মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৯

রুমকি রায় দত্ত

sobdermichil | ডিসেম্বর ৩১, ২০১৯ |
 উপহার
এই...ই ওঠো, এই...ই ওঠো... ঐ আবার ডাকছে পাখিটা, মনে মনে ভাবে হেমলতা। বাড়ির ঠিক পিছনেই সোনাঝুরির বনে; পাতার ফাঁকে ফাঁকে এখনও লেগে আছে আবছায়া অন্ধকার। ভোরের ঠান্ডা বাতাসের সাথে ভেসে আসছে শিরীষ ফুলের মিষ্টি গন্ধ! শিরীষ ফুল! কখন ফুটল, দেখিনি তো! ভাবতে ভাবতে উঠে বসে হেমলতা। কোলের উপর বালিশটা রেখে আরাম করে বসে; জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয়। ঝিরিঝিরি লাল পাপড়ির শিরীষ ফুলে ভরে আছে গাছটা। আহা,কি সুখ! এও বড্ড সুখের! গতকাল বিকেলেই তো বৈশাখের বৃষ্টির প্রথম ফোঁটায় সিক্ত হয়েছে প্রকৃতি। শুধু কি প্রকৃতি? মানুষ নয়? হ্যাঁ, মানুষও তো। যাঁরা প্রকৃতি ভালোবাসে অথবা ভালোবাসে না বৃষ্টি,তাঁরাও তো সিক্ত হয়েছে কাল। ঘুমন্ত পলাশের দিকে তকিয়ে বলে ওঠে-

- এই দেখো, একবার বৃষ্টির ফোঁটা পড়তেই শিরীষ গাছে কেমন ফুল ফুটেছে।

- উম, শব্দ করে পলাশ পাশ ফিরে শোয়। 

এই...ই ওঠো... আবার পাখিটা ডেকে উঠতেই, জানালার খুব কাছে মুখটা এগিয়ে নিয়ে পাখিটাকে খুঁজতে থাকে হেমলতা। এত খোঁজে তবু কোনোদিন দেখতে পেল না। আবার ডাকটা শোনা গেল, আর সঙ্গে সঙ্গে একটা হলুদ পাখি উড়ে গেল অন্য ডালে। গতবারও তাই হয়েছিল। ঠিক এই সময়ই এই এপ্রিলের শুরুতে পাখিটা হঠাৎ ডাকতে শুরু করেছিল। কথাটা মনে পড়তেই হাসি পেল হেমলতার। গতবার ঠিক ভোরবেলায় একদিন পাখিটা ডাকতেই হুড়মুড় করে উঠে বসেছিল পলাশ। ঘুম জড়ানো বিরক্ত গলায় বলেছিল,

- ‘ ছুটির দিনেও এমন ভোর বেলায় ডাকতে হয় হেম?’

- আমি তো ডাকিনি!

- তবে বললে যে, এই...ই ওঠো।

ঠিক তখনই পাখিটা ডেকে উঠে ওদের ভুল শুধরে দিয়েছিল। দুজনে মিলে সেদিন খুব হেসেছিল। এই দোতলার ঘর, বড় বড় জানালা, এমনই তো একটা বাড়ির স্বপ্ন দেখত সেই ছোটো থেকেই। বিয়ের আগে মা-বাবা যখন ছেলের বাড়ি-ঘর দেখতে এসেছিল, হেমলতা তখন একটাই কথা বলেছিল-

‘ছেলে যেমনই হোক মা, বাড়িতে যদি বড় বড় জানালা না থাকে আমি কিন্তু সেই ছেলেকে বিয়ে করব না’। কেমন করে বোঝাবে ও সবাইকে আলোহীন, সবুজহীন, পাখি,প্রজাপতিহীন একটা পৃথিবীর কল্পনাতেও ওর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। 

পাশে অঘোরে ঘুমাচ্ছে তিন্নি। ছোট্ট তিন্নির মুঠোকরা হাতটা নিজের হাতে নেয় হেমলতা। আলতো করে আঙুলগুলো খুলে চুমু খায়। ফুরফুরে কালো চুল ফ্যানের হাওয়ায় উড়ছে। ভোরের দিকে এইসময় বেশ ঠান্ডা লাগে। একটা পাতলা চাদর টেনে দেয় তিন্নির গায়ে। বিছানা থেকে নেমে পড়ে। ব্যালকনিতে রাখা গাছগুলো বেশ উজ্জ্বল হয়ে আছে। একটু পরেই সবাই কেমন যেন ম্লান হয়ে যায়! তখন মনটাও কেমন খারাপ হয়ে যায় হেমলতার। গ্রীষ্মের দুপুরের এই এক সমস্যা। কেমন যেন খাঁ-খাঁ করে বুকটা। মনে হয় সব থেকেও যেন কিছু নেই। ছাদে উঠে আসে হেমলতা। তাকিয়ে থাকে সোনাঝুরির বনটা’র দিকে। মাঝে মাঝে খুব ভয় লাগে ওর। পিছনের বনটা তো অন্য একজনের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। যদি এই বন সে কোনোদিন কেটে শেষ করে দেয়! যদি এই সবুজের বদলে দশতলা ফ্ল্যাট মাথা তুলে দাঁড়ায়! উফ্‌! ভাবনাতেও ভয়। চোখ বুঁজে দু-হাতে মুখ ঢেকে ফেলে। একছুটে নেমে আসে ছাদ থেকে সোজা ঘরে। ঘুমন্ত পলাশের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুখ লোকায়। ভয় পেলে বাচ্ছারা যেমন মায়ের আঁচলের নিচে মুখ লুকিয়ে নিজেকে নিরাপদ করতে চাই,ঠিক তেমন।

--কি হল হেম, এভাবে ছুটে এলে যে? হেমলতার মাথায় হাত বোলায় পলাশ।

-- ভয় লাগছে জানো। এবারে যদি সত্যিই ওরা গাছগুলোকে কেটে ফেলে! 

-- ওরা মানে? কেউ এসেছিল?

-- দু-দিন আগেই দু-তিন জন এসেছিল জানো।

-- সে তো কতবারই এসেছে। এতগুলো বছর ধরে যখন পড়ে আছে, অত সহজে ও জমি বিক্রি হবে না বুঝলে।

-- তবু ভয় লাগে জানো। এত অনিশ্চয়তা নিয়ে আমি আর থাকতে পারি না। আমরা কিছুটা জমি কিনে নিতে পারি না?

-- জানোই তো সে চেষ্টা যে করিনি এমন তো নয়। ওরা তো স্পষ্ট বলেছে এদেশি না হলে জমি বিক্রি করবে না।

হঠাৎ একটা শব্দে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায় হেমলতা পলাশের বুক থেকে। পাগলের মতো প্রশ্ন করে-

--ও কিসের শব্দ? তুমি শুনতে পেয়েছ?

-- ঠক ঠক ঠক ... বন কাঁপিয়ে শব্দটা যেন ঘুরতে ঘুরতে কানের পর্দায় ধাক্কা মারে হেমলতার। জানালার সামনে ঝুঁকে খুঁজতে থাকে শব্দের উৎস। বুঝতে না পেরে ছুটে চলে যায় ছাদে। দূরে প্রকান্ড শিরীষ গাছের গুঁড়ির চারিপাশে চলছে গাছকাটা মানুষের উল্লাস। বিস্তীর্ণ আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা গাছটির হাত-পা ছেটে ফেলা হচ্ছে। গাছের ডগায় বসে দা দিয়ে কোপ মারছে একজন আর নিচে ঝুলে থাকা দঁড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছে দু-জন। চিৎকার করে হেমলতা—‘ এই...ই...ই তোমরা গাছ কাটছ কেন? থামো...ও...ও তোমরা। এভাবে প্রকৃতিকে ধ্বংস করতে পারো না তোমরা’।

হেমলতার চিৎকার গাছের গায়ে গায়ে ধাক্কা খেতে থাকে। গাছ কাটা লোকগুলো ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে ঘুরে তাকায় ওর দিকে। হাসে, নিজেদের মধ্যে কি যেন কথা বলে, আবার কাটতে থাকে গাছ। হেমলতা চিৎকার করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে ছাদের কার্নিশ ধরে। হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। অসহায় আস্ফালন করতে থাকে।


পনেরো দিন ধরে পূর্বদিকের জানালাটা খোলেনি হেমলতা। শুধু বন্ধ ঘরের আড়াল থেকে শুনেছে গাছকাটা মানুষের উল্লাস আর গাছেদের আর্তনাদ। জানালার ওপারে একে একে ধরাশয়ী হতে থাকা গাছেদের কল্পনায় শুধু শিউরে উঠেছে। জানালাটা খোলার সাহস হয়নি ওর। পলাশ খুলতে গেলে চিৎকার করে উঠেছে চাই না আমার আলো, চাই না আমার বাতাস। শুধু পূবদিক নয়, এই ক’দিন বাড়ির একটি জানালাও খোলেনি হেমলতা। বন্ধ রেখেছে নিজেকে অন্ধকারে।

পনেরো দিন পর আজ ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল হেমলতা। গ্রিল ধরে সামনের একফালি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ঝড় থামার পর ধ্বংস হওয়া প্রকৃতির মতোই বড্ড শান্ত দেখাচ্ছে ওকে। পলাশ তাকিয়ে আছে হেমলতার দিকে। চোখের তলায় বেশ ঘন কালির দাগ। এগিয়ে এসে ওর পাশটিতে দাঁড়ায় পলাশ।

--কি দেখছ হেম?

--অন্যমনস্ক হয়ে উত্তর দেয় ‘ কিছু না তো। আর তো কিছু দেখার নেই! আর তো কিছু শোনার নেই! দেখেছ আর পাখিগুলোও আসে না! বারোটা বছর পূর্ণ হল এবাড়িতে আসা। যখন এসেছিলাম,তখন এই গাছগুলোর বেশির ভাগই ছোটো ছিল। প্রতিদিন এদের বেড়ে ওঠা দেখছি। আজ দেখব ছড়ানো-ছিটানো শব’। 

হেমলতার দু-চোখ বেয়ে নেমে আসে জলের ধারা। পলাশ চোখ মুছিয়ে দেয়। হাতধরে নিয়ে আসে পূবদিকের জানালার সামনে। 

--খোলো হেম জানালাটা।

হেমলতা চোখ তুলে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় পলাশের দিকে। চোখে লেগে আছে অসহ্য যন্ত্রণার চিহ্ন।

পলাশ দু-হাত দিয়ে ঠেলে খুলে দেয় পূবদিকের জানালাটা। হেমলতা ভয়ে ভয়ে তাকায় সামনে। চোখটা সামান্য চঞ্চল হয়ে ওঠে যেন। জানালার কোণে কাঠের ফাঁকে নিভৃতে বেড়ে উঠেছে একটা একইঞ্চির সোনাঝুরি গাছ। জানালার পাল্লায় ধাক্কা লেগে বীজসহ উঠে এসেছে সেটা। হেমলতা কুড়িয়ে নেয় সেটা। হাতের তালুতে রেখে চুমু খায়। 

--সামনে তাকাও হেমলতা।

পলাশের গলার আওয়াজে চমকে ওঠে। ভয়ে ভয়ে সামনে তাকায়। চোখটা আনন্দে চকচক করে ওঠে। মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে আছে শিরীষগাছটা আর তিনটে সোনাঝুরি।

--ভয় নেই হেম, ওদের গায়ে আর কেউ হাত ঠেকাতে পারবে না। নতুন মালিকের কাছ থেকে কিনে নিয়েছি ঐ জমি সহ চারটে গাছ। ওটা এখন আমাদের পৃথিবী। হেমলতা কান্নায় ভেঙে পড়ে পলাশের বুকে মাথা রেখে। আনন্দের কান্না থামাতে নেই জানে পলাশ। হেমলতার এলোমেলো চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলে—

--তুমি কি ভাবো আমি কষ্ট পাইনি? বিবাহবার্ষিকীর উপহার পছন্দ হয়েছে তোমার?

বাইরে শিরীষগাছে পাতার আড়াল থেকে ডেকে ওঠে একটা পাখি... ‘ পিউকাঁহা... পিউকাঁহা’

হেমলতের চোখ আবার চঞ্চল হয়ে ওঠে পাখিটির খোঁজে।

Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ,GS WorK । শব্দের মিছিল আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-