Monday, April 06, 2020

মৌমিতা ঘোষ

sobdermichil | April 06, 2020 |
করোনা নতুন করে যা যা ভাবালো।।    মৌমিতা ঘোষ

যখন চীনের করোনায় মৃত্যু সংবাদ আসছে, তখন সত্যি বলতে কি ক্যাজুয়াল ছিলাম আমি।ভাবিনি সারা পৃথিবী আক্রান্ত হতে পারে। ভাবিনি এত এত মানুষ মারা যাবে আর মৃত্যুর প্রহর গুনবে বাকি সবাই।এই প্যানডেমিক শব্দটার সঙ্গেই পরিচিত ছিলাম না আমি। এই প্রথম শিখলাম, সারা পৃথিবীর জন্য একটা কমন থ্রেট হতে পারে। আমরা যে বলি খুব তৃপ্ত হয়ে ওয়ার্ল্ড ইজ আ ভিলেজ সেটা কতবড় বাঁশ হতে পারে, শিখলাম। অত্যাধুনিক যানবাহন ব্যবস্থা। প্রতি ঘন্টায় লাখ লাখ লোক এক দেশ থেকে আরেক দেশে চলে যাচ্ছে। আর তার সঙ্গে নিত্য নতুন জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছে এই মারণ ভাইরাস। এই প্রথম বুঝলাম প্রযুক্তি কত বড়ো সর্বনাশা। হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি বলতে লাগলো গরমে মরে যায় করোনা ভাইরাস।আমি আরো রিল্যাকসড্। কলম্বো যেতে পারছিনা বলে গোয়ার টিকিট কাটলাম। ততদিনে দেদার গরম পড়ে যাবে। WHO কিন্তু বলেনি। তবু আমরা ভাবলাম। যখন ক্যানসেলেশনে মাত্র দশ শতাংশ ফেরত পেলাম , বুঝলাম আমার শিক্ষার ও অপূর্ণতা রয়েছে। আমি ও বোকা ট্রেন্ড ফলো করে বোকামি করি।

মার্চ মাস । অফিসের কাজের চাপ সবার। আমাদের কয়েক জনকে ওয়ার্ক ফ্রম হোম এর অনুমতি দেওয়া হল। এ এক উভয় সংকট। পিয়ার ফিলিং দেখাতে গিয়ে সেটা নিতে পারছিনা। এদিকে মন বলছে নেওয়া উচিৎ। এমন সময়ে একটি ছোট্ট রাজনীতি চলল, সারা সন্ধে। পরের দিন আমি উপস্থিত অফিসে। শেখার যেটা সেটা হল, মানুষ অসূয়া আর ফালতু ইগো ছাড়তে পারেনি কখনো।

এরপর হল লকডাউন। আর রোজ মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে দেখলাম আমরা। এইসময় সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ঘটনার সাক্ষী থাকলাম আমরা। এই প্রথম মানুষ নিজের পরিবার, আত্মীয় স্বজনদের বাইরে ভাবছে দেশের লোক ভালো থাকুক, পৃথিবীর মানুষের আরোগ্য লাভ হোক। 

আগে কখনো বুঝিনি কেমন দেখতে হয় মৃত্যু। এখন জানলাম কেমন করে গাঢ় নীল হয়ে আসে চেতনার রঙ।এখন জানলাম, অদৃশ্য ঘাতক ঘিরে ফেললে ঠিক কতটা দ্রুত দম আটকে আসে। জানলাম, মরেই যেতে পারি বলা আর মৃত্যুমিছিল দেখার ভয় এক নয়। কতগুলো নিঃশ্বাস বাকি আছে জানা নেই বলে প্রিয় মানুষদের ছবি সাজাতে শুরু করলাম। সাজালাম মুহূর্তদের। প্রাণপণে ভুলতে চাইলাম সমস্ত ঘৃণা, রাগ, অস্বস্তিদের। যে ধ্বংস হয়ে যাক চেয়েছিলাম তাকেও চোখ বুজে ক্ষমা করে দিলাম।

ক্ষমা চেয়ে নিলাম সকল জানা-অজানা ভুলের, নিঃশর্তে।

নতুন করে শিখলাম বেঁচে থাকার জন্য উপচে পড়া সমৃদ্ধি চাই না।ছোট ছোট গরাসে মুখে তুলে নেওয়া যায় সুখ। বাড়তির যাবতীয় বাড়াবাড়ি আমাদের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে যথেষ্ট।

নতুন করে শিখলাম দূরত্বের মানে, শিখলাম দূরত্ব কী ভয়ঙ্কর! শিখলাম খোলা আকাশ বুজে গেলে যে কোন পোক্ত ছাদ কী ভীষণ দুর্বিষহ হতে পারে।

শিখলাম আরেকবার প্রার্থনা। প্রকৃতির কাছে হাঁটু মুড়ে বসে জীবনের প্রার্থনা, ভুলটুকু শুধরে নেওয়ার প্রার্থনা।

এ তো গেল আমার একান্ত ব্যক্তিগত উপলব্ধি।আরো বড় বড় শিক্ষা পেলাম এই করোনা সংকটে। লাইট নোট শোনালেও সত্যি। মানুষ খাওয়ার চিন্তা ভুলতে পারে না এক মিনিট ও। মানে বেসিক নিডের কথা বলছি না। মানুষ মরে যায় যাক তবু রসনা তৃপ্তির কথা ভুলতে পারে না। তাই এত বারণ সত্তেও বাজারে ছুটছে। গিন্নিরা সব চমৎকার ঘরোয়া রেসিপি আবিষ্কার করছেন, বানাচ্ছেন। এর থেকে একটা জিনিস আবারো প্রমাণিত হয়, মানুষের শুধু পেট ভরলে চলে না, মন‌ ভরতে হয়। তার নতুন কিছু সব অবস্থাতেই করতে লাগে। তার বীক্ষণ সর্বদা কাজ করে।

সাদামাটায় সে খুশি হয়না, বিশেষ ভাবে দেখতে চায়।‌

এছাড়া ও যা শিখলাম, এদেশ থেকে যারা বিদেশে পড়তে যায়, চাকরিতে যায়, অথবা এদেশেই উচ্চবিত্ত, তারা শিক্ষা কাকে বলে জানেনা। তাদের রোগ গোপন করার বা ক্যাজুয়ালি নেওয়ার অর্বাচীন আচরণ আরেকবার শিক্ষা শব্দটিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।

আরো বড় করে শিখলাম যে কোন অবস্থায় ধর্ম ই নিয়ন্ত্রণ করে এদেশের রাজনীতি।‌ অতি প্রতিক্রিয়াশীল সরকার ও প্রয়োজনে ধর্মের ব্যাপারে চুপ করে থাকেন, পরে সেটা নিয়ে রাজনীতি করেন। আমরা দেখেছি এ দেশের গরীব জনগণ সত্যি ই কতটা গরীব। কেউ কতটা অসহায় হলে হাজার কিলোমিটার পথ হাঁটার কথা ভাবতে পারে? আর কতটা তাদের জীবন অপ্রয়োজনীয় হলে পোকামাকড়ের মতো তাদের গায়ে রাসায়নিক স্প্রে করা হয়। সবচেয়ে বড় কথা, এই অবস্থায় অর্থনীতির যে ভয়ঙ্কর ভাঙন শুরু হয়েছে, তাতে সবাই অর্থনৈতিক শ্রেণিতে দু ধাপ তিন ধাপ কি তারো বেশি নামবে। তখন আমাদের অস্তিত্ব টাও ওরকম ই পোকামাকড়ের মতো হয়ে যাবে বলাই বাহুল্য। স্কুলে মিড ডে মিলের চাল-আলু বলুন, কী সরকার থেকে রেশন বন্টন বলুন, লোকে ভিড় করে পড়ছে। যত ই বোঝানো হোক, খাবার টুকু জোগাড় করে রাখতে চায় মানুষ। এদেশে উচ্চ শিক্ষিতের শিক্ষা অপূর্ণ তো গরীব, নিরক্ষর এর থেকে কী আশা করব?

আমরা একটা সরু সুতোর উপরে দাঁড়িয়ে আছি। আছি থেকে নেই হতে কতক্ষন, কতদিন বাকি কেউ জানে না। এই শ্রেণিহীন মৃত্যুভয় আমাদের কে এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ঘরের বোবা সম্পর্কগুলো মুখর হয়ে উঠছে। শত কষ্টে ও গিন্নির দিকে না তাকানো কর্তার হাতে আজ ন্যাতা-বালতি। আজ বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা অবহেলা র বাইরে গুরুত্ব পাচ্ছেন। তারা একাই নন, যাদের ডাক যে কোন সময় আসতে পারে।পরিচারিকাকে সবেতন ছুটি দিচ্ছে মানুষ। বন্ধুরা তর্ক করছেনা । ফেসবুকে মানুষ বেশি করে কনস্ট্রাকটিভ জিনিস করছে এও কি কম কথা?

সবশেষে বলি, করোনা এক ধাক্কায় শিখিয়েছে অপচয় না করতে। শিখিয়েছে পয়সা, প্রতিপত্তি,কিছুই বাঁচাতে পারেনা এমন অসহায় দিন ও আসতে পারে। শিখিয়েছে সহমর্মিতা। শিখিয়েছে অন্যে ভালো না থাকলে আমার ভালো থাকাটা থাকা হয়না। এত বছরের সব ধর্মগ্রন্থ যা পারেনি, এক ধাক্কায় মানুষ তা শিখে গেছে। নিজ স্বার্থেই না হয় শিখলো স্বার্থপরতার বাইরের পাঠ, তাও কি কম কথা?

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

অডিও / ভিডিও

Search This Blog

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Powered by Blogger.