Saturday, May 09, 2020

► সুমনা সাহা / শাক্যসিংহ ভগবান বুদ্ধ--জীবন, বাণী ও দর্শন

sobdermichil | May 09, 2020 | |
সুমনা সাহা / শাক্যসিংহ ভগবান বুদ্ধ--জীবন, বাণী ও দর্শন
যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৫০০ বছর (খ্রিস্ট পূর্বাব্দ ৫৬৭, কারো কারো মতে ৫৬৩) আগে, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ২৫০০ বছর আগে বুদ্ধের জন্ম হয়। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হল আজও পৃথিবীর সর্বত্র কবি, সাধক, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক প্রভৃতি সকল দিগন্তের মানুষ বুদ্ধের জীবন ও তাঁর মহান বাণীর পূজারী। বুদ্ধ করুণা ও মৈত্রীর ভিত্তিতে এমন এক ধর্মমত সৃষ্টি করলেন, যে ধর্মে ঈশ্বর ও আত্মা সংক্রান্ত ধারণা অনুপস্থিত, এমনকি একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগেও যে ধর্মীয় চিন্তাধারা অত্যন্ত আধুনিক ও যুক্তিসম্মত—জগতের ধর্মের ইতিহাসে এ এক অনন্য নজির। বারানসী থেকে ১০০ মাইল উত্তরে নেপাল সীমান্তে তাঁর জন্ম হয় একটি রাজবংশে, যার রাজধানী ছিল কপিলাবাস্তু নগর। 

বুদ্ধের সমগ্র জীবনকে যদি তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়, তাহলে দেখা যায়, প্রথম ভাগে ‘জগতে দুঃখ আছে এবং তা নিবৃত্তির উপায় খুঁজে বের করাই জীবনের উদ্দেশ্য’—সিদ্ধার্থের এই উপলব্ধি; দ্বিতীয় ভাগে তাঁর গৃহস্থাশ্রম ত্যাগ (যাকে বৌদ্ধ গ্রন্থে ‘মহাভিনিষ্ক্রমণ’ বলা হয়েছে), সাধনা ও ‘বোধিলাভ’ এবং তৃতীয় ভাগে তাঁর পর্যটন, ধর্মপ্রচার ও মহাপরিনির্বাণ। এক মহামানবের জীবন ও ধর্মজগতে তাঁর অসামান্য অবদানকে আমরা এই তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত করে পর্যালোচনা করতে পারি। 

প্রথম ভাগ / দেবস্বপ্ন
আজ সমস্ত নগর মেতে উঠেছে উৎসবে। সারাদিনের আনন্দ-উৎসবের শেষে ক্লান্ত হয়ে প্রাসাদে ফিরলেন মহামায়া। আকাশে আষাঢ়ী পূর্ণিমার চাঁদের অপরূপ শোভা। শুভ্র জ্যোৎস্নায় প্লাবিত রাজপুরী, প্রাসাদ-কানন, মহামায়ার ঘরের গবাক্ষ পথেও প্রবেশ করেছে পূর্ণ চন্দ্রের অমলিন কিরণ। পালঙ্কে শুয়ে চাঁদ দেখতে দেখতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লেন ক্লান্ত রানী। 

চার দিকপাল এলেন। রাণীর পালঙ্ক তাঁরা তুলে নিয়ে চললেন শুভ্র তুষার মণ্ডিত এক মায়াময় লোকে। সেখানে দেবকন্যারা এসে মানস-সরোবরে রানীকে স্নান করিয়ে উত্তম বসন-ভূষণ ও গন্ধানুলেপনে তাঁকে সুসজ্জিত করলেন। রানী দেখলেন, দূরে, কৈলাস পর্বতের শিখর থেকে নেমে আসছে এক শ্বেত হস্তী, তার উত্তোলিত শুঁড়ে ধরা একটি শ্বেত-পদ্ম! রানীর দেহ-মন অজানা পুলকে শিহরিত হল। সেই শ্বেত-হস্তী এসে রানীর জঠরের ডান দিক থেকে শ্বেতপদ্মটি প্রবেশ করিয়ে দিল তাঁর গর্ভে। এমন সময় কাননের পাখীর কুজনে সুখনিদ্রা ভঙ্গ হল মহামায়ার—প্রভাত সূর্যের অরুণ-কিরণে আঁখি মেলে তিনি ভাবলেন—এ কি স্বপ্ন! অঙ্গ এখনও যে পুলকে কণ্টকিত!

সিদ্ধার্থের জন্ম
নেপালের কপিলাবাস্তু নগর। শাক্যবংশের রাজা শুদ্ধোদনের রাজত্ব সেখানে। তাঁরই রানী মহামায়া। রাজ্যে প্রজারা সুখেশান্তিতেই ছিলেন, কিন্তু রাজারানীর মনে শান্তি ছিল না—কারণ তাঁদের কোনও সন্তান হয়নি। তার জন্য তাঁরা অনেক জ্যোতিষীকে দিয়ে ভাগ্যগণনা করিয়েছেন, অনেক পূজার্চনাও করেছেন। একটি সন্তানলাভের আশায় অধীর প্রতীক্ষায় তাঁদের দিন কাটছিল। অবশেষে আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাতে মহামায়াদেবীর এই শুভ দেবস্বপ্ন রাজার মনে অপার্থিব আনন্দের সঞ্চার করল। তিনি রাজ-জ্যোতিষীদের ডেকে এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। তাঁরা জানালেন, এক মহাপুরুষ শাক্যবংশে জন্ম নেবেন। এভাবে দিন চলে যায়, এল সেই শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। এ-সময় রানির পিতৃগৃহে যাওয়ার ইচ্ছা হলো। রাজা সম্মতি দিলেন এবং পিতৃগৃহে যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। রানির যাত্রাপথ কপিলাবস্তু থেকে দেবদহ পর্যন্ত সজ্জিত ও সমতল করা হলো। সখীদের সঙ্গে নিয়ে রানি সোনার পালকিতে চড়ে পিত্রালয়ে চললেন। পথে দুই নগরের মাঝে লুম্বিনী কানন। শালবিথীকায় ঘেরা, চারিদিকে ফুল পাতার সমারোহ, পাখির কলকাকলিতে মুখর এই ছায়াশীতল কাননে রানির বিশ্রামের ইচ্ছা হলো। তাঁর নির্দেশে পালকি থামানো হলো। আকাশে বৈশাখী পূর্ণিমার উজ্জ্বল চাঁদ। রানি কিছুদূর হেঁটে এক শালতরুর নিচে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে একটি শাখা ধরলেন। তখনই তাঁর প্রসববেদনা শুরু হলো। আর অপূর্ব এক আনন্দের উচ্ছ্বাসে তিনি মূর্ছিতা হলেন। সহচরীরা জায়গাটির চারিদিকে কাপড় দিয়ে ঘিরে দিলেন। লুম্বিনী কাননের শালবৃক্ষের নিচে বৈশাখী পূর্ণিমার শুভক্ষণে জগতের আলো ভাবীকালের বুদ্ধ সিদ্ধার্থ গৌতম ভূমিষ্ঠ হলেন।

“আনন্দে মূর্ছিতা দেবী পড়িতে ধরিলা করে
এক শাল-শাখা সুশোভন,
প্রসূত হইল পুত্র ত্রিদিব লতায় যেন
ফুটিল কুসুম মনোরম।” (নবীন চন্দ্র সেন)

সিদ্ধার্থের শৈশব
লুম্বিনী কানন থেকে শোভাযাত্রা করে নিয়ে আসা হল নবজাত রাজকুমার ও রাজমাতাকে। নগরে আনন্দের প্লাবন। সমস্ত পুরবাসী এলেন রাজকুমারকে। ত্রিকালজ্ঞ ঋষি অসিতও এসেছিলেন রাজকুমারের দর্শনে। জটাভারে নত, মহাজ্ঞানী ঋষি এই দেবশিশুকে নিরীক্ষণ করে অশ্রুবিগলিত হয়ে প্রণাম করলেন, বিস্মিত রাজাকে তিনি বললেন, “এই শিশু কোনও সাধারণ মানব শিশু নয়। ইনি পৃথিবীর মানুষকে মুক্তিপথের সন্ধান দেবেন, আপনার সন্তানলাভের মনোরথ সিদ্ধ হয়েছে যেমন, সমগ্র মানব জাতির মনোরথও সিদ্ধ হয়েছে। তাই এই পুত্রের নাম রাখা হোক সিদ্ধার্থ।” 
শিশুপুত্রের নামকরণ অনুষ্ঠানে দৈবজ্ঞরা এসে ভাগ্যগণনা করে বললেন, “গৃহস্থাশ্রমে থাকলে এই পুত্র হবে হবেন এক মহাশক্তিশালী নৃপতি, কিন্তু সন্ন্যাসাশ্রমে গেলে ইনি হবেন যতিশ্রেষ্ঠ বুদ্ধ।” 

জন্মের সাতদিনের মাথায় মৃত্যু হল সিদ্ধার্থের মাতা মহামায়াদেবীর। শিশুর লালন পালনের ভার নিলেন তার মাসী তথা শুদ্ধোদনের অন্যতমা পত্নী মহাপজাপতি গৌতমী। তাই শিশুর আরেক নাম রাখা হল গৌতম। তৎকালীন বখ্যাত পণ্ডিত বিশ্বামিত্রের কাছে প্রাসাদের অন্যান্য কুমারদের সঙ্গে শুরু হল সিদ্ধার্থের বিদ্যাভ্যাস। বালকের প্রখর বুদ্ধি ও আশ্চর্য স্মৃতিশক্তি দেখে গুরু অবাক হলেন। ললিতবিস্তরে কথিত আছে যে, সিদ্ধার্থ ৬৪ প্রকার লিপি ও নানাপ্রকার বিদ্যা ও শাস্ত্র, যেমন-নিগম, পুরাণ, ইতিহাস, অর্থবিদ্যা, প্রভৃতি এবং শাস্ত্রের মধ্যে জ্যোতিষ, সাংখ্য, বেদ, অক্ষক্রীড়া প্রভৃতি তাছাড়া নৃত্য, বাদ্য, বীণা প্রভৃতি এবং লোকচরিত্র প্রভৃতিও শিক্ষা করেন। ক্ষাত্রধর্ম অনুসারে যুদ্ধবিদ্যা ও রণকৌশল ইত্যাদি যেমন শিখলেন, তেমন অন্যান্য কুমারদের সঙ্গে মৃগয়ায়ও যেতেন। কিন্তু ঘোড়া ছুটিয়ে কোন মৃগের পিছনে ধাওয়া করলেও শেষ মুহূর্তে তিনি ঘোড়ার বল্গা শিথিল করে ঐ পশুকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতেন। আবার কোন পশুকে তীর নিক্ষেপের পূর্ব মুহূর্তে ধনুকের জ্যা আলগা করে দিতেন। কোন পশুপাখি আহত হলেও তিনি তার শুশ্রূষা করে ছেড়ে দিতেন। এতে মৃগয়ার আনন্দ নষ্ট হতো বলে অন্য কুমাররা বিরক্ত হতেন—কিন্তু যিনি ভবিষ্যৎ মানবজাতির দুঃখমোচনের জন্য গৃহত্যাগ করবেন এবং করুণা ও মৈত্রীর বাণী প্রচার করে সহস্র সহস্র মানুষের প্রাণে যুগ যুগ ধরে ঢেলে দেবেন শান্তিবারি, তার লক্ষণ তো শৈশবে প্রকাশ পাবেই! 

মহাভিনিষ্ক্রমণের প্রেক্ষাপট
বংশধারা লুপ্ত হওয়ার ভয়ে এই দ্বিতীয় সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করার উদ্দেশ্যে রাজা শুদ্ধোদন সিদ্ধার্থকে বিলাস-ব্যাসন ও স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে ডুবিয়ে রাখার ব্যবস্থা করলেন এবং সকল পুরবাসীদের সাবধান করে দেওয়া হল যেন কোনও জাগতিক দুঃখ দুর্দশার চিত্র কুমারের চোখের সামনে উপস্থিত না হয়। 

সিদ্ধার্থ ও গোপাদেবীর বিবাহ
সিদ্ধার্থ গৌতম ক্রমে ষোল বছর বয়সে পদার্পণ করলেন। মহারাজ শুদ্ধোদন পুত্রের উদাসীনতা ও বৈরাগ্য ভাব অনুধাবন করে পুত্রকে সংসারী করার তাগিদ অনুভব করলেন। তিনি এক স্বয়ংবর সভার আয়োজন করলেন। কুমার সিদ্ধার্থ গৌতম রাজসভায় অশোকভাণ্ড পাশে নিয়ে বসলেন। বিভিন্ন রাজ্য থেকে সুন্দরী রাজকন্যা ও শ্রেষ্ঠীকন্যারা একের পর এক আসলেন। কুমার অশোকভাণ্ড হতে উপহারসামগ্রী তাঁদের হাতে তুলে দিলেন। এভাবে সারাদিন কেটে গেল। অশোকভাণ্ড নিঃশেষ, কুমার কোন রাজকন্যাকেই পছন্দ করতে পারলেন না। আসন ছেড়ে উঠে যাবেন, এমন সময় প্রবেশ করলেন রাজ্য কোলীয় গণতন্ত্রের লাবণ্যময়ী রাজকন্যা সুস্মিতভাষিনী যশোধরা গোপা। অশোকভাণ্ড শেষ। কুমার ইতস্তত বোধ করলেন। তখন দণ্ডপাণি-কন্যা যশোধরা মৃদু হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার জন্যে কি কোনো উপহার নেই? রাজপুত্র সিদ্ধার্থ মুহূর্তে নিজ অঙ্গুরীয়টি গোপাদেবীকে পরিয়ে দিলেন। এ-দৃশ্যে সভায় উপস্থিত সকলে আনন্দে মেতে উঠল।

রাজা শুদ্ধোদন গোপার পিতা দণ্ডপাণির নিকট পুত্রের বিবাহের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠান। প্রস্তাব পেয়ে দণ্ডপাণি আনন্দিত হলেন। কিন্তু তিনি জানালেন যে কুল প্রথা অনুযায়ী তাঁদের কন্যার পাণিপ্রার্থীকে অশ্বচালনা, ধনুর্বাণ, অসিচালনা প্রভৃতিতে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হবে। অতএব নির্ধারিত দিনে দেশ-বিদেশের ক্ষত্রিয় কুমারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হলেন রাজকুমার সিদ্ধার্থ্ অশ্বচালনা, ধনুর্বাণ, অসিচালনা একে একে সবকটিতেই তিনি জয়লাভ করে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করলেন। সভামঞ্চে গোপা সিদ্ধার্থের গলায় বরমালা পরিয়ে দিলেন।

বোধিসত্ত্বের জন্ম-জন্মান্তরের সাথি যশোধরা গোপার সঙ্গেই সিদ্ধার্থ গৌতমের পরিণয় হয়ে গেল। মহা ধুমধামের সাথে মহারাজ শুদ্ধোদন পুত্রের বিবাহউৎসব করলেন। গৌতম সংসারী হলেন, রাজাও চিন্তমুক্ত হলেন।

পাখির কলকাকলিতে মুখর, পুষ্পশোভিত উদ্যানে নির্মিত ভিন্ন ভিন্ন ঋতু উপযোগী সুরমা প্রাসাদে আনন্দে কাটতে লাগল কুমার সিদ্ধার্থ ও রাজবধু গোপাদেবীর দিনগুলি। কোথাও কোনো কষ্ট নেই, দুঃখ নেই। জগৎ যেন আনন্দময়।

চারি নিমিত্ত দর্শন
সিদ্ধার্থ একদিন ভ্রমণে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। মহারাজ শুদ্ধোদন পুত্রের ভ্রমণ যেন আনন্দময় হয় সে-ব্যবস্থা করলেন। সারথি ছন্দককে নিয়ে রাজকুমার নগরভ্রমণে বের হলেন। সঙ্গে প্রিয় অশ্ব কন্থক। অনেক দূর তাঁরা ভ্রমণ করলেন। নগরী সুসজ্জিত, নগরবাসী সুসজ্জিত ও সুখী। সকলেই কুমারকে আনন্দের সাথে অভ্যর্থনা জানাল। আরও কিছু দূর অগ্রসর হলেন, হঠাৎ দেখতে পেলেন একজন বৃদ্ধ, দুর্বল ও পক্বকেশ, লাঠিহাতে শীর্ণ শরীরে বহু কষ্টে হেঁটে চলেছেন। সিদ্ধার্থ ছন্দককে জিজ্ঞাসা করলেন, ইনি কে ছন্দক? সাদা চুল, স্থুল চর্ম, দুর্বল শরীর? ছন্দক জানালেন, “ইনি বয়সের কারণে বৃদ্ধ হয়েছেন, বয়স বাড়লে সবাই একদিন এমন বৃদ্ধ ও দুর্বল হয়ে যায়।” সিদ্ধার্থ ভাবলেন, আমিও একদিন এমন বৃদ্ধ হব? প্রিয়তমা গোপাদেবীও বৃদ্ধ হবে? তিনি ছন্দককে বললেন, রথ ফিরাও। আজ আর ভ্রমণ করব না।

পরদিন আবার নগরভ্রমণে বের হলেন। নগরের বাইরে এসে দেখতে পেলেন এক ব্যক্তি গাছের তলায় হাহাকার করছে, বেদনায় তার মুখ-চোখ কুঁকড়ে গেছে। সিদ্ধার্থ আবার ছন্দককে জিজ্ঞাসা করলেন, “এর কী হয়েছে?” ছন্দক জানাল, ও ব্যাধিগ্রস্ত। মানুষমাত্রই কোনো না কোনো সময় রোগ ব্যাধি ভোগ করে থাকে। কুমার আবারও বিষন্ন হলেন। গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হলেন। সেদিনও প্রাসাদে ফিরে গেলেন। প্রাসাদে ফিরে কুমার ভাবতে লাগলেন, ঐ বৃদ্ধ আর ব্যাধিগ্রস্ত লোকদের কথা। সবাই কি এমন বৃদ্ধ হবে? ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে সকল মানুষকে কি এরূপ কষ্ট পেতে হয়?

এভাবে তৃতীয় দিন চিন্তমগ্ন সিদ্ধার্থ পুনরায় সারথি ছন্দককে নিয়ে অশ্ব কন্থকের পিঠে চড়ে নগরভ্রমণে বের হলেন। নগরের বাইরে কিছু দূরে এসে তিনি দেখতে পেলেন কিছু লোক একটি শবদেহ কাঁধে নিয়ে বিলাপ করতে করতে যাচ্ছে। শোকাচ্ছন্ন এই দলটিকে দেখে সিদ্ধার্থ ছন্দকের কাছে জানতে চাইলেন, ওদের কী হয়েছে? ওরা কাঁদছে কেন?

ছন্দক বিমর্ষ চিত্তে জানালেন, ওরা একটি মৃতদেহ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। মৃত ব্যক্তি ওদের নিকটআত্মীয়। আপনজনের মৃত্যুতে তারা শোকে বিলাপ করছে। সিদ্ধার্থ পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, বিলাপ করলে কি মৃত ব্যক্তি জীবিত হবে? ছন্দক বললেন, “না কুমার, মৃত ব্যক্তিরা জীবিত হয় না।” তিনি আবারও জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সবাইকে কি এরূপ মৃত্যুবরণ করতে হবে?”

ছন্দক উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ কুমার, জীবিত সবাইকেই একদিন মারা যেতে হয়।” জীবের এই পরিণতি দেখে সিদ্ধার্থ অত্যন্ত কাতর হলেন। বিষন্ন মনে ফিরে এলেন প্রাসাদে।

চতুর্থ দিনে নগরভ্রমণে বেরিয়ে তিনি নগরের বাইরে বেশ কিছু দূরে নির্জন জায়গায় বড় গাছের তলায় একজন সন্ন্যাসীকে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় দেখতে পেলেন। স্থির, সৌম্য, ধ্যানমগ্ন সন্ন্যাসীকে দেখে সিদ্ধার্থ আকৃষ্ট হলেন। ছন্দককে প্রশ্ন করলেন, “ইনি কে?” ছন্দক উত্তর দিলেন, ইনি সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী। সংসারের মায়া ত্যাগ করে তিনি সত্য জানার জন্য সাধনা করছেন। মুহূর্তে সিদ্ধার্থ গৌতমের সন্ন্যাস-চেতনা জাগ্রত হলো। সন্ন্যাসীর মধ্যে নিজেকে দেখতে পেলেন তিনি। জগতের দুঃখ, জরা, ব্যাধি থেকে মুক্তির পথ অনুসন্ধান করতে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। ছন্দককে রথ ফেরানোর আদেশ দিলেন।

নগরভ্রমণে বেরিয়ে সিদ্ধার্থ জরা, ব্যাধি, মৃত্যু ও সন্ন্যাসী দেখে মানবজীবনের লক্ষ্য সম্যকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। একেই সিদ্ধার্থের চারি নিমিত্ত দর্শন বলা হয়ে থাকে।

চার নিমিত্ত দর্শনের পরে সিদ্ধার্থ গৌতমের মনে শান্তি নেই। সব সময়ই তিনি গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। ঐ তরুণ সন্ন্যাসীর গভীর ধ্যানমগ্ন দৃশ্যটি গৌতমের মনে দাগ কেটেছে। তিনিও দুঃখমুক্তির সন্ধানে গৃহত্যাগ করবেন সিদ্ধান্ত নিলেন। গৃহত্যাগের আগে তিনি পিতার অনুমতি নেওয়ার কথা ভাবলেন। পিতার নিকট গিয়ে তিনি তাঁর সংকল্পের কথা জানালেন। পুত্রের কথা শুনে রাজা যেন বজ্রাহত হলেন। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করে প্রাণাধিক পুত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি শাক্যরাজ্যের রাজপুত্র, সিংহাসনের উত্তরাধিকারী, তোমার কিসের অভাব যার জন্যে তুমি সংসার ত্যাগ করতে চাও? সিদ্ধার্থ উত্তরে বললেন, চারটি বিষয়ে নিশ্চয়তা দিতে পারলে আমি সংসারত্যাগ করব না :

১. আমি কোনোদিন জরাগ্রস্ত হব না, চিরযৌবনপ্রাপ্ত হব;
২. আমি কোনোদিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হবো না;
৩. মৃত্যু কোনোদিন আমার জীবন কেড়ে নেবে না এবং
৪. আমি অক্ষয় সম্পদ লাভ করব।

পুত্রের শর্ত শুনে রাজা অবাক হয়ে বললেন, এ অসম্ভব! জরা, ব্যাধি, মৃত্যুকে রোধ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এ-শর্ত প্রত্যাহার কর পুত্র। তখন সিদ্ধার্থ বলরেন, মৃত্যুও যে-কোনো সময় আমাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে। আমি গৃহত্যাগ করার সংকল্প করেছি। রাজা বুঝতে পারলেন মহৎ কর্তব্যসাধনে পুত্র সংকল্পবদ্ধ, তাঁকে আর বেঁধে রাখা যাবে না। তিনি সিক্ত কণ্ঠে বললেন, পুত্র! তোমার মনস্কামনা পূর্ণ হোক। পিতাকে প্রণাম করে অশ্রুসজল নয়নে সিদ্ধার্থ পিতৃকক্ষ ত্যাগ করলেন।

এর মধ্যে গোপাদেবীর কোল আলো করে একটি পুত্র সন্তানজন্ম নিল। পুত্রের জন্মের খবর পেয়ে গৌতম নিজের অজান্তে বলে উঠলেন, “রাহু জন্মেছে, বন্ধন উৎপন্ন হয়েছে।” দূতমুখে এ কথা জানতে পেরে রাজা শুদ্ধোদন পৌত্রের নাম রাখলেন ‘রাহুল’। যার অর্থ শৃঙ্খল, সংসারবিরাগী ছেলেকে সংসারে বেঁধে রাখবার মায়ার শিকল! কিন্তু গৌতম সিদ্ধান্ত নিলেন, এ-বন্ধন ছিন্ন করতে হবে। ওদিকে রাজা গৌতমকে আনন্দে রাখার জন্য নৃত্য গীতের আয়োজন করলেন। কিন্তু সিদ্ধার্থ আমোদ-প্রমোদে মনঃসংযোগ করতে পারলেন না, তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আজই গৃহত্যাগ করতে হবে। আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাত, জ্যোৎস্নায় আলোকিত নগরী। কুমার শেষবারের মতো গোপাদেবীর ঘরে গেলেন। দেখলেন শিশুপুত্র রাহুল মায়ের সঙ্গে ঘুমাচ্ছে। নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। সারথি ছন্দককে নির্দেশ দিলেন ঘোড়া প্রস্তুত করতে। ছন্দক অশ্বরাজ কন্থককে সজ্জিত করে নিয়ে এলেন। সিদ্ধার্থ গৌতম কন্থকের পিঠে চড়ে নগর থেকে বেরিয়ে ছুটে চললেন। তারপর তিনি অনোমা নদীর তীরে পৌঁছালেন। 

এবার বিদায়ের পালা। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে গৌতম তরবারি দিয়ে নিজের দীর্ঘ কেশ কেটে ফেললেন। রাজপোশাক ও অলংকারগুলো খুলে ফেললেন। মুকুটটি ছন্দকের হাতে দিয়ে বললেন, “পিতাকে দিও।” রাজপোশাক ও অলংকার মায়ের হাতে দিতে বললেন। গোপাদেবীকে তাঁর পাদুকাদ্বয় আর পুত্র রাহুলকে সোনার তরবারি দিতে বললেন। ছন্দককে ফিরে যাওয়ার আদেশ দিলেন। গৌতমের বিয়োগব্যখা সইতে না পেরে কন্থক তখনই প্রাণত্যাগ করল। শোকাচ্ছন্ন ছন্দক ফিরে গেলেন কপিলাবস্তুতে। রাজপুত্র রাজসুখ ত্যাগ করে হলেন গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী। গৌতম একাকী হেঁটে চললেন অনোমা নদীর তীর ধরে গভীর বনের দিকে। আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে উনত্রিশ বৎসর বয়সে সিদ্ধার্থের এই গৃহত্যাগ বৌদ্ধ সাহিত্যে ‘মহাভিনিষ্ক্রমণ’ নামে অভিহিত।

বিশ্বজগৎ আমারে মাগিলে/কে মোর আত্মপর/আমার বিধাতা আমাতে জাগিলে/কোথায় আমার ঘর।/কিসেরি বা সুখ, কদিনের প্রাণ?/ওই উঠিয়াছে সংগ্রাম-গান,/অমর মরণ রক্তচরণ/নাচিছে সগৌরবে/সময় হয়েছে নিকট, এখন/বাঁধন ছিঁড়িতে হবে। (গৌতম প্রয়াণ/রবীন্দনাথ ঠাকুর) 

দ্বিতীয় ভাগ
গৌতমের কাছে জগতের দুঃখময় দিক আড়াল করে রাখার শুদ্ধোদনের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল, সুন্দরী পত্নীর প্রেম, পুত্র স্নেহ—কোনকিছুই গৌতমকে সংসারে বেঁধে রাখতে পারল না। জরা, ব্যাধি, মৃত্যু—এই ত্রিবিধ দুঃখে সন্তপ্ত মানুষের যন্ত্রণা গৌতমের সমগ্র সত্তায় প্রবল আলোড়ন তুলল। এই দুঃখ থেকে পরিত্রাণের উপায় সন্ধান না করে গৃহসুখ উপভোগ করে জীবন কাটিয়ে দেওয়া তাঁর পক্ষে আর সম্ভব ছিল না। প্রাথমিক ভাবে গৌতমের এই দৃষ্টিভঙ্গি ‘নেতিবাচক’ (pessimistic) হলেও তা এক প্রকৃত ইতিবাচক আধ্যাত্মিক উপলব্ধির জনক—যা গৌতমকে দিল মহান ‘বোধি’। 

গৃহত্যাগ করে গৌতম প্রথমে উপস্থিত হলেন ভার্গব মুনির আশ্রমে। কিন্তু তত্ত্বজিজ্ঞাসু কুমারের জিজ্ঞাসার উত্তর এখানে মিলল না। 

দুঃখ ও দুঃখের কারণ সম্বন্ধে জানতে সিদ্ধার্থ যাত্রা অব্যাহত রাখেন। তিনি বৈশালী নগরীতে আলার কালামের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তাঁর কাছে সাংখ্যদর্শন শিক্ষা করেন। তাঁর কাছে তিনি ধ্যানের এমন একটি পদ্ধতি শিক্ষা করেন যার দ্বারা মনকে ‘শূন্য অবস্থায়’ নিয়ে যাওয়া যায়—যেখানে সুখ বা দুঃখ কোনও কিছুরই অনুভব হয় না। কিন্তু তাঁর আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা পরিতৃপ্ত হল না। 

তিনি ধ্যানের আরও পদ্ধতি শিক্ষা করার উদ্দেশ্যে এরপরে বৈশালী থেকে কিছু দূরে রাজগৃহে চলে যান। সেখানে রুদ্রক রামপুত্তের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তাঁর কাছে ধ্যানের বিভিন্ন পদ্ধতি শিক্ষা করলেন। তিনি মনের চেতন-অচেতন অবস্থার পারে’ একটি অবস্থার অনুভব করেন। তিনি সেই সমাধি-সুখ অনুভব করতে চাইছিলেন, শৈশবে অসচেতন ভাবে একবার যা তাঁর কাছে ধরা দিয়েছিল! রুদ্রক রামপুত্তের কাছে তিনি কর্ম, জন্মান্তর, আত্মস্বরূপ, ঈশ্বরতত্ত্ব প্রভৃতি সম্পর্কে অনেক জ্ঞানলাভ করলেন। কিন্তু এখানেও তাঁর জ্ঞান-তৃষ্ণা নিবারিত হল না। তাঁর সঙ্গী হলেন রুদ্রকের পাঁচজন শিষ্য—কোণ্ডন্য, বাপা, ভদ্দীয়, মহানাম ও অশ্বজিৎ; যাঁরা এই নবীন যতিকে তাঁদের পথপ্রদর্শক রূপে বরণ করেছিলেন। 

এরপর তিনি যোগ দিলেন ‘নির্গ্রন্থ’ নামে এক শ্রমণ বা ভিক্ষুসঙ্ঘে। এই শ্রমণ বা ভিক্ষুরা ছিলেন এক শ্রেণির ভিক্ষাজীবি পরিব্রাজক ও দার্শনিক-বুদ্ধিজীবী সাধক সম্প্রদায় যাঁরা খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে ভারতের উত্তরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। অন্যদিকে, ভারতীয় সমাজ তখন ছিল ব্রাহ্মণ্য ধর্মের শাসনে। বৈদিক ধর্মের ভিত্তিতে ব্রাহ্মণ পুরোহিত বর্গ বহু যাগযজ্ঞের প্রবর্তন করেছিলেন এবং তাঁরা প্রচার করলেন, ত্রিভুবনে হেন কোনও বস্তু নেই যা যজ্ঞ দ্বারা অপ্রাপ্য। ফলত, যজ্ঞই হয়ে দাঁড়ালো ঈশ্বরের সমনাম! এই সমস্ত যাগযজ্ঞের একটা অনিবার্য শর্ত ছিল পশুবলী। চিন্তাশীল কিছু মানুষ, যাঁরা বৈদিক ধর্মের দার্শনিক দিকের প্রতি শ্রদ্ধাবান অথচ যাগযজ্ঞের নিষ্ঠুরতা ও অন্যান্য অর্থহীন আচার-অনুষ্ঠানের সমর্থন করতে পারেননি, তাঁরা বেদের উপনিষদ অংশের ধ্যান ও আধ্যাত্মিক তত্ত্বের দিকটি গ্রহণ করলেন এবং প্রতিবাদ স্বরূপ হিন্দুধর্ম থেকে বহির্গত হয়ে স্বাধীন ভাবে তাঁদের আধ্যাত্মিক মত প্রচার করতে শুরু করলেন—এঁরাই শ্রমণ। তত্ত্ব চিন্তা, দৈহিক কঠোরতা বা কৃচ্ছ্রসাধন ও ধ্যান—এই ছিল এঁদের সাধন-পদ্ধতি। বৌদ্ধ গ্রন্থে এই ধরণের প্রায় ৬২ টি শ্রমণ সম্প্রদায়ের কথা পাওয়া যায়। 

সিদ্ধার্থ তাঁর সমস্যা সমাধানের উপায় স্বরূপ প্রথমে এই দৈহিক কৃচ্ছ্রসাধনে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। পাঁচজন সঙ্গীর সঙ্গে সিদ্ধার্থ দৈহিক কঠোরতার উগ্র তপস্যা শুরু করলেন। গবাদি পশুর মতো ঘাস খেয়ে জীবনধারণ এবং ক্রমশ খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে সম্পূর্ণ অনাহারে দিনের পর দিন অতিবাহিত করা, এমনকি বাছুরের গোবর খেয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করা—ইত্যাদি অমানুষী শারীরিক ক্লেশদায়ক তপস্যার মাধ্যমে তিনি ক্ষুধা, তৃষ্ণা, লোভ জয় করলেন। কিন্তু তাঁর জিজ্ঞাসার উত্তর পেলেন না। বিরক্ত হয়ে তিনি সেই ভিক্ষুসঙ্ঘ ও অত্যধিক আত্মনিপীড়ন ত্যাগ করে আবার খাওয়াদাওয়া শুরু করলেন। সঙ্গীরা সিদ্ধার্থকে ‘অসংযমী’ মনে করে ভুল বুঝলেন এবং তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করলেন। 

এরপরে প্রায় ৬ বছর ধরে সিদ্ধার্থ সত্যের সন্ধানে নানা স্থানে ভ্রমণ করলেন, অনেক গুরুর কাছে সংগ্রহ করলেন বহু আধ্যাত্মিক জ্ঞান, অবশেষে তিনি মগধের উরুবিল্ব নামক স্থানে এসে পৌঁছালেন। সেখানে প্রথমে একটি উত্তর-পূর্বমুখি শিলাখণ্ডের উপর বোধিসত্ত্ব জানু পেতে বসে আপন মনেই বলেছিলেন যে, "যদি আমাকে বুদ্ধত্বলাভ করতে হয় তা হলে বুদ্ধের একটি প্রতিচ্ছায়া আমার সম্মুখে দৃশ্যমান হোক।" এই কথা উচ্চারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে শিলাখণ্ডের গায়ে তিন ফিট উঁচু একটি বুদ্ধের প্রতিচ্ছায়া প্রতিফলিত হয়। বোধিসত্ত্ব তপস্যায় বসার পূর্বে দৈববাণী হয় যে, "বুদ্ধত্ব লাভ করতে গেলে এখানে বসলে চলবে না; এখান থেকে অর্ধযোজন দূরে পত্রবৃক্ষতলে তপস্যায় বসতে হবে।" এরপর দেবগণ বোধিসত্ত্বকে সঙ্গে করে এগিয়ে নিয়ে যান। মধ্যপথে একজন দেবতা ভূমি থেকে একগাছা কুশ ছিঁড়ে নিয়ে বোধিসত্ত্বকে দিয়ে বলেন যে, এই কুশই সফলতার নিদর্শন স্বরূপ। বোধিসত্ত্ব কুশগ্রহণের পর প্রায় পাঁচ শত হাত অগ্রসর হন এবং পত্রবৃক্ষতলে ভূমিতে কুশগাছটি রেখে পূর্বমুখি হয়ে তপস্যায় বসলেন। শুরু হল সমাজ-সংসার থেকে দূরে, লোকচক্ষুর অন্তরালে, সুদীর্ঘ তপস্যা। অতি কঠোর সাধনার ফলে তাঁর শরীর ক্রমে ক্ষয়ে গেল। কিন্তু এ তপস্যায় তিনি ভয়, লোভ, ও লালসাকে অতিক্রম করে নিজের মনের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করতে সক্ষম হলেন। দীর্ঘকাল ধরে কঠোর তপস্যার পর তাঁর শরীর অস্থিচর্মসার হয়ে পড়ে ও তাঁর অঙ্গসঞ্চালনের ক্ষমতা কমে গিয়ে তিনি মরণাপন্ন হলে তাঁর উপলব্ধি হয় যে, অনশনক্লিষ্ট দুর্বল দেহে শরীরকে অপরিসীম কষ্ট দিয়ে কঠোর তপস্যা করে বোধিলাভ সম্ভব নয়। নৈরঞ্জনা নদীতে স্নান করে একটি অশ্বত্থ গাছের তলায় তিনি ধ্যানে বসেন। নিকটবর্তী গ্রামের কোনও এক শ্রেষ্ঠী কিম্বা গোপকন্যা সুজাতা তাঁকে বনদেবতা মনে করে এক পাত্র পরমান্ন নিবেদন করেন। সেই পরমান্ন বা পায়স আহার করে তিনি দেহে-মনে তৃপ্তি ও বল অনুভব করেন। তখনই তিনি উপলব্ধি করেন, অসংযত বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং কঠোর তপস্যার মধ্যবর্তী একটি মধ্যম পথের অনুশীলনের মাধ্যমে বোধিলাভ সম্ভব। 

এই ঘটনার পরে সেই অশ্বত্থ গাছের তলায় তিনি ধ্যানে বসলেন এবং সাধনায় সিদ্ধির জন্য শপথ নিলেন, সত্যলাভ না করে স্থানত্যাগ করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করলেন। ললিতবিস্তার গ্রন্থের ১৯-তম অধ্যায়ে বুদ্ধের এই মনোভাব বর্ণনা করা হয়েছে—

“ইহাসনে শুষ্যতু মে শরীরং/ত্বগস্থি মাংসং প্রলয়ঞ্চ যাতু।/অপ্রাপ্য বোধিং বহুকল্প দুর্লভাং/নৈবাসনাৎ কায়মতশ্চলিষ্যতে”।।

“এই আসনে বসে আমার শরীর শুকিয়ে যাক; চামড়া, মাংস, হাড় লুপ্ত হয়ে যাক; তবুও বহুজন্ম দুর্লভ বোধিলাভ না করে এই আসন থেকে আমি কিছুতেই উঠব না।” 

বোধিলাভের পূর্বে তিনি ধ্যানের চারটি স্তর অতিক্রম করলেন। এই আধ্যাত্মিক সংগ্রামের সর্বাপেক্ষা কঠিন পরীক্ষা ছিল ‘মার’ বিজয়। সূক্ষ্ম কামনা-বাসনা ‘মার’ রূপে এসেছিল সিদ্ধার্থের সাধন-সংযম ভঙ্গ করতে। সংস্কৃত ‘মৃ’ ধাতু থেকে এসেছে ‘মার’ কথাটি—সুতরাং এর আক্ষরিক অর্থ ‘মৃত্যু’। বাসনার অর্থই মৃত্যু, যেহেতু বুদ্ধের উপদেশের মূল বিষয় হল-- এই বাসনাই পুনঃ পুনঃ জন্মলাভ ও দুঃখভোগের হেতু। 

উনপঞ্চাশ দিন ধরে ধ্যান করার পর তিনি ‘বোধি’ প্রাপ্ত হন। এই সময় তিনি মানব জীবনে দুঃখ ও তাঁর কারণ এবং দুঃখ নিবারণের উপায় সম্বন্ধে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেন, যা চতুরার্য সত্য নামে খ্যাত হয়। তাঁর মতে এই সত্য সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করলে মুক্তি বা নির্বাণ লাভ সম্ভব।

তৃতীয় ভাগ /ধর্মপ্রচার
বোধিলাভের পর গৌতম অনুভব করলেন যে এই ‘বোধি’ বা সত্য অত্যন্ত জটিল, গভীর ও সূক্ষ্ম। সাধারণ মানুষ অজ্ঞান অন্ধকারে ডুবে আছে, লোভ ও কামনায় জর্জরিত হয়ে আছে। এদের কাছে সত্য প্রচার করা নিরর্থক। এই নূতন সত্যকে মানুষ ধারণা করতে পারবে না। এইরকম চিন্তা করে তিনি প্রচার থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি একটি গাছের তলায় বসে ছিলেন, এমন সময় তপস্সু ও ভল্লিক নামক বলখ (বর্তমান উড়িষ্যা) অঞ্চলের দুইজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তারা তাঁকে মধু ও চালের পিঠে নিবেদন করেন। তারা বুদ্ধকে ধর্ম সম্বন্ধে কিছু প্রশ্ন করলে বুদ্ধ ধীরে ধীরে তার উত্তর দিতে শুরু করেন। তিনি দেখে অবাক হলেন যে এই দুই বণিক তাঁর নতুন ধরনের উপদেশের মর্ম অনুধাবন করতে পারল এবং আগ্রহ সহকারে তারা বুদ্ধের শিষ্য হওয়ার আর্জি জানালে তিনি তাঁদের শিষ্য রূপে গ্রহণ করলেন। এই দুইজন বুদ্ধের প্রথম গৃহী শিষ্য। বুদ্ধ তার প্রাক্তন শিক্ষক আলার কালাম ও রুদ্রক রামপুত্তের সাথে সাক্ষাত করে তাঁর নবলব্ধ জ্ঞানের কথা আলোচনার জন্য উৎসাহী ছিলেন, কিন্তু তাঁদের দুইজনেরই ততদিনে জীবনাবসান হয়ে গেছে। এরপর তিনি বারাণসীর কাছে ঋষিপত্তনের মৃগদাব উদ্যানে গিয়ে তাঁর পাঁচ প্রাক্তন সাধন-সঙ্গী, যারা তাঁকে একসময় পরিত্যাগ করেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাত করলেন ও তাঁদেরকে তাঁর প্রথম শিক্ষা প্রদান করেন, যা বৌদ্ধ ঐতিহ্যে ধর্মচক্রপ্রবর্তন নামে খ্যাত। এই ভাবে তাঁদের নিয়ে ইতিহাসের প্রথম সন্ন্যাসী-সঙ্ঘ, বৌদ্ধসংঘ গঠিত হয়।

এরপর মহাকশ্যপ নামক এক অগ্নি-উপাসক ব্রাহ্মণ ও তাঁর অনুগামীরা সংঘে যোগদান করেন। বুদ্ধ সম্রাট বিম্বিসারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিমতো বুদ্ধত্ব লাভের পরে রাজগৃহ যাত্রা করলে রাজা বিম্বিসার তাঁকে ‘বেণুবন বিহার’ দান করেন। এই বিহারেই সঞ্জয় বেলাঢ়িপুত্তের দুইজন শিষ্য সারিপুত্ত ও মৌদ্গল্যায়ন পঞ্চাশ জন শিষ্যসহ বুদ্ধের ধর্ম গ্রহণ করে সংঘে যোগদান করেন। বুদ্ধত্ব লাভের এক বছর পরে শুদ্ধোধন তাঁর পুত্রকে কপিলাবস্তু শহরে আমন্ত্রণ জানান। একদা রাজপুত্র গৌতম রাজধানীতে সংঘের সাথে ভিক্ষা করে খাদ্য সংগ্রহ করেন। এখানেই বুদ্ধ ভিক্ষুসংঘের জন্য বিনয় বিধান প্রবর্তন করেন। রাজগৃহ থেকে তিনি কপিলাবস্তুতে যান। সেখানে পিতা শুদ্ধোদন, বিমাতা মহাপ্রজাপতি গৌতমীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। স্ত্রী গোপাদেবীকেও ধর্মোপদেশ দান করেন। আনন্দ, দেবদত্ত, অনিরুদ্ধ, ভৃণ্ড, কিম্বিল, ভদ্দিয় প্রমুখ শাক্যকুমারগণ এসময় বুদ্ধের নিকট প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। এঁদের সহচর নাপিতপুত্র উপালিও একইসঙ্গে প্রব্রজ্যা নেন। পুত্র রাহুলকে শ্রামণ্য ধর্মে দীক্ষা দিয়ে তিনি বুদ্ধ শাসনের উত্তরাধিকার দেন। রাজা শুদ্ধোদন পুত্রস্নেহবশত বুদ্ধকে রাজ্যভার গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানান। উত্তরে বুদ্ধ রাজাকে বলেন,“মহারাজের অপরিসীম পুত্রস্নেহ আমার অপরিজ্ঞাত নয়। কিন্তু আপনার স্নেহডোর তো এখন ছিন্ন হয়েছে। আপনার সেই পুত্রপ্রীতির দৃষ্টি দিয়ে আপনি আপনার প্রজাবৃন্দের দিকে তাকান। তাদের প্রত্যেককে আপনি পুত্রের ন্যায় স্নেহ করুন এবং সকল মানুষকে, এমনকি প্রত্যেকটি জীবকে আপনি ভালোবাসুন। তা হলেই আপনি সিদ্ধার্থের মতো অগণিত সন্তান লাভ করবেন এবং পরিণামে নির্বাণ সুখের অধিকারী হবেন।”এভাবে বিমুক্ত পুরুষ ভগবান বুদ্ধ স্নেহশীল পিতাকে একজন আদর্শ প্রজাপালক, ধার্মিক নরপতির করণীয় বিষয়ে সচেতন করেন।

তিন বছর পরে রোহিণী নদীর জলের অংশ নিয়ে শাক্যদের সাথে কোলীয় গণের একটি বিবাদ উপস্থিত হলে বুদ্ধ সেই বিবাদের মীমাংসার জন্য বৈশালী থেকে কপিলাবস্তু যান। এর কয়েকদিনের মধ্যে শুদ্ধোধনের মৃত্যু হয়। এইসময় পাঁচশত শাক্যকুমার ভিক্ষুসঙ্ঘে যোগদান করেন। তাঁদের পত্নীরা মহাপ্রজাপতি গৌতমীর নেতৃত্বে বুদ্ধের কাছে উপস্থিত হয়ে ‍ভিক্ষুণীবৃত গ্রহণ করার অনুমতি প্রার্থনা করেন। ‍কিন্তু বুদ্ধ তাঁদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বৈশালীতে চলে যান। মহাপ্রজাপতি ও তাঁর সহচারিণীগণ হতাশ না হয়ে নিজেদের মাথা মুণ্ডন করিয়ে এবং কাষায়বস্ত্র পরিধান করে বৈশালী পর্যন্ত বুদ্ধের অনুগমন করেন। তাঁরা ক্ষতবিক্ষত পায়ে বিহারে উপস্থিত হয়ে দ্বিতীয়বার বুদ্ধকে অনুরোধ জানালে বুদ্ধের প্রধান অনুচর আনন্দ তাঁদের ভিক্ষুণীধর্মে দীক্ষা দেওয়ার জন্য বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা জানান। অবশেষে বুদ্ধ প্রার্থনা অনুমোদন করলে মহাপ্রজাপতি গৌতমীর বাসনা পূর্ণ হয়। মহাপ্রজাপতি গৌতমীর নেতৃত্বে গোপা ও অন্যান্য শাক্য নারীদের নিয়ে ভিক্ষুণীসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে নারীগণ সঙ্ঘভুক্ত হলেন।

বুদ্ধের শিক্ষাদান পদ্ধতি
বুদ্ধের লোকশিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতি ছিল অপূর্ব। কাউকে শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করার আগে তিনি গল্পচ্ছলে বুঝিয়ে দিতেন, শিষ্যের কেমন হওয়া উচিৎ। তিনি বলতেন, “একশ্রেণির শিষ্য আছে, যারা ‘অধোমুখ কুম্ভ’। একে উপুড় করে জলে ছেড়ে দিলে কলসীর মধ্যে জল ঢোকে না। তেমনই, এই শ্রেণির শিষ্যরা সারাজীবন গুরুর উপদেশ শুনেও কিছু করতে পারে না। আরেক শ্রেণির শিষ্য আছে, যারা ‘উৎসঙ্গ বদর’, অর্থাৎ ছড়িয়ে পড়া কুল। আঁচল ভরে কুল নিয়েও কেউ যদি তা বেঁধে না ওঠে, তবে কুলগুলি ছড়িয়ে পড়ে যায়। তেমনই অন্য একশ্রেণির শিষ্য আছে, যারা ‘ঊর্ধ্বমুখ কুম্ভ’, এই কলসী জলে ডুবিয়ে দিলে সহজেই জল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। এরা গুরুর উপদেশ অন্তরে গ্রহণ করে। এই গল্প বলে বুদ্ধদেব জিজ্ঞাসা করতেন, তারা কোন ধরনের শিষ্য হতে চায়। তাই শুনে শিষ্যরাও সাবধান হতো। 

একবার শ্রাবস্তী নগরে নদীতীরে বসে আছেন বুদ্ধ। এমন সময়ে মৃত সন্তানের দেহ বুকে ধরে শোকে অধীর হয়ে পাগলিনীর মতো কাঁদতে কাঁদতে এল এক বিধবা নারী। কিসা গৌতমী তার নাম। ঐ সন্তানই ছিল তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। সে শুনেছে ভগবান বুদ্ধের ইচ্ছা হলে তার মৃত সন্তানের দেহে প্রাণসঞ্চার হতে পারে। বুদ্ধ বুঝলেন শোকাতুরা নারীকে তত্ত্বকথায় বোঝাবার চেষ্টা বৃথা। তিনি সেই সন্তানহারা মাতাকে শান্তভাবে বললেন, “এ অতি সহজ কাজ, আমার কেবল প্রয়োজন একমুঠো সর্ষে। কিন্তু শর্ত হল, সেই সর্ষে সংগ্রহ করে আনতে হবে এমন কোনও গৃহ থেকে যেখানে অদ্যাবধি মৃত্যু প্রবেশ করেনি। অধীর হয়ে কিসা ছুটল শ্রাবস্তীর প্রতি ঘরে ঘরে, কিন্তু না, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল, তবুও মিলল না এমন কোনও ঘর যেখানে মৃত্যুর পদসঞ্চার হয়নি! সে উপলব্ধি করল, মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা নেই কারো। সে বুদ্ধের চরণে শরণ নিল, যোগ দিল ভিক্ষুণী সঙ্ঘে। 

আরেকদিনের কথা বুদ্ধ চলেছেন দক্ষিণগিরির একনালা গ্রামে ভিক্ষায়। পথে ভরদ্বাজ নামে এক ব্রাহ্মণের সঙ্গে দেখা। ভিক্ষুক বা সন্ন্যাসী দেখলেই তার বিরক্তির সীমা থাকে না। বুদ্ধকে এখেই তিনি বললেন, “আমি কৃষিজীবী, ক্ষেতে প্রচুর ফসল হয়, সুখে আছি। তুমিও ভিক্ষা না করে চাইলে আমার ক্ষেতে কাজ করতে পারো।” উত্তরে বুদ্ধ বললেন, “আমিও কৃষক, তবে সৎ মানুষের হৃদয় আমার ক্ষেত, শ্রদ্ধা বীজ, বিনয় আমার লাঙ্গল, ধারণা ফলক, মন হল জোয়াল। বীর্যই বলদ, আর এই চাষের ফল নির্বাণ। যার অর্জনে মানুষ জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর হাত থেকে নিস্তার পায়।” ভরদ্বাজের ঔদ্ধত্য স্তব্ধ হল, শির নত হল বুদ্ধের চরণে। 

বুদ্ধ যেখানেই গেছেন, মানুষের হৃদয় জয় করেছেন, কারণ তিনি মানুষের দুঃখ দূর করার চেষ্টাই করেছেন আজীবন। তিনি ক্রুদ্ধ বা অসহিষ্ণু হয়ে কাউকে কটুকথা বলেননি, এমনকি যারা তাঁর বিরোধীতা করেছে, তাদেরও নয়। তিনি দেবভাষার পরিবর্তে সহজ সরল কথ্য ভাষায় (পালি) তাঁর শিক্ষা দিয়েছেন যাতে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের কাছে তাঁর বাণী পৌঁছাতে পারে। তিনি তাঁর অনুগামীদের সর্বদা মানুষের সাহায্যে নিঃস্বার্থ ভাবে এগিয়ে যেতে বলতেন এবং তিনি নিজেও তা করে দেখাতেন। তাঁর জীবনই ছিল শিষ্যদের কাছে জ্বলন্ত অনুপ্রেরণাস্বরূপ। একবার তিনি মঠে গিয়ে একজন রুগ্ন সাধুকে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। সাধুটি সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে কেউ তাঁর দেখাশোনা না করে তাঁকে পরিত্যাগ করেছিল। বুদ্ধ সেই অসুস্থ সাধুর ক্ষতস্থান স্বহস্তে পরিষ্কার করে তাঁকে নতুন শয্যায় শুইয়ে দেন। অন্য সাধুদের তিনি আদেশ দেন, “ভিক্ষুগণ, তোমাদের পরিচর্যার জন্য না আছে পিতা, না আছে মাতা, যদি তোমরা পরস্পরের দেখাশোনা না করো, কে তোমাদের দেখবে? যে পীড়িতের সেবা করে, জেনো সে আমারই সেবা করছে।”

এইভাবেই বুদ্ধ শত শত নরনারীকে করুণা ও মৈত্রীর বাণী শুনিয়ে শান্তির সন্ধান দিতেন। 

মহাপরিনির্বাণ
মহাপরিনিব্বাণ সুত্ত অনুসারে গৌতম বুদ্ধের বয়স যখন আশি বছর, তখন তিনি তাঁর আসন্ন মৃত্যুর কথা ঘোষণা করেন। পওয়া নামক একটি স্থানে অবস্থান করার সময় চণ্ডনামক এক কামার তাঁকে ভাত ও শূকরমদ্দভ* ইত্যাদি খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। এই খাবার খাওয়ার পরে গৌতম আমাশয় দ্বারা আক্রান্ত হন। চণ্ডের দেওয়া খাবার যে তাঁর মৃত্যু কারণ নয়, আনন্দ যাতে তা চণ্ডকে বোঝান, সেই ব্যাপারে বুদ্ধ নির্দেশ দেন। এরপর আনন্দের আপত্তি সত্ত্বেও অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় তিনি কুশীনগর যাত্রা করেন। এইখানে তিনি আনন্দকে নির্দেশ দেন যাতে দুইটি শাল বৃক্ষের মধ্যের একটি জমিতে একটি কাপড় বিছিয়ে উত্তর দিকে মাথা রেখে তাঁকে যেন শুইয়ে দেওয়া হয়। এরপর শায়িত অবস্থায় বুদ্ধ উপস্থিত সকল ভিক্ষু ও সাধারণ মানুষকে তাঁর শেষ উপদেশ প্রদান করেন। তাঁর অন্তিম বাণী ছিল “বয়ধম্মা সঙ্খারা অপ্পমাদেন সম্পাদেথা”, অর্থাৎ “সকল জাগতিক বস্তুর বিনাশ আছে। অধ্যবসায়ের সাথে আপনার মুক্তির জন্য সংগ্রাম কর।”

দীপবংশ ও মহাবংশ নামক শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থানুসারে, বুদ্ধের মৃত্যুর ২১৮ বছর পরে সম্রাট অশোকের রাজ্যাভিষেক হয়, সেই অনুযায়ী ৪৮৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বুদ্ধের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে চীনা পুঁথি অনুসারে, বুদ্ধের মৃত্যুর ১১৬ বছর পরে অশোকের রাজ্যাভিষেক হয়, সেই অনুযায়ী ৩৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বুদ্ধের মৃত্যু হয়। যাই হোক, থেরবাদ বৌদ্ধ ঐতিহ্যে ৫৪৪ বা ৫৪৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ ঘটে বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মায়ানমারের বৌদ্ধরা ৫৪৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ১৩ই মে এবং থাইল্যান্ডের বৌদ্ধরা ৫৪৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ১১ই মার্চ বুদ্ধের মৃত্যুদিবস বলে মনে করেন।

পাদটীকা— *[বিভিন্ন পুঁথিতে অনুবাদবিভ্রাট ও লিখনশৈলীর পার্থক্যের জন্য গৌতম বুদ্ধের অন্তিম আহার্য্য বস্তু সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না। আর্থার ওয়েলির মতে থেরবাদ ঐতিহ্যানুসারেশূকরমদ্দভ বলতে শূকরের নরম মাংস বোঝানো হয়। যদিও কার্ল ইউজিন নিউম্যান এই শদের অর্থ করেছেন শূকরের নরম আহার। নিউম্যান ও ওয়েলি আবার এও মত প্রকাশ করেছেন যে এই আহারের সাথে শূকর শব্দটি যুক্ত হলেও হয়তো এটি একটি শুধুমাত্র একটি উদ্ভিদ, যাকে আহার হিসেবে ব্যবহার করা হত। পরবর্তীকালে কয়েক শতাব্দী পরে বুদ্ধের জীবনী রচনার সময় এই শব্দের অর্থ সাধারণ ব্যবহারে অপ্রচলিত হয়ে পড়ায় শূকরমদ্দভ শব্দটি শূকরের নরম মাংস হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। অস্কার ভন হিনুবার মত প্রকাশ করেছেন যে, বুদ্ধের মৃত্যু খাদ্যে বিষক্রিয়ার মাধ্যমে হয় নি, বরং ‘সুপিরিয়র মেসেন্ট্রিক আর্টারি সিন্ড্রোম’ নামক বার্ধক্যের সময়ের একটি রোগের কারণে হয়েছিল।]*

বুদ্ধের উপদেশের প্রধান ভিত্তি: তিনটি সর্বজনীন সত্য শৈশবে বুদ্ধের জীবনে একটি ঘটনা ঘটেছিল যার প্রভাব পরবর্তী কালে তাঁর প্রচারিত ধর্মবিশ্বাসে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। 

হলকর্ষণ শাক্যসাম্রাজ্যের এক প্রাচীন উৎসব। রোহিণী নদীর তীরে জড়ো হয়েছে সমস্ত গ্রামবাসী, ধনী-দরিদ্র, কৃষক, শ্রেষ্ঠী, রাজা, মন্ত্রী সকলে। নানা বাদ্য বাজছে, নৃত্যগীত চলছে। রাজা স্বহস্তে হলকর্ষণ করে বছরের প্রথম ফসল চাষের সূচনা করবেন। বালক সিদ্ধার্থ দেখল, চাষা তার বলদকে প্রহার করছে। তিনি মনে আঘাত পেলেন। চষা ক্ষেতের উপর পড়ে আছে মৃত পোকামাকড় আর পাখি উড়ে এসে সেগুলো খাচ্ছে, ব্যাঙও মৃত কীট খাচ্ছে মনের আনন্দে, আবার গর্ত থেকে সাপ বেরিয়ে এসে সেই ব্যাঙগুলোকে খাচ্ছে। আকাশ থেকে চিল নেমে এসে আবার ছোঁ মেরে তুলে নিচ্ছে তার আহার সাপ। নিজের জীবন রক্ষার জন্য জীব জীবকে বিনাশ করছে। সিদ্ধার্থ প্রত্যক্ষ করলেন জীবনের ব্যর্থ প্রয়াস! তাঁর মন উদাস হয়ে গেল। জন-কোলাহল থেকে একটু দূরে সরে এসে একটি বড় জাম গাছের তলায় তিনি বসলেন। গভীর চিন্তায় ডুবে গিয়ে তাঁর মন চলে গেল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ থেকে অনেক দূরে। এদিকে রাজা পুত্রের খোঁজ করতে করতে এসে দেখলেন, যেন পর্বত শিখরে আগুনের শিখার মতো দীপ্ত তেজে ভাস্বর ধ্যানমগ্ন কুমার। এই দৃশ্য দেখে রাজজ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী স্মরণ করে রাজার সর্বশরীর যেন দগ্ধ হয়ে যাচ্ছিল।

বোধিলাভের পর, বুদ্ধ এই ঘটনা স্মরণ করে অন্তরে তার ব্যাখ্যা খুঁজে পেলেন। চাষা কেন তার ভারবাহী পশুকে প্রহার করে? জীবনধারণের জন্য এক জীব অন্য জীবকে কেনই বা হত্যা করে? তিনটি মহান সত্য তিনি উপলব্ধি করলেন। 

(১) মহাবিশ্বে কোনকিছুই চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না:
প্রথম সত্য হল, মহাবিশ্বে কোনও কিছুই চিরতরে হারায় না। বস্তু নাশ হয়ে শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, আবার শক্তি বস্তুতে পরিণত হয়। একটি শুষ্ক পত্র মাটিতে মিশে যায়, একটি বীজ অঙ্কুরিত হয়ে জন্ম হয় নতুন বৃক্ষের। পুরনো সৌরজগৎ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে মহাজাগতিক রশ্মিতে পরিণত হয়। আমরা পিতামাতা থেকে জন্মাই, আবার আমাদের মাধ্যমে আসে আমাদের সন্তান-সন্ততি। আমরাও গাছের মতো, অন্যান্য মানুষের মতো, মাটিতে ঝরে পড়া বৃষ্টিধারার মতো। আমাদের পারিপার্শ্বিক উপাদান দ্বারাই আমরা গঠিত হই, সর্ববস্তুই মূলে এক। যদি আমরা আমাদের পরিবেশের কোনও বস্তু ধ্বংস করি, তা আমাদের নিজেদের ধ্বংস করারই সমান। অন্যকে ঠকালে, তা নিজেকেই ঠকানো। এই সত্য উপলব্ধি করে বুদ্ধ ও তাঁর অনুগামীরা সর্বজীবে অহিংসা নীতি অনুশীলন করেন। 

(২) জগতে সর্ববস্তু পরিবর্তনশীল:
বুদ্ধ আবিষ্কৃত দ্বিতীয় সর্বজনীন সত্য হল, জগতের প্রত্যেক বস্তু অনবরত পরিবর্তিত হচ্ছে। জীবন এক নদীর মতো—প্রবহমান স্রোতের মতো নিত্য পরিবর্তনশীল। কখনো নদী ধীরে বয়, কখনো বা খরস্রোতা। কোনও স্থান মসৃণ তো কোথাও বা এবড়োখেবড়ো। এই মুহূর্তে আমরা নিজেদের নিরাপদ মনে করিতো পরমুহুর্তেই অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে যায় আমাদের জীবনে। একসময় ডাইনোসর জাতীয় বড় বড় প্রাণিরা ঘুরে বেড়াত পৃথিবীর বুকে, কিন্তু এখন তার পরিবর্তে অন্য প্রাণি এসেছে। জীবন থেকে থাকেনি। আমাদের ধারণাও পরিবর্তনশীল। একসময় আমরা ভাবতাম পৃথিবীটা বুঝি সমতল, এখন জানি, আসলে তা গোল। 

(৩) বিশ্বে সবই ঘটে কার্যকারণ নীতি অনুসারে:
তৃতীয় যে সর্বজনীন সত্য বুদ্ধ ব্যাখ্যা করলেন, তা হল কার্যকারণ সূত্র। এই কার্যকারণ পরিণামই জীবকে অবিরাম পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ভ্রমণ করায়। এই কার্যকারণ শৃঙ্খলকেই বলা হয় ‘কর্ম’। শুভ অশুভ যা কিছু আমাদের ভাগ্যে জোটে, সে সমস্তই আমাদের বাসনার ফল। আমাদের বর্তমান আমাদের অতীত কর্মের ফলশ্রুতি। আমাদের চিন্তা ও কর্মই আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণকরে। আমরা সৎ কর্ম করলে শুভ ফল পাই, আর অসৎ কর্মের ফলে অশুভ ভোগ করতে হয়। প্রত্যেক মুহূর্তে আমাদের চিন্তা, বাক্য ও কাজ দ্বারা আমরা নতুন কর্মফল তৈরি করে চলেছি। তাই শুভ বা সৎকর্মের ও সৎ চিন্তার দ্বারা আমরা আমাদের ভাগ্য নিজেরাই গঠন করতে পারি। 

বৌদ্ধধর্ম ও দর্শনের মূলনীতি
বুদ্ধের দর্শনের প্রধান অংশ হচ্ছে দুঃখের কারণ ও তা নিরসনের উপায়। বাসনা সর্ব দুঃখের মূল। বৌদ্ধমতে সর্বপ্রকার বন্ধন থেকে মুক্তিই হচ্ছে প্রধান লক্ষ্য। একে নির্বাণ বলা হয়। নির্বাণ শব্দের আক্ষরিক অর্থ নিভে যাওয়া, বিলুপ্তি, বিলয়, অবসান, ইত্যাদি। এ সম্বন্ধে বুদ্ধের চারটি উপদেশ (Four Noble Truths) যা আর্যসত্য বা চতুরার্য সত্য নামে পরিচিত। এই চতুরার্য সত্য হল:
(১) দুঃখ—জগতে দুঃখ আছে।
(২) দুঃখের হেতু: যেহেতু জগতে সর্ব বস্তুই দুঃখময়, দুঃখের কারণও আছে। বাসনাই দুঃখের জন্ম দেয়।
(৩) দুঃখ নিরোধের উপায়: বাসনার নিবৃত্তি হলেই দুঃখ নিবৃত্তি হয়।
(৪) দুঃখ নিরোধ মার্গ: বুদ্ধ নির্দেশিত ‘অষ্টাঙ্গিক মার্গ’ অনুশীলন করলে দুঃখ থেকে মুক্তিলাভ সম্ভব। 
আমাদের দুঃখের জন্য আমাদের বাসনাই দায়ী। বাসনা নির্বাপিত হলে দুঃখ দূর হবে। তাই তিনি সরল ভাবে দুঃখ নিবৃত্তির উপায় স্বরূপ ‘অষ্টাঙ্গিক মার্গ’ প্রচার করলেন। 
এই অষ্টাঙ্গিক মার্গ হল—(১) সম্যক দৃষ্টি (ধারণা/ চিন্তা), (২) সম্যক সংকল্প, (৩) সম্যক বাচ্য, (৪) সম্যক আচরণ, (৫) সম্যক জীবিকা (জীবনধারণ), (৬) সম্যক প্রচেষ্টা, (৭) সম্যক স্মৃতি (মনন) ও (৮) সম্যক সমাধি (একাগ্রতা)। 
এই আটটি উপায়কে একত্রে বলা হয় আয্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ, যার দ্বারা জীবন থেকে দুঃখ দূর করা বা নির্বাণ প্রাপ্তি সম্ভব। এই আয্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের উপর ভিত্তি করেই বৌদ্ধ ধর্মে দশ শীল, অষ্টশীল এবং পঞ্চশীলের উৎপত্তি। অষ্টাঙ্গিক মার্গকে বৌদ্ধ ধর্মের মূল ভিত্তি বলা যায়, যা মধ্যপথ নামে অধিক পরিচিত।

বৌদ্ধধর্মে নির্বাণের ধারণা
বুদ্ধদেব বলেছিলেন, ‘দুঃখম্ দুঃখম্ সব্বম্ দুঃখম্’। বৌদ্ধ দর্শন হৃদয়ঙ্গম করতে হলে প্রথমে এটি অনুভব হওয়া প্রয়োজন যে, জগতে দুঃখ আছে, জগতের সর্ব বস্তু দুঃখময়। এই দুঃখ তার নিবৃত্তির উপায়—এটাই বুদ্ধদেবের মূল উপদেশ। এই দুঃখ জন্ম থেকে—জন্মেই শিশু কেঁদে ওঠে। এই দুঃখ রোগে—যখন আমরা রোগাক্রান্ত হই, চরম দুঃখ অনুভব করি। দুঃখ বার্ধক্যে বা জরায়—জরা আমাদের দৈহিক ক্ষমতা কেড়ে নেয়। শারীরিক অজস্র ব্যথা-বেদনা, দুর্বলতা আমাদের চলচ্ছক্তিহীন অশক্ত করে তোলে। দুঃখ আছে ম্রিত্যুতে—আমরা কেউ কখনও মৃত্যু চাই না, প্রিয়জনের মৃত্যু আমাদের অসহনীয় বিয়োগব্যথা দেয়। এছাড়াও আছে আরও কত দুঃখের হেতু! যাদের সঙ্গ ভাল লাগে না, হয়তো তাদের সঙ্গে থাকতে হয়, অথচ যাদের ভালবাসি, তাদের সঙ্গেই বিচ্ছেদ ঘটে যায়! আমরা যা চাই, হয়তো তা পাই না! যে কোনও সমস্যা বা হতাশা—আমরা না চাইলেও অনিবার্য ভাবে তাদের মুখোমুখি হতেই হয়। অজ্ঞান বা অবিদ্যা আমাদের জীবনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। অজ্ঞান থেকেই এই মোহ জন্মায় যে, জগতের এই নিত্য পরিবর্তনশীলতার মধ্যে একটা কিছু আছে, যা স্থায়ী—যাকে আঁকড়ে ধরে আমি বেঁচে থাকব। এই স্থায়ীত্বের বোধই তৃষ্ণার মূল। আমাদের ভোগ্য বস্তু এবং সেগুলো ভোগ করার জন্য জীবনের স্থায়ীত্ব—এই তৃষ্ণা বা কামনাই আমাদের পুনঃ পুনঃ জন্মমৃত্যু চক্রে আবর্তিত করায় ও এর পরিণাম অশেষ দুঃখভোগ। 

জীবনে সুখ নেই—একথা বুদ্ধ বলেননি। কিন্তু তিনি আমাদের যেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়েছেন, তা হল এই সুখ স্থায়ী নয়। তিনি বলেছেন—জীবনে সুখ আছে, বন্ধুত্বে সুখ আছে, পরিবার পরিজনের সান্নিধ্য সুখকর, সুস্থ দেহ ও মন সুখের কারণ—কিন্তু যখন এগুলোর অভাব হয়, দুখের সূত্রপাত হয় তখনই (ধম্মপদ)। বুদ্ধ দুঃখ কি, দুঃখের কারণ, দুঃখ দূর করার উপায় সম্বন্ধে উপদেশ দিয়েছেন। তাঁর মতে জীবন দুঃখপূর্ণ। দুঃখের হাত থেকে কারও নিস্তার নেই। জন্ম, জরা, রোগ, মৃত্যু সবই দুঃখজনক। মানুষের কামনা-বাসনা সবই দুঃখের মূল। মাঝে মাঝে যে সুখ আসে তাও দুঃখ মিশ্রিত এবং অস্থায়ী। অবিমিশ্র সুখ বলে কিছু নেই। নিবার্ণ লাভে এই দুঃখের অবসান ঘটে। কামনা-বাসনার নিস্তারের মাঝে অজ্ঞানের অবসান ঘটে। এতেই পূর্ণ শান্তি অর্জিত হয়।

সকল প্রকার কামনা-বাসনা-বন্ধন থেকে মুক্তি লাভই হচ্ছে নির্বাণ, এই ‘নির্বাণ’ লাভই বৌদ্ধ দর্শনে সর্বোচ্চ অবস্থা বা মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ লক্ষ্য বলা হয়। নির্বাণ শব্দের অর্থ ‘নির্বাপিত হওয়া’। ‘নি’ উপসর্গের সঙ্গে ‘বাণ’ শব্দটি যুক্ত হয়ে ‘নির্বাণ’ শব্দটি ব্যুৎপন্ন হয়েছে। ‘নি’ উপবর্গটি অভাব, নাই, ক্ষয়, শেষ ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। ‘বাণ’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ ধনুকের তীর। বৌদ্ধ শাস্ত্রে তৃষ্ণা বোঝাতে ‘বাণ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অতএব, ‘নির্বাণ’ বলতে তৃষ্ণার ক্ষয় বোঝায়। আমাদের মনে রাগ, ঈর্ষা, মোহ, লোভ, ইত্যাদি ক্ষতিকর প্রবৃত্তির উৎপত্তির কারণ হচ্ছে তৃষ্ণা বা কামনা। তৃষ্ণার কারণেই মানুষ বার বার জন্মগ্রহণ করে দুঃখভোগ করে। যিনি নির্বাণ সাক্ষাৎ করেন তিনি তৃষ্ণামুক্ত হন। তাঁর তৃষ্ণাজাত রাগ-দ্বেষ-মোহাগ্নি নির্বাপিত হয়। তাঁর জন্ম-মৃত্যুর প্রাবহ নিরুদ্ধ হয়। ফলে তিনি সর্বপ্রকার দুঃখ হতে মুক্ত হন। অতএব, যে-ধর্ম প্রত্যক্ষ করলে তৃষ্ণার ক্ষয় হয়, রাগ-দ্বেষ-মোহাগ্নি নির্বাপিত হয়, জন্ম-মৃত্যুর প্রাবহ বা কার্যকারণ নিরুদ্ধ হয় এবং সর্ব প্রকার দুঃখের নিরোধ হয় তারই নাম নির্বাণ। তাই বলা হয়, ‘নিব্বাণং পরমং সুখং’। 
জীবনের প্রতি পাঁচটি দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বুদ্ধ এদের ‘পঞ্চশীল’ নামে অভিহিত করলেন। এই ‘শীল’ পালন নৈতিক জীবনের প্রধান মানদণ্ড। এগুলি হল—

(১) জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা—সুতরাং জীব হিংসা ত্যাগ,
(২) অপরের সম্পদের প্রতি শ্রদ্ধা—সুতরাং চুরি না করা,
(৩) শুদ্ধ স্বভাবে শ্রদ্ধা—সুতরাং অনৈতিক কাম-চরিতার্থতার চেষ্টা ত্যাগ করা,
(৪) সততায় শ্রদ্ধা—সুতরাং সত্যভাষণ
(৫) স্বচ্ছ মানসিকতায় শ্রদ্ধা—সুতরাং মাদক দ্রব্য বর্জন।

বৌদ্ধ ধর্মের যে পঞ্চশীল বা পঞ্চনীতির কথা বলা হয়েছে সেটা সুশৃঙ্খল ও বৈরীহীন আধুনিক সমাজ ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গঠনে এবং ঐক্য সংহতি, পারস্পরিক প্রীতি, ভালোবাসা ও বিশ্বমৈত্রী স্থাপনে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এই পঞ্চনীতি পালনে ব্যক্তি যেমন উপকৃত হবে, নিরাপদে থাকবে; তেমনি সমাজ ও দেশের মানুষ সুখে-শান্তিতে অবস্থান করতে পারবে। এমনকি সমাজ ও দেশ থেকে নানা ধরনের দুর্নীতি, অপরাধ এবং হিংসা, নৈরাজ্য বিদূরিত হবে। বিশ্বে কোনো রকম যুদ্ধবিগ্রহ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতও থাকবে না। সুতরাং এ সুন্দর মানবসমাজের সামাজিক সংহতি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য নীতিবোধ ও মানবিক মূল্যবোধ তৈরি করার ক্ষেত্রে বুুদ্ধের এই পঞ্চনীতি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং অপরিহার্য। 

গৃহস্থের উদ্দেশ্যে বুদ্ধের উপদেশ
(১) মাতাপিতাকে সম্মান করবে, স্ত্রী ও সন্তানের যত্ন নেবে
(২) শান্তিপূর্ণ পথে অর্থ উপার্জন করবে, কারণ সেটাই করণীয়।
(৩) সৎ জীবন যাপন করবে, দরিদ্রকে ভিক্ষা দেবে, পরিবার ও পোষ্য প্রতিপালন করবে।
(৪) অসৎ কর্ম বা নিন্দনীয় কাজ করবে না যাতে কেউ তোমাকে দোষারোপ করতে পারে।
(৫) পাপাচরণ থেকে বিরত থাকবে, সুরা ও মদিরাপান সর্বথা পরিহার করবে।
(৬) ধর্মাচরণে অবহেলা করবে না, কারণ এই সঠিক পন্থা। 

বৌদ্ধ সঙ্ঘ ও ভিক্ষুর নিয়মাবলী
বুদ্ধ ও তাঁর অনুশাসনের মতো বৌদ্ধসংঘও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের সকল স্তরের ও সকল জাতির মানুষের জন্য এই সঙ্ঘের দ্বার অবারিত। কুষ্ঠ জাতীয় কোনও ব্যাধি না থাকলে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে যে কোনও মানুষ চাইলে সঙ্ঘে যোগ দিতে পারে। নারীর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। সঙ্ঘে যোগদানে ইচ্ছুক ব্যক্তি একজন অগ্রজ ভিক্ষুকে পথপ্রদর্শক হিসাবে বেছে নেবেন এবং তাতে সঙ্ঘের সম্মতি থাকতে হবে। সঙ্ঘের গুরুজনদের অনুমতিক্রমে তাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে কাষায় বস্ত্র দিয়ে ভিক্ষু হিসাবে গ্রহণ করা হবে। সঙ্ঘাধ্যক্ষের কাছে তাকে ভিক্ষু হিসাবে শপথ গ্রহণ করতে হবে।

ভিক্ষুর শপথ-- ত্রিশরণ মন্ত্র
(১) বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি - আমি বুদ্ধের শরণ নিলাম। বোধি লাভ জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য। বুদ্ধত্ব মানে পূর্ণ সত্য, পবিত্রতা, চরম আধাত্মিক জ্ঞান।
(২) ধম্মং শরণং গচ্ছামি - আমি ধর্মের শরণ নিলাম। যে সাধনা অভ্যাস দ্বারা সত্য লাভ হয়, আধ্যাত্মিকতার পূর্ণ বিকাশ হয় তাই ধর্ম।
(৩) সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি - আমি সঙ্ঘের শরণ নিলাম। যেখানে পূর্ণ জ্ঞান লাভের জন্য ধর্মের সাধনা সম্যক্ ভাবে করা যায় তাই সঙ্ঘ।

প্রথমে নবীন যতিকে ‘প্রব্রজ্যা’ দেওয়া হয়। ১০ বছর ধরে তাঁকে কঠোর তপস্যা ও নৈতিক আচরণ অনুশীলন করতে হয়। এরপর তিনি ‘উপসম্পদ’ স্তরে উন্নীত হন। এই স্তরের অনুশাসন পালন করার পর তিনি সঙ্ঘের স্থায়ী সদস্য হন এবং ‘পাতিমোক্ষ’ অনুশাসন দ্বারা তাঁর পরবর্তী জীবন নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। 

ভিক্ষুর ধন
বুদ্ধ বললেন—“পাখী যেমন যেখানেই যায়, তার দুই ডানায় ভর করে উড়ে যায়, তেমন করেই মুণ্ডিত মস্তক যতি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করবেন এই দুই সম্বল করে—কাষায় বস্ত্র ও ভিক্ষাপাত্র।” ভিক্ষুর অহংকার তার মুণ্ডিত মস্তক—নিজের দেহকে সুন্দর করে তোলার সমস্ত চেষ্টা সে বর্জন করেছে, এই তার অর্থ। এক ভিক্ষুর গৈরিক বস্ত্র তাঁর জ্বলন্ত ত্যাগের প্রতীক—অর্থাৎ সত্য লাভের চরম আকাঙ্ক্ষায় সে সংসার ত্যাগ করেছে আর নিজের শরীর রক্ষার চেষ্টাও সে করবে না, ঐ ভিক্ষাপাত্র তারই প্রতীক। গৃহস্থের দয়ার একমুঠো দানে সে দেহ প্রতিপালন করবে। 

ভিক্ষুর দশ আচরণবিধি
অহিংসা, অচৌর্য, দুর্নীতি পরিহার, সত্যবাদিতা, মাদক দ্রব্য বর্জন, বিলাসবহুল শয্যা ব্যবহার না করা, নৃত্য-গীত ইত্যাদি প্রমোদ উপভোগ না করা, অনিয়মিত আহার বর্জন, উপহার গ্রহণ না করা, অপরের ধনে লোভ ত্যাগ করা এবং অর্থ সঞ্চয় না করা। 

বুদ্ধের দর্শন ও বৌদ্ধ কর্মবাদ
বুদ্ধের বিশ্ব-দর্শন সাধারণ ভাবে অন্যান্য সকল ধর্মমত থেকে মূলে ভিন্ন। অন্য যে কোনও ধর্মবিশ্বাসের মূলে এই জগতের স্রষ্টা ও পালনকর্তা রূপে একজন ঈশ্বরের ধারণা এবং জীবের এক অবিনাশী সত্তা—যাকে আত্মা বলা হয়, এই দুই ধারণা অনস্বীকার্য। কিন্তু বুদ্ধ এই দুই-এর কোনটাই গ্রহণ করেননি, কিন্তু ধারণাগুলি অগ্রাহ্যও করেননি। বলা চলে ঈশ্বর প্রসঙ্গে তিনি নীরব থেকেছেন, তাঁর সমস্ত মনোযোগ কেবল মানবের দুঃখ ও তার নিরসনে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। তাঁর মতে, সামগ্রিক ভাবে, প্রকৃতি নিত্য বিদ্যমান এবং স্ব-পালনী (self sustaining) ক্ষমতা সম্পন্ন। প্রকৃতি হল আভ্যন্তরীণ নীতি দ্বারা কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রিত চিরস্থায়ী সত্তাবিহীন এক অবিরাম ঘটনাপ্রবাহ, যা নিজেকে অপরিবর্তনীয় কার্যকারণ শৃঙ্খল রূপে প্রকাশিত করে চলেছে। তিনি একে ‘প্রতীত্য সমুৎপাদ’ তত্ত্ব বা ‘নির্ভরশীল সৃষ্টিবাদ’ (dependent origination) আখ্যা দিলেন। অত্যাধুনিক বিজ্ঞানীদের মতোই তিনি জগতের সৃষ্টি রহস্য ব্যাখ্যা করার জন্য ‘ঈশ্বর’ ধারণার প্রয়োজন স্বীকার করেননি। 

‘প্রতীত্য সমুৎপাদ’ তত্ত্ব মানব-জীবনের ক্ষেত্রেও এই ‘প্রতীত্য সমুৎপাদ’ তত্ত্ব প্রযোজ্য। প্রকৃতির অংশ হিসাবে মানুষও স্থায়ী সত্তা (আত্মা) বিহীন এক পরিবর্তনশীল ক্রমপ্রবাহ। বুদ্ধ বিষয়টিকে এইভাবে ব্যাখ্যা করলেন—
অবিদ্যা> থেকে সংস্কার উৎপত্তি> সংস্কার জন্ম দিচ্ছে > বিজ্ঞান (conciousness)> দেহ-মন (নাম-রূপ)> ষড়ায়তন (ছয়টি অঙ্গ)> স্পর্শ (contact)> বেদনা (sensations)> ভাব (craving, grasping and becoming)> জাতি (জন্ম)> জরা-মরণ। এই কার্যকারণ শৃঙ্খলের দ্বারা চালিত হয়ে মানুষ ক্রমাগত জন্মমৃত্যু চক্রে আবর্তিত হয়ে চলেছে। এই চক্র থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়ই বুদ্ধের বাণী। অবিদ্যা নাশ করাই একমাত্র উপায়, এবং এই অবিদ্যা আসে এই বোধ থেকে যে, একটি নিত্য অবিনাশী সত্তা আছে (বেদান্তে যাকে আত্মা বলা হয়), যে এই জন্মমৃত্যু চক্রে পরিভ্রমণ করছে। আত্মা, অর্থাৎ স্ব-ভাব, বা স্বরূপ-প্রকৃতি, যার কোনও ক্ষয় নেই, পরিবর্তন নেই, যার অস্তিত্ব কোনও কিছুর উপর নির্ভরশীল নয়। 

‘নৈরাত্ম্য’
কিন্তু বুদ্ধ বললেন, বাস্তবে বাহ্য প্রকৃতিতে, কিম্বা মানব ব্যক্তিত্বে, আমরা এইরকম কোনও স্থায়ীত্ব দেখতে পাই না। এই অনিত্যতা, অস্থায়ীত্বকে বুদ্ধ ‘নৈরাত্ম্য’ বললেন। অন্তর্জগতে তা ‘পুদ্গল নৈরাত্ম্য’ ও বহির্জগতে ‘ধর্ম-নৈরাত্ম্য’। দেহ-মন সমষ্টি বিশিষ্ট এই অস্তিত্বের যে প্রবহমানতা—যাকে ‘আমি’ বলে বোধ হয়, বৌদ্ধিক ও আধ্যাত্মিক ভাবে এই বোধ সম্পূর্ণ নির্মূল করার মাধ্যমেই জন্মমৃত্যু চক্র থেকে অব্যাহতি লাভ সম্ভব। যতক্ষণ এই ‘আমি’ থাকবে, বেঁচে থাকার ইচ্ছা এবং ভোগ-বাসনা ও ভোগ্যবস্তুর প্রতি আসক্তি (‘তৃষ্ণা’) আমাদের সঙ্গ ছাড়বে না। পরিণাম—অবিরাম, অনিঃশেষ জন্ম ও মৃত্যু। এই ‘তৃষ্ণা’ বা ‘তঞহা’ হল ‘মার’ বা মৃত্যু স্বয়ং। 

অনাত্তা
‘আমি’ বোধ নির্মূল করা অসম্ভব নয়, যেহেতু ‘আমি’ একটি অলীক ধারণা। বুদ্ধ উপদিষ্ট অষ্টাঙ্গিক মার্গের অনুশীলন দ্বারা এই ভ্রম জয় করা সম্ভব। এই আটটির মধ্যে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— সম্যক দৃষ্টি, সম্যক জীবনযাপন ও সম্যক একাগ্রতা, বস্তুত এই তিনের মধ্যেই অবশিষ্টগুলি অন্তর্ভুক্ত। সম্যক দৃষ্টি হল ‘নৈরাত্ম্য’ বা ‘অনাত্তা’ (soullessness) তত্ত্বের সঠিক ধারণা। বাইরে যাকে প্রকৃতি বলে ও অন্তরে চেতনা বলে বোধ হচ্ছে, তা প্রকৃতপক্ষে এক নিত্য প্রবাহমানতা (constant flux), কোনও স্থায়ী বস্তু নেই, কোনও স্বাধীন সত্তা নেই, কোথাও নিজস্ব স্বতন্ত্রতা নেই— অর্থাৎ কোনও একটি সত্তা নেই, অসংখ্য সত্তা ক্রমাগত সৃষ্টি হচ্ছে ও লয় পাচ্ছে—‘প্রতীত্য সমুৎপাদ’ (only becoming, no being)। 

পুনর্জন্মের ব্যাখ্যা
কিন্তু যেহেতু বৌদ্ধধর্মের মূল তত্ত্ব হিসাবে পুনর্জন্ম ও কর্মফল স্বীকৃত, এবং এই দুটি না থাকলে বৌদ্ধধর্ম ধর্মের শিরোপা পেত না, কেবলমাত্র একটি দর্শন হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করত, তাই এই ‘আমি’ বোধের বিদ্যমানতা ও তার ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা থেকেই যাচ্ছে—কারণ ‘আমি’ না থাকলে কর্মফল কার এবং পুনর্জন্মই বা কার হয়? এর ব্যাখ্যা স্বরূপ বলা হয়েছে যে, ‘অহং’ বলে কিছু নেই। জীবন-মৃত্যুর যাতায়াতের মূলে ‘আত্মা’ বলেও কিছু নেই। আছে শুধু চিন্তাপ্রবাহ। একটির পর আরেকটি সঙ্কল্প। একটি সঙ্কল্পের ফুট উঠল, আবার সেই মুহূর্তেই তা বিলীন হয়ে গেল। এই চিন্তা বা সঙ্কল্পের কর্তা কেউ নেই। কোনও জ্ঞাতাও নেই। দেহ অনুক্ষণ পরিবর্তিত হচ্ছে, মন এবং বুদ্ধিও পরিবর্তনশীল। সুতরাং ‘অহং’ নিছক ভ্রান্তি। এই নিয়ত পরিবর্তনশীলতা (constant flux), এটি কোনও বিশৃঙ্খল প্রক্রিয়া নয়। বর্তমান মুহূর্ত তার কার্যকারিতা ও স্বভাব পরবর্তী মুহূর্তে প্রবাহিত করে দিচ্ছে। ফলে একটি নিত্য-চেতনা প্রবাহ উৎপন্ন হচ্ছে, একে বলে ‘বিজ্ঞান-সন্তান’। চেতনার একটি অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ—যা তৈরি হচ্ছে একক ও মুহূর্তজীবি চেতনার ধারাবাহিক উৎপত্তি ও লয়ের মাধ্যমে, প্রত্যেকটি নব চেতনা পূর্ব মুহূর্তের চেতনার সংস্কার নিয়ে আসছে কিন্তু তাতে কোনও অবিনাশী সত্তা থাকছে না। এই ভাবে প্রতি মুহূর্তে একটি চেতনার সঙ্গে পূর্ববর্তী চেতনার সংস্কার সংযুক্ত হয় এবং এইভাবেই পুনর্জন্মকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। 

বৌদ্ধ ও বেদান্ত দর্শনের তুলনা
বেদান্ত মতে ধ্যানে অন্তিমে ‘ধ্যাতা’ও বিলুপ্ত হয়, কিন্তু মানস-চেতনা স্তরে বৃহৎ আমির প্রতিফলন রূপেই ধ্যাতা বা ক্ষুদ্র আমির এই বিলুপ্তি ঘটে। কিন্তু বুদ্ধ এক্ষেত্রে দেহ-মনস্তত্ত্বমূলক ব্যাখ্যাকেই বেছে নিয়েছেন। অধিবিদ্যা জগতে প্রবেশ করে ‘বৃহৎ আমি’র ধারণায় তিনি যেতে চাননি। কারণ, বৌদ্ধিক দিক থেকে যতক্ষণ আত্মা-পরমাত্মার ধারণা থাকবে, আমাদের স্বাভাবিক প্রবণতায় আমরা তাকে ‘বিষয়’ হিসাবে দেখার চেষ্টা করব এবং আমার ক্ষুদ্র আমি বা অহং-বোধ (pseudo I, যাকে শ্রীরামকৃষ্ণ ‘কাঁচা আমি’ বলেছেন) নির্মূল হবে না, ফলে তৃষ্ণা নিবারিত হবে না এবং পুনর্জন্ম অব্যাহত থাকবে। আমাদের দেহ-মনস্তাত্ত্বিক সত্তার সম্পূর্ণ বিষয়ীকরণ—এই হল বুদ্ধের ধ্যান-পদ্ধতি, বৌদ্ধ মনস্তত্ত্ব পাঁচটি স্কন্দ রূপে যার ব্যাখ্যা করেছে—রূপ (জাগতিক বিষয়), বেদনা (অনুভূতি), সংজ্ঞা (বোধ), সংস্কার (মানসিক সঙ্কল্প ও ইচ্ছা) ও বিজ্ঞান (বুদ্ধি)। কেবলমাত্র একটি বৌদ্ধিক ধারণা এই প্রকার ধ্যানের গভীরে প্রবেশ করার পক্ষে যথেষ্ট নয়, তাতে আমাদের ‘আমি’-বোধের আরেকটি মাত্রা যোগ হবে মাত্র। ধ্যানকালীন চেতনাকে নিয়ে যেতে হবে ঐ ‘আমি’ বোধের একেবারে গভীরে এবং ‘আমি’ রূপ ঐ দেহ-মনস্তাত্ত্বিক যৌগটিকে বাহ্য বিষয়ে পরিণত করে তার সঙ্গে ঐকাত্ম্যবোধকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে। এইভাবে ‘আমি’কে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য ও বহিষ্কার করলে দীপ নিভে যাওয়ার মতো ‘অহং-বোধ’ নির্বাপিত হয়। এই অবস্থাই নির্বাণ। যা একাধারে নির্বাপণ ও প্রশান্তি (blowing out and cooling)। যেখানে ‘নাস্তি’ ‘নাস্তি’ শেষ হয়—সেখানেই পূর্ণ ‘অস্তি’। এটাই ঘটে যখন চেতনা ‘আমি’কে অস্বীকার করে, তা কার্যকারণ শৃঙ্খল-চ্যুত হয়ে পড়ে—তখনই তা পরম অবিকারী সত্তা রূপে অবস্থান করে। বৌদ্ধ দর্শন সংক্রান্ত গবেষণার শেষে ম্যাক্স মুলার ও শিল্ডারস (Max Muller & Childers) বলেন যে, সমগ্র বৌদ্ধ শাস্ত্রে তাঁরা এমন উল্লেখ কোথাও পাননি, যেখানে বলা হয়েছে, ‘নির্বাণ’-এর অর্থ সম্পূর্ণ বোধশূন্যতা, যদিও অনেকে ‘অনাত্তা’ বলতে তাই বোঝান। কিন্তু বুদ্ধ নিজে বলেছিলেন—“যে কথা আমি প্রকাশ করিনি, তা অপ্রকাশিতই থাক।” শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, “বুদ্ধ ‘নেতি’ নেতি’ দ্বারা যে অবস্থার কথা বলতে চেয়েছেন, তা অস্তি নাস্তির পারের কথা।” 

নির্বাণের স্বরূপ
বারম্বার জিজ্ঞাসিত হয়ে বুদ্ধ এই অবস্থার ইঙ্গিত দিয়ে বলেছিলেন, “মহাসমুদ্রে মিলিত হয়ে নদী নিজেকে হারিয়ে ফেলে, সব নদীর জল এসে মহাসাগরে মিশলেও মহাসাগরের জল কমেও না, বাড়েও না, তেমন ভাবেই যখন অনেক ‘অর্হৎ’ নির্বাণ লাভ করেন, নির্বাণ সমুদ্র স্ফীতও হয় না, হ্রাসও পায় না। সেই নির্বাণ-ভূমি জলও নয়, আগুনও নয়, সেখানে কোনও দীপ আলো দেয় না, কোনও সূর্য বা চন্দ্রও কিরণ দেয় না, সেখানে কোনও অন্ধকারও নেই। আর নির্বাণ প্রাপ্ত ‘বুদ্ধ’ যখন অন্তঃপ্রজ্ঞালোকে স্থির হন, তিনি রূপ ও অরূপ, দুঃখ ও আনন্দ উভয় থেকেই মুক্ত হন।” কঠোপনিষদে একই ভাবের প্রতিধ্বনি—“নেমা বিদ্যুতো ভাতি/কুতোঽয়ম্ অগ্নিঃ।” তিনি আরও বললেন, “যে যতি নির্বাণ প্রাপ্ত হয়েছেন, তিনি তথাগত স্তরে প্রবেশ করেছেন—এমনকি ইন্দ্র ও প্রজাপতি ব্রহ্মা প্রভৃতি দেবতারাও সেই অবস্থা লাভ করতে সক্ষম হন না, এই জীবনেই বুদ্ধত্ব লাভ করেছেন, আমার মতো এমন মানুষ খুঁজে পাবে না! আমার বিরুদ্ধে কত ব্রাহ্মণ পুরোহিত সম্পূর্ণ যুক্তিহীন ও মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছেন যে, শ্রমণ গৌতম একজন নাস্তিক, তিনি আত্মার অবিনশ্বরতা অস্বীকার করার শিক্ষা দিচ্ছেন! কিন্তু আমি মানুষকে কেবল তার দুঃখ নিবৃত্তির উপায় উপদেশ করি…আমি মোহ নাশের শিক্ষা দিই। আমি মুক্তির বাধাস্বরূপ পাপ নাশের শিক্ষা দিই।” বৌদ্ধধর্মের এই পরম অবস্থা বা নির্বাণ লাভ অতএব বেদান্ত মতের ‘আত্যন্তিক দুঃখ নিবৃত্তি’ অবস্থারই নামান্তর। কিন্তু এরপরে বেদান্তের সংযোজন—‘পরমানন্দ সম্প্রাপ্তি’। বুদ্ধও আভাসে বললেন, “শোন শিষ্য, এমন কিছু আছে, যা জাত হয় না, উৎপন্ন হয় না, সৃষ্ট বস্তু তা নয়, তাকে ভেঙ্গে ফেলাও যায় না। যেখানে ‘নেতি’ ‘নেতি’ সমাপ্ত হয়, হে শিষ্য, নিশ্চিত জেনো, সেখানে যে বস্তু আছে, তা অজাত…”; বুদ্ধের প্রিয় শিষ্য সারিপুত্ত একথা শুনে আনন্দে বিহবল হয়ে বলে ওঠেন, “আনন্দ! আনন্দই নির্বাণ!” 

পরম মৌন
বহির্জগৎ ও অন্তর্জগতের অবিরাম পরিবর্তনশীলতার মধ্যে একটি শাশ্বত অবিনাশী সত্তার বিদ্যমানতাকে চূড়ান্ত ভাবে অস্বীকার, অর্থাৎ পূর্ণ ‘নাস্তি’ বোধ এমন একটি অবস্থায় পৌঁছে দেয়, যা চূড়ান্ত ‘অস্তি’। আর যা ‘বোধে বোধ’ হয়, তা ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ তা বিষয় বা বিষয়ী—কোনটাই হতে পারে না। বুদ্ধের ‘নির্বাণ’ সম্বন্ধে নীরবতার অর্থ হয়তো এটাই। এই নীরবতার ব্যাখ্যাস্বরূপ একজন বৌদ্ধ গ্রন্থকার বলেছেন, “এমন কিছু প্রশ্ন থাকে, যার উত্তর ইতিবাচক ভাষায় দিতে হয়, কোন কোন প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক ভাষাতেই দেওয়া যায়, কিন্তু এমনও কোন বিষয় থাকে, নীরবতাই যার উত্তর। কারণ ব্যাখ্যার দ্বারা তা স্পষ্ট না বরং সংশয়-মেঘ সৃষ্টি করে।” 

বেদান্তও আত্মা-ব্রহ্ম চরম ঐক্যের ব্যাখ্যায় ‘পরম মৌন’-এর (ultimate silence) তাৎপর্য স্বীকার করেছে। যদিও বৈদান্তিক আচার্যগণ অধিবিদ্যাগত দিক থেকে ব্রহ্ম-তত্ত্ব ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা বললেন, এই জীবাত্মা বলে যার অনুভব হয়, তা আসলে পরমাত্মারই ছায়া মাত্র। চৈতন্যের উন্মেষে এই প্রতিফলনের আধারস্বরূপ চিত্তবৃত্তির নিরোধ হলে, জীবাত্মা পরমাত্মার মিলন হয়। অর্থাৎ ব্যষ্টি-অহং, সমষ্টি-অহং-এ লয়প্রাপ্ত হয়। কিন্তু বুদ্ধ কোনও অধিবিদ্যাগত তত্ত্ব দ্বারা তাঁর ‘নির্বাণ’ অবস্থার ব্যাখ্যা করেননি। তিনি এই ‘আমি’কে কেবল এক মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখেছেন, যা সম্পূর্ণ কাল্পনিক বা অলীক এবং প্রতি মুহূর্তের আবেগ ও চিন্তা দ্বারা জাত এক ক্ষণিক বস্তু। 

কর্মবাদ
কর্ম বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করে। তাই বলা হয় কর্মের শক্তি বিশ্বব্যাপী। বৌদ্ধধর্মের মূল ভিত্তিই হলো ‘কর্মবাদ’। মানুষ নিজ নিজ কর্ম অনুসারে কর্মফল ভোগ করে। ভালো কাজ করলে ভালো ফল এবং মন্দ কাজ করলে মন্দ ফল তাকে ভোগ করতে হবেই। শুধু মানুষ নয়, জীবমাত্রই কর্মের অধীন। কর্মের জন্য তার উৎপত্তি, কর্মের মাধ্যমে তার স্বীকৃতি, কর্মই তার বন্ধু, কর্মই তার আশ্রয়। কর্মের দ্বারা উন্নত জীবন যেমন লাভ হয় তেমনি কর্মের দ্বারা হীন জীবনও লাভ হয়।
কর্মবাদ অনুসারে প্রত্যেক মানুষকে তার নিজ নিজ কৃতকর্মের ফল ভোগ করতে হয়। যে যেমন কর্ম করবে সে তেমন কর্মফল ভোগ করবে। কর্ম যদি ধানের বীজ রোপন করে তবে সে ধান পাবে, গম পাবে না। আর যদি কেউ খারাপ ধানের বীজ বপন করে তবে খারাপ ধান পাবে, ভালো ধান পাবে না। পৃথিবীর সর্বত্রেই একই নিয়ম প্রযোজ্য। ‘আমি তোমাকে মুক্ত করবো’ এ কথা বুদ্ধ কোথাও বলেননি। বর্তমান মুর্হুতের কর্ম পরবর্তী মুর্হুতে ফল প্রদান করে। এটাই পৃথিবীতে প্রাকৃতিক নিয়ম। মানুষ নিজ নিজ ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে।

চিন্তাশীল মানুষের কাছে বৌদ্ধধর্মের আবেদন 
পরবর্তী কালে যারা বৌদ্ধ দর্শন নিয়ে গবেষণা করেছেন, তাঁরা বুদ্ধের দার্শনিক চিন্তার ভিত্তিতে বহু অধিবিদ্যা শাখা ও সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করেছেন। একই ভাবে, যদিও বুদ্ধ ঈশ্বরবাদের বিরোধী ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিতকাল পরেই বুদ্ধকেই ঈশ্বরের আসনে বসিয়ে তাঁর অনুগামীদের মধ্যে বুদ্ধ-পূজার প্রচলন হয়। পরে বহু দেবতার পূজা, প্রার্থনা, অনুষ্ঠান ও নানা রহস্যবিদ্যার অনুশীলন বৌদ্ধধর্মের অন্তর্ভূত হয়ে একে একটি জটিল ধর্মমতে পরিণত করে তোলে। পরবর্তী কালের এই বিবর্তন বাদ দিলে, আধুনিক চিন্তাশীল মানুষের কাছে শুদ্ধ বৌদ্ধ দর্শনের আবেদন অতি গভীর ও মনোগ্রাহী। তথাকথিত ঈশ্বর ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রতি যাঁদের একটি স্বাভাবিক অনীহা অথচ একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবন যাপনে আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়, তাঁদের কাছে বুদ্ধের আকর্ষণ অনস্বীকার্য। 

বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ
বৌদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থের নাম ত্রিপিটক। ত্রিপিটক পালি ভাষায় লেখা। পালি তি-পিটক থেকে বাংলায় ত্রিপিটক শব্দের প্রচলন। তিন পিটকের সমন্বিত সমাহারকে ত্রিপিটক বোঝানো হয়। পিটক শব্দের অর্থ ঝুড়ি যেখানে কোনো কিছু সংরক্ষণ করা হয়। খ্রীষ্টপূর্ব ৩য় শতকে সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে ত্রিপিটক পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হিসাবে স্বীকৃত হয়। এই গ্রন্থের গ্রন্থনের কাজ শুরু হয়েছিল বুদ্ধের পরিনির্বানের তিন মাস পর অর্থাৎ খ্রীষ্টপূর্ব ৫৪৩ অব্দে এবং সমাপ্তি ঘটে খ্রীষ্টপূর্ব প্রায় ২৩৬ অব্দে। প্রায় তিনশ বছরে তিনটি সঙ্ঘায়নের মধ্যে এর গ্রন্থায়নের কাজ শেষ হয়। ত্রিপিটকের তিনটি ভাগ--

(১) সূত্র পিটক- ধর্মীয় সূত্র ও তার ব্যাখ্যা।
(২) বিনয় পিটক- ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের পালনীয় নিয়ম-কানুন।
(৩) অভিধর্ম পিটক- বুদ্ধের উপদেশের অন্তর্নিহিত দর্শন ও মনস্তত্ত্ব।

ত্রিপিটক পাঠের প্রয়োজনীয়তা
বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনই ত্রিপিটকের মূল উপজীব্য বিষয়। কিন্তু প্রসঙ্গক্রমে এই গ্রন্থে বুদ্ধের সমকালীন সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম-দর্শন, রাজনীতি, ভূগোল, অর্থনীতি প্রভৃতি সম্পর্কেও আলোচনা রয়েছে। তাই ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস জানার জন্য ত্রিপিটকের গুরুত্ব অপরিসীম। ত্রিপিটকের প্রতিটি বাণী মানুষকে নৈতিক ও মানবিক গুণাবলি বিকাশে উদ্বুদ্ধ করে। অকুশল কর্ম থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করে। সকলপ্রকার পাপ বর্জন করে ধর্মময় জীবনযাপনে প্রেরণা যোগায়। মানুষকে দুঃখহীন নৈর্বাণিক পথে পরিচালিত করে। ত্রিপিটক পাঠে কুশল-অকুশল কর্ম, চিত্তের প্রকৃত স্বরূপ, মানুষের বৈশিষ্ট্য, মনোজগতের নানা অবস্থা, দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখমুক্তির উপায়, অনিত্য, অনাত্মা, নির্বাণ, নির্বাণলাভের উপায়, জগতের প্রকৃত স্বরূপ, শীল, সমাধি, প্রজ্ঞা প্রভৃতি সম্পর্কে জানা যায়। তা ছাড়া বুদ্ধ জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ত্রিপিটকে বর্ণিত আছে। ত্রিপিটকের অমৃতবাণী রাগ-দ্বেষ-মোহ দূর করে মানুষের পারস্পরিক সুসম্পর্ক, সৌহার্দ্য ও ঐক্য বিকাশে সাহায্য করে। ভারতবর্ষে জাতিভেদ ও বর্ণপ্রথার নামে যে নিষ্ঠুরতা প্রচলিত ছিল তা দূর করতে বুদ্ধের বাণী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তাঁর প্রতিটি বাণী ছোট-বড় সকল প্রাণীকে রক্ষার প্রেরণা যোগায়। সেই আদর্শকে বিকশিত করার উদ্দেশ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ভিক্ষু ও ভিক্ষুণী সঙ্ঘ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সঙ্ঘে জাতি, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকলের প্রবেশাধিকার ছিল। এভাবে তিনি সমাজে এবং তাঁর অনুসারীদের মধ্যে সাম্যনীতির আদর্শ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। বুদ্ধ-নির্দেশিত বিধি-বিধান অনুসরণে মানুষ বিনয়ী, শীলবান এবং চরিত্রবান হয়। ফলে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবন সুখের হয়। অতএব, ত্রিপিটক পাঠের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

বুদ্ধ প্রচারিত দার্শনিক চিন্তার অনন্য বৈশিষ্ট্য
বুদ্ধের ব্যক্তিত্বে ও তাঁর ধর্মপ্রচারের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য আছে যা তাঁকে পৃথিবীর সর্বত্র, সর্বকালের মহান আচার্যদের মধ্যে এক অনন্য স্বাতন্ত্র্য দান করেছে। 

(১) সাম্প্রদায়িকতা নেই— বুদ্ধ নিজের ধর্মবিশ্বাসে অটল ছিলেন, কিন্তু তিনি কখনও তাঁর মত কারো উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেননি। তিনি সাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে একটি কথাও বলেননি, বরঞ্চ সর্বদা যুক্তিনিষ্ঠ প্রশ্ন ও অনুসন্ধিৎসার সমর্থন করেছেন। তিনি যে কোনও প্রশ্ন সাদরে গ্রহণ করেছেন এবং তারপরে নম্রভাবে অথচ অকাট্য যুক্তিসহায়ে প্রশ্নকর্তাকে স্বমতে নিয়ে এসেছেন। 

(২) মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতি ও নৈতিক জীবনযাপনের মাধ্যমে মুক্তিলাভ— জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছানোর উপায় স্বরূপ তিনি নিজে যা গ্রহণ ও প্রচার করেছেন, তাতে ধর্ম অপেক্ষা একটি মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতি এবং নৈতিক জীবনযাপনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। যদিও চরম লক্ষ্য বা ‘নির্বাণ’ লাভ অবস্থাটি তিনি বিশদে ব্যাখ্যা করেননি।
(৩) কার্যকারণ শৃঙ্খল ও পুনর্জন্মবাদ— অন্ধবিশ্বাসে মেনে নেওয়ার মতো কোনও মত বুদ্ধ প্রচার করেননি। কেবল দুটি বিষয় এর ব্যতিক্রম। (ক) প্রকৃতি কার্যকারণ রূপ দৃঢ় আভ্যন্তরীণ নিয়মে আবদ্ধ এবং (খ) এই নিয়মাবলী নৈতিক ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যা প্রত্যেক জীবকে তার কর্মফলের দায়স্বরূপ পুনঃ পুনঃ জন্মমৃত্যু চক্রে আবর্তন করায়।

(৪) আত্মা ও ঈশ্বর বাদ দিয়ে নৈতিক ধর্ম— বুদ্ধ এমন একটি ধর্ম প্রচার করেছেন যা উচ্চতম নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ধর্ম, যে ধর্মে আত্মা ও ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই, অথচ তা নৈতিক দায়িত্ব পালন ও মুক্তিলাভের আদর্শের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এখানেই জগতের অন্যান্য ধর্মগুরুদের সাপেক্ষে বুদ্ধের অনন্যতা। 

(৫) সর্বজনীন বাণী ও তার প্রচার— ধর্মীয় সঙ্ঘ গঠন ও সঙ্ঘের তরফ থেকে ধর্মীয় বার্তা প্রচারের উদ্দেশ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দূত পাঠানোর ক্ষেত্রে বুদ্ধ প্রথম পথপ্রদর্শক। বিশেষ কোনও জাতি বা জনগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর বাণী প্রচার করেননি, তাঁর বার্তা ছিল সর্বজনীন। সমগ্র বিশ্বের দরবারে তা প্রচার করার জন্য তিনি তাঁর শিষ্যদের পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পর্যটনের আদেশ দিয়েছিলেন। 

(৬) জাতিভেদ প্রথা অস্বীকার— ভারতীয় সমাজের তৎকালীন জাতিভেদ প্রথা তিনি অগ্রাহ্য করেছিলেন। উচ্চকূলে জন্মগ্রহণের সুবাদে কেউ শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হতে পারে—একথা তিনি স্বীকার করেননি। তাঁর প্রচারিত ধর্মমত ছিল সকলের জন্য এবং তিনি তাঁর সন্ন্যাসী-সঙ্ঘে সমাজের সকল জাতের মানুষকে অবাধ স্থান দিয়েছিলেন। 

(৭) নারী-পুরুষের সমানাধিকার— জগতের ধর্মগুরুদের মধ্যে বুদ্ধই প্রথম, যিনি নারী-পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলেছিলেন এবং তিনি নারীদের সন্ন্যাসাধিকার দিয়ে সঙ্ঘে স্থান দিয়েছিলেন। 

(৮) সমদর্শিতা— বুদ্ধ সকলের সঙ্গে সম মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করতেন। সমালোচনা ও অপমানেও অবিচলিত থাকা এবং উচ্চনীচ নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের মানুষের সেবা করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা— শিষ্যদের প্রতি এই ছিল তাঁর নির্দেশ। 

বৌদ্ধধর্মের প্রসার
দরিদ্র ও পতিত মানুষের কাছে বুদ্ধ ছিলেন ভগবান। তিনি সমাজের সকলের জন্য তাঁর ধর্ম প্রচার করেছিলেন, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের প্রতি তাঁর ছিল সমদৃষ্টি এবং তাঁর প্রদর্শিত ‘অষ্টাঙ্গিক মার্গ’ অনুশীলনের মাধ্যমে দুঃখের অবসান ঘটিয়ে সকলকে নির্বাণ লাভের জন্য চেষ্টা করতে তিনি উৎসাহিত করতেন। তিনি নতুন কোনও ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, তা নয়, বরং প্রচলিত ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সংস্কার করে সমাজকে কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। সততা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে তিনি প্রকৃত মানবতার যে ধর্ম প্রচার করেছিলেন, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের তাতে প্রাণের সাড়া দিয়েছিল। শিক্ষিত মানুষ তথা সাধারণ মানুষ জাতিধর্ম নির্বিশেষে বুদ্ধের ধর্মে পেল প্রকৃত সুখের অন্বেষণে এক সঠিক জীবনদর্শন। 

বুদ্ধের দেহাবসানের অব্যবহিত কাল পরে রাজগৃহে প্রথম বৌদ্ধ সভা আয়োজিত হয়, যেখানে বিভিন্ন সঙ্ঘের প্রায় ৫০০ বৌদ্ধভিক্ষু অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই সভায় বুদ্ধের উপদেশগুলি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানুষের পথ নির্দেশিকা স্বরূপ গৃহীত হয়। উপদেশগুলিকে মূলত দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়—বিনয় পিটক ও ধম্ম পিটক। সভার পৌরোহিত্য করেন মহাকাশ্যপ এবং বুদ্ধের প্রধান দুইজন শিষ্য আনন্দ ও উপালি সভার অন্যান্য কার্য পরিচালনা করেন এবং সঙ্ঘের নেতৃত্ব দেন।

দ্বিতীয় ধর্মসভা আয়োজিত হয় এর ১০০ বছর পরে মগধের রাজার তত্ত্বাবধানে বৈশালী নগরীতে। সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে পাটলিপুত্রে তৃতীয় বৌদ্ধধর্মসভা হয়। মোজ্ঞলিপুত্ত তিসসা এর সভাপতিত্ব করেন। বাসুমিত্র ও অশ্বঘোষের নেতৃত্বে সম্রাট কনিষ্কের শাসনকালে কাশ্মীরে চতুর্থ বৌদ্ধধর্মসভা হয়। এরপরে আর বৌদ্ধধর্মসভা হয়নি। 

বুদ্ধ সম্বন্ধে যুগাচার্য স্বামী বিবেকানন্দের মত
পূজানুষ্ঠানে পশুবলি নিবারণ করে, বংশগত জাতিভেদ ও পুরোহিতকুলের আধিপত্য লুপ্ত করে এবং আত্মার নিত্যত্বে অবিশ্বাস করে বৌদ্ধধর্মের লক্ষ্য ছিল বৈদিক ধর্মের সংস্কার করা। বৌদ্ধধর্ম কখনও হিন্দুধর্মকে ধ্বংস করতে চায়নি, প্রচলিত সমাজব্যবস্থাও বিপর্যস্ত করতে চায়নি। বৌদ্ধগণ একদল ত্যাগী সাধুকে একটি সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ে সুগঠিত করেছিল, কতগুলি ব্রহ্মবাদিনী নারীকে সন্ন্যাসিনীরূপে গড়ে তুলেছিল, আর যজ্ঞবেদীর স্থানে সিদ্ধ মহাপুরুষদের প্রতিমূর্তি স্থাপন করেছিল। এইভাবেই প্রাণশক্তিসম্পন্ন একটি পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়েছিল। (৫/৩০৩)
বুদ্ধের শেষ অক্ষয় বাণী ছিল এই—“কোন শাস্ত্রগ্রন্থের প্রামাণ্য, তা সে যত প্রাচীন গ্রন্থই হোক, মেনে নিও না। শুধু পূর্বপুরুষগণের উক্তি বলে কোন কথায় বিশ্বাস কোরো না, অথবা আর দশজন লোক বিশ্বাস করে বলেও কোন মতবাদ গ্রহণ কোরো না। প্রতিটি জিনিস পরীক্ষা কর, যাচাই কর, তারপর বিশ্বাস কর। আর যদি কোন কিছু বহুজনের হিতকর হবে বলে মনে কর, তবে সকলের মধ্যে সেটি বিতরণ কর।” 

এই মহতী প্রজ্ঞাবাণী অনুধাবনযোগ্য। তিনি দেবতা নন, দানব নন, দেবদূতও নন। তিনি শুধু একজন দৃঢ়চিত্ত প্রাজ্ঞ ব্যক্তি—যাঁর মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষই নিখুঁত, পরিপুষ্ট এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সতেজ ও ক্রিয়াশীল। মোহ নেই, ভ্রান্তি নেই—এই বুদ্ধের স্বরূপ। ...পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞাবান দার্শনিক তিনি। প্রবল ব্রাহ্মণ্যশক্তির অত্যাচারের কাছে কখনো তিনি মাথা নত করেননি। ...দুঃখীর দুঃখে তিনি দুঃখী, তাদের সাহায্যে তিনি মুক্তহস্ত। আবার সঙ্গীত-সভায় তিনি মহাসঙ্গীতজ্ঞ। শক্তিমানের মধ্যে তিনি মহাশক্তিমান। কিন্তু সর্বত্রই সেই এক প্রাজ্ঞ মনীষী, সেই সমর্থ শক্তিমান পুরুষ। ...তাঁর মতবাদের সবকিছু আমার বোধগম্য নয়। আমরা হিন্দুরা একথা বিশ্বাস করি যে, মানুষের মধ্যে শাশ্বত একটি পদার্থ আছে—যেটি অপরিবর্তনীয়, যেটি অনন্তকালস্থায়ী। সেই পদার্থই আত্মা, তার আদি নেই, অন্ত নেই—সে-ই ব্রহ্ম। কিন্তু বুদ্ধদেব এই আত্মা, ব্রহ্ম—দুই-ই অস্বীকার করেছেন। তিনি বলতেন, কোন বস্তুর চিরস্থায়ীত্বের কোন প্রমাণ নেই। ...সবই নিত্যপরিবর্তনের সমষ্টিমাত্র। নিত্যপরিবর্তনশীল যে চিন্তাস্রোত—তারই সমষ্টিকে ‘মন’ বলে। একটি ঘূর্ণায়মান মশাল যেন এক শোভাযাত্রা পরিচালনা করছে, কিন্তু ঐ ‘অলাতচক্র’টি মায়া। অথবা একটি নদীর উপমা গ্রহণ করা যেতে পারে—একটি নদী যেমন অবিরাম প্রবাহে গতিশীল, প্রতি মুহূর্তে তার মধ্যে নূতন জলরাশি আসছে এবং চলে যাচ্ছে—জীবনও ঠিক তেমনি; দেহ, মনও তেমনি। ...বুদ্ধদেব বলতেন, জগতে স্বার্থপরতাই প্রচণ্ড অভিশাপ। ...ঈশ্বর নয়, আত্মা নয়, আত্মশক্তিতে বিশ্বাস নিয়ে নিজের পায়ের উপর দাঁড়াও। সৎ কাজের জন্যই সৎ কাজের অনুষ্ঠান কর—শাস্তির ভয়ে নয়, কোন আকাঙ্ক্ষিত লোকে যাবার উদ্দেশ্য নিয়েও নয়। সুবুদ্ধি নিয়ে দাঁড়াও, মতলব ছেড়ে দিয়ে দাঁড়াও। সৎকাজ সৎ বলেই আমি তার অনুষ্ঠান করব, অন্য কোন কারণে নয়—এই হবে উদ্দেশ্য। কি অদ্ভুত, কি বিচিত্র এই মতবাদ! আমি তাঁর দার্শনিক তত্ত্বগুলির সঙ্গে একমত নই, একথা আগেই বলেছি, কিন্তু তাঁর নৈতিক প্রভাব আমাকে যেন উৎসাহিত করে তোলে। আপনারা প্রত্যেকে নিজ নিজ অন্তরে প্রবিষ্ট হয়ে প্রশ্ন করুন, দেখুন তাঁর মতো নির্ভীকতা নিয়ে, শক্তি নিয়ে—এক ঘন্টাও নিজের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে দাঁড়াতে পারেন কি না। আমি তো পাঁচ মিনিটেই যেন ভয় পেয়ে যাই, একটি অবলম্বন যেন আমার কাছে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। তখন আমি বুঝতে পারি—আমি কত ভীরু, কত দুর্বল! আর সঙ্গে সঙ্গে এই বিরাট মহামানবের কথা চিন্তা করে আমি উদ্দীপ্ত হয়ে উঠি। তাঁর যে প্রচণ্ড মহাশক্তি, তাঁর কাছাকাছি যাওয়াও আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তেমন শক্তি-প্রকাশ জগৎ ইতঃপূর্বে আর কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। 

উপসংহার 
সুত্ত পিটকের অন্তর্গত ‘ধর্মপদ’ নামক গ্রন্থে দেখা যায় :
‘অত্তাহি অত্তনো নাথো অত্তা হি অওনো গতি/ন সন্তি পুত্তা তানায় ন পিতা নাপি বান্ধবা/কোহি নাথো পরেসিযা’/অওনাহি সুদন্তেন নাথং লভতি দুল্লভং’— অর্থাৎ নিজেই নিজের ত্রাণকর্তা বা প্রভু, নিজেই নিজের আশ্রয়, অন্য কোনো ত্রাণ কর্তা বা প্রভু নেই। পুত্র, পিতা বা বন্ধুবান্ধব কেউই মৃত্যুর কবল থেকে ত্রাণ করতে পারে না। নিজেকে সুসংযত করতে পারলেই যে কোনো দুর্লভ বিষয় লাভ সম্ভব।

বুদ্ধদেব নিজের জীবনে এটি পরীক্ষা করেছেন। তাই মৃত্যুর আগে ক্রন্দনরত প্রিয় শিষ্যদের উদ্দেশ্যে রেখে গেছেন মহান আশার বাণী—“আমি সর্বজয়ী, সর্ববিদ, সমস্ত বিষয়ে নির্লিপ্ত, সর্বত্যাগী ও তৃষ্ণা নাশ করে দুঃখের পারে গেছি। অশেষ তপস্যায় জীবন গঠন করেছি, নিজের চেষ্টায় ‘মহাবোধি’ লাভ করেছি। আমার মৃত্যুতে শোক কোরো না। মনুষ্যজীবনে মৃত্যু অনিবার্য। আমি তোমাদেরই একজন ছাড়া আর কিছু নই। তোমরা প্রত্যেকে সর্বাংশে আমারই মতো। সুতরাং তোমরাও অধ্যবসায় সহকারে অক্লান্ত চেষ্টা দ্বারা বুদ্ধত্ব লাভের জন্য যত্নশীল হও।”

ক্যালিফোর্নিয়ার প্যাসাডোনায় শেক্সপীয়ার ক্লাবে স্বামী বিবেকানন্দ ‘বৌদ্ধভারত’-এর উপর একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তাতে তিনি বলেন—“একদা বুদ্ধকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘মৃত্যুর পর মানুষের কী অবশিষ্ট থাকে?’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘সবই থাকে, সবই থাকে’। কিন্তু মানুষের মধ্যে অক্ষয় পদার্থ কোনটি, সেটি তার চরিত্র—তার দেহ নয়, আত্মা নয়, অন্য কিছুই নয়। আর সেই চরিত্রই কালজয়ী হয়ে জীবিত থাকে। যাঁরা চলে গেছেন, তাঁরা তাঁদের চরিত্ররূপ মহাসম্পদই শুধু রেখে গেছেন, রেখে গেছেন আমাদের জন্য, সমগ্র মানবজাতির জন্য। আর কালে কালে সেই চরিত্র-প্রভাব কাজ করে চলেছে।” 

বোধিদ্রুমতলে তব সেদিনের মহাজাগরণ
আবার সার্থক হোক মোহ আবরণ।
বিস্মৃতির রাত্রি শেষে এ’ ভারতে তোমার স্মরণ
নবপ্রাতে উঠুক কুসুমি।”

সহায়ক গ্রন্থ: 
Life and Teachings of Lord Buddha (source: Internet)
Life of Gautama Buddha and his Teachings by Priyadarshini (source: Internet)
Philosophy Of The Buddha by Christopher W. Gowans
The Buddhist Way To Peace Of Mind by Venerable Pramote Pamojjo
গৌতম বুদ্ধ এবং তার জীবনী; ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়, বৌদ্ধ গবেষক।
জগতের ধর্মগুরু; রামকৃষ্ণ মিশন লোকশিক্ষা পরিষদ; রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম, নরেন্দ্রপুর।
ভগবান বুদ্ধ ও তাঁর বাণী; স্বামী বিবেকানন্দ; উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা। 
শিব ও বুদ্ধ; ভগিনী নিবেদিতা; উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা। 

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

অডিও / ভিডিও

Search This Blog

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Powered by Blogger.