শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২০

চিন্ময় ঘোষ

sobdermichil | ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২০ |
ভাষা দিবস ও আত্মবিস্মৃত বাঙালি
ভাষা দিবস ও আত্মবিস্মৃত বাঙালি  

" আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১শে ফেব্রুয়ারি...." এক বিশেষ দিনের মধ্যরাতের এই সুর বাঙালির রক্তে একটা শিহরণ তোলে, রোমকূপ খাড়া হয়ে ওঠে, এবং তার রেশটুকু শুধুমাত্র কিছু আনুষ্ঠানিকতার ছোঁয়াতে জড়িয়ে গিয়েই শেষ হয়। তারপর আবার তা পরের বছরের জন্য তুলে রাখা। আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস উদযাপনের আয়োজন আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। সারা বিশ্বে ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটি বর্তমানে ১৮৮টি দেশে "আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস" হিসাবে পালিত হয়। তার পিছনে যে রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, শুধুমাত্র মাতৃভাষার মর্যাদাটুকু রক্ষার লড়াইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একঝাঁক তাজা তরুণ ছাত্র পুলিশের গুলিতে মৃত্যুবরণ করেছিল, এইটুকুই আমরা স্মরণ করি। সেই ইতিহাস প্রায় সবার জানা। 

১৯৪৭সালে স্বাধীনতা লাভের সন্ধিকালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষকে ভাগ করে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হল। পাকিস্তান আবার পূর্বপাকিস্তান ও পশ্চিমপাকিস্তান নামে দু'টুকরোয় ভাগ হয়ে বিরাট ভৌগোলিক দূরত্বের ব্যবধানে দুটি আলাদা ভূখণ্ডের একটি দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলো। এই দুই অংশের মধ্যে একমাত্র ধর্মীয় ব্যাপার ছাড়া, ভাষা-সংস্কৃতি-খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি আর কোনো বিষয়েই মিল ছিল না। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী জোর করে উর্দুকে সরকারি ভাষা হিসাবে সমগ্র দেশের উপর চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করে। পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যা গরিষ্ঠ বাংলাভাষী মানুষ তা মেনে নিতে রাজি হয়নি। প্রতিবাদ শুরু হয়। শাসন ব্যবস্থায় যে সমস্ত বাঙালিরা ছিলেন তাঁরাও প্রতিবাদ করেন। বাংলাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দিতে হবে এই লড়াই ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে।

এই ভাষা-আন্দোলনের মূল কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার হোস্টেল এলাকা। আন্দোলন দমনে ঐ এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ছাত্রসমাজ সেই বিধিকে লঙ্ঘন করে এবং পাকিস্তান পুলিশের নির্বিচার গুলির মুখে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি - সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেক তাজা তরুণ ও বহু মানুষ হতাহত হয়েছিল। 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইউনেসকোর তৎকালীন মহাসচিব কোফি আন্নানের কাছে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার নিবাসী দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষণার আবেদন জানান এবং ১৯৯৯সালের ১৭ই নভেম্বর প্যারিসে ইউনেসকোর ১৫৭তম অধিবেশনের ৩০তম সম্মেলনে ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে " আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস " হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের তেইশটা দেশ তাতে সমর্থন দেয়। শুধুমাত্র মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার জন্য এরকম রক্তক্ষয়ী আত্মবলিদানের সংগ্রাম সারা বিশ্বে আর কোথাও হয়নি।

অথচ দুই বাংলার মানুষ কি আজ তাদের মাতৃভাষাকে 'মা' হিসাবে ভালোবেসে তার সম্মান রক্ষার্থে সন্তানের যথাযোগ্য ভূমিকা পালন করছে ? বরং নিজেদের প্রাণের ভাষা আদরের ভাষাকে ক্রমাগতই অবহেলার স্তরে নামিয়ে এনেছে এবং তাতেই তারা বেশ আত্মশ্লাঘা অনুভব করে। "আমার ছেলেটার বাংলাটা ঠিক আসেনা " - এই ধরনের উচ্চারণে আজ বাঙালিরা লজ্জ্বা বোধ করেনা। ছেলেমেয়েদের বাংলা মাধ্যমের বদলে ইংরেজি মাধ্যম ইস্কুলে ভর্তি করানোয় তারা বেশী উৎসাহী। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিত করে তুলতে ও ইংরেজি আদবকায়দা রপ্ত করাতে তারা যতটা সচেষ্ট, নিজের মাতৃভাষার প্রতি তাদের অবহেলা ততটাই পরিলক্ষিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনও এর জন্য বহুলাংশে দায়ী একথা হয়তো অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু মাতৃভাষার গৌরবকে এভাবেই বাঙালি ক্রমশ মলিন থেকে মলিনতর করে চলেছে। ইংরেজি বা অন্যান্য বিদেশি ভাষা শেখার গুরুত্ব আজকের দিনে অবশ্যই অনস্বীকার্য। অন্তত ভালো চাকরির প্রয়োজনে। তার মানে মাতৃভাষাকে অবহেলা বা অবজ্ঞা করতে হবে এমনটা অবশ্যই কাম্য হতে পারেনা। এই বিষয়ে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ উভয় অংশের বাঙালিদেরই সমানভাবে দায়ী করা যায়।

আজকের দিনে ভোট সর্বস্ব রাজনীতির সৌজন্যে চালু হয়েছে তীব্র ভাষা সন্ত্রাস, রাজনীতিহীন বিষয় নিয়ে প্রায় সমগ্র দেশের সঙ্গে আমাদের এই বাংলাতেও তার প্রকাশ প্রকট।সৌজন্যের সীমারেখা লঙ্ঘন করে শুরু হয়েছে ব্যক্তিগত কুৎসা ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় ব্যক্তি আক্রমণ। ভাষার কৌলিন্যের অবক্ষয় এবং যথেচ্ছ অপপ্রয়োগ, বিশেষ করে, বাংলা ভাষায় নানা কুরুচিপূর্ণ শব্দের ব্যবহার আমাদের এই সুন্দর রত্নগর্ভ মধুরতম ভাষার গায়ে কালিমা লেপন করছে। বতর্মান সময়ের রাজনীতি-জগতের বেশকিছু ব্যক্তি সমস্তরকম শিষ্টাচারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাদের অসংযত আস্ফালনকে নিম্নতর রুচির আবহে টেনে এনে ভাষা সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে এবং এই সমস্ত অশিক্ষিত রুচিহীন অসংযমী মানুষেরাই বর্তমানে রাজনীতির মঞ্চ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের আচরণ ও বক্তব্যে বোঝা যায় ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান বা পুরাণের পরম্পরাগত কোন শিক্ষাই এদের নেই। 

সোশ্যাল মিডিয়ার জগতেও এর অন্যথা নেই। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়ের উপর মন্তব্যে নানান অশ্লীল এবং রুচিহীন শব্দের যথেচ্ছ প্রয়োগের সাবলীল বিচরণ এখানেও। কারণ সেই এক, অশিক্ষা আর বিকৃত রুচি। সুতরাং ভাষার সম্মান রক্ষার কোন দায়ই এদের নেই। সোশ্যাল মিডিয়াতে ইদানিং সাহিত্য চর্চার যে হিড়িক পড়েছে সেখানেও গল্প, কবিতা এবং মন্তব্যে বাংলা বানানের বিকৃতি চোখ এবং মনকে পীড়া দেয়। এতে বাংলা ভাষার প্রতি অযত্ন ও অবজ্ঞা পরিলক্ষিত হয়। ভয় হয়, পরবর্তী প্রজন্ম এই ভুলগুলিকেই সঠিক ভাবতে অভ্যস্থ না হয়ে পড়ে। 

এদেশে বাঙালি হিসাবে বাংলা ভাষার সরকারি স্তরে ব্যবহারের জন্য লড়াই যে হয়নি এমন নয়। যেমন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের অনুবাদ ছ'টি ভাষায় হবার প্রাথমিক যে রায় ছিল তার বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের প্রতিবাদী স্বর দিল্লী পযর্ন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো উদ্যোগ ছাড়াই কিছু ব্যক্তি-মানুষের বিশেষ উদ্যোগের ফলশ্রুতিতে অবশেষে বাংলা ভাষাতেও সুপ্রিম কোর্টে রায়ের অনুবাদের কথা ঘোষিত হয়েছিল। এটা অবশ্যই বাংলা ভাষার সম্মানকে ঊর্ধে তুলে ধরার লড়াইয়ের জয়। 

বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা, তা শিক্ষার ক্ষেত্রেই হোক বা সরকারি সমস্তরকম কাজের ক্ষেত্রেই হোক, এই ব্যবস্থা যেন আমরা স্বাভাবিক অবস্থা হিসাবে মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। শুধু বাংলা জেনে পশ্চিম বাঙলায় চাকরি পাওয়া প্রায় অসম্ভব অথচ বাংলা একেবারে না জেনেও পশ্চিম বাঙলায় বসে জীবিকা অর্জন ভীষণ সহজ এবং বাধাহীন। এই কথা বলা মানে অবাঙালিদের প্রতি বিরুদ্ধ মনোভাব পোষণ করা, এমনটা নয়। বরং মাতৃভাষার মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করার অধিকার হিসাবে সরকারি বেসরকারি সমস্ত স্তরে বাংলা ভাষার ব্যপক ব্যবহারের দাবী আমরা করতেই পারি। 

২১শে ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বের ১৮৮টি দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে আজ স্বীকৃত। ১৯৫২ র এই দিনে সেদিনের তরতাজা সেই বরকত, সালাম, রফিক, জব্বারসহ আরও যে সব তাজা তরুণের রক্তে ঢাকার রাজপথ ভেসে গিয়েছিল তাদের সেই রক্তের ঋণ শোধ করার দায় তো আমাদেরই নিতে হবে। বাংলা ভাষার মর্যাদাকে রক্ষা করার দায়িত্ব পালনের লড়াইয়ে সমস্তরকম দলীয় রাজনীতির কূপমণ্ডুকতাকে পিছনে রেখে এক হয়ে সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার প্রয়োজন অবশ্যই আছে। বিশ্বে ছোটবড় বহু দেশে বহুতর মাতৃভাষা বিদ্যমান কিন্তু বাঙালির মতো আর কোনো জাতিকে তার এত সমৃদ্ধ মাতৃভাষার প্রতি অবহেলা করতে দেখা যায় না। এই প্রচেষ্টা চলতে থাকলে বাংলা ভাষা আগামীদিনে কিছু পুরনো গল্প, উপন্যাস ও কবিতা ছাড়া আর কোথাও দৃষ্টিগোচর হবেনা। বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা এইভাবে বাড়তে থাকলে পৃথিবীর অন্যতম মধুর ভাষাটিকে হয়তো কোনো এককালে মহাফেজখানা এবং জাতীয় গ্রন্থাগারে খুঁজতে যেতে হবে।

চিন্ময় ঘোষ
দুর্গাপুর


Comments
0 Comments

-

 
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.