Friday, February 21, 2020

পূজা মৈত্র

sobdermichil | February 21, 2020 | |
চক্র সম্ভব
পর্ব - ১৭

অনিকেত বুঝতে পারছিলো না – কী চলেছে। ওকে ঐ পাশের ঘরেই বসিয়ে রেখেছে। শাঁওলি মিস পরী বলে মেয়েটাকে নিয়ে এসে গল্প করে অনিকেতকে টিফিন খাইয়ে দিয়ে চলে গেলো। অনিকেত খেয়েও নিয়েছে। কিন্তু ফাদার এখনো ডাকছেন না কেন? ভাবতে ভাবতেই ফাদার এলেন। সাথে ঐ মস্ত বড় লোকটা।“ফাদার – “উঠে দাঁড়ালো অনিকেত। “ক্লাসে যাবে, অনিকেত?” “হ্যাঁ – ক্লাস শুরু হয়ে গেছে তো”। “দেখলেন অনিরুদ্ধবাবু। কতটা সিনসিয়ার আপনার বাবিন”। অনিকেত অবাক হয়, ফাদার ও ওকে বাবিন-বাবিন বলছে? লোকটা অনিকেতের পাশে বসে। ওর পিঠে একটা হাত রাখে। “তাই তো দেখছি। বাবিন অবশ্য ছোট থেকেই শান্ত ছিলো খুব”। অনিকেত অবাক চোখে তাকায়। “আপনি আমাকে ছোট বেলায় দেখেছেন?” ফাদার অগাস্টিন অনিকেতের সামনের চেয়ারে বসেন। মুখার্জীদের হয়ে গল্পটা এস্টাব্লিশ ওনাকেই করতে হবে। “দেখবেন না? উনিতো তোমার বাপি, ইওর ফাদার”। চমকে ওঠে অনিকেত। ফাদার বলছেন যখন তখন কথাটা তো সত্যি। ফাদার তো মিথ্যা বলেন না। “নিতে এসেছেন তোমায়। আজই নিয়ে যাবেন। সাথে গ্রান্ডপা, গ্রান্ডমা ও এসেছেন”। “আজই?” অনিরুদ্ধ ছেলেটার চোখে চোখে রেখে ভরসা দিলো, “হ্যাঁ, আজই”। “এখানে আপনারাই রেখে গিয়েছিলেন?” অনিরুদ্ধ চমকালো, ফাদার সামলালেন। “হ্যাঁ, আসলে তোমার দাদার খুব শরীর খারাপ ছিলো। দাদাকে নিয়ে বাপি মামণি খুব ব্যাস্ত ছিলো। তাই আমাদের কাছে রেখে গিয়েছিলেন”। অনিরুদ্ধ দেখল অনিকেতের চোখে অভিমান জমলো না। শুধু চোখটা ছলছল করে উঠলো। “এখন নিয়ে যাবেন? দাদা ভাল আছে?” “তোমার দাদা আর নেই। গডের কাছে চলে গেছে অনিকেত”। অনিকেত চুপ হয়ে গেলো। অনিরুদ্ধ ওকে কাছে টেনে নিলো, “তোমার মামণির খুব মন খারাপ তাই। সবসময় বাবিন, বাবিন করছে”। “বাবিন মানে আমি?” “হ্যাঁ”, “আমি তো অনিকেত”। “উঁহু, বাবিন”, “ওটা আমার বোন?” অনিরুদ্ধ বুঝল পরীর কথা বলছে। “হ্যাঁ, ছোট্ট বোন”, “তাই ও বাবিন দাদা বলছে?” “হ্যাঁ, তোমার নাম বাবিন, তুমি জানতে না?” “না তো!”, “ভুলে গেছ তবে। আমি তোমার বাপি সেটা মনে নেই?” অনিকেত মনে করার চেষ্টা করে,”না তো!”অনিরুদ্ধ অনিকেতকে কোলে বসায়, “আমি অনিরুদ্ধ মুখার্জী, তোমার বাপি। আর তোমার মামণি হলো নীরা মুখার্জী, আর বোন পরী মুখার্জী”। “তাহলে আমি অনিকেত মুখার্জী?” ফাদার হেসে ফেললেন, “ঠিক ধরে নিয়েছে”। “চলো, বাড়ি যাই তবে”, “এখনি?” “হ্যাঁ,” “ওখানে মামণি আছে?” “আছে। তবে মামণির শরীর তো ভালো না, মামণিকে একটু বুঝে চলবে”। “মামণি রাগী?” অনিরুদ্ধ জানে না। উৎসার সাথে কখনোই রাগ দেখায়নি নীরা। অনিকেতের সাথে কি দেখাবে? “রাগী না। দাদার জন্য মন ভালো থাকে না, তাই। তুমি গেলে মামণির ভাল লাগবে”, “যাবো ফাদার?” ফাদার অগাস্টিন হাসেন, “যাও। বাপিকে মামণিকে, বোনকে, ঠাম্মাকে, দাদুভাইকে খুব ভাল বাসবে। শাঁওলি মিস যাবে ওখানেও। তোমাকে পড়াবে”। “আর স্কুল?” “স্কুলেও আসবে, তাই না অনিরুদ্ধবাবু?” “একদম, স্কুলেও আগের মতোই আসবে বাবিন”, “আমার সব বন্ধুদের বলবো বাপি-মামণির কথা?” “আজ না অনিকেত, কাল স্কুলে এসে, বলবে”। “ওকে ফাদার”।

গাড়িতে রুদ্রদেবও ফিরছিলেন। সামনের সিটে বসেছিলেন। পিছনে অনিরুদ্ধ, কোলে পরী, অনিরুদ্ধর পাশে অনিকেত। অনিরুদ্ধ খুঁটিয়ে দেখে অনিকেতকে। এতটা সাদৃশ্য – ও নিজেই আশা করেনি। মনে হচ্ছে বাবিনকেই ফিরে পেয়েছে, দেড় বছর পর। শুধু মনে হলেই হবে না। এটাকেই বিশ্বাস করতে হবে অনিরুদ্ধকে। অনিকেতকে ভালোবাসতে হবে, উৎসবের মতো করেই। নীরাকে জীবনে ফেরাবার এটাই শেষ সুযোগ। একে হাতছাড়া হতে দেবে না অনিরুদ্ধ। 

“বাবিনদাদা বাড়ি গিয়ে খেলবে তো জেঠুমণি?” পরী ছটফট করে। “বাবিনদাদাকেই জিজ্ঞাসা কর। বাবিন – খেলবি বোনের সাথে”? অনিকেত ঘাড় নাড়ে। ওর আপত্তি নেই। তবে বোন তো ছোট, খেলায় পারবে? “বোন তো ছোট”। অনিরুদ্ধ তাকায়, “তাতে কী?" “যদি বোনের লেগে যায়?" অনিরুদ্ধ খুশি হয়। মনে পড়ে কাকিমণির কথা। কাকিমণি ওকে বলতো, “খেলতে গিয়ে সাবধানে খেলবি। ভাইদের দেখে রাখবি। ওরা ছোট, ওদের আগলে রাখা তোর কাজ”। “কথা না শুনলে?” “কথা শোনাতে হবে। যদি কারোর লাগে আমি কিন্তু যে বড় তাকেই শাসন করবো”। অনিরুদ্ধ কাকিমণির কথার মানে বুঝতো। অতীন আর অনুপমকে আগলে রাখতো মাঠে। ওরাও দাদাভাই এর কথার অবাধ্য হবার সাহস করতো না তেমন। পরে বড় হয়ে দুষ্টু হয়। নিজেরা দুষ্টুমি করে অনিরুদ্ধকে কেস খাওয়াতে চাইত। কিন্তু ধরা পড়ে যেতো। কাকিমণির হাতে মারও খেতো তেমন। অনিকেতের মধ্যে বোনের লেগে যাবে এই চিন্তা দেখে নিজের ছোট বেলার কথা মনে পড়লো। “তুই দেখে রাখবি বোনকে, হবে না?” অনিকেত খুশি হয়,“আচ্ছা”। “তুই তো দাদা – তোর দায়িত্ব”। “আচ্ছা। এই গাড়িটা আপনার”? অনিরুদ্ধ বলার আগেই রুদ্রদেব বললেন, “বাপিকে তুমি করে বলতে হয় দাদুভাই”। অনিকেত চুপ করে থাকে। “শুধু এটা কেন আরো অনেক গাড়ি আছে তোমার বাপির”। “পরী বলে ওঠে, “আমি জানি ডাক্তার দাদু। ন’টা গাড়ি আছে আমাদের। বাড়িতেই থাকে, গ্যারেজে।” অনিরুদ্ধ পরীকে চুমু খায়, “পরী তো মা সব জানে”। চুমু খেয়েই তাকিয়ে দেখে অনিকেতের দিকে। ওর চোখে আদরের প্রত্যাশা দেখে কী? না বুঝলেও ঝুঁকে অনিকেতকে চুমু খায়। বাবিনকেই চুমু খাচ্ছে মনে হয় ওর। বহুদিন পর। “অনি, বাবিন পড়াশুনাতেও ভালো শুনেছ তো”? “হ্যাঁ, কাকাবাবু”। “তোমার মতোই হয়েছে”। অনিরুদ্ধ খুশি হয়। শান্ত ছেলে অনিকেত। ভালো হওয়াটাই স্বাভাবিক। উৎসব আর অনিকেতের চরিত্রগত এই ফারাকটাও নীরার চোখে বাঁধবে, বাঁধবেই। কী প্রতিক্রিয়া দেবে, তা নিয়ে যথেষ্ট আশঙ্কিত অনিরুদ্ধ।

পর্ব – ১৮

গাড়ি থেকে নামতেই মালির চোখের বিস্ময় দেখলো অনিরুদ্ধ। নিধুকাকা, রাধুনী ঠাকুর, মণিপিসি, ড্রাইভার, মালি- বিস্ময় মাখা চোখ টপকে যাওয়া দুষ্কর ছিলো। সবার চোখেই প্রশ্ন লেগে ছিলো যেন। “নিধুকাকা, মণিপিসি – বাবিনকে নিয়ে এলাম”। অনিরুদ্ধই বললো। “বাবিন!” সবার গলায় সম্মিলিত বিস্ময় ঝরে পড়লো যেন। “হ্যাঁ, বাবিন”। রুদ্রদেব বললেন। কড়া গলায়। “নীরার বাবিনকে অবশেষ খুঁজে পাওয়া গেছে, মনে রাখবে”। সবার মুখ বন্ধ হয়ে গেলো যেনো। পরী জেঠুমণির কোলে ছিলো। “জেঠুমণি, সিঁড়ি দিয়ে উঠবে তো। নামিয়ে দাও”। অনিরুদ্ধ মাথা নাড়লো, “না, কোলেই চল। বাবিন – চল”। অনিকেতের হাত ধরে টানলো ও। অনিকেত ভাবলো স্বপ্ন দেখছে ও, না সত্যি।অনিকেত অবাক হয়ে দেখছিলো।এত বড় বাড়ি কখনো দেখেনি ও।ঢুকেই সামনে কত্ত বড় মাঠ,মাঠের বামদিকে ছোট ছোট ঘর,ডানদিকে গাড়ির গ্যারেজ।মাঠের মাঝে ফোয়ারা,দোলনা,স্লিপ রয়েছে খেলার জন্য।বাড়িটাও কত্ত বড়।ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে দেখলো বড় হল।ডাইনিং হল মনে হয়।পাশে কিচেন।হলের দুদিক দিয়েও ঘর,অনেক।মাঝে সিঁড়ি।সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায় পৌঁছলো ওরা।দোতলাতেও অনেক ঘর রয়েছে।ঢুকেই ডাইনিং কাম ড্রয়িং রয়েছে।এর মধ্যে মামণির ঘর কোনটা?

“মামণির কাছে যাবো এখন বাবিন”। অনিরুদ্ধ অনিকেতকে বললো। “মামণি কোথায়?” “জেঠিমণি, জেঠিমণির ঘরে বাবিনদাদা। তুমি স-ব ভুলে গেছো”। “পরী – তুই একটু ডাক্তারদাদুর সাথে বস – আমি জেঠিমণির কাছে বাবিনদাদাকে নিয়ে যাই?” “বাবিনদাদা বললে জেঠিমণি বকা দেবে, জেঠুমণি। দাদাভাই বলো”। অনিরুদ্ধ হাসলো। “হ্যাঁ তোর দাদাভাই। দাদাভাইকে একটু নিয়ে যাই ওর মামণির কাছে?” “আচ্ছা”। পরীর সামনে নীরার কোন আউটবার্স্ট হোক – এটা চায় না অনিরুদ্ধ। “চলো, বাবিন”। অনিরুদ্ধ অনিকেতকে বলে।

নীরার ঘরে ঢুকতে গিয়েও থমকায় অনিরুদ্ধ। সেই এক কান্ড করে চলেছে নীরা। বাবিনের ছবির সাথে কথা বলে চলেছে। এমন অবস্থায় অনিকেতকে নিয়ে যাবে? কাকিমণি থাকলে ভালো হতো। নীরা কাকিমণিকে মান্য করে, ভয় পায়। কিন্তু কাকিমণিও তো এখন আসতে পারবে না। ভাবতে ভাবতেই অনিরুদ্ধ দেখলো অনিকেত বিস্ফরিত চোখে নীরার উৎসবের ছবির সাথে কথা বলা দেখছে। বুদ্ধিমান ছেলে, কিছু বুঝে না ফেলে। “নীরা –“নীরা ঘুরে তাকালো, “অনি – এত দেরী হলো? পরী কই?” “দেখো কাকে এনেছি”। “কাকে?” চমকালো নীরা। অনিকেত অনিরুদ্ধর আড়ালে লুকিয়ে ছিলো। অনিরুদ্ধ হাত ধরে সামনে টেনে আনলো। “তোমার বাবিন”, আধো অন্ধকার ঘরে এহেন কথা শুনে নীরার আবেগ বাঁধ মানলো না। ছুটে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো বাবিনের সামনে। হ্যাঁ – অনি ঠিকই তো বলছে। বাবিন – বাবিনই তো। একটু বড় হয়েছে, হবেই তো। দেড়টা বছর কম সময় নয়। “বাবিন! কোথায় ছিলি বাবা? এ-তদিন মা’কে ছেড়ে থাকলি কী করে? মামণির কত কষ্ট হয়েছে বলতো ...”। অনিকেত কাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। ও বুঝতে পারছে না মামণি কী বলছে। ও কি যেতে চেয়েছিলো নাকি! ওকে তো রেখেই আসা হয়েছিলো। “কী হলো? কী ভাবছিস? ওহ! বকবো ভাবছিস, তাই না? এতদিন না বলে দূরে ছিলি তাই।বকবো। তবে এখন না, আগে আদর করে নিই”। অনিরুদ্ধর চোখে জল চলে এসেছিলো। সন্তানের প্রতি অনিরুদ্ধর ভালোবাসা নীরার থেকে কম না হলেও প্রকাশের কত ফারাক দুজনের। নীরা সত্যিই বাবিনকে না পেযে কষ্ট পেয়েছে - খুব কষ্ট পেয়েছে। "বাবিন - মামণির কাছে যাও, বকবে না"। অনিকেতকে সহজ করতে চায় অনিরুদ্ধ। "তুমি বকোনি তো?" "নাহ, একটুও বকিনি"। অনিকেত এমন আদর জীবনে কোনোদিন পাবে ভাবেনি। মায়েরা তাহলে এভাবে আদর করে? অনেকক্ষণ আদরের ঝড় চলার পর শান্ত হয় নীরা, অনিকেতকে কোলে তুলে নেয়। কোলে করে খাটে বসে, "পরী কই? সে দেখেছে তার দাদাভাইকে?" অনিরুদ্ধর মনটা খুশিতে ভরে যায়। বাবিন এলেও নীরা পরীকে ভোলেনি। "দেখেছে, খুব খুশি সে"। "আমার পরী খুব লক্ষ্মীমন্ত,অনি। ও এলো সাথে বাবিনকেও নিয়ে এলো।" "ভালোই হল এখন নীরার দুই ছেলেমেয়ে, খাটের দু’দিক ভরে থাকবে”। নীরা আরো চুমু খেলো অনিকেতকে, “অনি – একটু লাইটটা জ্বালাও। ভালো করে দেখি বাবিনকে, কতদিন পর দেখলাম বলোতো”।

অনিরুদ্ধ প্রমাদ গুনলো, লাইট জ্বালালেই তো নীরা বুঝে যাবে। অথচ না জ্বালিয়েও উপায় নেই। হঠাৎই কাকিমণির গলা পেলো। “বাবিন চলে এসেছে, অনি?” ধড়ে প্রাণ এলো অনিরুদ্ধর। নীরার রিঅ্যাকশনটার তীব্রতা কমবে এতে। “হ্যাঁ, কাকিমণি”, “কই, দেখি আমার বড় নাতিটাকে”। সুহাসিনী অনিকেতের পাশে গিয়ে বসলেন। “নীরা, খুশি তো এবার? তোমার সাতরাজার ধন এক মাণিক খুঁজে পেলে”। “খুব খুশি কাকিমণি, বাবিন – ঠাম্মা এসেছে দেখেছো?” অনিকেত কিছু বললো না। ঠাম্মাকে ও আগেই দেখেছে, মামণি জানে না। সুহাসিনী অনিকেতকে কোলে নিলেন। আদর করে দিলেন অনেক করে। “তাহলে নীরা, এখন দুই ছেলেমেয়ের মা। একা সামলাতে পারবে তো?” “একা সামলাবো না তো কাকিমণি, আপনি তো আছেন”। “তাই বুঝি? অনি, শুনলি? আমার ও বাড়িতে কাজ নেই?” “ওরা তো আপনার বৌমা, কাকিমণি, মেয়ের কাছে মা বেশি থাকে”। অনিরুদ্ধ নীরার কথায় খুব খুশি হলো। নীরার পাশে গেলো। মাথায় হাত রাখলো। “কী গো, লাইটটা জ্বালাও”। সুহাসিনী অনিরুদ্ধকে চোখের ইশারায় লাইট জ্বালাতে বললেন।

লাইট জ্বালাতেই যা হবে ভেবেছিলো ঠিক তাই হলো। নীরা চমকে উঠলো, ছিটকে খাট থেকে উঠে এলো। “অনি – এ কে? কাকে এনেছো? এ আমার বাবিন না”। অনিরুদ্ধ প্রস্তুত ছিলো। ঠান্ডা মাথায় উত্তর দিলো, “নীরা, ভালো করে দেখো। এ আমাদের বাবিন”। “না, হতে পারে না, কাকিমণি –“ “এ বাবিনই নীরা, বড় হয়েছে, বদলেছে একটু। এমন সামান্য পরিবর্তন হয়”। নীরা অনিরুদ্ধর কলার চেপে ধরলো। “কী ভেবেছ অনি? যাকে তাকে বাবিন বলে নিয়ে আসবে কোথা না কোথা থেকে আর আমি মেনে নেব?” কলার ধরে ঝাঁকাচ্ছিলো নীরা। অনিরুদ্ধ আড়চোখে দেখলো নীরার এই রূপ দেখে কাকিমণি অবাক হয়ে গেছে। কাকিমণির কোলে অনিকেত ভয়ে কাঁপছে। অনিরুদ্ধ নীরার হাত চেপে ধরে কলার ছাড়ালো। “ও যাকে তাকে নয় নীরা! কোথা থেকে না কোথা থেকেও আনিনি। ও বাবিন”। “আমি মানি না।তুমি বাবিনকে চেনাবে আমায়?” নীরা উৎসবের ফটো দৌড়ে নিয়ে আসে, “এ আমার বাবিন”। অনিকেত অবাক হয়। মামণি দাদার ছবিকে বাবিন বলছে কেন? “ভুল করছো তুমি, ও উৎসব। দেড় বছর আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। এ, বাবিন”। নীরা রেগে ওঠে, “বাবিন আর উৎসব আলাদা নাকি! তুমি এসব জঞ্জাল যেখান থেকে নিয়ে এসেছো, ফেলে এসো”। “নীরা!” “সুহাসিনী আর না পেরে ধমকে ওঠেন। “কথা বলার সহবত শেখোনি মনে হছে! অনি বলেছে এ বাবিন। আমিও বলছি। আমরা মিথ্যা বলবো?” এক ধমকেই চমকে ওঠে নীরা। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। “কাঁদবে না, কেঁদে লাভ হবে না। ছোট থেকে মা শাসন করেনি এক মেয়ে বলে তাই এমনতর হয়েছো”। নীরা সুহাসিনীর পা চেপে ধরে। “কাকিমণি – ও বাবিন না। আপনি একবার বলুন”। সুহাসিনী অসহায় কন্যাসমা মেয়েটির মাথায় হাত রাখেন। “ও – ই বাবিন। নীরা”। নীরা অসহায় চোখে তাকায়। “আমি তোমার মা হয়ে, মিথ্যা বলবো?” নীরা সুহাসিনীর পা জড়িয়ে কাঁদতে থাকে। সুহাসিনী অনিরুদ্ধকে ইশারা করেন। অনিকেতকে ওর কোলে দেন। “বাবিনকে নিয়ে ও ঘরে মা, অনি”। নীরাকে খাটে তুলে নেন। “পা ধরে কাঁদে? বোকা মেয়ে”। বুকের মধ্যে টেনে নেন সুহাসিনী। নীরা ওনাকে জড়িয়ে ধরে। ওহ কান্নায় ভেসে যেতে থাকেন সুহাসিনী।

“ঐ ছবির ছেলেটা বাবিন?” অনিকেত অনিরুদ্ধর ঘরে গিয়েই প্রথম প্রশ্ন করে। “না, ও উৎসব। তোর দাদা”। “কিন্তু মামণি তো ওকেই –“ অনিরুদ্ধ অনিকেতকে কোলে নিলো। খাটে বসালো। “মামণি কষ্টে আছে। দাদা নেই বলে। তাই বলছে অমন”। “মামণি আমাকে চায়না, তাড়িয়ে দিলো –“ অনিকেতের চোখে জল দেখলো অনিরুদ্ধ। “কে বললো চায় না? খুব চায়”। “আমি বুঝি, মামণি দাদাকে আর পরীকে ভালোবাসে। আমাকে না”। অনিরুদ্ধর মনটা মোচড় দিয়ে উঠলো। “আর বাপি যে তোকে ভালোবাসে?” অনিকেতের চোখের জল মোছাতে মোছাতে বললো অনিরুদ্ধ। “অল্প”। অনিরুদ্ধ গভীর শ্বাস নিলো। উৎসবের থেকে কী কাউকে ভালোবাসা সম্ভব ওর পক্ষেও, অথচ মিথ্যা বলতে হবে। “উঁহু, সবচেয়ে বেশি”। “পরীর থেকেও?” “হ্যাঁ, একটু বেশি”, “দাদার থেকেও?” “হ্যাঁ, অ-নেক বেশি”। বলেই বুকের মধ্যের একটা পাথর সরে যাওয়া টের পেলো অনিরুদ্ধ। অনিকেতকে ভালোবাসে ও। স্বীকারোক্তিটা করে নিজের কাছেই ভালো লাগছে। যে নেই তাকে আঁকড়ে না ধরে যে আছে – তাকে ভালোবাসাটাই সঠিক কাজ। সেটাই করবে অনিরুদ্ধ। “সত্যি?” “হ্যাঁ – আমি বাবিনকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি”। অনিকেত নিজের চোখ নিজে মুছলো। “আমাকে আবার রেখে দিয়ে আসবে না তো?” “না, কক্ষনো না”। “মামণি বললেও?” অনিরুদ্ধ অনিকেতের হাত ধরলো। “নিজের ছেলেকে রেখে আসবো কেন? যখন দাদা অসুস্থ ছিলো – তাই রেখেছিলাম”। “স্কুলের জামা ছাড়বো না?” অনিরুদ্ধ লজ্জিত হলো। ছাড়বি তো বাবা। ব্যাগে করে জামাকাপড় এনেছিস – নিয়ে আসি?” “নীচে?” “হ্যাঁ,” “আমিও যাবো”। অনিরুদ্ধ বুঝলো বাপিকে ছাড়া থাকবে না বাবিন। “চলো”।অনিকেতকে কোলে নিতে গেলো অনিরুদ্ধ। “কোলে তো ছোটরা ওঠে, বাপি। বোন ওঠে”। অনিকেতের মুখে প্রথমবার বাপি ডাক শুনলো অনিরুদ্ধ। ভীষণ আনন্দ পেলো। “তুই এমন কিছু বড় হোসনি কোলে না ওঠার মতো”। অনিকেতকে কোলে নিয়ে বললো অনিরুদ্ধ। “আমি তো বড়ই। বোন ছোট। আমি একা শুই। একা একা খাই। একা পড়ি। একা স্নান করি, একা ড্রেস আপ করি – -“ “এখানে এগুলো সব বাপি করাবে। আর মামণি, ঠাম্মাও করাবে”। “এমা!” “কোন এমা নয়, চল তো ব্যাগ নিয়ে আসি”। “চলো”।

পর্ব - ১৯

"পরীকে তাহলে মফেরৎ দিয়ে দেবে, তাই তো?" অচ্যুতের কথায় সুহাসিনী তাকালেন, "ফেরৎ কেন দেবে? আইনত নিয়েছে তো"। "ওদের বাবিন চলে এসেছে যে, যত্তসব! কোথাকার না কোথাকার আবর্জনা তুলে এনেছে!" "তুমি গিয়ে দেখো কাল, বাবিন কিনা"। অচ্যুত থমকান,"বাবিনই এসেছে? কিন্তু তা কী করে হয়?" "কেন? না হবার কী আছে? বাবিনের চলে যাওয়াটাই তো অবাক করার মতো ছিলো"। "সুহাসিনী মশারি খাটাতে খাটাতে বলেন। "কী উল্টোপাল্টা বকছো, মরা ছেলে ফিরে আসে, নাকি?" অচ্যুত আশ্চর্য হন। "জ্যান্ত ছেলেও তো মাত্র তিন দিনের জ্বরে এভাবে মারা যায় না - অচ্যুত"। সুহাসিনী অচ্যুতের চোখে চোখ রাখেন। "মনে? ডেঙ্গু হলে মরে না? কি বলতে চাইছো?" "ডাক্তার রিপোর্টে ডেঙ্গু লেখেনি কোথাও"। "এসব কথা আমাকে কেন বলছো? আমি কী জানি এসবের?" অচ্যুতকে ঘামতে খেয়াল করেন সুহাসিনী। "এমনিই বলছি"। "সুহাসিনী হাসেন।"ববিনকে অনি নিজে হাতে পুড়িয়ে এসেছিলো, না?" অচ্যুত প্রশ্নটা করেই ফেলেন। "কে জানে? অনিও তো বলছে এ-ই বাবিন"। "আশ্চর্য!""খুবই, তুমি তার জন্য রাতের ঘুম কেন খারাপ করছো। অনির ছেলে ফিরেছে এতো আনন্দের কথা"। অচ্যুত নিজেকে সামলালেন। "কাল যাবে?" অচ্যুত মাথা নাড়লেন, "হ্যাঁ"। "পরীকে নিয়ে চিন্তা করো না। সে খুব ভালো আছে ওখানে"। "সম্পত্তি?" সুহাসিনী হাসলেন, "এইতো ঠিক জায়গায় চলে এসেছো,দুজনে সমানই পাবে, অনি বলেছে"। "সত্যি?" "অনিকে জিজ্ঞাসা করো নিজে"।অচ্যুত খাটে পা তুলে বসলেন। "ছোটগিন্নি - রুদ্র এসেছিলো, না,আজ?" সুহাসিনী অপ্রস্তুত হলেন না। "হ্যাঁ, কেন বলতো?" "না, এমনি"। "বাবিনকে দেখতে এসেছিলো"। "শুধু বাবিনকে"? অচ্যুত হাসলেন, সুহাসিনী ইঙ্গিতটা বুঝলেন। "তোমার সেই সন্দেহ আজও যায়নি না?" "যাবে কী করে বলো? কোনদিন মনটা পেলামই না যে"। "চেষ্টা করেছো? শরীর নিয়েই তো খুশি ছিলে যে ক'বছর ছিলে"। "শরীরটাও তো অনিচ্ছার"।সুহাসিনী এই কথাটা আশা করেননি।এটা অচ্যুত বোঝেন উনি জানতেন না।"থমকালে? আমি শুরু থেকেই জানতাম, গা করিনি। পাচ্ছি তো,যখনই চাইছি - খুশি ছিলাম। এখন মনে হয় - ইচ্ছা না থাকার সাথে সাথে ঘেন্নাটাও ছিলো। আমি তো আর ডাক্তার না। তাও আবার বিলেত ফেরৎ। মেয়েদের মন ভোলানো কথা বলতে পারি না। হ্যাঁ - গয়না এনে দিতে পারি - কিন্তু কাকে দেবো? সে তো পরেই না"। সুহাসিনী বুঝলেন এটাই উচিত সময়, "তোমার বাইরের সংসারের মেয়েমানুষটাও গয়না নেয় না তবে?" অচ্যুতকে কেউ যেন স্থানু করে দিয়েছিলো। "কে বললো এসব?" "বলতে হবে? কেন পাতলেই শোনা যায়।কে সে? কোথায় থাকে?" অচ্যুত চুপ করে থাকলেন। "এখনো যাও?" অচ্যুত মাথা নাড়লেন, "নাহ"। "মিথ্যা বলছো?" "যাই না বৌ, তোমার দিব্যি"। অচ্যুতের মুখে বৌ শব্দটা বহুবছর পর শুনলেন সুহাসিনী। ছোটগিন্নিই বলেন বরাবর, যখন খুব আদরের ইচ্ছা হতো বৌ বলতেন। "শুয়ে পড়ো", সুহাসিনী বললেন। "সব জেনেও ছেড়ে যাওনি কেন?" অচ্যুত প্রশ্নটা করেই বসলেন। "ছেলেপিলে ফেলে কোথায় যেতাম?" "কেন? নিয়ে যেতে ওদের। তোমার বাপের বাড়ি"। "ডিভোর্স? ভালো বলেছো তো। আমার মা বাবা, তাদের মানসম্মান?" "ওহ, মানসম্মানের জন্যেই রয়ে গেল?" "তা কেন? তিনটে ছেলে - বাড়িঘর, পরিবার, শ্বশুর, শাশুড়ি, ভাসুর, জা - কম কী"। "আমি কোথাও ছিলাম-ই না, তাই তো?" "সবই তো বোঝো, তাও প্রশ্ন করো খামোখা"। অচ্যুত উঠে দাঁড়ালেন, ঘরের মাঝে রাখা তিনপায়া টেবিলের উপর থেকে তামার ঘটিতে রাখা জল নিয়ে ঢকঢক করে খেলেন। তারপর বললেন, "পরী নেই, ফাঁকা লাগে না?" "লাগে"। "পরীর ঠাকুরদাকে নেবে?" "ইশ! একদম না, নাক ডাকবে"। অচ্যুত কাছে এলেন। সুহাসিনীর কোমর জড়িয়ে ধরলেন। "আজ থাকি", "কেন?" "তোমাকে কাছে থেকে দেখবো বলে"। "চৌত্রিশ বছর দেখোনি?" "সে দেখার থেকে এ দেখা আলাদা"। "কিভাবে?" "সব জেনেও আমাকে মেনে নেয় যে মেয়ে তাকে দেখবো না?" "তোমাকে মানিনি। মেনেছি পরিস্থিতিকে"। "ঐ হলো"। অচ্যুত হাসেন। "চৌত্রিশ বছর আগে ফিরবে?" "আবার!" "কেন? তোমাকে জ্বালাতাম একটুও?" "একদম জ্বালাতে না"!"অনিটাকে একা তুমি বুকে করে বড় করেছো বুঝি? তার এই বোকা কাকার একটুও অবদান নেই?" সুহাসিনী চুপ করে গেলেন। এটা অস্বীকার করতে পারবেন না কখনো। নতুন দাম্পত্যেও ছোট্ট অনিকে রাতের পর রাত কাছে রাখা নিয়ে সুহাসিনীকে কখনো বিব্রত হতে হয়নি। অচ্যুত কখনো উত্যক্ত করেননি। ছেলে ঘুমোলে অচ্যুত আসতেন, পাশের খাটে ডাকতেন। কিন্তু তাও সুহাসিনীর ক্লান্তি, বুঝে। ছেলে জেগে কেঁদে উঠলেই সুহাসিনী ছুটতেন, অচ্যুতও। "দাদাভাই দিদিভাইকে অনিকে নিয়ে হ্যাপা করতেই হয়নি", সুহাসিনী বললেন। "আমরাও কী হ্যাপা করেছি বৌ? ছোট্ট প্রাণটাকে মাঝে রেখে এগোতে তো হ্যাপা লাগেনি আমার কোনদিন"। "অনির আগের বাচ্চাটার ঠিক কী হয়েছিলো অচ্যুত? বাবিনের মতোই নাকি ..."। সুহাসিনী বহুদিন পর স্বামীর নাম ধরলেন। অচ্যুত সুহাসিনীর মুখে হাত চাপা দিলেন, "চুপ, এসব বলবে না"। "কেন?" "বলেছি বলবে না, বলবে না"। "কেন বলবে তো", "এটা অভিশাপ। পাপের ফল"। "পাপ! অভিশাপ! করে?" "কাল বলবো, আলো ফুটলে"। "ভয় পাচ্ছো?" "পাচ্ছি। কারণ আছে"। সুহাসিনী জোর করলো না। " শুয়ে পড়ো।", "ওই খাটে না"। "বেশ, এখানেই শোও"। অচ্যুত সত্যি সত্যিই সুহাসিনীর পাশে শুয়ে পড়লেন। সুহাসিনীর বুকে মুখ ডুবিয়ে দিলেন। আঁকড়ে ধরলেন তারপর। "একি! এভাবে তো-", "পরী শোয়, আমিও এভাবেই শোবো"। "বেশ, ভয় পেয়ো না, ঘুমাও"। "বৌ -""বলো"। "আমি খারাপ, না?" "কই,না তো"। "তাহলে আমাকে ছেড়ে যাবে না তো কখনো?" "মরতেও দেবে না বলছো?" অচ্যুত সুহাসিনীর বুকে মুখ ঘষেন, "মরবে না, কোথাও যাবে না আমাকে ছেড়ে"। "আচ্ছা"। "আমি ভালো হয়ে যাবো"। "আচ্ছা"। "অনিকে নীরাকে, বাবিনকেও খুব ভালোবাসবো, ছোট্ট অনিকে যেমন বাসতাম বাবিনকে তেমন ভালোবাসবো"। "বাহ"। সুহাসিনী বুঝলেন ধরা পড়ে গিয়ে অনুতপ্ত অচ্যুত আজ। "বাবিনের জন্য কী নিয়ে যাবো কাল?" "গয়না - ওটাই তো তুমি দাও"। "তোমার মা বাবাও তো গয়না দিয়েছেন আমায়"। "কই? গলার হার, পাঞ্জাবির বোতাম আর আংটি ..." "উঁহু, তুমি, বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা"। অচ্যুত বলেই হেসে উঠলেন। সুহাসিনী মুখে হাত চাপা দিলেন। "এমন বলতে নেই, আর রাত দুপুরে হেসো না, ছেলেদের ঘরে আওয়াজ যাবে"। অচ্যুত মুখে আঙ্গুল দিলেন। "ঘুমাও"। সুহাসিনী বললেন। "আচ্ছা", ঘুমিয়ে পড়লেন অচ্যুত।

পর্ব – ২০ 

“নীরা – শুয়ে পড়ি চলো”, অনিকেতকে কোলে নিয়ে নীরার ঘরে এসেছিলো অনিরুদ্ধ। পরী ততক্ষণে জেঠিমণির পাশে শুয়ে পরেছে। “ওকে রেখে এসো। পরী ঘুমিয়েছে। “নীরা স্পষ্ট করে বললো। বিকাল থেকে পরী জেঠুমণির কাছে ছিলো। পড়িও বাবিন ভাবছে ছেলেটাকে। দাদাভাই বলছে। মাঠে বিকালে খেলেওছে দুজনে। ফিরে এসে জেঠিমণিকে কত গল্প। ওর দাদাভাই খুব ভালো, আর দুষ্টু নেই। পড়ে গেলে ছুটে গিয়ে তুলে আনে। জেঠুমণিকে ডেকে আনে। নীরা অবোধ মন্টাতে কোন কালির দাগ লাগায়নি। রুচিতে বেধেছিলো। দোষ তো বড়দের। ও বাবিনকে যেটুকু চিনতো ছেলেটাকে বাবিন ভাবতে অসুবিধা হবার কথা নয়। নীরাও দেখেছে। অনেকটাই মিল, পরী সন্ধ্যাবেলা জেঠিমণির কাছে বই নিয়ে বসে আজকাল।বসেছিলো, পড়তে পড়তেও সারাক্ষণ দাদাভাই।

“পড়ায় মন নেই, পরী ?” “পড়ছি তো জেঠিমণি”, “কই? শুধু গল্প তোর”, “ও তো আজ এও খুশি বলে”। “কেন?” পরী জেঠিমণির গলা জড়িয়ে ধরে, “দাদাভাই এলো যে”, “খুব মজা?” “খু-উ-ব, সারাদিন তো কেউ ছিলো না। এখন দাদাভাই থাকবে, খেলা যাবে”। “ও বাড়িতে তো দুটো দাদা তোর”। “হ্যাঁ, খেলতাম তো, সারাদিন। তারপর সন্ধ্যায় পড়তে বসে ঘুম ঘুম। মায়ের হাতে দুম দুম কিল খেতাম”। নীরা আঁতকে ওঠে। এটা কী করতো ওর মা। এইটুকু দুধের বাচ্চাকে কেউ মারে? নীরা তো কখনো বাবিনকে মারেনি। অনির হাতে মার খেয়েছে বাবিন। কিন্তু সেগুলো তো খুব দুষ্টুমি করলে তবেই। নীরা পরীকে চুমু খেয়েছিলো। “পড়ো এবার”। “এমা, তুমি বকবে না? মন নেই যে”, “না, আমি বোঝাবো যে পড়তে হয়। আমি বকাঝকা করার মতো মা না – পরী”। “পরী জেঠিমণির গালে চুমু খায়”, “তুমি ভালো মা”। নীরা খুশি হয়েছিলো, “তাহলে ডাকিস না যে – খালি জেঠিমণি - - -“ পরী জেঠিমণির বুকে মাথা রাখে। বোঝায় ও ডাকবে। নীরা ভোরে করেনি। পরীটার মা হতে ভালোই লাগবে ওর। কিন্তু পরী যাকে দাদাভাই বলছে, ভাবছে, মাঞ্ছে – তার মা হতে পারবে না নীরা। কখনোই না। এটা সব্বার ওকে বাবিনের কাজ থেকে আলাদা করার জন্য করছে। ও ওর বাবিনকে ভুলবে কী করে, ছাড়বে কী করে।

সন্ধ্যায় মা, বাবা এসেছিলেন। নীরার মা, বাবা, খুব একটা আসেন না। অনি-ই নিশ্চয় খবর দিয়েছে। বাবা মা এসে নীরার ঘরের সোফাতেই বসেছিলো। অনি ঐ ছেলেটাকে সাথে করে এসেছিলো তারপর। বাবা মা – ও বাবিন ভেবেছে। বাবাতো খুশিতে লাফিয়ে উঠেছিলো। ওকে কোলে টোলে নিয়ে - - আর মা কাঁদছিলো, অঝোরে। ওরাও কী ঠকছে? নাকি সবাই মিলে নীরাকে ঠকাছে। ছেলেটা দাদুভাই, দিদুন বলছিলো – দিব্যি। প্রণাম করেছিলো ঘরে এসেই। যেমন বাবিন করতো, এই সহবত গুলো তো নীরার শেখানো। এ শিখল কী করে, নিশ্চয় অনিই শিখিয়েছে। নীরাকে বাবিনের দেখভাল ঠিক করে করতে বলে গেছে মা – বাবা, এর মানে ও এখানেই থাকবে। 

মনিপিসি আর নিধু কাকাকে বলে বাবিনের ঘর পরিস্কার করিয়েছে নীরা। বাবা-মা যাওয়ার পর। খাকবে যখন ওখানে শোবে। বাবিন যদিও ওখানে ক’দিন ঘুমিয়েছে যাতে গুণে বলা যাবে। রোজ দিনই সে জেদ করতো বাপি মামণির মাঝে ঘুমাবে। বড় হলে রোজ জেদ রাখবো না অনি। সেপারেশন অভ্যাস করছিলো। নীরার ইচ্ছা না থাকলেও বাবিনের ভালোর জন্য সায় দিতো। শুতে গিয়েই আবার ফিরে চলে আসতো কোন কোনদিন। ভয় লাগছে বলে অনি আর গম্ভীর মুখ করে থাকতে পারতো না। বাহানা জেনেও হেসে ফেলত। দুজনের মাঝে নিয়ে নিতো। বাবিন যাওয়ার পর অনি তো আর এ ঘরে শুতোই না। নিজের বেডরুমে আলাদা শুতো, হালে তো আবার শুতো, পরীকে মাঝে রেখে।

“বাবিনকে কোথায় রেখে আসবো?” “ওর জন্য ঘর পরিষ্কার করিয়েছি”। “একা শোবে, এতদিন পর এলো?” অনিরুদ্ধ নিজের কাঁধে অনিকেতের হাতের চাপটের #### “হ্যাঁ, বড় হয়েছে। তুমিই তো সেপারেশন অভ্যাস করাতে চাইতে, আর অনি – ও আমায় বাবিন নয়। তাই ওকে এই বিছানায় আমি মানবোও না – বাবিনের জায়গাতেও মানবো না”। নীরা চাপা গলায় বললো, “নীরা! সবাই মানছে তোমার সমস্যা কোথায় শুনি?” একটু বেশি বাড়াবাবি করে ফেলছো না?” অনিরুদ্ধ ধমকে ওঠে, নীরা কিছু বলার আগেই অনিকেত বলে, “বাপি, মামণিকে বকো না। মামণির কষ্ট হবে, কাঁদবে, আমি একা শুতে পারবো। আমাকে রেখে এসো”। অনিরুদ্ধ নীরার দিকে তাকালো, “দেখেছো, কত ভালোবাসে তোমায়? নিজের পার্টটা ভাবছে না – তোমার পার্ট ভাবছে। না বাবিন – একা কেন? তুমি বাপির সাথে শোবে”। “তুমি আসবে না?” নীরা বলে, “না, আমি আমার বাবিনের সাথে থাকবো, ছেলেটা এতদিন পর এসেছে। ওকে ছেরে থাকতে পারবো না”। বলেই চলে গিয়েছিলো অনি। নীরা অবাক হয়েছিলো, ঐ ছেলেটাকে এত ভালোবাসছে অনি? বাবিনের মতো করেই তো। নাকি তার থেকেও বেশি! ভালবাসলে কেন ভালোবাসছে এভাবে! নীরার মনে একটা অদ্ভুত কষ্ট শুরু হলো, রাগও। বুকের ভেতরটা জ্বলছে যেন, একেই কী ঈর্ষা বলে? কিন্তু ঈর্ষাটা কাকে, ঐটুকু ছেলে? কেন? নিজেই বুঝলো না নীরা।

পর্ব – ২১

"স্কুল থেকে ফিরে টিউশন! কোথায়? প্রতীক - দেখো তোমার বোন কী বলছে"। শাঁওলি স্কুলে বেড়োবার আগে বৌদিকে বলেছিলো টিউশন করতে যাবে। যেতে তো হবে অনিদার ওখানে, ফাদারের নির্দেশে, অনিকেত কেমন আছে, দেখতে, "টিউশন? না, না, ওসবের দরকার নেই, মিত্রা - তোমার আদরের বোনকে না করে দাও। নেট টা দিক এক মন দিয়ে, "প্রতীক সাফ বলে দেয়, "যেতে হবে, দাদাভাই। ফাদার অগাস্টিন পাঠাচ্ছেন। "ফাদার! নিয়ে পাঠাচ্ছেন। তাও টিউশন করতো কোথায়?" মিত্রা শাঁওলিকে চেপে ধরলেন। "ওহ, বৌদিমনি, তোমার পুলিশি জেরা সবসময়। "দেখেছো? কেমন কথা হয়েছে?"মিত্রা ননদকে খুব ভালোবাসে, বিয়ে হয়ে আসার সময় শাঁওলি বছর বারোর ছিলো। সেই থেকে শাঁওলি মিত্রার আদরে, শাসনে বড় হয়েছে। বৌদি ননদে খুব বন্ধুত্বো আছে – আবার ভয়টাও বৌদিকেই পায়। দাদাভাই – এর কাছ থেকে কিছু আদায় করতে হলে বা পারমিশন নিতে হলেও বৌদিমণিই ভরসা। “দাও, দু-চার ঘা, ঠিক হয়ে যাবে”। প্রতীক হেসে বলে, শাঁওলি বৌদিমণিকে জড়িয়ে ধরে, “যেতে হবে, তুমি পারমিশন দাও”। “আমি তো জেরা করি! পারমিশন কাকুর থেকে নে”। “ইস! না, না, দাও না পারমিশন”। “কথায় যাবি ঠিক করে বল আগে”, “অনিদার বাড়ি”, প্রতীক অবাক হয়, “অনির বাড়ি কেন রে?” “অনিদা কাল আমাদের অরফ্যানেজ থেকে একটা বাচ্চা আডপ্ট করেছে”। “বাচ্চা! কতটুকু? অনি আডপ্ট করলো? ওরা তো খুব অর্থাডকস”। “ছয় বছর বয়স, অনিকেত ওরনাম, খুব ভালো ছেলে, ওকে নাকি অনিদার বাবিনের মতোই দেখতে,” প্রতীক এবার বুঝলো, “আচ্ছা, বাবিনের মতো দেখতে টাই আনল তবে, তা তো কি কাজ সেখানে?” “দু’মাস অব্জার ভেটরি যোদু চলতে দাদাভাই, আমাকে গিয়ে দেখতে হবে অনিকেত ঠিক আছে কিনা”। মিত্রা অবাক হলো, “তুই কেন? তুই তো ছোটো”। “জানি না বৌদিমণি, ফাদারের নির্দেশ”, “হয়তো অনির সাথে ওর পূর্ব পরিচয় আছে বলেই ফাদার ওকে বোঝাছেন”। প্রতীক বললো, “হয়তো, ঠিক আছে মা, সাবধানে থাকবি, তাড়াতাড়ি ফিরবি। আর ওরা তো ভীষণ বড়লোক। বুঝে শুনে কথা বলবি, চলবিত্ত, “ভীষণ বড়লোক! অনিদাকে দেখে তো বোঝাই যায় না সেসব। “আচ্ছা”, “কীভাবে যাবি?” “গাড়িতে, অনিদাদেরই গাড়ি। অনিকেতকে নিতে স্কুলে আসবে তো। ওর আগে ## হলেও পরে আমাকে নিয়ে যাবে, বাড়ি দিয়ে যাবে”। “অনিকেত তোদের স্কুলেই পড়বে?” “হ্যাঁ, মিড সেশনে কোথায় যাবে? আমি তো বলেছি পরীকেও আমাদের স্কুলে দিতে”। “পরী?” মিত্রা অবাক হয়, “অনিদার ভাইঝি, অনিদাদের সাথেই থাকে। খুব মিষ্টি আর টরটরে”। মিত্রা শাঁওলির জন্য টিফিন প্যাক করতে থাকে। “তোর মতোই তবে”। “এত টিফিন! দিওনা! নষ্ট হবে!” মিত্রা চোখ বড় করে”। “পুরোটা খেয়ে, আসবি”। “দেখেছ দাদাভাই, খালি বকে”। পরতীক জানে এগুলো খুনসুটি। মুচকি হাসে, মিত্রা বলে, “যখন ফিরবি, দাদাভাই থাকবে তো?” শাঁওলি জিভ কাটে। “অইতো! দাদাভাই তো পাটনা যাচ্ছে! ভুলেই গিয়েছিলাম। না, না বৌদিমণি – তুমিতো বকবেই। তুমি ছাড়া কে বকবে বলো?” মিত্রা বলে, “না খেয়ে বাড়ি এলে তোমার হবে”। শাঁওলি বৌদির থেকে টিফিন বক্স নেয়। জুতো পরে, “আসি, দাদাভাই, আসি, বৌদিমণি”। শাঁওলি গেলে ঘড়ি দেখে মিত্রা, সাড়ে ছটা, মেয়েকে তুলতে হবে, স্কুলে যাবে। ওর স্কুল কাছেই। শাঁওলির স্কুল দূরে অনেক শ্বশুর – শাশুড়ীরা ঘমোছেন। ওদের দাকে না মিত্রা, বয়স হয়েছে, নিজে উঠেই দুজঙ্কে স্কুলে পাঠায়, রোজ। তারপর কাকিমা উঠে চাক্রে, মিত্রা জলখাবার করে স্নানে যায়, ন’টায় ওকেও বেরোতে হয়। সরকারী অফিসে কাজ করে মিত্রা, ইন্ডিয়া পোষ্টে। “ছেলেমানুষই রয়ে গেলো”। বোনকে উদ্দেশ্য করে বলে প্রতীক। “থাকুক, পি এইচ ডি টা করে নিক, তারপর বিয়ে থার কথা ভাববে”। “আমি তো ভাবছিই না”। “মা-বাবা, কাকা-কাকিমা - -“ “আমি বোঝাবো, সবে তেইশ তো, এখনি কি”। “চাকরিটা ছাড়াও নেটের জন্য পড়ুক, “আমরা থাকতে চাকরির কি দরকার এখনি”। স্কুলটা মনে হয় ও এনজয় করে, মিরা”। “আর এই যে অতিরিক্ত হাঙ্গামা গুলো”। “অনিদের বাড়ি যাওয়ার কথা বলছো?” “ব্যাপারটা আমার ভালো ঠেকছে না”। “দেখোই না ক’দিন, না হলে আটকাবে”। “তোমার বন্ধুর বাড়ি – তুমি ভালো বুঝবে”। “অনি খুব ভালো ছেলে, মিত্রা। খুব ডাউন টু আর্থ”। “আর ওর ওয়াইফ?” “জানি নয়া, এডভোকেট শুনেছি। বিয়েতে বলেছিলো আমায়, রেসেপশনে দেখেছি, খুব সুন্দরী”। তেইশ তো বিপদ”। প্রতীক হাসলো, “হ্যাঁ – একটা অহংকার থাকে সৌন্দর্যের, কিন্তু মনে হয় তেমন নয়। নাহলে অনির সাথে মানাতে পারতো না”। “লাভ ম্যারেজ?” “না, না, আরেজ্ঞড, অনির কাকিমণি দেখে শুনেই দিয়েছেন”। “অনিরুদ্ধবাবুর মা-বাবা নেই, তাই না?” “না, আমাদের বিয়ের সময় নাগাদই মারা যান, আয়াক্সিডেন্টে”। ঐ জন্যি অনি আমাদের বিয়েতে আসতে পারেনি”। “আমাদের বিয়ে তো ওঠছুড়ি। তার বিয়ে ...” মিত্রা মুচকি হাসে, “নাহলে যদি ফস্কে যেতে?” প্রতীক চোখ মারে, “সরকারী চাকরি পাওয়া মেয়ে – যদি বাড়ি থেকে অন্যত্র দিয়ে দেয়? তাই আর দেরী করিনি। চটপট একটা চাকরি জুটিয়ে, বিয়ে”। “এখন মনে হয় – ভালোই করেছি। না হলে এত তাড়াতাড়ি সব দিকে এগোতাম না”। মিত্রার চোখে খুশির ঝলক দেখে প্রতীক, “বিয়ের তাড়া না থাকলে আগে দু-চার বছর বাবার হোটেলে চালাতাম বলছো?” মিত্রা মুচকি হাসে, “রিজিওনাল ম্যানেজার তো হতে না – পঁয়ত্রিশেই”। প্রতীক মিত্রার হাত ধরলো। “সব তোমার জন্য”। মিত্রা কিছু বললো না আর। 

পর্ব – ২২

স্কুল থেকে ফিরে গাড়ি থেকে নামতে যাবে, অনিকেতকে ঘিরে ধরলো দু-তিনজন। এরা এ বাড়িতে কাজ করে। একজনকে চেনে অনিকেত, নিধুকাকা বলে বাপি। নিধু দাদু বললো, “ব্যাগটা নিয়ে দাও খোকাবাবু”। “কেন?” “ভারী না? ও নিয়ে যাবে, একটা ছেলেকে দেখালো”। “না, না, থাক নিধুদাদু, তুমি খেয়েছো?” নিধুদাদু অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলো। ওকে কি কেউ জিজ্ঞাসা করে না খেয়েছে কিনা, “খেয়ে নাও সবাই। আমি সিঁড়ি দিয়ে চলে যাবো”। অনিকেত নিজের ব্যাগ লোককে দিয়ে বওয়াবি কেন? ও তো নিজেই পারে। আজ ওর আগে আগে ছুটি হয়েছে। শাঁওলি মিস বলেছিলো একসাথে আসবে। কিন্তু মিসের তো অনেক দেরি হবে – তাই বাপিকে বলে ও একাই ফিরে এসেছে। ওকে দিয়ে গাড়িটা সবসময় স্কুলের সামনেই পার্ক করা থাকে। বাপি শাঁওলি মিসকে দিয়ে গাড়িতে তুলিয়ে ড্রাইভার কাকুর সাথে কথা বলে তবে ছেড়েছে। 

ক’টা বাজে?বারোটা কুড়ি! এ মা, বোনও ফেরেনি তাহলে! বোন ফেরে দুটোয়। অনিকেত ফেরে চারটেয়। বোন পুচকি, ওর ছোট্ট স্কুল। তার মানে ঠাম্মাও আসেনি। ঠাম্মা আসবে দেড়টায়। বোনকে স্নান করাবে, খাওয়াবে – মামণিকে খাওয়াবে – বোন, মামণি ঘুমোলে নিজেও বাপির ঘরে শোবে একটু। অনিকেত এলেই আবার অনিকেতে নিয়ে, পড়বে।খাওয়ানো, ড্রেস চেঞ্জ করানো – অনিকেত যত বলে পারবে, ঠাম্মা ছাড়বেই না। মিসের কাছে পড়তে বসার আগে দুইভাই বোনকে একটুক্ষণ মাঠে ছাড়ে ঠাম্মা। খেলে এসে পাঁচটা থেকে মিসের কাছে পড়ে আবার বাপি এলে বাপির কাছে পড়তে হয় অনিকেতকে। গত দুদিনে এই রুটিনটাই দেখেছে অনিকেত। কিন্তু আজ কী হবে, আজতো ও আর মানণিই শুধু – উপরে।

মামণি কোথায়? দেখতে ইচ্ছা করে অনিকেতের। মামণির ঘরে উঁকি মারে।স্কুল থেকে এসে পিঠের ব্যাগ রাখেনি জুতোটাও খোলেনি। মামণি এমন সময় নাকি ঘরে থেকে দাদার ছবির সাথে কথা বলে। বোন বলেছে। এখনো কি তাই বলছে? এই দেখার কৌতুহলে উঁকি দিয়ে ফেলে অনিকেত, আর ধরা পড়ে যায়। নীরা বলে, “কে ওখানে?” নীরা পরী আসার আগে নিয়ে স্নান করবে বলে রেডি হচ্ছিলো। হটাৎ উঁকিটা ওর নজর এড়ায় না। ঐ বাচ্চাটা না? এখন? ওর তো স্কুলে থাকার কথা। চারটেয় ফেরে, ফিরে একটু খেয়ে খেলে পড়তে বসে, এখন কী করছে? অনিকেত বোঝে না উত্তর দেবে কি দেবে না। লুকিয়ে যাবে? কোথায় লুকোবে? বাপির ঘরে? বাপির ঘরেও যদি মামণি চলে আসে খুঁজতে খুঁজতে। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে যায় অনিকেত। নীরা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়ানো অনিকেতকে দেখে। হঠাৎ-ই রেগে যায়, “উঁকি দিচ্ছিলিস?” “না, মামণি”। “আমি দেখলাম তো, আবার মিথ্যাও বলতে জানিস?” নীরা কান ধরে অনিকেতের, “কারোর ঘরে উঁকি দিতে নেই – জানা নেই?” অনিকেতের চোখ ছলছল করে।নীরা দেখে। নিজের রাগটা কমায়। কান ধরে টেনে নিয়ে টুলে বসায়। পিঠের ব্যাগটা খোলায়। পাশের চেয়ারে রাখে। “এখন ফিরলি?” “আজ একটা পেপের ছিলো জাস্ট”।অনিকেতের চোখ দিয়ে জল পড়ে। নীরা মুখটা তুলে ধরে, “চোখ মোছ, অনিকে বলে এসেছিস?” “বাপিই তো গাড়ির ড্রাইভার কাকুকে বলে দিলো ----“ নীরা নিশ্চিত হলো। অনি জানে তবে। মণি পিসি এসে পড়ে ছিলেন ততক্ষণে। “বৌমা- আমি চেঞ্জ করিয়ে দিচ্ছি ----“নীরা ভাবলো একটু, বাবিনকে তো মণিপিসি চেঞ্জ করিয়ে খাইয়ে দিতেন। একেও -- হঠাৎ ছেলেটার মুখের স্বস্তির ভাব দেখে মত বদলায় নীরা। ও নিজেই করাবে, ভয়টা বজায় রাখতে চায় নীরা। “না মনিপিসি, আপনি যান। আমি করাচ্ছি”। “তুমি পারবে? বাবিনকে তো আমিই –“ নীরা আড়চোখে দেখে মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে ছেলেটার, “পরীকেও তো করাই। কাকিমণির আসতে দেরি হলে – কে করায় তখন? আপনি যান।" মনিপিসি চলে গেলে নীরা জুতো খোলাতে যায়। “আমি পারি মামণি”। “আবার কথা?” নীরা জুতো মোজা খুলিয়ে দেয়, “কী পেপার ছিলো তোর?” “ইংলিশ”। “কোয়েশ্চেন পেপার কোথায়?” “খাতায় কোয়েশ্চেন লিখে এক সাথে তো খাতা জমা নিয়েছে। দিলে, দেখাবো, তুমি দেখবে?” নীরা বলে, “হ্যাঁ, স্কুল থেকে এসে, আগে দেখাবি”। “আচ্ছা, মামণি ----“ মামণি ডাকটাকে নীরা না করতে পারেনি। এই ছেলেটাও বাবিনের মতোই। মা হারা, কোথায় না কোথায় মা’কে হারিয়ে ফেলে এসেছে— যদি নীরাকে মামণি বলে আনন্দ পায়, পাক, “বল, “ “আমি চেঞ্জ করে নিচ্ছি। পারি সব। ওখানে তো একাই করতাম”। “ওখানে?” “যেখানে রেখে এসেছিলে আমায়। স্কুলের পাশে। অনেক ছেলেরা থাকতো”। “হোস্টেল?” “হোস্টেলই, কী একটা বলে – হ্যাঁ – অরফ্যানেজ”। নীরা বুঝলো স্কুলের লাগোয়া অরফ্যানেজের বাচ্চা। অনি আনার সময় বলেছে যে ওরাই রেখে এসেছিলো। “অত পারতে হবে না। জামা কাপড় কোথায়?” “বাপির ঘরে”। নীরা ইচ্ছা করেই ভাঙ্গলো না কিছুই। বাচ্চাটার মনে আঘাত দিতে ওর বাঁধে। অথচ বাবিনের জায়গায় বসাতেও আটকায়।

নীরা ঘরে ঢুকে দরজা ভেজায়। অনির কাবার্ড খোলে। ছেলেটার জামাও এখানে!ওর ঘরে রাখলেই তো পারে। অনির বড্ড প্রশ্রয়। রাতে নিয়ে ঘুমোনো, বাবিনকে তো আলাদা করতে ব্যস্ত হতো। নাকি নতুন জায়গায় যাতে ভয় না পায় তার জন্যই এমন করে। অনিকে বলবে আজই – একা শোওয়াতে। না হলে অভ্যাস হবে না। অনি একে বাবাই-এর থেকেও বেশি ভালোবাসে? তা কি করে হয়? পরীক্ষা নেবে নীরা, আজই নেবে। অনিকেতের জামা খোলায় নীরা। ভিতরে গেঞ্জিও পরিয়েছে অনি। বুদ্ধি করে। গেঞ্জিটা ভিজে জল হয়ে গেছে। অক্টোবর মাস – এত ঘাম তো উচিৎ নয়। ভয়ে, নাকি? কে জানে! স্নান করিয়ে দেবে আবার, ঠিক করলো নীরা, “এত ঘেমেছিস কেন?” নীরা টাওয়েল দিয়ে ঘাম মুছিয়ে দেয়, “এটা ধরে থাক, পরে বাথরুমে যাবি”। টাওয়েলটা অনিকেতের হাতে দেয় নীরা। প্যান্ট খুলিয়ে দেয়। দিয়েই থমকায় ডান থায়ের বাইরের উপরের দিকে ভিতর ঘেঁষা তিলটাতে চোখ আটকায়। হাত দিয়ে ডলে দেখে। না – তিলই। “এই তিলটা তো ছোট্ট থেকেই, মামণি”। নীরা গম্ভীর হয়। ও বুঝতে পারে না এটা কী করে হলো? বাবিনেরও এখানেই তিল আছে। “তুমি জানো না?” “জানি, ঐ জন্যই দেখলাম”। নীরা টাওয়েল পরায়। “চল”, “কোথায়?” “স্নানে”। “সকালে করেছি তো মামণি”। নীরা কান ধরে আবারো। “ঘাম গা সপসপ করছে এর মধ্যে জামা পরে খাবি? চল, স্নানে চল আগে। "অনিকেত বোঝে মামণি খুব রাগী। মুখে মুখে কথা বললেই রেগে যাবে। চুপ হয়ে যায় ও। নীরা কান ধরেই নিয়ে যায় বাথ্রুমে। অনি নীরাকে শাসন না করার জন্য দোষ দিতো আগে। এবার আর দোষ দিতে পারবে না।

বাথরুমের দরজায় নক শুনে শাওয়ার অফ করে নীরা। “নীরা – ভেতরে বাবিন আছে?” কাকিমণির গলা। চিন্তিত লাগছে। “স্নান করাচ্ছি কাকিমণি”। নীরার জবাব শুনে সুহাসিনীর বুকের ধড় ফড়ানি কমে। অনি যেই বলেছে বাবিন আগে ভাগে চলে এসেছে সুহাসিনী হুটোপাটা করে চলে এসেছেন। নীরা যদি বাবিনকে অন্য কারোর হাতে খাওয়াতে ছেড়ে দেয় – আর আগেই পৌঁছতে হবে। “আচ্ছা – করিয়ে নাও। এখন স্নান, নীরা?” “ঘেমে গিয়েছিলো খুব।"একটু পরেই টাওয়েল পরা বাবিনকে নিয়ে বেরিয়ে আসে নিরা। “খাবার গরম করছি, ছেলেকে চেঞ্জ করিয়ে নিয়ে এসো”। “আচ্ছা”। “বাবিন – পেপার কেমন গেল?” “ভালো, ঠাম্মা”। সব পেরেছো?” “হ্যাঁ”, নীরা অবাক হয়, “স-ব পারলি?” “নীরা, তোমার বাবিন বড় হয়ে যেমন শান্ত হয়েছে – তেমনি পড়া শুনাতেও ভালো হয়েছে। ক্লাসে ফার্স্ট হয়”। নীরা মুচকি হাসলো। ঐ জন্যই অনির এত পছন্দ এই বাচ্চাটাকে। শান্ত, ভদ্র, ফার্স্ট হয় – যেমন অনি চেয়েছিলো – তেমনি। 

“তোমার কাকা এসেছিলেন কাল?” অনিকেতকে খাওয়াতে খাওয়াতে নীরাকে প্রশ্ন করলেন সুহাসিনী। নীরা স্নান করে এসে চুল মুছছিলো। “হ্যাঁ, সন্ধ্যা বেলা এসেছিলেন, কাকিমণি”। “কিছু বললেন?” “না, না, বাচ্চাদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন সারাক্ষণ, ওদের জন্য কত কী নিয়ে এসেছেন”। “কত কী?” “অনেক কিছু ঠাম্মা। বোনের জামা, আমার জামা, খেলনা গাড়ি, ব্যাট, বল, ফুটবল ----“ “বাব্বাঃ!অনেক কিছু তো”। সুহাসিনী হাসলেন। “বাবিন ফিরে আসায় খুব খুশি উনি”। নীরা কাকিমণির মুখে কাকার প্রশংসা শুনে অবাক হলেও মুখে কিছু বললো না। কাল যেমন অনিও চুপ করেই ছিলো। “ঠাম্মা, এই দাদুভাই তোমার হাসব্যান্ড?” সুহাসিনী অনিকেতের গালে আদর করেন। “হ্যাঁ ঠাকুরদাদা হয়, বাবিন”। “তাহলে – ঐ দাদুভাই?” সুহাসিনী চমকে ওঠেন। নীরা, বোঝে ডাক্তার কাকার কথা বলছে ছেলেটা। “কাকিমণি – আমাকে প্লেটটা দিন তো, খাওয়ার নাম নেই শুধু গল্প!” অনিকেত ভয় পায়। “নীরা, বকো না। দেখো, কেমন ভয়ে কাঁপছে ছেলে। ঐ দাদুভাই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, বাবিন। আবার মস্ত ডাক্তার”। “ওহ।” সুহাসিনী অনিকেতের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন, “খেতে খেতে বাচ্চাকে বকতে নেই”। সুহাসিনী নীরাকে বলে। পরী স্কুল থেকে ফেরে তখনি। “দাদাভাই!” ছুটে চলে আসে ও। ওর ব্যাগ হাতে নিধুকাকা এসেছিলেন। “ব্যাগ রেখে দিন, কাকা”। নীরা বলে। “তুমি চলে এসেছো, স্কুল থেকে – দাদাভাই?” “হ্যাঁ – জাস্ট একটা পেপার ছিলো তো”। “কী মজা!” নীরা পরীর কাছে যায়। কোলে নেয় ওকে, দুগালে চুমু খায়। “মজা কেন?” অনিকেত অবাক হয়ে দেখে মামণি বোনের মামণিও না। জেঠিমণি, তাও বোনকে কত ভালোবাসে আর ওকে একটুও ভালোবাসে না। নাকি মায়েরা ওমনই হয়। বাপি বলছিলো ঠাম্মাও নাকি বাপিকে খুব শাসন করতো। মামণিও ওকে শাসন করে। “স্নান করবো, খাবো – খেলবো”। নীরা মানা করে, “একদম না! ঘুমোবে, খেলা পরে”। “ঘুমোতে হবে?” পরী কাঁচুমাচু মুখ করে, “হবেই তো”। “দাদাভাই-ও ঘুমোবে তবে”। অনিকেতের মুখ শুকিয়ে যায়। মামণি তো ওকে ও ঘরে শুতে দেয় না, বোন ঘুমোলে বাপি নিয়ে আসে – তাও একদিনও শুতে দেয়নি। “আমি মিসের হোমওয়ার্ক করবো বোন, তুই ঘুমো”। অনিকেত কথা ঘোরায়। “তাহলে আমিও হোমওয়ার্ক করবো”। “পরী!” পরী নীরার গলা জড়িয়ে দুগালে দুটো চুমু খায়, “প্লিজ জেঠিমণি। দাদাভাইকেও বলো ঘুমাতে”। নীরা পরীর কথা ফেলতে পারে না, “ঠিক আছে, আগে তুই চল স্নান করবি, খেয়ে নিয়ে তারপর ঘুম”।সুহাসিনী খুশি হন। নীরা পরীকে নিয়ে চলে গেলে অনিকেতকে বলে, “চটপট খেয়ে নাও বাবিন। তারপর ঘুমোবে”। অনিকেতের মনে খুব আনন্দ হচ্ছিল। বোনের জন্য আজ মামণির কাছে শুতে পারছে।

নীরা খেয়ে,ওষুধ খেয়ে শুতে এসে দেখলো দুইভাইবোনেই শুয়ে পড়েছে। ছেলেটার পাশেই শুয়ে পড়লো নীরা। “ঘুম না গল্প?” পরী লাফিয়ে উঠলো। “গল্প বলো জেঠিমণি”। “না, বোন-ঘুমা। উঠে মিসের পড়া করতে হবে। তারপর খেলতে যাবি”। অনিকেত বলে ওঠে। পরী নীরাকে অবাক করে ওর দাদাভাই এর কথা শোনে। দাদাভাইকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। অনিকেত আসতে করে পাশ ফেরে। দেখে মামণি জেগে। বোন যে বলে মামণি দুপুরে ওষুধ খেলেই ঘুমিয়ে পড়ে! এমা! আবার বকুনি দেবে! “ঘুম আসছে না?” অনিকেত চুপ করে থাকলো। “অনির কাছে তো দিব্যি ঘুমাস”। “বাপি তো গল্প বলে, কোলের মধ্যে নেয়”। নীরা হাসলো, “ওখানে তো একাই ঘুমোতিস, তাহলে?” “সরি মামণি, ঘুমোচ্ছি। “নীরা বলে। “বাপি পড়ায়?” “রোজ”। “বকে?” “না, না, আমার তো রেডি থাকে সব”। “মিস কেমন?” “ভালো”।“মিস বকে না?” “না, কেউ বকে না। “বলেই থমকে তাকালো অনিকেত। নীরা বললো, “ঘুম না এলে পড় ও ঘরে গিয়ে”, অনিকেত সাহস করে নীরার কোল ঘেঁষে এলো। “পড়া রেডি”।“দেখতে হবে বলছিলি যে?” “ওটা বোনকে বললাম। তুমি এঘরে শুলে বকো তো, ও তো জানে না”। নীরা বোঝে ওকে ঢাকতে গিয়ে এটা করেছে ছেলেটা। নীরা হাসে, “চোখ বন্ধ কর তবে”। “মিস এলে তুলে দিও। “ অনিকেত বলে, “চুপ করে না ঘুমালে, এখনি তুলে কান ধরে দাঁড় করিয়ে দেবো ঘরের কোণে”। অনিকেত চটজলদি চোখ বুঁজলো। নীরা ওর গায়ে একটা হাত রাখলো। অনিকেত এটাই চাইছিলো, নীরা জানে। “ঘুমো।বড্ড বেশি কথা হয়েছে তোর, পাকাপাকা। আমাকেই এবার সব ঠিক করতে হবে”। নীরা ইচ্ছা করেই বলল। ভয় থাকা ভালো। তাহলে বাবিনের মতো অবাধ্য হয়ে পালাতে সাহস করবে না। এই ছেলেটাকে ছেড়ে অনি থাকতে পারবে না তিনদিনেই বুঝেছে নীরা, তাই অনির জন্যই ওকে হারাতে চায় না। বাবিনের মতো একই জায়গায় তিল ছেলেটার। এই কথাটা কাকে বলবে নীরা? কাকিমণিকে – নাকি অনিকেই, ভেবে কূল পেলো না নীরা।

পর্ব – ২৩

পরীদের মিস এসেছিলো। ওরা পড়তে বসলে কাকিমণি চলে গেলেন। নীরা এই মিসকে দেখেনি এখনো। আজ দেখবে, বাবিনকেও কেবল নিজেই পড়িয়েছে। আর অল্পস্বল্প অনি। মিস লাগেনি। অনির মাথায় মিসের ভুত চাপলো কেন হঠাৎ নীরা বুঝছে না। ছেলেটার স্কুলের মিস নাকি? স্কুলের হলেই কী বাড়িতে রাখতে হবে? নীরা পরীকে পড়ায়, ওকেও পড়িয়ে দেবে। নাকি নীরা ওকে পড়াবে না ভেবেই - - তাই হবে হয়তো। তবে এই মিস কেমন পড়ায় – দেখবে নীরা, পছন্দ না হলে অনিকে বলে, তাড়াবে।

“পরী –“ দরজার কাছে থেকে গলাটা পেয়ে তাকালো শাঁওলি, বৌদিই নিশ্চয়, এত সুন্দর যখন। হ্যাঁ – অনিদার মোবাইলের ছবির সাথে মেলে, শাঁওলি দেখলো পরী লাফিয়ে উঠেছে, “জেঠিমণি!” অনিকেতকে দেখলো শাঁওলি। চুপ করে গেছে, ভয় পায় কী বৌদিকে? “বৌদি – আসুন না, বসুন”। বৌদি শুনে একটু অবাক হলেও মুখে প্রকাশ করলো না নীরা। পরীকে কোলে নিয়ে বসলো। বৌদিকে খুঁটিয়ে দেখছিলো শাঁওলি। অনিদা বললো অসুস্থ, কই – মনে হয় না তো। “পরী পড়ছে ঠিক করে?” “হ্যাঁ – প্লে স্কুলের অল্প স্বল্প পড়া, কিন্তু পড়ে”। “আর বড়টা?” অনিকেত মামণির দিকে তাকালো। মামণি তাও বাবিন বললো না। “অনিকেত – মানে বাবিন তো ফার্ষ্ট বয়। ওর সব ছড়া তৈরীই থাকে”। অনিকেত নাম তবে ছেলেটার। “আপনাদের স্কুলে পড়তো তো আগে থেকে?” “এমা! আমাকে আপনি বলবেন না বৌদি, আমি অনেক ছোট, অনিদা তুই বলে”। নীরার খটকা লাগলো আবারো। “অনিদা মানে অনিরুদ্ধ? তুমি চেন?” “চিনবো না? আমার দাদার ছোট বেলার বন্ধু তো, কত গেছে আমাদের বাড়ি”। নীরা ক্ষুন্ন হলো। অনিরুদ্ধ ওকে এসব বলেনি তো, মেয়েটার বয়স বাইশ – তেইশ হবে। বেশি কথা বলে, ছটফটে, এ কী পড়াবে কে জানে! “হয়ে গেছে, মিস”। অনিকেত মিসকে খাতা দিলো। শাঁওলি সব চেক করে ফেরৎ দিলো অনিকেতকে, “বাহ, অল রাইট”, “ছুটি তাহলে?” অনিকেত বললো, শাঁওলি ছুটি দিতেই যাচ্ছিলো নীরা বললো, “একদম না, পরের চ্যাপ্টারটা খোল”। “হোমওয়ার্ক, ক্লাসওয়ার্ক, মিসের পড়া – সব কমপ্লিট, মামণি”। “কমপ্লিট বলে কিছু হয় না। ক্লাসের বইটা পুরো কমপ্লিট হলে, তবে কমপ্লিট হবে।তোমার নাম কী যেন?” “শাঁওলি চুপ করে বৌদির বকুনি শুনছিলো, “শাঁওলি, শাঁওলি রায়”। “বেশ ভালো ছাত্র পেয়েছো – সিলেবাস যত তাড়াতাড়ি পারো শেষ করাও। যত রিভিশন দেবে, ভালো হবে”। “আচ্ছা”, শাঁওলি তর্কে গেলো না। বৌদি রাগী খুব তবে।অনিদাকে বলতে হবে। “বেশি করে কাজ দাও বড়টাকে। না করে রাখলে আমাকে বলবে”। পরীকে কোলে করে উঠে দাঁড়ালো নীরা। “মিস গেলে আমাকে দেখাবি কতটা কী পড়লি”। অনিকেত বলে চলে গেলো নীরা, শাঁওলি বললো, “পরের চ্যাপ্টার তবে”। “হ্যাঁ, পড়িয়ে দাও মিস”। “মামণি বললো বলে?” “না, না, মামণি তো ঠিকই বলেছে, ঐটুকু পড়া আমার রোজ জলদি হয়ে যায়। বেশি করে পড়ে নিলে সিলেবাস তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে”। “ভয় লাগে, মামণিকে?” “না, না, মা-তো, আজ মামণির পাশে শুয়েওছি”। শাঁওলি খুশি হয়, “খুব ভালো”, “মামণি স্নানও করিয়ে দিয়েছে, চেঞ্জও, ঠাম্মা খাইয়েছে”। “গুড, ওখানকার কথা মনে পড়েনা?” “পড়ে, কিন্তু বাপি – মামণি – বোন – ঠাম্মা – দাদুভাই --- এদের কাছেই তো সবাই থাকে, বলো?” শাঁওলি হাসে, “বেশ, কাল তোর এত্ত বড় ফ্যামিলির একটা ছবি এঁকে নিয়ে ক্লাসে আসবি”। অনিকেত বেজায় খুশি হয়, “আসবো” বলে ওঠে ও।

অনিরুদ্ধ বাড়ি ফিরে দেখে বাবিন তখনো পড়ছে। নীরা অনিরুদ্ধকে দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। “চা খাবে?’ “করবে তুমি?” “খেলে করবো”। “বেশ, বাবিন পড়ছে এখনো?"”"হ্যাঁ, ওর মিসকে বলেছি ওকে পরের চ্যাপ্টার টাও পড়িয়ে তবে যেতে। অত অল্প পড়াতে ওর হচ্ছে না”। “ওহ, এখন ছুটি দিই একটু?” “পরে, আমি ডেকে নেবো”। অনিরুদ্ধ খুশি হলো, “আগে তো আমি যেদিন পড়াতাম আর তুমি বলতে এত পড়াচ্ছো কেন – ব্রেক দাও”। নীরা চা করছিলো, “বলতাম, সবার ক্ষমতা সমান হয় না। বাবিন এরকমের, এ আর একরকমের। কী যেন নাম – অনিকেত, তাই তো?” অনিরুদ্ধ বুঝলো নীরা জেনেছে নামটা। “কে বললো?” “তোমার বন্ধুর বোন, শাঁওলি। ওহ – এটাও তো বলোনি আমাকে”। “কী বলবো?” “শাঁওলি কে, কেমন মিস সেটা?” “বাবিনকে আনার পর থেকে তুমি কিছু শোনার মুডে ছিলে দুদিন যে বলবো? রাতে শুতে গেলেও তো তাড়াচ্ছও”। “তাড়াবো না? একা শোওয়াবে ওকে। বাবিনকে তো শোওয়াতে, সেপারেশন দরকার – মনে নেই?” “ভুল করতাম, বাবিনের সেপারেশন না – মা’কে দরকার”, নীরা তাকালো, “মোটেও না। তোমাকে জড়িয়েই তো দিব্যি ঘুমোয়”। অনিরুদ্ধ জানে এবার কী করতে হবে, নীরাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে, পিঠ থেকে চুপ সরিয়ে পিঠে, ঘাড়ে, গলায় চুমু খায়। “আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে হিংসা? বাবিনকে বলবো মামণিকে জড়িয়ে ঘুমোতে”। “ছাড়ো”। নীরা নিজেকে ছাড়ায়, “বাচ্চা কাচ্চা ভরা বাড়ি। লজ্জা করে না”। “লজ্জা কিসের? বাচ্চারা যদি দেখে তাদের মা’কে আদর করছি মন্দ কী?” অনিরুদ্ধ হাসে। “ওরও ওখানে তিল আছে –“ চমকে ওঠে অনিরুদ্ধ, “কার কোথায় তিল আছে?” “তুমি খেয়াল করোনি চেঞ্জ করাতে গিয়ে?” “বাবিনের?” “ডান থাইয়ের ভিতর দিকে, একই জায়গায়”। “তুমি কী করে দেখলে?” “চেঞ্জ করিয়েছি আজ আমি, স্নানও করিয়েছি। দুপুরে আমার পাশেই ঘুমিয়েছে”। অনিরুদ্ধ খুশি হলো খুব, এইতো বরফ গলছে। খুশিটা প্রকাশ করলো না। “একই জায়গায় তিল?” “হ্যাঁ”, “সেটাই তো থাকবে নীরা, ওতো বাবিনই”। নীরার মুখটা বিস্বাদ হলো, “মিথ্যা বলোনা অনি, কত মিথ্যা বলবে? জানি ওকে খুব ভালোবাসো। জানি ও শান্ত, ভদ্র, ক্লাসে ফার্ষ্ট হয় – এসব তোমার চাওয়ার ছিলো খুব। আমি ওকে যেতে বলবো না। কিন্তু ওকে বাবিন মানবো না, জোর করো না আমাকে”। অনিরুদ্ধ কথা বাড়ালো না। “এবার তো ছুটি দাও - - সাতটা বাজে”। নীরা দেওয়াল ঘড়ি দেখলো, “দেবো, আমি গিয়ে কাজ গুলো দেখে নিই, তারপর। আর আমি থাকতে আবার মিস টিস কেন অনি?” “তুমি চাও না?” “একদমই না, বাচাল মেয়ে একটা, সবসময় অনিদা অনিদা, ক্লাস নেই”। “এমন বলে না নীরা, বন্ধুর বোন আমার”। “সে হোক”। “ফাদার চান যে ও আসুক”। “ফাদার মানে?” “অগাষ্টিন, বাবিনের স্কুলের –“ ওহ, কেন? নজরদারি?” “প্লিজ নীরা – এভাবে বোলো না”। “কতদিন চলবে?” “দু’মাস”। “বেশ, তারপর যেন একদিনও না দেখি”। অনিরুদ্ধ বুঝলো নীরা কিছু একটা সেন্স করেছে শাঁওলির কথা থেকে, নাহলে এত কড়াভাবে বলার মেয়ে ও না। নিজে আর কথা বাড়ালো না।

পর্ব – ২৪

সুহাসিনী রুদ্রদেবের সাথে দেখা করতে বেড়িয়ে ছিলেন। ক্যাফেতে বসেছেন দুজনে। রুদ্রদেবেরই জরুরি তলব ছিলো। “বলো, রুদ্র, হঠাৎ ডাকলে?” “হ্যাঁ, জরুরি কথা আছে”। “বলো”,।“এতো তাড়া কেন? আগে ভাবো আমরা এভাবে মুখোমুখি একলা –“ “চৌত্রিশ বছর পাঁচ মাস বারো দিন পর”। রুদ্রদেব অবাক হলেন, “এক্স্যাক্ট ডেট মনে আছে?” “মেয়েদের মনে থাকে”। রুদ্রদেব সুহাসিনীর হাতে হাত রাখলেন। “আমারো মনে আছে।সু, তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে, আজ”। “জরুরি তলব কী এটা বলবে বলে?” “উঁহু, দাঁড়াও আগে অর্ডার দিই”। অর্ডার দিয়ে রুদ্রদেব বললেন, “অচ্যুত কাল অনির কাছে গিয়েছিলো?” “তোমার ও বাড়িতে স্পাইটাকে, বলো তো?”

“স্পাই না।এটা অনি বলেছে। ও তো বেশ অবাক হয়েছে, এত ভালো ব্যবহারে”।" আমার সাথেও হঠাৎ-ই খুব ভালো ব্যবহার করছে”। “যেমন?” “ওর বাইরের অ্যাফেয়ারটা জানতাম বলায় জোঁকের মুখে নুন পড়ার মতো করছে”। “বলে দিয়েছো?” “আর কতদিন চেপে রাখবো?” “এখনো আছে?” “বললো তো নেই, ওর কথা কি বিশ্বাস করা যায়?” “আর কী চেঞ্জ?” “কাছে আসতে চাইছে ...।“ রুদ্রদেব ভ্রু কুচকালেন। “কাছে?” “সেভাবে নয়।অনিকে আগের মতো করে ভালোবাসবে বললো। পুরনো সব কথা মনে করালো..”। “বিশ্বাস করলে?” “নাহ, অবিশ্বাসও করিনি। কাল গিয়ে বাবিনকে অনেক কিছু দিয়েও এসেছে”। “নতুন কোন ফন্দী আছে কী?” “হতে পারে,সতর্ক আছি”। “নীরা ঠিক আছে?” “অনেকটাই, আজ বাবিনকে নিজে হাতে স্নান করিয়েছে,চেঞ্জ করিয়েছে, ঘুম পাড়িয়েছে”। “বাহ, ডক্টর চক্রবর্তীকে ও বাড়ি নিয়ে যাবো একদিন -এর মধ্যেই”। “এগুলোই জিজ্ঞাসা করার ছিলো তো?” রুদ্রদেব হাসেন, “হ্যাঁ, তবে এই বাহানায় এত বছর পর একটা ডেট - এই বা কম কী”।সুহাসিনী রুদ্রদেবের হাতে হাত রাখলেন, “অচ্যুত সেদিন বলছিলো ওকে ছেড়ে যাবো না কথা দিতে”। রুদ্রদেব চমকালেন “হঠাৎ?” “ওর অ্যাফেয়ার জেনে গেছি শুনে ....।“ “কি বললে? যাবে না?” “যাবো আর কোথায়?” “কেন? জায়গার অভাব?” “খুব”, “আমার মনের ভিতর অনেক বড় ঘর আছে সু, আসবে?” সুহাসিনী রুদ্রদেবের হাত চেপে ধরলেন, “নতুন করে আসতে হবে বলছো?” “পাকাপাকি, এবার ,অনেক তো হলো সুহাসিনী, আর লোক সমাজ সংসারের ভয় করলে হবে?” “ভেবে বলছো?” “সারাদিন এই নিয়েই ভাবছি”। “ঘর সংসার, ছেলেপুলে বিশেষত নীরা,অনি, বাবিনকে ছেড়ে, পরীকে ছেড়ে ....”"ওরা একটু সামালে নিক। তারপর না হয়, আসবে।” “যদি অচ্যুত কিছু করে বসে, রুদ্র?” রুদ্রদেব হেসে ফেললেন, “করতে পারে।সুইসাইডাল এটেম্পট বা সে জাতীয় কিছু। তবে সেটা নাটকই হবে, তার বেশি কিছু নয়”। “ওদের পরিবারের কোন একটা পাপ আর অভিশাপের কথা বলছিলো আমায়। ওর বিশ্বাস এর জন্যই অনির আগের দাদাভাইদের বাচ্চাটা মারা যায়, আর বাবিনও”। “অভিশাপ! স্ট্রেঞ্জ! আমার তো মনে হয় কেস দুটোই মার্ডার।স্লো পয়জনিং-এর মাধ্যমে কাছেরই কেউ একজন করেছে”। “দাদা আর দিদিভাই-এর অ্যাক্সিডেন্টটা ভাবো - -“ “হ্যাঁ, ওটাও অবাক করার মতো।তবে ওটা অ্যাক্সিডেন্টই মনে হয়। অভিশটা কী নিয়ে কিছু বলেছে?” “নাহ, রাতে বলেছিলো বলবে, সকালে। আর বলে নি”। “রাতে বলতে কি দোষ?” “অন্ধকারে নাকি বলা যাবে না”। রুদ্রদেব হো গো করে হেসে ফেলেন। “কুসংস্কার যতো”। “জানি, তবে অনিকে আগলে রাখার সিদ্ধান্তটা আমার ঠিক ছিলো – রুদ্র”। “হ্যাঁ, আর অচ্যুত সেখানে বাঁধা দেয়নি – এটাই অবাক করার মতো কথা”। “সাহায্য করেছে – সবসময়। ওর এই একটা বিষয়ে আমি কৃতজ্ঞ”। “আর আমি অবাক, যার ক্ষতি করলে লাভ – তাকে বাঁচাবো, কেন?” সুহাসিনী চমকান, “অচ্যুত এসব করিয়েছে বলে বিশ্বাস তোমার?” “সবচেয়ে বেশি লাভও তো ওর”। “অংক কষে সম্পর্কের সব বিচার হয়, রুদ্র? ও খারাপ, লোভী, দুশ্চরিত্রও বলতে পারো,কিন্তু কাউকে মেরে ফেলার মতো খতরনাক নয়”। “তাহলে আর কে তবে? নাকি এক্সিডেন্ট – আমরাই বেশি ভাবছি”। “অভিশাপটা কী জানতে হবে আমায়”। “বিশ্বাস করো এসবে?” “জানি না, তবে সবসময় কেউ না কেউ দেখছে আমায় – এমন ফিল করতাম”। “তোমাকে?” “হ্যাঁ, বিশেষত অনিকে যখন অতবড় বাড়িতে খুঁজে পেতাম না, এদিক ওদিক পাগলের মতো ছুটতাম – মনে হত পিছন থেকে কেউ দেখছে”। “স্ট্রেঞ্জ”। “একেবারেই। ঐ জন্যই কাছছাড়া করতাম না। তখন আমরা পুরনোবাড়িতে, মানে এখন যেটা অনিদের বাড়ি।একবার সন্ধ্যার পর পাতকুয়োর পাড়ে গিয়ে বল খুঁজছিলো সে। বীরপুরুষ তো জানেই। ভাইদের সামনের মাঠে বসিয়ে রেখে – একাই। বাড়ির পিছনের দিকে পাতকুয়ো।ওখানে যেতে হয়, পিছনের মাঠ পেরিয়ে।পাঁচিল ধারে দুপাশে কয়েকটা ঘর আছে। তখন ব্যবহার হতো, চাকর বাকররা থাকতো। সামনের নতুন সার্ভেন্টস কোয়ার্টার হয়নি তখনও।" “এখন তো ঘর গুলো ভাঙ্গা চোরা কনডেমড।""দীর্ঘদিনের অব্যবহারে।তখন লোক থাকতো।সামনের মাঠ থেকে পিছনের মাঠের ঐ দিকটা নজরে পরে না।দোতলা থেকে অনিকে সামনের মাঠে দেখতে না পেয়ে ছুটে মাঠে যাই।অতীন আর ছোটন ছিলো।দাদাভাই কই,ওরা তো বলবেই না প্রথমে।জানে,মা দাদাভাইকে পিছনের মাঠে ধরতে পারলে শেষ।আমি ধমক দিতেই বললো অতীন,নিজের পিঠে পড়বে ভয়ে।আমি ছুটে গিয়ে দেখি পাতকুয়োর মধ্যে শরীরের সত্তর ভাগ ঝুঁকে আছে – আর ত্রিশ ভাগ বাইরে। আমার মনে হলো কেউ ওকে ধাক্কা দেবে বলে তৈরি। একটুও অপেক্ষা না করে এক ঝটকায় টেনে আনলাম।মনে হলো এতে কেউ খুব অখুশি হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।যদিও আশেপাশে কেউ ছিলো না”। “ওগুলো তোমার মনের ভয়, সু”। “হয়তো, তবে আমি বোঝাতে পারবো না কেমন গা ছমছম করতো”। “এখন করে?” “নাহ, এ বাড়িটাতে আসার পর – আর গা ছমছম করেন। তবে অচ্যুত এখানেও ভয় পায়”। “ওই ঘটনার সময়,অনি কত বড় তখন?” “আট – কী নয় – ফোরে পড়ে মনে হয়।তবে,অনির পৈতে হতে আর কিন্তু গা ছমছম করতো না”। রুদ্রদেব হাসলেন, “দ্বিজত্বপ্রাপ্তি একেই বলে। তা সেদিন ঐ ভাবে উদ্ধার করে তোমার ছেলেকে ছেড়ে দিয়েছিলে? মনে তো হয় না”। রুদ্রদেব কথা ঘোরালেন। “খুব মেরেছিলাম। হুঁশ ছিলো না আমার। কুয়োরপাড় থেকে কান ধরে টানতে টানতে বাড়ি। বাড়ির বৈঠকখানাতে এসেই মার শুরু হয়েছিলো, শেষ হয়েছিলো আমার ঘরে। সারা বাড়ি, সারা ঘর, সিঁড়ি,সব্বার সামনে মার খেতে খেতে ঘুরেছিলেন বাঁদর”। “কে ঠেকালো?” “ওর কাকা, দোকান থেকে জলদি ফিরেছিলো সেদিন। এসেই ছোটগিন্নী – দরজা খোলো – মরে যাবে যে – এত কেউ মারে ....।“ রুদ্রদেব হাসলেন, “ওর কথায় দরজা খুলতে?” “খোলাতে না পেরে শেষে অনির দিব্যি দিতো।ঘরে ঢুকেই অনিকে কোলে তুলে নিতো, নিজে পিঠ পেতে দিতো”। “পতিদেবতাকেও দু’চার ঘা দিতে তখন, নাকি?” “হ্যাঁ, তাও খেয়েছে, তিনজনকে বাঁচাতে গিয়েই খেয়েছে। শাশুড়ি একবার দেখে ফেলেছিলেন ছোটছেলের পিঠে লাঠির দাগ – খুব বকেছিলেন আমাকে”। “তোমার আমাকে মারতে সাধ যায় না?” সুহাসিনী লজ্জা পেলেন, “এ কেমন কথা”, “যদি বলি – আমিও তোমার হাতে দু’চার ঘা খেতে চাই?” “তোমাকে মারবো কেন? তুমি তো ভালো”। রুদ্রদেব সুহাসিনীর হাতে চুমু খান। “জানো, ইংল্যান্ড সেটল হবার অফার আছে। তোমাকে নিয়ে যাবো ভাবছি একেবারে”। “সেটল! ওখানে?” “হ্যাঁ, অনিরা না হয় যাবে। মাঝে মধ্যে। একেবারে যেতে চাইলেও যাবে।আমার ছেলে পরিচয়ে।ওকে তো আমি নিজের ছেলেই ভেবেছি আজীবন, তোমার বাকি দুজন তো ত্যাজ্যমাতা করতে সময় নেবে না”। “ডিভোর্স?” “যদি না দেয় বলছো?” “হ্যাঁ”। “তোমাদের বিয়ের রেজিস্ট্রির কাগজ আছে?’ “নাহ”। “আমাদের থাকবে, চিন্তা কী”। “তা দিয়ে হবে?” “খুব হবে, ওসব ভাবনা ভেবনা, ওগুলো আমার ভাববার বিষয়, তুমি কেবল হ্যাঁ বলো”। সুহাসিনি একটু ভেবে বললেন, “সব ঠিক থাকলে – যাবো”। সুহাসিনী রুদ্রকে আর ফেরাতে চান না। “ঠিক থাকবে।সু – তুমি অভিশাপটা জেনো”। “বললে জানবো”। “চেষ্টা করো, বলবে”। “আচ্ছা”। “এর মধ্যেই আগের সমস্ত রহস্য লুকিয়ে আছে – আমার স্থির বিশ্বাস”। রুদ্রদেব স্পষ্ট করলেন। সুহাসিনী সম্মত হলো, সত্যিটা ওকে জানতে হবে, জানতেই হবে।

পর্ব – ২৫

রাতে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে ছিলো অনিকেত। একরকম জোর করেই, বাপি কিছুতেই চায়নি ও একা ঘুমোক। অথচ মামণি চায় ও একা ঘুমোক। মামণি তো ঠিকই বলেছে। বড় হয়ে গেছে অনিকেত। ওখানেও তো একাই ঘুমোতো। অনিকেতের জন্য বাপিকে ও ঘরে শুতে দিচ্ছে না মামণি। বাপিরা তো মামণিদের সাথেই থাকে, ও শুনেছে স্কুলের বন্ধুদের থেকে ,তাহলে ওর জন্য বাপি শুতে না পারলে ওদের দু’জনেরই খারাপ লাগবে, বোনেরও, তাই জেদ করেই একা শুয়ে অনিকেত। 

আজ দিনটা খুব ভালো গেছে। মামণির কাছে সন্ধ্যা বেলাতেও পড়েছে অনিকেত। বাপি এলে একটুক্ষণ ছুটি দিয়েছিলো মামণি। তারপর নিজে পড়াতে বসেছিল। মামণি খুব ভালো পড়ায়, বাপির থেকেও। মিসের থেকে তো বটেই।  তবে ভীষন স্ট্রিকট। অনিকেতের ক্লাসওয়ার্কের খাতায় স্পেলিং মিসটেক পেয়ে কানমলা দিয়েছে। সহজ বানান ভুল করে ফেলেছিলো অনিকেত, মামণি তো বকবেই। কাল থেকে স-ব খাতা বাড়ি এসে আগে মামণিকে দেখাতে হবে, তারপর অন্য কথা হবে, মামণি বলেই দিয়েছে। তবে মামণির কাছে পড়লে সেই চ্যাপ্টার নিজে আর না পড়লেও চলে। এত উদাহরণ দিয়ে সহজ করে বোঝায় – মুখস্ত হয়ে যায়। এবার থেকে মামনির কাছেই পড়বে অনিকেত। বকলে বকবে। কিন্তু পড়াবে দারুণ।

ভাবতে ভাবতেই ঘুম এসে গিয়েছিলো অনিকেতের ঘুমিয়েও পড়েছিলো ও। হটাৎ গায়ে কারো একটা নিঃশ্বাস পেয়ে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। চোখ খুলতে খুলতে দেখলো যে ঝুঁকে আছে তার মাথায় একরাশ চুল, খোলা। অনিকেতকে খুব কাছ থেকে দেখছে। মুখ দিয়ে কেমন একটা আওয়াজ করছে। টেনে টেনে শ্বাস নিচ্ছে যেন। কী করবে অনিকেত!চিৎকার করে উঠবে? কিন্তু ও বুঝে গেলে যদি গলা টিপে ধরে? দম বন্ধ করে শুয়ে থাকলো অনিকেত, বেশ কিছুক্ষণ এই পর্যবেক্ষণ চললো। অনিকেতের দুইবন্ধু আর ভাল্লুকের গল্প গুলোর কথা মনে ছিলো। গল্পে চালাক বন্ধুটাও এভাবে বেঁচেছিলো। মিনিট পাঁচেক পর শ্বাসের শব্দ বন্ধ হলো, পা টেনে টেনে চলে গেলো সে, একচোখ খুলে দেখলো অনিকেত। আবছা অন্ধকারে দেখলো গায়ে সাদা শাড়ি, খোলা চুল, পা টেনে হাঁটে, কে এ? অনিকেত তো এ বাড়িতে দেখেনি ওকে আগে? পেত্নী? গল্পে পড়েছে অনিকেত। বড় বড় বাড়িতে ভুত প্রেত পেত্নীরা থাকে। এ তেমন নয় তো? অনিকেত একবার ভাবলো স্বপ্ন দেখছে। নিজের গায়ে নিজে চিমটি কাটলোও, না- স্বপ্ন তো নয়, বেশ লাগছে। কী করবে অনিকেত? চেঁচিয়ে উঠলে যদি ও ফিরে আসে? মামণির কাছে যেতে হবে,গেলে যদি বকে? বকুক, মারুক – তাও যাবে অনিকেত।
“মামণি ....” নীরা খাটের দরজার দিকের পাশটাতেই ঘুমোছিল। মাঝে পরী ওপাশে অনিরুদ্ধ, হঠাৎ মামনি ডাকটা শুনে চমকে উঠলো। পাশ ফিরে উঠেই দেখে অনিকেত। “কী হয়েছে?” বলেই নীরা দেখল ছেলেটা দরদর করে ঘামছে। শ্বাস নিচ্ছে বড় বড় করে, “ভয় পেয়েছিস?” “একটা এভিল এসেছিলো”। অনিরুদ্ধরও ঘুম ভেঙে যায় অনিকেতের কথায়। “বাবিন – কী হয়েছে?” “একটা এভিল এসেছিল বাপি”। নীরার দিকে তাকায় অনিরুদ্ধ। খাট থেকে নেমে আসে, সোফায় বসে। বাবিনের গায়ে হাত রাখে “স্বপ্ন দেখেছে মনে হয়”। “স্বপ্ন না, বাপি – চিমটি কাটলে লাগছিলো।অনিরুদ্ধ হাসে, “বাবিন, ছোট বেলার বাহানা এখনো চালাচ্ছিস?” নীরার মনে পড়ে আলাদা শোওয়ালেই বাবিন শুতে চাইত না। অনি জোর করে শুইয়ে দিলে কিছুক্ষণ পরে “বাপি! মামণি” বলে চেঁচিয়ে দৌড়ে চলে আসতো, ভয় করতো নাকি। ওর জ্বরটা যেদিন এলো – তার আগের রাতেও ও নিজের ঘরেই শুয়েছিলো। ছুটে চলে যখন আসে তখন ধুম জ্বর গায়ে। ভয়ে এমন হয়েছিলো তবে? অনি আর নীরা দুজনেই দুষ্টু ছেলের বাহানা ভাবতো, বাপি- মামণির কাছে শোবার জন্য অজুহাত ভাবতো। খুব কম দিনই একা শুয়েছে বাবিন। কিন্তু তার মধ্যে ছুটে চলে আসেনি এমন দিন হাতে গোনা।ভয় কী নিয়ে পেতো এটা কখনো বলেনি বাবিন। অথচ এ তো বলছে। “অনি, মনে হয় না বাহানা”। “নীরা – ওতো ছোট্ট ছেলে, একা একটা ঘরে প্রথম শুলে ভয় লাগে”। নীরা বলে, “লাইটটা জ্বালাও, দরজা ভেজিয়ে দিও”। অনিরুদ্ধ তাই করলো। নীরা খুঁটিয়ে দেখলো অনিকেতকে, সত্যিই ভয় পেয়েছে। কাছে টেনে নিলো। জামাটা খুলিয়ে দিলো। ঘামে ভিজে গেছে। “অনি, টাওয়েল দাও”। “ঘেমে গেছিস খুব, বাবিন”। টাওয়েল দিয়ে বললো অনিরুদ্ধ, নীরা গা মোছালো। প্যান্টে হাত দিলো। অনিকেত বুঝল ও প্যান্টে হিসি করে ফেলেছে ভয়ে  মামণি বুঝে যাবে তো ... “প্যান্টে হিসি করে ফেলেছে”। অনিরুদ্ধ অবাক হয়, “কেন, বাবিন? ভয়ে? এমনিতে রাতে তো বিছানা ভেজাস না?” “ভয় করছিলো, ও খুব কাছে চলে এসেছিলো। ঝুঁকে দেখছিলো আমাকে। ওর গরম শ্বাস আমার গায়ে পড়ছিলো”। নীরা প্যান্টটা খুলিয়ে দে, অনিরুদ্ধর চোখ পরে তিলটার দিকে, নীরা ঠিকই বলেছে। একই জায়গায় তিল, “ও কে?” “জানি না, ওই তো এভিল  লম্বা চুল, শ্বাস টানছিলো কেমন একটা করে, আওয়াজ হচ্ছিল”। নীরা আর অনি মুখ চাওয়া চাওয়ি করে, অনিরুদ্ধ বলে “তুই দেখেছিস?” “হ্যাঁ, অল্প করে চোখ খুলে, পুরো খুলিনি, জেগে গেলে যদি মেরে ফেলে? ভাল্লুকের গল্পটা জানি তো”। “ভাল্লুক?”অনিরুদ্ধ অবাক চোখে তাকায়। “দুইবন্ধু আর ভাল্লুকের গল্প”। নীরা বলে, “ওহ "।“আমাকে পাঁচ মিনিট ধরে দেখলো, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। শ্বাস পড়া থামলে বুঝলাম চলে যাচ্ছে”। “চলে কোথায় গেল?” “পা টেনে টেনে চলে গেল, সাদা শাড়ি পরা ছিলো ... নীচের দিকে চলে গেল”। “নীচে মানে নীচের তলায়?” নীরা জিজ্ঞাসা করে। “হ্যাঁ, সিঁড়ির দিকে, লেডি ছিলো পেত্নী ....” “এসব গল্পের বই পড়ে জেনেছিস?” “হ্যাঁ, মামণি।" অনিরুদ্ধ বললো, “বই পড়েই মনে হয় কল্পনা হয়েছে”। “না, অনি, ভয়টা সত্যিই পেয়েছে”। “আমি নীচে গিয়ে দেখবো?” “নিধু কাকাকে ডাকো, একসাথে খোঁজো”। “আচ্ছা, তুমি একটু বাবিনকে দেখো”। “দেখছি!” অনিরুদ্ধ ছুটে চলে গেলো। নীরা টাওয়েল পরালো অনিকেতকে, “জামা?” “বাপির ঘরে তো – এনে দিচ্ছি? “অনিকেত নীরার হাত চেপে ধরলো, “না মামণি, তুমি থাকো, আমি টাওয়েল পরেই থাকবো”। নীরা অনিকেতকে কোলে বসালো। প্রথমবার। জড়িয়ে ধরলো। “ভয় নেই, আমি আছি, কিন্তু জামা প্যান্ট তো পরতে হবে, বোন আছে না? জেগে গেলে?” অনিকেত লজ্জা পেলো, “তাই তো! পরিয়ে দাও তবে”। "তোর বাপি আসুক, বাপিকে দিয়ে আনাচ্ছি”। “আমি ও ঘরে শোব না মামণি। আমি এখানে সোফায় শোবো, কি মেঝেতে শোবো।" নীরা দেখলো ভয়ে কাঁপছে এখন ছেলেটা। “সোফায় না, খাটেই শুবি”। “বাপির ঘরে?” “না, এঘরে, আমার পাশে”। নীরা একা ছাড়বে না বাচ্চাটাকে, কোন মতেই।

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

অডিও / ভিডিও

Search This Blog

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Powered by Blogger.