Friday, January 31, 2020

রাহুল ঘোষ

sobdermichil | January 31, 2020 |
পরাজিতদের গল্প  ---------------   (পর্ব ১১)  বহুরূপী বিদ্যুৎ
আগের পর্বেই লিখেছি, বিভীষণই লঙ্কার একমাত্র বিশ্বাসঘাতক নন। সেই সূত্র ধরে এগোলেই আমরা পেয়ে যাবো এমন আরও একজনকে। সেই ব্যক্তি লঙ্কার না-হয়েও লঙ্কা তথা অসুর সাম্রাজ্যের রাজনীতিতে এমন সম্পর্কে জড়িত, যা লঙ্কার ঘটনাক্রমকে এক অচিন্তনীয় অভিমুখ দিয়েছে। সেই ব্যক্তির নাম বিদ্যুৎজিহ্বা। এখানে বলে নেওয়া ভালো, রামায়ণের মূলানুগ বর্ণনায় এই চরিত্রটির খুব বেশি গুরুত্ব নেই। কিন্তু বিভিন্ন বিকল্প আলোচনায় ('অল্টারনেটিভ স্টাডি' বলতে আমরা যা বুঝি) বিদ্যুৎজিহ্বাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে। বিশেষত, রামায়ণের বেশ কয়েকজন আধুনিক ব্যাখ্যাতা এই চরিত্রটির উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে আলোকপাত করতে চেয়েছেন। কেন বিদ্যুৎজিহ্বার গুরুত্ব রামায়ণের কাহিনিতে আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল, সেকথা তাঁদের আলোচনা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়।

মূলানুগ ও বিকল্প, প্রায় সব বর্ণনাতেই বিদ্যুৎজিহ্বা একজন কালকেয় দানব। আরও ভালো করে বললে, তিনি কালকেয় প্রজাতির দানবদের রাজা বা রাজপুত্র (মতান্তরে, গোষ্ঠীপতি)। সুতরাং লঙ্কার না-হলেও, তিনিও অসুরদেরই একজন। তবে রাবণের মতো সর্বত্রগামী প্রভাব তাঁর নেই। এমনকি স্বর্ণলঙ্কার বৈভব ও জাঁকজমকের কাছে কালকেয়দের রাজধানী অশ্ম নেহাতই একটি সাদামাটা বিবর্ণ শহর। সভ্যতা-সংস্কৃতির দিক থেকেও তারা লঙ্কার তুলনায় অত্যন্ত পিছিয়ে। তা হলে কী হবে, কালকেয়রা অত্যন্ত পটু ও নৃশংস যোদ্ধা হিসেবে খ্যাত; যাদের হারানো নাকি প্রায় অসম্ভব! রাবণ প্রায় সম্পূর্ণ ত্রিলোক জয় করে ফেললেও, বহুবারের চেষ্টাতেও কালকেয়দের নিজের অধীনে আনতে পারেননি। ফলে, বিদ্যুৎজিহ্বার সঙ্গে তাঁর তীব্র শত্রুতা থাকাই স্বাভাবিক। তাহলে সেই ব্যক্তি লঙ্কার ভবিষ্যতের মোড় ঘোরানোর অন্যতম কারণ হয়ে উঠলো কী করে? এই প্রশ্নের উত্তরে যাওয়ার আগে আমরা একটু সাম্প্রতিক অতীতে ঘুরে আসবো।

কয়েক বছর আগে এস এস রাজামৌলি পরিচালিত 'বাহুবলী' সিরিজের দুটি চলচ্চিত্রে আমরা কালকেয়দের উপস্থিতি দেখেছি। ছবিদুটি প্রথমে তামিল ও তেলুগু ভাষায় নির্মিত হলেও, পরে তার মালয়ালম ও হিন্দি ডাবিং মুক্তি পায়; এবং আসমুদ্রহিমাচলে ইদানীংকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবি হয়ে ওঠে। 'বাহুবলী ২' তো দেশের সীমানা পেরিয়ে রাশিয়ান, চিনা ও জাপানি ভাষাতেও মুক্তি পেয়েছিল! যাইহোক, বাহুবলী সিরিজে মাহিষমতীর শত্রু এই কালকেয়রা অসভ্য ও হিংস্র এক জাতি। স্বভাবে অত্যন্ত নিষ্ঠুর, দেখতে কুৎসিত, দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলে, এমন কিছু মানুষ। রামায়ণের মূলানুগ বা বিকল্প বর্ণনায় কালকেয়রা স্বভাবের দিক থেকে ঠিক ওইরকম হলেও, দর্শন ও বাচনে অবশ্য অমন ভয়ানক নয়! বিশেষত, বিদ্যুৎজিহ্বাকে তো বেশ সুঠামদেহী এবং প্রায় রাবণের মতো সুপুরুষ হিসেবেই দেখানো হয়েছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে তাঁর বাকপটুত্ব। কথার মায়াজালে তিনি যে-কোনো শ্রোতাকে মুগ্ধ করতে সক্ষম। তিনি দক্ষ যোদ্ধা তো বটেই, তাছাড়া যুদ্ধের কৌশল রচনায় প্রায় অতুলনীয়! ঠিক সেই কারণেই, ছোটোখাটো একটি দানবরাজ্যের শাসক হলেও প্রবলপ্রতাপ রাবণ তাঁকে অধীনে আনতে পারেননি। এছাড়াও নানারকম ধূর্ততায় তিনি সিদ্ধহস্ত। এই কারণেই বিদ্যুৎজিহ্বাকে 'দুষ্টবুদ্ধি' বলে ডাকা হতো। এখানে মনে রাখতে হবে, আজকের আধুনিক বাংলায় 'দুষ্ট'-র চলিত রূপ 'দুষ্টু' শব্দটি দিয়ে যেমন কিঞ্চিৎ প্রশ্রয়ের সুরে কারও চঞ্চলমতি চপলতাকে বোঝানো হয়, প্রাচীন সংস্কৃতে মোটেই তেমনটা হতো না। সেখানে 'দুষ্ট' বলতে আক্ষরিক অর্থেই দুষ্ট, ইংরেজিতে evil অথবা vice যাকে বলা হয়। আধুনিক ব্যাখ্যাতাদের মধ্যে যাঁরা বিদ্যুৎজিহ্বাকে বিস্তারিতভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছেন, তাঁদের ব্যাখ্যায় পার্থক্য থাকলেও এই মূল বিষয়গুলি মোটামুটি এক।

যাইহোক, রাবণের বোন শূর্পনখা এই বাকপটু ও রণকৌশলী বিদ্যুৎজিহ্বার প্রেমে পড়লেন। কিন্তু কী করে? অমন শত্রুর তো রাবণের রাজত্বের চৌহদ্দির মধ্যে আসতে পারার কথা নয়! এই প্রসঙ্গে কবিতা কানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যাবতীয় শত্রুতা সত্ত্বেও কুম্ভকর্ণের বিয়েতে বিদ্যুৎজিহ্বা ছিলেন অন্যতম আমন্ত্রিত অতিথি। নিজের প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও, ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন পরামর্শদাতাদের কথায় রাবণ সেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অনেকটা কূটনৈতিক কারণেই এবং ভবিষ্যতে দেবশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য পাওয়ার আশাতেই এই সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ, যে-শত্রুকে পরাজিত করা যাচ্ছে না, তাকে বন্ধু করে নাও; তাহলে ভবিষ্যতে তার বিরোধিতা আর সহ্য করতে হবে না। যাকে কূটনীতির প্রথম পাঠ বলা যায়, আর কী! সেখান থেকেই শূর্পনখা-বিদ্যুৎজিহ্বা সম্পর্কের শুরু। যার পরিণতিতে রাবণের প্রাসাদে শূর্পনখার ঘরে বিদ্যুৎজিহ্বার ধারাবাহিক গোপন নৈশ অভিসার এবং একদিন ঘনিষ্ঠ অবস্থায় ধরা পড়ে যাওয়া। আনন্দ নীলকণ্ঠন অবশ্য দেখিয়েছেন, বিদ্যুৎজিহ্বা লঙ্কার জনসাধারণের মধ্যে মিশে গিয়ে রাবণের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি ও সশস্ত্র অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন; যে-কারণে লঙ্কার সৈন্যদল তাঁকে বন্দি করার জন্য খুঁজে বেড়াচ্ছিল। পাশাপাশি শূর্পনখার সঙ্গে গোপন প্রেমও অবশ্য চলছিল। এবং সেভাবেই একরাতে গুপ্তচরের কাছে খবর পেয়ে প্রাসাদের বাগান থেকে বিবস্ত্র অবস্থায় উভয়কে ধরে ফেলা হয়। আবার কেভিন মিসালের বর্ণনা অনুযায়ী, বিদ্যুৎজিহ্বাকে লঙ্কায় ঢুকে বেআইনিভাবে নানারকম কারবার চালানোর কারণে আটক করা হয়। ব্যাখ্যায় বিভিন্নতা থাকলেও, একটা ব্যাপারে প্রায় সকলেই একমত যে, বিদ্যুৎজিহ্বার ভয়ানকরকমের নারী-আসক্তি ছিল এবং শূর্পনখার পাশাপাশি আরও অজস্র মহিলার সঙ্গে তাঁর নিয়মিত সম্পর্ক ছিল। আরেকটি ব্যাপারেও প্রায় সকলেরই ব্যাখ্যা একইদিকে যায়। তা হলো, শূর্পনখার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার পিছনে বিদ্যুৎজিহ্বার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রাবণকে হত্যা করে লঙ্কা দখল করা।

শূর্পনখা অবশ্য এইসব বিশ্বাস করতেন না। ধরা পড়ে গেলেও হতোদ্যম হওয়ার মতো চরিত্র তাঁর নয়। বরং তিনি রাবণের উপরে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। কুম্ভকর্ণ, বিভীষণ, কৈকেশী, মারীচ --- প্রত্যেকেই তাঁকে বোঝাতে গিয়ে বিফল হলেন। রাবণকে একধরনের ব্ল্যাকমেইল করে তিনি বিদ্যুৎজিহ্বার সঙ্গে নিজের বিবাহ নিশ্চিত করলেন। কবিতা কানের মতে, রাবণ এই বিয়েতে রাজি না-হলে মন্দোদরীর কানে রাবণের বেদবতী-কাণ্ড তুলে দেবেন বলে শূর্পনখা হুমকি দিয়েছিলেন। ফলে, রাবণের রাজি না-হয়ে উপায় ছিল না। আমরা অবশ্য এখানে বেদবতীর কথায় ঢুকবো না; সেকথায় পরে আসা যাবে। এখন বিয়ে তো হলো। কিন্তু বিয়ের পরে, শূর্পনখাকেও যথেষ্ট আশ্চর্য করে বিদ্যুৎজিহ্বা লঙ্কার রাজপ্রাসাদেই থাকা শুরু করলেন। আধুনিক ভাবনাচিন্তায় যাকে 'ঘরজামাই' বলে, আর কী! শূর্পনখা অবশ্য কালকেয়-রাজ্যে গিয়ে নিজের সংসার শুরু করতেই উদগ্রীব ছিলেন। তাছাড়া, ওখানে গেলে তিনি রানি হয়ে থাকতে পারবেন। সেই বাসনা থাকা অস্বাভাবিক কিছুও নয়। কিন্তু পত্নীর ইচ্ছা অগ্রাহ্য করে বিদ্যুৎজিহ্বা জানালেন, অশ্মে তাঁর বাসস্থানটি নামেই প্রাসাদ। আসলে সেটি যোদ্ধাদের উপযুক্ত একটি দুর্গ ছাড়া কিছুই নয়। লঙ্কার বিলাসবহুল জীবনে অভ্যস্ত শূর্পনখা কিছুতেই অশ্মের ওই শ্রীহীন দুর্গে মানিয়ে নিতে পারবেন না।

অতএব বিদ্যুৎজিহ্বা লঙ্কায় থেকে গেলেন। শুধু তাই নয়, লঙ্কার রাজসভায় স্থানও পেলেন। বেশ কয়েকবছর পরে, শূর্পনখা ও তাঁর একটি পুত্রসন্তান হলো। তার নাম রাখা হলো শম্ভুকুমার (মতান্তরে, শম্বরী)। ইতিমধ্যে বিদ্যুৎজিহ্বা হয়ে উঠেছেন রাবণের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সেনাপতি। কোনো-কোনো বর্ণনায় তাঁকে অসাধারণ জাদুকরও বলা হয়েছে। যেমন, কথিত আছে, রামের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালীন অশোকবনে বন্দিনী সীতার মনোবল ভেঙে দিতে, একবার রামের মৃত্যুসংবাদ রটানো হয়। তখন সেই খবরের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য রামের কাটা মাথা হিসেবে যে-বস্তুটি সীতাকে দেখানো হয়, সেটি নাকি বিদ্যুৎজিহ্বার তৈরি! জিনিসটি এতই সুনির্মিত ছিল যে, সীতা ওটাকে সত্যি মনে করে শোকে ও ত্রাসে অজ্ঞান হয়ে যান। পরে অবশ্য ত্রিজটা (মতান্তরে, সরমা) রামের জীবিত থাকার সংবাদ দিয়ে সীতাকে আশ্বস্ত করেন। 

এহেন বিদ্যুৎজিহ্বা কিন্তু লঙ্কায় যথেষ্ট ক্ষমতা পেয়েও রাবণের বিরুদ্ধে তাঁর গোপন এজেন্ডা বজায় রাখলেন। নেশাতুর কুম্ভকর্ণকে আরও বেশি মাদকাসক্ত করে তোলার পিছনে তাঁর হাত ছিল। মত ও পথের পার্থক্যের কারণে বিভীষণ এমনিতেই রাবণের থেকে দূরত্ব রাখতেন। তাই একমাত্র সহায়ক কুম্ভকর্ণকে যদি নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া যায়, তাহলে রাবণকে একা করে দেওয়া যাবে; এমন একটি ভাবনা হয়তো তাঁর পরিকল্পনায় এসে থাকবে। যদিও বাইরে থেকে রাবণের আস্থাভাজন হয়ে ওঠার জন্য বেশ কিছু যুদ্ধে তাঁর অবদানের মধ্যে কোনো ফাঁকি ছিল না। তবে রাবণ তাঁকে আদৌ বিশ্বাস করতেন না। নেহাত বোনের জেদ ও হুমকির কাছে হারতে হয়েছিল বলে তিনি বিদ্যুৎজিহ্বাকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু পুরোনো শত্রুর উপর থেকে সন্দেহ মুছে ফেলার কোনো কারণ তিনি দেখেননি। তাছাড়া, প্রহস্ত ও মারীচের মতো বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ নাম ছিল তাঁর সহায়। ফলে, বিদ্যুৎজিহ্বার পিছনে রাবণের চর লেগেই ছিল। অত্যন্ত বুদ্ধি ধরলেও তিনি সেটা বুঝতে পারেননি। এভাবেই একদিন রাবণের বিরুদ্ধে তাঁর ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে গেল। সেই অপরাধে তাঁর প্রাণদণ্ড হলো। যদিও কীভাবে বিদ্যুৎজিহ্বাকে মারা হয়েছিল, তা নিয়ে বর্ণনান্তর আছে। কোনো-কোনো বর্ণনায় রাবণ নিজে হাতেই তাঁকে হত্যা করেন, যদিও রাবণের এক সাধারণ সৈনিক (মতান্তরে, গুপ্তচর) এই হত্যার দায় নেন। কারণ, বিদ্যুৎজিহ্বা ওই সৈনিক অথবা চরের স্ত্রীর (মতান্তরে, প্রেমিকার) সঙ্গে নিয়মিত যৌন সম্পর্কে লিপ্ত ছিলেন। কোনো-কোনো বর্ণনায় (যেমন, নীলকণ্ঠনের) দেখা যায়, বিদ্যুৎজিহ্বার ওই অবৈধ সংসর্গকে শাস্তি দেওয়ার জন্যই এক খুব সাধারণ ও নিম্নবিত্ত গুপ্তচর সাগ্রহে রাবণের কাছ থেকে তাঁকে হত্যা করার দায়িত্ব নেয়। এইভাবে রাবণ তাঁর রাজত্বের প্রথম বিশ্বাসঘাতকটিকে সরিয়ে দিতে সমর্থ হন। যদিও এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী ও ভয়ানক হয়েছিল। তার বিস্তারিত আলোচনায় আমাদের যেতেই হবে পরবর্তী কোনো পর্বে।

(ক্রমশ)
Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

অডিও / ভিডিও

Search This Blog

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Powered by Blogger.