয়ে ভাগ্যের পরিবর্তন কিভাবে আসবে,যদি এই পরিচয়টা কাজে লাগানো না যায়?কিন্তু শিক্ষা বিক্রির কাজটা মন থেকে মেনে নিতে পারছে না বলে কোচিং সেন্টার খোলার কোন প্ল্যান করতে গেলেই তার স্ট্যামিনা ফুরিয়ে আসছে।

তবে উপার্জন জিনিসটা গুরুত্বপূর্ন ,বুঝতে পারলেও সেটা বাড়ানোর তেমন কোন পথ বিপ্লব আবিষ্কার করতে পারল না।বরং শিক্ষকতাকে নিয়ে বোনা বিভিন্ন প্রকার কল্পনার জাল বাস্তবের হাওয়ায় ধীরে ধীরে ছিড়ে যাচ্ছিল।এর মধ্যে একদিন অলক মজুমদার বললেন, আমার বোনের ননদ ওরা থাকে মালুগ্রামে। ওর ছেলেটার জন্য একজন প্রাইভেট টিউটর খুজতেছে ।ক্লাস টুয়ে পড়ে। আমি বলেছি, তোমার কথা।

আসলে স্যার, কয়েকজন স্টুডেন্ট বিকালের দিকে বাসায় আসে।
কোন স্কুলের স্টুডেন্ট?
বিপ্লব কয়েকটা স্কুলের নাম বলে।
ওগুলো তো বাংলা মিডিয়াম।
হ্যাঁ।বিপ্লব বলল।

আমার কাছে যদি ক্ষমতা থাকত , তাহলে সব বাংলা মিডিয়াম স্কুল গুলোকে একদিনে ইংলিশ মিডিয়াম করে দিতাম। পৃথিবীর বুকে এত বড় একটা পরিবর্তনের পরিকল্পনা হজম করতে বিপ্লবের অসুবিধা হচ্ছে বুঝতে পেরে অলক মুজমদার বললেন, সেটা অবশ্য একটু রুড হয়ে যেত। ইন দ্যাট কেস, আমি ছাত্র ছাত্রীদের অপশন দিতাম,বাঙ্গলা কিংবা ইংলিশ । আমি শিওর ইংলিশ মিডিয়ামই জিতত। আজকে ওষুধের দোকানের কর্মচারীও তার ছেলেমেয়েকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পাঠাতে চায়।

চোখের সামনে এত বড় একজন সমাজবিজ্ঞানীকে দেখে বিশ্বাস হচ্ছিল না।যতই হোক বাংলা ভাষার জন্য প্রতিবাদ ও ত্যাগের একটা ইতিহাস আছে এই অঞ্চলে।

অলক মজুমদার বললেন, আসলে মানুষের কোন কিছুতেই ওভার ইমোশনাল হওয়া উচিত নয়।তা সে নিজের ভাষা হোক, কিংবা নিজের বউ।

এতসব কিছু গুলিয়ে যায়।সে একজন সাধারন মানুষ , বেশী বড় সে স্বপ্ন দেখতে পারে না।একটা চাকরিই তার কাছে যথেষ্ট।

কোনও একটা সিদ্ধান্ত না নিয়েই কথাগুলো শেষ হয়।তবে অলক মজুমদার জানাতে ভুলেন না,ওর প্রস্তাবিত টিউশনিতে ওর প্রাপ্য হবে আর্থিকভাবে দুর্বল কতকগুলো ছাত্রদের দেওয়া মোট বেতন থেকেও বেশী।

কার সাথে সে বলবে কথাগুলো? এই পৃথিবী ভালবাসা চায় না , চায় সফলতা। আর সফলতার মাপকাঠি টাকা,পেশাগত পজিশন।কলেজ জীবনে হয়ত ইনফাচুয়েশন জিনিসটা হয়েছিল।কিন্তু কোথায় হল প্রেম? কথায় হল কোন মেয়েকে লুকিয়ে চুমু খাওয়া। হ্যাপী মেয়েটা ঠিক কেমন এই মুহুর্তে বুঝতে না পারলেও সেই এখন বিপ্লবকে টানছ। ওর সাথে প্রেম হোক বা না হোক , কিন্তু একজন সাথী তো হতে পারত, যে বুঝবে মনের আকাশ।

বিপ্লব সুযোগ খুজছিল হ্যাপীর সাথে সহজ হওয়ার।যদিও মনের ভেতর সন্দেহ ও ভয় রয়ে গিয়েছিল ,অলক মজুমদার বা অন্য কেউ হয়ত কান পাতছে। তার উপর পারফিউমের ব্যাপারটা তো রয়েছেই।হ্যাপী বলল,অলক স্যার নতুন অফিস নিবেন।উনারা শিলচরে রিয়েল এস্টেট বিজনেস শুরু করবেন।অম্বিকাপট্টিতে জমি কেনা হয়ে গেছে।কাঠা ত্রিশ লাখ।আর রামনগরে গাড়ীর শোরুমের জন্য জমি দেখা হয়ে গেছে। সেখানে আমারও চাকরি প্রায় কনফার্ম।আমি অফিসের রিসিপশনিস্ট।

বিপ্লবের শুধু মনে হয় এক জালে আটকা পড়ে যাচ্ছে সে এবং এই মুহুর্তে যাকে নিয়ে সে সবচে বেশী চিন্তা করছে সেই হ্যাপীও।কিন্তু হ্যাপীকে দোষ দিয়েই বা কি হবে?একজন ড্রাইভার যখন বিপ্লবের চেয়ে বেশী বেতন পকেটে ঢুকায় তখন এরকম চিন্তা ভাবনা অন্যায়ের কি?

হ্যাপীকে নিয়ে নিরন্তর ভাবনায় একটা লাগাম টানতে চাইছিল। আপাতত হ্যাপী যখন তাকে বুঝতে পারছে না তখন সামনের পথে একাই চলতে হবে বলে বুঝে নিল। তবে বিপ্লব না করতে পারল না ছেলেগুলোকে যারা ওর বাসায় পড়তে আসে। ওরাই তো বেকার জীবনে চা আর সিগারেটের খরচ জুগিয়েছে। কয়েকজন সামনে মেট্রিক পরীক্ষা দেবে।ওদের প্রতি একটা ভালবাসা তৈরী হয়ে গিয়েছিল।ওরা বিপ্লব স্যার বলে না, বলে বিপ্লবদা।

তবে বিপ্লবের মনের আগুনের আঁচ বুঝতে পারেননি অলক মজুমদার।তিনি টিউশনির ব্যাপারটা ফাইনাল করে নিয়েছিলেন।বিপ্লবকে জানিয়েছিলেনও সে কথাটা।চুপ থাকলেও বিপ্লব ঠিক চাইছিল না কারো বাসায় গিয়ে ক্লাস টুয়ের একটা ছাত্রকে পড়াতে।

হয়ত বিপ্লবের দোটানা তার বডি ল্যাংগুয়েজে ফুটে উঠছিল।অলকবাবু বললেন, ডিওড্র্যান্ট কিন্তু খুব কাজে আসছে।তোমার ভেতরে একটা পরিবর্তন এসেছে।

বিপ্লব এখনো অলক মজুমদারের স্মার্টনেসের কাছে পরাজিত।বুঝতে পারে না কথাগুলোর উদ্দেশ্য কি?এক দুদিন ব্যাবহার করার পর ডিওড্র্যান্টটা আর ব্যাবহার করেনি সে। তবে এর মধ্যে কেউ তাকে বলেনি ওর শরীরে বাজে গন্ধ আছে।

শেষ হলে বলিও। অলকবাবু বললেন,আমার কাছে আরো আছে।

সেদিন বিপ্লব বাসায় ফিরেছিল শরীরে একপ্রকার জ্বলুনি নিয়ে। দরজা লাগিয়ে পটাপট খুলে ফেলল শার্ট।আলমারীর সামনে দাঁড়িয়ে একবার দেখল তার মুখ , তারপর শুঁকতে লাগল নিজের শরীরের গন্ধ।বগল তলার পাশে নিজের নাকটাকে নিয়ে বার বার গভীর শ্বাস নিচ্ছিল , দুর্গন্ধের স্বরুপ বুঝতে।

কি বুঝল সে নিজেও জানে না, তবে বুঝে নেওয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ মেনে নিল। অলক বাবুর দেওয়া পারফিউমের ডিবি নিয়ে ধরল হাত তুলে বগল তলার সামনে। স্প্রে করতেই একটা গন্ধে আশপাশ ছেয়ে গেল।

অলক বাবুর দেওয়া ডিওড্র্যান্ট বেশ ভাল কোম্পানীর।টেলিভিশনে প্রায়ই বিজ্ঞাপন বিরতিতে দেখা যায় পারফিউমটি মাখার পর এক দল তরুনী মেয়ে ,জিন্সের হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জী পরা, হুমড়ি খেয়ে পরে ছেলেটির শরীরের উপর। তবে এই মুহুর্তে অন্য ভাবনা এল মাথায়। তবে কি তাকে প্রস্তুত হতে হবে চড়া লাল লিপস্টিক আর সাদা পাউডার মেখে, বারবনিতার অন্য রুপে খদ্দের লোভানোর জন্য?

কয়েকটা দিন কোন বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছাড়াই কেটে যায়। তবে বিপ্লব প্রস্তুতি নিচ্ছিল পাজঁরের গুহায়, সেখানে সে জ্বালিয়েছিল আলোর ধুম,যার কারনে ইচ্ছা করেই এম ডি’র অফিসে বিলম্বে হাজির হয় টিউশনিতে যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট দিনটিতে। কথা ছিল সেখান থেকেই অলক মজুমদার তাকে নিজে সাথে করে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আসবেন।

অলক মজুমদার বললেন,প্রথম দিনেই দেরী।
বিপ্লব বলল,কিসের প্রথম দিন?

অবাক ব্যাপার। অলকবাবু সহজেই বুঝতে পারেন কিছু একটা উল্টা পাল্টা আছে। বললেন,তুমি এর মধ্যেই ভুলে গেলে , তোমাকে নিয়ে আজকে টিউশনির বাসায় যাওয়ার কথা ছিল?

আমি আপনাকে একটা জরুরী কথা বলতে এসেছি। বিপ্লব নির্ভীক হয়। আপনার মাথায় অনেক পচা জিনিস। আপনাকে একটা পারফিউম কিনে দিতে পারতাম। কিন্তু আপনিও ভাল করেই জানেন যে মনের দুর্গন্ধ পারফিউম দিয়ে দূর করা যায় না।

কি বলছো? অলক মজুমদারের গলা কাপঁছে,হঠাৎ এক ঘুর্নিঝড় এসে যেন তছনছ করে দিয়েছে চারদিক।
আর আপনার জন্যই আপনার স্কুলে থাকার ইচ্ছা আমার নেই।বিপ্লবের ঘোষনা শুধু বলিষ্ঠ কন্ঠই দিতে পারে।এটা আমার রেজিগনেশন লেটার। বিপ্লবের চোখে ততক্ষনে স্পষ্ট দৃষ্টি।কিন্তু অলক মজুমদার তাকাতে পারছেন না বিপ্লবের চোখের দিকে।

বৃষ্টি জিনিসটা বেশ রোমান্টিক।বিপ্লব বেরিয়ে এল। বৈশাখের আগমনী ঘোষনা করা বৃষ্টির ফোটাগুলো যেন এক নতুন সুবাসে তাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে অবিরাম ধারায়।


Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.